পাঁচ মিশালী

একটি গ্রামীণ রাস্তার ইতিবৃত্ত

মোর্শেদ আহমেদ চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৪-২০১৯ ইং ০০:২১:৪৫ | সংবাদটি ৩৩০ বার পঠিত

সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার থানার আলীনগর ইউনিয়নের কাদিমলিক গ্রামের বাসিন্দা আছাদুর রহমান চৌধুরী। ১৯৬২ সালে তিনি শিক্ষা জীবন শেষ করে শুরু করেন চাকরি জীবন। ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বকশিবাজারে সড়ক বিভাগে কাজ করেন। পরে চলে আসেন সিলেটে। চাকরি জীবনের বাকি সময়টুকু কাটিয়ে দেন সিলেট সড়ক ও জনপদ বিভাগে ড্রাসম্যান পদে। ১৯৯৭ সাল। দীর্ঘ ৩৯ বছর চাকরি জীবন শেষে অবসর যাপনের দ্বারপ্রান্তে। হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ভাবলেন, এই দীর্ঘ চাকরি জীবনে কী পেলেন? আর মানুষের কাছে কী রেখে গেলেন? অনেক চিন্তা করে ভাবতে লাগলেন তার নিজের গ্রামের মানুষের কথা। গ্রামের মানুষের জন্য একটা কিছু করে যেতে হবে। একদিন গ্রামে এলেন, দেখলেন গ্রামের মানুষের যাতায়াতের করুণ দশা। বন্যার সময় কিভাবে গ্রামের মানুষ পানি ডিঙিয়ে সাতার কেটে রাস্তা পার হয়। গ্রামের কোমলমতি ছাত্র ছাত্রীরা কি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে যায়। এ যেন গ্রামের রাস্তা নয় এটা একটা মরণ ফাঁদ। সব দেখে তিনি চিন্তা করলেন কি করে গ্রামের মানুষকে এই পরিণতি থেকে মুক্ত করা যায়?
তিনি ফিরে গেলেন শহরে। যেহেতু তিনি সড়ক ও জনপদ বিভাগে কাজ করতেন, সেই সুবাদে এলজিইডির অনেকের সাথে ভালো জানা শোনা ছিলো। তিনি যোগাযোগ করলেন তাদের উপর লেভেলের কর্মকর্তাদের সাথে। আলাপ আলোচনা করে তিনি একটি দরখাস্ত লিখলেন গ্রামের রাস্তা উন্নয়ন তথা পাকাকরণের জন্য। তিনি সেই দরখাস্ত প্রথমে আলীনগর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আব্দুল আহাদ এবং পরে ১৯৯৯ সালের ২৭ এপ্রিল তৎকালীন সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নাহিদের কাছ থেকে সিলেট সার্কিট হাউসে বসে সুপারিশ করে নিয়ে আসেন। ওই বছর ১৬ই জুলাই স্থানীয় একটি পত্রিকায় কাদিমলিক রাস্তা পাকাকরণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে একটি কলাম প্রকাশ করে। তারপর এলো সেই কাংখিত দিন। ১৯৯৯ সালের ১২ আগস্ট প্রকৌশলী অধিদপ্তর থেকে এলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার একটি অর্ডার। আমরাও আশায় বুক বাধলাম। কিন্তু বিধির কি লীলা। শুধু এই অর্ডারই এলো, বাস্তবে কোন কাজ হলো না। তাই দেখে তিনি আবারও ব্যবস্থা নিলেন এবং নতুন করে দরখাস্ত লিখলেন। শিরোনাম দিলেন ‘আর কত বছর অপেক্ষা করব?’ সেটা পেয়ে এলজিইডি কর্তৃপক্ষের যেন শুভবুদ্ধির উদয় হলো। তখন তাকে সেই কাজে কিছুটা সহায়তা করেন তার বড় জামাতা হাবিব আহমদ শিলু।
অবশেষে ২০১২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আমরা কাদিমলিক গ্রামের মানুষ পেলাম যাতায়াতের এক নতুন দিগন্ত। পাকাকরণ করা হলো আমাদের গ্রামের রাস্তা। আজ প্রায় ৬ বছর হয়ে গেলো রাস্তা পাকাকরণের। এখন আবার রাস্তার অবস্থা বেহাল হয়ে পড়েছে। প্রায় চলাচলের অনুপযোগী। আলহাজ্ব আছাদুর রহমান চৌধুরী থাকেন কানাডায়। কিছুদিন হলো দেশে এসেছেন। থাকেন গ্রামের বাড়ি। বাড়ি এসে যখন দেখলেন রাস্তার এই বেহাল অবস্থা তখন নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলেন না। তিনি যোগাযোগ করলেন এলজিইডির উপর লেভেলের কর্মকর্তার সাথে। তাদেরকে দাওয়াত দিলেন তার বাড়িতে ডালভাত খাওয়ার জন্য। আর মূল উদ্দেশ্য ছিল রাস্তার এই জরাজীর্ণ অবস্থা পরিদর্শন করানোর। তারা তার ডাকে সাড়া দিয়ে গত কিছুদিন আগে ঢাকা সড়ক বিভাগের এডিশনাল চিপ ইঞ্জিনিয়ার পিকে চৌধুরী এবং বিয়ানীবাজার থানার ইঞ্জিনিয়ার রামেন্দু হোম চৌধুরী দুজনেই এলেন তার বাড়িতে। দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর তিনি তাদেরকে নিয়ে রাস্তা পরিদর্শনে বের হলেন। তারা রাস্তার এই জরাজীর্ণ অবস্থা দেখে তাকে আশ্বাস দিয়ে যান যে অচিরেই রাস্তার একটা ব্যবস্থা করবেন। তাদের কথামতো তিন চার দিন পর উপজেলা থেকে লোক পাঠিয়ে রাস্তা পরিদর্শন করিয়ে সার্ভে করানো হলো। এখন শুধু সময়ের ব্যাপার। অচিরেই, সম্ভবত এই মাসেই আমাদের গ্রামের রাস্তার নতুন কাজ শুরু হবে। মহান আল্লাহতায়ালা তাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আমীন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT