বিশেষ সংখ্যা

শৈশবের নববর্ষ উদযাপন

শুভ্রেন্দু শেখর ভট্টাচার্য প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৪-২০১৯ ইং ০০:৪৫:৩৫ | সংবাদটি ১৬৯ বার পঠিত

বসন্তের আমেজ ম্রিয়মাণ হওয়ার পথে পুরো চৈত্র মাস জুড়েই নতুন বছরের আগমনী টের পাওয়া যেত। বিগত শতকের ষাট দশকের গোঁড়ার দিকের কথা। গোটা চৈত্র মাসের প্রতি রোববারেই সিলেট শহরের মনিপুরি রাজবাড়ী প্রাঙ্গনে মেলার আসর বসত এবং চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষের দিন পূর্ণাঙ্গরূপে এই মেলার সমাপ্তি ঘটত। পৌষের উত্তরায়ণ সংক্রান্তি উৎসবের পর থেকেই আমরা অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষায় থাকতাম এই মেলা মৌসুম ও নববর্ষ উদযাপনের। শুধু এই রাজবাড়ী প্রাঙ্গনের মেলাই নয়, আমার নিজ উপজেলা বিশ্বনাথের খাজাঞ্চী ইউনিয়নেও এক বিশাল বট গাছের ছায়াতলে পুনি নামক স্থানে এইভাবেই প্রতি শনি-মঙ্গলবারে মেলার আসর বসত যার সমাপ্তি ঘটত নববর্ষের দিনে এক বিশাল মেলার বাহারি সজ্জা।
প্রসঙ্গক্রমে মনিপুরী রাজবাড়ী সিলেট নগরের মির্জাজাঙ্গালে ১৮১৯-’২৬ এর মাঝামাঝি সময়ে স্থাপিত হয়। ১৮২২ সালে বার্মার সাথে পরাজিত হওয়ার পর মনিপুর রাজ্যের তিন সহোদর রাজা চৌর্জিত সিং, মার্জিত সিং ও গম্ভীর সিং সিলেটে এসে উক্ত বাড়িটি তৈরি করেন। এটা সহজেই অনুমেয় যে, বাড়িটি প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকেই রাজবাড়ী প্রাঙ্গনে এই মেলার আয়োজন করা হয়। এই মেলাতে তখন মনিপুরীদের হাতে বুনা নক্সি কাপড়, গামছা, চাদর, মাটির তৈরি বিভিন্ন সাজের পুতুল, পশুপক্ষী, নানারকমের খেলনা, বাশের ফটাস, মেয়েদের চুড়ি, সাজগোজের সামগ্রী, মুড়িমুড়কি এবং হস্ত ও কুটির শিল্পজাত দ্রব্যাদি পাওয়া যেত। উন্মুক্ত আকাশের নিচেই দোকানিরা পসরা সাজিয়ে বসতেন। মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল নাগরদোলা (চরকা-সিলেটি ভাষায়) ও বায়স্কোপ দেখা। তারপর ছিল ছোট ছেলেরা মেয়ে সেজে গান গেয়ে নৃত্য পরিবেশন করছে আর মানুষ উপভোগ করছে।
রববারি মেলায় আমাদের বরাদ্ধ ছিল আট আনা আর নববর্ষের মেলায় থাকত এক টাকা। বাবা, বড় ভাইদের কাছ থেকে এ অর্থ আদায় করা হত। নববর্ষের দিন ছিল মেলার সমাপ্তি দিবস। আকারে প্রকারে, বৈচিত্রে এই মেলা ছিল পরিপূর্ণ। মেলার বিরাট প্রাঙ্গন টইটুম্বুর করত বাহারি জিনিসের প্রাচুর্যে। আনন্দে দোলা দিত প্রাণমন, মনে হত পাখনা মেলে আকাশে উড়ে যাই। ঠেলা ধাক্কা খেয়ে একদিকে নাগর দোলায় উঠা, অন্যদিকে বায়স্কোপ, খেলনার দোকানে যাওয়া, বটবটি ফুটান কোনটা আগে, কোণটা পরে করব দিশা হারিয়ে ফেলতাম। সাথে গার্জিয়ানরা থাকত টেনশনে, কোন সময় না দৃষ্টির আড়াল হয়ে যাই। একবার একটু বড় হওয়ার পর আমরা তিন বন্ধু মিলে ‘এক আনায় তিন আনা মিলে’ খেলতে গিয়ে পুরো পুঞ্জিই খুইয়ে ফেললাম। এরপর খালি হাতে বাড়ীতে আসার পর শুরু হল নববর্ষের ধোলাই।
তখনকার দিনে আমাদের নববর্ষের দিন শুরু হত সকালে স্নান পর্ব দিয়ে। তারপর নতুন জামা কাপড় পরে আমরা মাবাবা সহ ব্যবসায়ীদের গদিতে নিমন্ত্রণ খেতে যেতাম। গদিতে দেখতাম, দোকানিরা একদিকে বিগত বছরের পাওনা আদায় করে বকেয়ার খাতাকে হালনাগাদ করছেন, অন্যদিকে কর্মচারীরা আগন্তুকদের মিষ্টি মুখ করাচ্ছেন। রঙিন কাগজ আর লতা পাতা দিয়ে দোকান নতুন সাজে সাজান হত। চারিদিকে একটা উৎসব মুখর পরিবেশ ।সমানে একে অন্যে সম্ভাষণ, কুলাকুলি চলছে। কী একটা সম্প্রীতি, একাত্মবোধ এ যে অনির্বচনীয় এক মিলন মেলা। কে হিন্দু, কে মুসলমান, কোন ভেদাভেদ নেই, কুলাকুলির উষ্ণতায় বছরের প্রথম দিনেই সব ভেদাভেদ শূন্যে মিলিয়ে যাচ্ছে। এ যে আবহমান বাঙলার চিরায়ত দৃশ্যপট যা ঐতিজ্যে পরিণত হয়েছে কালক্রমে।
প্রসঙ্গত, পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ইতিহাস সুপ্রাচীন। সম্রাট আকবরের আমল থেকেই পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উদযাপনের সূচনা। সম্রাট আকবর তারিখ-ই-এলাহি প্রবর্তন করে ১৪ টি নতুন উৎসবের সূচনা করেন। এর মধ্যে একটি উৎসব হল নববর্ষ উদযাপন। তখন থেকেই পহেলা বৈশাখ নববর্ষের উৎসব উদযাপন করা শুরু হয়। প্রজাদের চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা পরিশোধ করতে হত। এরপর দিন ভূমি মালিকেরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হত। এই উৎসবটি কালক্রমে একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। পরবর্তীতে কালের প্রভাবে বিভিন্ন সময় এর রুপ পরিবর্তন ঘটতে থাকে। পূর্বাপর লক্ষ করলে দেখা যায়, বাঙলা নববর্ষের ইতিহাস একটি সৃষ্টিশীলতার ইতিহাস। সময়ের পরিক্রমায় ও যুগের প্রভাবে উৎসবের রীতিনীতি পালনের ধরন পালটেছে, নতুন উপকরনের সংযোগ হয়েছে, উৎসব নতুন মাত্রা পেয়েছে। নববর্ষের শুরুর দিকে হালখাতা, পুণ্যাহ, এইসব আয়োজন ছিল, পরবর্তীতে যোগ হয় বৈশাখি মেলা, ঘুড়ি উড়ান, শোভা যাত্রা, সূর্যোদয়ের সাথে সাথে গানের মাধ্যমে নতুন বছরের বরনসহ নানা ধরনের আয়োজন। আর হাল আমলে নববর্ষ উদযাপনের উৎসবে আধুনিকতার ছাপ পড়েছে, যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। আজকাল নতুন বছর শুরু হয় পান্তা ইলিশ খেয়ে, রমনা বটমূলে গানের মাধ্যমে নতুন বছরকে আবাহনের মাধ্যমে এবং এরপর মঙ্গল শোভাযাত্রা দিয়ে নতুন বছরে মঙ্গলের বার্তা বহন করে। তারপর আছে, বৈশাখি কনসার্ট, ডি জে পার্টি , ফ্যাশন শো ইত্যাদি ধামাকা; আরও কত আনন্দের উপকরন যোগ হবে কালের বিবর্তনে ও প্রজুক্তির উদ্ভাবনে। ইহাই স্বাভাবিক, স্থবিরতা মৃত্যুর সামিল, গতিশীলতাই জীবন।
আসলে শুধুমাত্র ঢাকা শহরে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের নিরিখে সারা বাঙলা দেশের নববর্ষ উদযাপনের ইতিহাস নির্ধারণ করা যায় না। সাধারণভাবে একটি প্রচলিত ধারনা হল পাকিস্তানি সামরিক সরকারের বাঙালিদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদ স্বরূপ ১৯৬৭ সালে রমনা বটমূলে ছায়া নটের নববর্ষ বরনের অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পূর্বে পহেলা বৈশাখ এত জনপ্রিয় ছিলনা। এ ধারণাটি ঢাকা শহরের ক্ষেত্রে কিছুটা প্রযোজ্য হলেও গ্রামীণ বাঙলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আরেকটি মতবাদ প্রচলিত আছে যে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের প্রাক্কালে ১৯১৭ ও ১৯৩৭ সনে বৃটিশদের বিজয় কামনা করেই এদেশে নববর্ষের উৎসব উদযাপন শুরু হয়। এ মতবাদও গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়না।
এ কথা অনস্বীকার্য যে, নববর্ষ উদযাপনে যতই আধুনিকতার ছাপ পড়ুক, প্রযুক্তির ব্যবহারে নতুন উপকরনের সংযোগে বহুমাত্রিক আড়ম্বরের সমাগম ঘটুক, কিন্তু আবহমান বাঙলার সেই হালখাতা, নতুন জামা কাপড় পরে সাবেকি ব্যবসাকেন্দ্রে মিষ্টি খেতে যাওয়া, বৈশাখি মেলায় লোকজ সংস্কৃতির ধারক নানা পণ্যের সমাহার, গ্রামীণ কৃষি ও কুটির শিল্পজাত দ্রব্যের বাহারি সমাহার, নাগরদোলা, পুতুল নাচ, মুরি মুড়কির দোকান ইত্যাদি আজও নতুন রূপ, মাধুর্যে স্নিগ্ধতায় প্রবহমান; এ যে গ্রামীণ বাঙলার জনমানুষের জীবন আচারের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, প্রাচীন এই জনপদের মানুষের নির্মল বিনোদনের খোরাক। নববর্ষ আসলেই আমার শৈশব স্মৃতি জেগে উঠে, মানস চক্ষে দেখতে পাই সিলেটের মনিপুরি রাজবাড়ী প্রাঙ্গনে বৈশাখি মেলার বাহারি আয়োজন।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT