বিশেষ সংখ্যা

বৈশাখে রবীন্দ্র-নজরুল

মোহাম্মদ আব্দুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৪-২০১৯ ইং ০০:৪৭:১৫ | সংবাদটি ২০৬ বার পঠিত



আমরা চিরদিন বাঙালি। বহু শতাব্দীকাল ধরে চলছি বাংলার মৃত্তিকায় গড়াগড়ি করে। আমরা হেঁটে চলেছি বাংলার মাটির পুষ্টিতে ভরা ফল, ফসল, জলজ প্রাণ, মাটির লালিত তৃণভোজী পশু আর যতো পাখিদের কাছে ঋণের বোঝা নিয়ে। এই বাংলার যুগ যুগের কিছু মজার ব্যাপার আছে যা আমরা লালন করে পালন করে হয়ে আছি বাঙালি হয়ে, বিশ্বের এক জাতি হয়ে। আমাদের এসব ব্যাপার আমাদেরকে আনন্দ দেয়। আর এসব আনন্দের ব্যাপারকে আরো জীবন ঘনিষ্ঠ করে রেখে গেছেন আমাদের বাঙালির ঘরের মনীষী অনেকে। আমাদের এতোসব মজার ব্যাপারগুলোই হলো আমাদের উৎসব। আমরা বাঙালিদের আনন্দ উৎসব। এসবই আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের লালিত ঐতিহ্য। এমনি এক শিকড় ঘনিষ্ঠ আনন্দঘন প্রাণের উৎসব বাংলা সনের প্রথম মাস বৈশাখ ঘিরে। পহেলা বৈশাখ বৈশাখী মেলা হয়। এ মেলা একান্তই বাঙালির মেলা।
যে কোন মেলা সৃজনশীল ও মননশীল মানুষের যতেœ, সাধারণ সকল মানুষের কাছে ধরা দেয় অতি আপনার হয়ে। এসব সৃজনশীলতা থাকে অনেকের, থাকে কবি সাহিত্যিকদের। আমরা এই বাংলার মাটিতে অনেক গুণিজন পেয়েছি। এখানে যেহেতু বৈশাখ নিয়েই কথার শুরু, তাই বৈশাখ মাস বা বৈশাখী মেলা ঘিরে আমাদের বৈশাখী উৎসবে যে দুজন কবির প্রভাব কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যায় না, তাদের দুটি গানে বিশেষ মনোযোগ দিয়ে কিছু কথা বলতে চাই।
বৈশাখ মাসকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম গান লিখেছেন, সুর করেছেন এবং তা গীত হয় বিশেষ আবেগ নিয়ে বৈশাখ মাসের প্রাক্কালে ও সারা বৈশাখ মাস জুড়ে। গান দুটি আমরা শুনে থাকি এবং আন্দোলিত হই সময়ে। দুই কবির গান দুটিতে কি আছে তা ভালোভাবে উপলব্ধি করতে হলে গানের কথায় গভীর মনোযোগ দিতে হবে এবং গান গাওয়া শুনতে হবে। আসুন গানের কথায়। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত গান-
“এসো এসো এসো হে বৈশাখ।/ তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুর দাও উড়ায়ে/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।/ যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি/ অশ্রু বাষ্প সুদূরে মিলাক।/ মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,/অগ্নি¯œানে শুচি হোক ধরা।/ রসের আবেশ রাশি শুষ্ক করি দাও আসি,/আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ।/মায়ার কুজ্ঝটি জাল যাক দূরে যাক।”
গানের কথা এখানে পরিষ্কার। পড়ে বুঝা যায়, কবি বৈশাখ মাস ও এ মাসের চরিত্র সম্পর্কে খুবই সচেতন। তিনি বৈশাখ মাসকে যথা সময়ে আসার আহবান জানাচ্ছেন এবং তিনি জানেন বৈশাখ এসে পুরনো বছরের আবর্জনা সাফ করে দিবে। হ্যাঁ আমাদের বাংলায় বৈশাখ মাস তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে আসে আর প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টি হয়। বাতাসের ঝাপটায় গাছপালা, দুর্বল বাড়ি সহ রাস্তায় জমে থাকা যতো জঞ্জাল সব উড়িয়ে নিয়ে যায়। ময়লা ধুয়ে পরিষ্কার করে ফেলে। এই কথাগুলোই আমরা গানে শুনি। তখনই কথামালার যথার্থতা আমাদের কাছে ধরা দেয়। তবে এ গানের সুর এতোটাই নরম স্বভাবের যা তর্জন গর্জনরূপী বৈশাখী আকাশের সাথে যথেষ্ট দূরত্বে থাকে। এই দূরত্বটুকু আমার কাছে এমনি এমনি ধরা দিতো কি-না জানা নেই। তবে আমাদের আরেক কবি কাজী নজরুল ইসলাম যে গান উপহার দিয়েছেন, তা শুনেই যে ব্যাপারটা ভাবতে পারছি তা সত্য। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর “এসো এসো এসো হে বৈশাখ।” গানের কথায় বৈশাখী দর্শন যেভাবে তুলে ধরেছেন, প্রকৃত অর্থে গানের সুরে সেই চেতনা জেগে উঠেনি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমসাময়িক আমাদের বাংলা সাহিত্যের আরেক প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব বিদ্রোহী কবি খ্যাত কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন বৈশাখ নিয়ে। আসুন কথাগুলো পড়ি আর প্রতিষ্ঠিত সুরে গাইতে চেষ্টা করি-
“তোরা সব জয়ধ্বনি কর!/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর!/ ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!/ আসল এবার অনাগত প্রলয় নেশায় নৃত্য পাগল,/ সিন্ধু পারের সিংহ দ্বারে ধমক হেনে ভাঙল আগল!/ মৃত্যু গহন অন্ধকুপে, মহাকালের চন্ড-রূপে ধু¤্র-ধূপে/বজ্র শিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ঙ্কর।/ ওরে ওই হাসছে ভয়ঙ্কর!/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!”
আমরা জানি এই গানটি খুবই জনপ্রিয়। বিশেষ করে চৈত্র মাসের শেষ দিকে যখন আকাশ ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে তখন মনে জাগে আকাশ কি আজ বিদ্রোহ করবে? মানুষের মনে ভয় এবং আশার সঞ্চার হয়। বৈশাখী আকাশের এলোকেশ চেহারা আর মেঘের গর্জনে বাঙালি পরিচিত। তাই ঘর-বাড়ি আগেই সংস্কার করে শক্ত করে নেয়। এরই পাশাপাশি মানুষের মনে জাগে আশা। বৈশাখ মাসে যে বৃষ্টি বর্ষণ হয় তাতে নিষ্প্রাণ মাটি প্রাণ ফিরে পায়। গাছে গাছে নতুন করে নানান রকম ফল আসে। মরা খাল, শুকিয়ে যাওয়া পুকুর, নদী প্রাণ ফিরে পায়। ব্যাঙ, মাছ ইত্যাদি জলজ প্রাণে জয়োল্লাস লক্ষ করা যায়। তাই কবি কালবোশেখির ঝড়ে নতুন করে জেগে ওঠার আহবান জানিয়ে, পুরাতন জঞ্জাল সরিয়ে নতুন পতাকা ওড়াতে বলেন। আসলে গানটি যেভাবে সুর করা হয়েছে এবং গাওয়া হয়ে থাকে তাতে বৈশাখ মাসের চরিত্র যেনো একেবারেই ফুটে উঠে। আমি এখানে শুধু দুটি গানে আমাদের বৈশাখ যেভাবে এসেছে এবং আমার কাছে ধরা পড়েছে তা-ই পরিস্ফুট করেছি।
প্রিয় পাঠক, এখানে কেউ আমাদের কবিদ্বয়ের সম্পর্কে তুলনামুলক কোনো নেতিবাচক কিছু খোঁজার চেষ্টা করে পক্ষপাত দুষ্টে দোষি না হওয়াই ভালো। দুজনের গানের আবেদন প্রায় একই এবং বৈশাখী বৈশিষ্ট্য আছে। শুধু গান দুটি আলাদা করে শুনলেই, দুটি গান যে ভিন্ন রকম শিহরণ জাগায় সেটিই আমি খুঁজে পেয়েছি। আমাদের ষড়ঋতুর এই বাংলাদেশে বারোটি মাস। প্রতিটি মাস তার নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য গুণে আমাদের কাছে পরিচিত। ফাল্গুন যেমন তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে স্বমহিমায় উজ্জ্বল তেমনি জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, চৈত্র প্রতিটি মাসের আলাদা ধরনের দর্শন আছে।
শেষ করছি আমার কথা। আমার উপস্থাপনার মূলে আছে আমাদের বাংলা বর্ষের প্রথম মাস বৈশাখ এবং আমাদের বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্যকে কবিতা, গল্প, নাটক ও গানে সমৃদ্ধ করেছেন যে দুজন সাহিত্যিক তাঁদের নিয়ে নির্দিষ্ট বিষয়ে আলোচনা। এখানে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কবি কাজী নজরুল ইসলাম বৈশাখের যে দর্শন ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁদের দুটি গানে তার উপর। এ পর্যায়ে এসে আমাকে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে আর অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। আমার কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় দুটি গানের আবেদন এক রকম হলেও সমান ঘনিষ্ঠতা পায়না। বাংলা সাহিত্যের দুই ঝলমল তারকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। বৈশাখ নিয়ে এই দুই মনীষীর অত্যন্ত জনপ্রিয় দুটি গান হচ্ছে (১) ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ (২) ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়’। আমার মনে বৈশাখের চরিত্রের সাথে সুরে ও কথায় কাজী নজরুল ইসলামের গানটি বেশ মানিয়ে যায়। বৈশাখ এমনি ঝড়ের বেগ যা নজরুলের গানেই মিলে। রবীন্দ্রনাথ অনেকটাই শান্ত আহবান জানাচ্ছেন যা বৈশাখী চরিত্রের সাথে পুরোপুরি যায় না। বৈশাখ মাস এলে সকল বাঙালির মতো আমিও দুই বিখ্যাত কবির গান শুনি এবং দুই চরণ গাইতে চেষ্টা করি। এ থেকে গান দু’টির কথা ও সুর কতোটা বৈশাখের চরিত্রের সাথে মিলে তা তুলে ধরেছি এখানে।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT