বিশেষ সংখ্যা

বৈশাখী ভাবনা

অহিদুর রব প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৪-২০১৯ ইং ০০:৪৭:৪৩ | সংবাদটি ১৯০ বার পঠিত



আবার এলো বৈশাখ। আসে প্রতি বছর। 'এসো হে বৈশাখ এসো’-এর জবাবে প্রকৃতি হয় তো বলছে, ‘এসেই তো গেছি, চৈত্রের শেষে আগাম কালবোশেখির প্রবল দাপটে’। এখন বৈশাখ আসে বর্ণাঢ্য সাজে, বিপুল গণজোয়ার নিয়ে। এতো রঙ্গিন বৈশাখ আমাদের শৈশব, কৈশোর কিংবা যৌবনে ছিল না। বাংলা নববর্ষকে ঘিরে এখন হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয় । আগে এমন ছিল না। বর্ষবরণের সময় রঙ-বেরঙের নতুন পোশাক পরার যে ধুম এখন পড়ে, আগে তেমনটি ছিল না। তবে, নতুন কাপড়-চোপড় কেনা না হলেও যার যার সাধ্য অনুযায়ী সংগ্রহে থাকা ভাল জামা-কাপড় সব সময় পরা হতো বাংলা নববর্ষে।
আমাদের শৈশবে ‘হালখাতা’ ছিল পয়লা বৈশাখের প্রধান আকর্ষণ। ব্যবসায়ীগণ নিজ নিজ দোকানপাট সাজাতেন রঙ্গিন কাগজ কেটে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভেতরকে ঝকঝকে তকতকে করা হত। কেউ কেউ গেইটও বাঁধতেন দোকানের সামনে। দোকানে যারা নিয়মিত কেনা-কাটা করতেন তাদেরকে নিমন্ত্রণ করা হতো। এখন যেভাবে বকেয়া পাওনা আদায়ের জন্য শুধু দেনাদারদের দাওয়াত করা হয়, তখন তা করা হতো না। ছোটবেলা পহেলা বৈশাখে বাবার সাথে বেশ কটি দোকানে যাবার স্মৃতি আছে। সেখানে থাকতো রসগোল্লা, নিমকি, জিলাপি, খাজা প্রভৃতি। কেউ কেউ করতেন আখনি পোলাও। যদিও আমার বাবা কোনও ব্যবসাদার ছিলেন না, তার কাছে কারো পাওনা ছিল না। এখন সারা বছর দু’তিনটে দোকান থেকে কেনাকাটা করি। কই, কেউ তো আমন্ত্রণ জানায় না। কারণ, বাকিতে বাজার করি না। বেশ কবছর আগে কাজির বাজারের এক ব্যবসায়ীকে বলেছিলাম, ‘সালের দাওয়াত তো পেলাম না। তিনি বলেন, ‘আপনি তো খেলাপি নন যে দাওয়াত দিয়ে অসম্মান করবো।’ এর মাধ্যমে জানলাম, এখন হালখাতার আমন্ত্রণ নিছক বকেয়া আদায়ের বিজ্ঞপ্তি মাত্র। এখন সবাই একই দিনে হালখাতা করে না। কেউ করে পয়লা বৈশাখ, আবার কেউ কেউ করেন বৈশাখ মাসের অন্য কোন দিন। পাওনা আদায়ের গতির উপর নির্ভর করে 'হালখাতা' তথা নতুন বছরের জন্য নতুন হিসেবের খাতা খোলার দিন।
বাংলা নতুন বছরকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য করার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে তার সুবিধা ধনিক বণিকরা নেন, কিন্তু বাংলা বর্ষকে তারা অন্তরে ধারণ করেন না। বড় বড় প্রতিষ্ঠান জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বছর গণনা করেন ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে, বৈশাখের সাথে ঠোঁট মেলান মাত্র। দেশের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাইন বোর্ডের দিকে তাকালে বুঝতে পারি, আমরা জাতির নামে কতটা বদজাতি করছি। সেদিন দেখলাম, বাঁশ-মাটির বেড়া দিয়ে ধান ভাঙ্গানোর মেশিন বসানো এক জীর্ণ দোকান। সেখানেও লেখা অমুক এন্টারপ্রাইজ'। এ থেকে বুঝা যায়, আমাদের অনুকরণ ও মূর্খতার মাত্রা কোন পর্যায়ে গেছে। অথচ ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে বসবাসকারী বাঙালিরা তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সুন্দর সুন্দর বাংলা নাম ব্যবহার করছেন।
বৈশাখ উপলক্ষে আপামর জনগণের যে জাগরণ ঘটেছে তা খুবই উপভোগ্য এবং প্রণিধানযোগ্য। মূলতঃ প্রান্তিক মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ বৈশাখকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। আমাদের কৃষক, আমাদের মাঝিমাল্লা, আমাদের দিনমজুর একদিনের বাঙালি নয়, তাঁরা সারা বছরের বাঙালি। শহুরে একদিনের বাঙালিরা পয়লা বৈশাখ ছাড়া বাংলা মাস তারিখের হিসেব রাখেন না, কিন্তু কৃষক-মজুর, মাঝি-মাল্লার কাছে সে হিসেব স্বভাব জাত, মুখস্ত। কৃষক-মজুর সারা বছরই লুঙ্গি, গামছা ব্যবহার করে, আর শহরের একদিনের বাঙালি ‘একদিন’ এই সাজে সাজলেও ৩৬৪ দিন-এমনকি ঘরের ভেতর লুঙ্গি পরাকে ‘স্মার্টনেসের’ খেলাপ মনে করে। পান্তাভাত কৃষক-মজুরের সারা বছরের সকালের আহার। কিন্তু শহরের একদিনের বাঙালিরা গরম ভাতে ঠান্ডা পানি ঢেলে পান্তা বানিয়ে হাজার টাকার ইলিশ দিয়ে তা খেয়ে বলেন, এটা বাঙালি সংস্কৃতি। কিন্তু বাংলার কৃষকের কাছে ইলিশ হলো স্বপ্ন । দুই মন ধান বিক্রি করেও একটি ইলিশ কিনতে পারেন না। আর ইলিশ কখনো বৈশাখের অনিবার্য অনুষঙ্গ ছিল না। একদিনের জন্য ‘ভং’ না ধরে আমরা যারা সামর্থবান তারা যদি বছরে একজন সত্যিকারের কৃষককে একটা ইলিশ দান করি, একজন দিনমজুরকে একবেলা ইলিশসহ ভালো খাবার খাওয়াই তবে আমাদের উৎসব সার্থক হবে।
নববর্ষের উৎসবে চিন্তা করতে হবে ফসল হারানো, ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়া থেকে বঞ্চিত কৃষকের কথা। প্রতিকারের বাস্তব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যে মজুর কোদাল বা অন্য হাতিয়ার নিয়ে টিলাগড় পয়েন্ট, জেলরোড, বাঘবাড়ি পয়েন্টসহ দেশের আনাচে-কানাচে বসে থাকে কাজের ডাক পাওয়ার অপেক্ষায়, বেলাগড়ায় নয়টা, দশটা, এগারোটা বাজে, কাজের ডাক পায় না, তখন তার চেহারা কি আমরা দেখি? কত অসহায় সে। ঘরে ফিরে ভগ্ন হৃদয় নিয়ে, অনাহারে অর্ধহারে দিন কাটে। উৎসবের খরচের সামান্য অংশ দিয়ে এদের দুঃখ অনেকখানি লাঘব করা যায়।
বাংলা নববর্ষে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ উৎসব ভাতা পান মূল বেতনের শতকরা বিশ ভাগ। বেসরকারি বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কর্মকতাও পেয়ে থাকেন। কৃষক-মজুরদের জন্যে আমাদের চিন্তা করতে হবে। ফসল হারানো কৃষক তার দেনা থেকে রেহাই পায় না। ফসল হারানোর চাক্ষুস প্রমাণ দিয়েও সে মাফ পায় না। বৈশাখের উৎসবে আমাদের ভাবতে হবে, বৈশাখ থেকে চৈত্র পর্যন্ত বাংলাদেশের মাঠে-ঘাটে কত কৃষক-মজুর বজ্রপাতে মারা যায়। উৎসবের বাজেটের এক অংশ দিয়ে হাওরে মাঠে ঘাটে বজ্রপাত নিরোধক ধাতব খুঁটি স্থাপনের ব্যবস্থা করা যায়, হাওরে একটু উঁচু জায়গা করে গাছ, বিশেষত তালগাছ লাগালে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা কমবে। এ বিষয়ে কৃষক-মজুরকে প্রশিক্ষণ দেয়াও জরুরি। প্রতি বছর শত শত কৃষক বজ্রপাতে মারা যাবে, আর আমরা নির্বিকার উৎসব করবো এটা হয় না।
আমরা বৈশাখী বাণিজ্যের সুযোগ গ্রহণ করি, কিন্তু মানসম্মত বর্ষপঞ্জি বের করতে আমাদের যতো লজ্জা ও কুণ্ঠা। কিন্তু ইংরেজি বছরের বর্ণাঢ্য ক্যালেন্ডার ঠিকই বের করি । সংবাদপত্রগুলো এক পাতার বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রকাশ করে একটু মুখ রক্ষা করে ।
বাংলা নববর্ষের উৎসব ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে নরপশুদের দ্বারা সন্ত্রমহানি ঘটেই চলেছে। এর কার্যকর প্রতিকার করতে না পারলে জাতি হিসেবে আমাদের মর্যাদা ভূ-লুষ্ঠিত হতে থাকবে।
বাঙালি সম্প্রদায়ের সিংহভাগ বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ (অধুনা বাংলা) প্রদেশে বসবাস করে। বাংলাদেশে প্রতি বছর পয়লা বৈশাখ হয় ১৪ এপ্রিল। এখানে বাংলা সনের প্রথম পাঁচ মাস ৩১ দিনের। পরবর্তী ৭ মাস ৩০ দিনের। কিন্তু ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ২৯, ৩০, ৩১ ও ৩২ দিনের বাংলা মাস আছে। যেমন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দের বৈশাখ থেকে আশ্বিন পর্যন্ত ৬ মাসের মধ্যে আষাঢ় মাস ৩২ দিনের, অন্য ৫ মাস ৩১ দিনের। অগ্রহায়ণ ও মাঘ মাস ২৯ দিনের এবং কার্তিক, পৌষ, ফাল্গুন ও চৈত্র ৩০ দিনের। আবার সব বছর সব মাস সমান নয়। ১৪২৬ বঙ্গাব্দের পৌষ ও মাঘ মাস ২৯ দিন। আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, ফাল্গুন ও চৈত্র মাস ৩০ দিন, বৈশাখ, আষাঢ়, ভাদ্র মাস ৩১ দিন, জ্যৈষ্ঠ ও শ্রাবণ মাস ৩২ দিন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পয়লা বৈশাখ ১৫ এপ্রিল। (দ্র. ১৪২৫ ও ১৪২৬ বঙ্গাব্দের লোকনাথ পঞ্জিকা) প্রায়ই দেখা যায় সেখানে পয়লা বৈশাখ আমাদের একদিন পরে হয়। বাঙালি হিন্দুদের ধর্মীয় দিবস ঠিক হয় চন্দ্রমাস ও বাংলা মাসের মধ্যে সমন্বয়ে। বাঙালি মুসলমানদের ধর্মীয় দিবস ঠিক হয় শুধু চন্দ্রমাস অনুযায়ী। বাংলা মাসের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দু তথা সনাতন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে যারা ধর্মপ্রাণ তারা সমস্যায় পড়েন। একই দিনে তাদেরকে ঘরে ‘চৈত্র সংক্রান্তি’ এবং বাইরে পয়লা বৈশাখ পালন করতে হয় । এর কোন বিহিত করা যায় কি-না ভেবে দেখা দরকার।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT