উপ সম্পাদকীয়

কে জন্মায়, হে বৈশাখ?

রতীশ চন্দ্র দাস তালুকদার প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৪-২০১৯ ইং ০০:৪৮:৪৯ | সংবাদটি ১৫৪ বার পঠিত

সভ্যতার বিকাশের সাথে মানুষ অনুভব করেছে কোন বিশেষ ঘটনাকে সময়ের গন্ডিতে বেঁধে স্মরণীয় করে রাখতে। তাই দেখা যায়, কোন রাজা, বাদশার সিংহাসনে আরোহণের দিনকে বা কোন মহাপুরুষের আবির্ভাবকালকে ভিত্তি ধরে বর্ষ গণনা শুরু হয়েছে। তখনকার জ্যোতির্বিদগণ পৃথিবীর সূর্য পরিক্রমনকালকে আবার কখনো পৃথিবীকে চন্দ্রের আবর্তনকালকে এক বর্ষ হিসেব করে সাল গণনা শুরু করেন। প্রথম ক্ষেত্রে বর্ষকে সৌর বৎসর (Solar year) এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে চান্দ্র বৎসর (Lunar year) বলা হয়। হিজরি বর্ষ, চৈনিক বর্ষ হলো চান্দ্র বৎসর, অন্যদিকে ইংরেজি বা আমাদের বাংলা বর্ষ হচ্ছে সৌর বৎসর। বৎসরকে কয়েকটি ঋতুতে ভাগ করা হয়েছে এবং ঋতুগুলো মূলত পৃথিবীর সূর্যকে প্রদক্ষিণকাল ভিত্তিক। ফসল উৎপাদন ঋতুর সাথে সম্পর্কিত। হিজরি সাল যেহেতু চান্দ্র সাল তাই এর মাসগুলো ঋতুভিত্তিক নয়। ফলে ফসল উৎপাদন, ফসল উত্তোলন এসব ক্ষেত্রে হিজরি মাস অনুসরণ করা অসুবিধাজনক। মধ্যযুগে এদেশে মোগল শাসকরা হিজরি সাল অনুসরণ করতেন। কিন্তু হিজরি সালের মাসগুলো ঋতুর সাথে সাযুজ্যপূর্ণ না হওয়ায় প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ে অসুবিধা হতো। স¤্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজীকে এ অসুবিধা দূর করার নির্দেশ দেন। ফতেহ উল্লাহ সিরাজী আকবরের মসনদ আরোহণের বছর ৯৬৩ হিজরি সালকে ৩৬৫ দিনে পরিবর্তন করে সৌর সালের ‘প্রস্তাবনা করেন এবং ৯৬৩ হিজরিকে ভিত্তি ধরে এ সাল গণনা শুরু হয়। সিরাজী প্রবর্তিত সালকে ফসলি সালও বলা হয় এবং বাংলাদেশে এ সালই বাংলা সন নামে পরিচিত।
মানুষ তাদের জীবনের বিভিন্ন ঘটনাকে স্মরণ করে সাধ্যমতো আড়ম্বরের সাথে, আবার কোন প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা দিবসও পালন করা হয় যথাযথ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যেখানে আনন্দ বিনোদনের নানাবিধ আয়োজনও থাকে। নতুন বছরকে আবাহন করাও তেমনি একটি সাংবাৎসরিক অনুষ্ঠান। মানুষ পুরাতন বছরের সব ব্যর্থতা জীর্ণতাকে ঝেড়ে ফেলে আনন্দ আয়োজনের মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে। ইংরেজি ভাষাভাষী জনগণ অত্যন্ত সাড়ম্বরে ‘নিউইয়ার্স ডে’ পালন করেন। চীনারা জাকজমকের সাথে বসন্ত উৎসব হিসেবে নববর্ষকে বরণ করেন এবং সাতদিন যাবৎ ছুটি ও আনন্দবিনোদনে মেতে থাকেন।
উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভিয়েতনামের জনগণও চীনা ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে নববর্ষে বসন্ত উৎসব উদযাপন করেন। ইরানীরা প্রাচীনকাল থেকেই নতুন বছরের প্রথম দিনে ‘নওরোজ উৎসব’ পালন করে আসছেন। আমাদের দেশে পাহাড় অঞ্চলের নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী ত্রিপুরা, মারমা, চাকমা সহ অন্যান্য সম্প্রদায় বর্ষবরণ ও বর্ষবিদায় উৎসব বৈসুক, সাংগ্রাই, বিজু, বিহু, বিশু অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপন করে থাকেন। এ উৎসবগুলো সংক্ষেপে বৈসাবি নামে সমধিক পরিচিত। ইংরেজরা এ দেশের শানসভার গ্রহণ করার পর থেকেই শহরাঞ্চলের অফিস আদালতে ইংরেজি বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করা হতে থাকে। তবে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী যারা গ্রামে বাস করতেন, তারা বিভিন্ন শুভ কাজে এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে বাংলা সন ও তারিখই অনুসরণ করতেন এবং এখনও করে থাকেন। নববর্ষে গ্রামের হাটবাজারে ব্যবসায়ীরা ‘হালখাতা’ উৎসব পালন করেন। মহাজনরা সেদিন তাদের বাধা খদ্দেরদের আমন্ত্রণ করে সাদরে আপ্যায়ন করেন এবং অতিথি খদ্দেররাও বিগত বছরের পাওনাদেনা আংশিক বা সম্পূর্ণ পরিশোধ করেন। ব্যবসায়ীরা সেদিন নতুন খেরোখাতায় তাদের নাম নতুনভাবে লিপিবদ্ধ করেন। তাই একে ‘হালখাতা’ উৎসব বলা হয়ে থাকে। গ্রামাঞ্চলের স্থানে স্থানে ‘বৈশাখি মেলা’র আয়োজন হয়। এসব মেলায় গ্রামের জনগণের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সমাহার ঘটে, আবার শিশু কিশোরদের খেলাধুলার বিভিন্ন সামগ্রী যেমন পাওয়া যায় তেমনি তাদের আনন্দ বিনোদনের আয়োজনও থাকে। এককথায় নববর্ষ উপলক্ষে দেশের অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নববর্ষে কিছু ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করেন, তবে এটা বর্ষবরণের মুখ্য অনুসঙ্গ নয়। আসলে নতুন বছরের মুখ্য অনুসঙ্গ হলো এর অসাম্প্রদায়িক চরিত্র। সকল ধর্ম সম্প্রদায়ের লোকজনই সোৎসাহে এদিনকে বরণ করে থাকেন।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে বাঙালিদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটতে থাকে এবং শহর নগরে নব্য ইংরেজি শিক্ষিত একটি শ্রেণী গড়ে উঠে যারা ঔপনিবেশিক শক্তির তাবেদারি এবং ব্যবসা বাণিজ্য করে রাতারাতি অঢেল সম্পদের মালিক হয়। এরা সাহেবদের অনুকরণে ‘নিউইয়ার্স ডে’ পালন শুরু করে। সে সময় স্বদেশ চেতনায় উদ্বুদ্ধ জনগণ যারা ইংরেজ ঔপনিবেশিক শক্তির নিগঢ় থেকে দেশকে মুক্ত করার সংগ্রাম করেছিলেন, তারা আন্দোলনের অনুষঙ্গ হিসেবে ঊনিশ শতকের শেষার্ধ থেকে শহরাঞ্চলে বাংলাবর্ষবরণ উৎসব করতে থাকেন। এ উৎসবের প্রথম প্রবর্তক ছিলেন, রাজনারায়ণ বসু। নববর্ষ আমাদের লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান উপাদান বিধায় শহরাঞ্চলের শিক্ষিত ও ইতিহাস সচেতন জনগণ অত্যন্ত সানন্দে তা গ্রহণ করেন এবং স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে নববর্ষ উৎসব উদযাপন করতে থাকেন। পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনেও বর্ষবরণ আমাদেরকে প্রভূত অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। ষাটের দশকে বাংলাদেশর অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ঢাকার রমনা পার্কের বটমূলে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্ষবরণ শুরু করে। শহুরে মধ্যবিত্ত জনগণ সাগ্রহে এ অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করেন এবং দ্রুত দেশের বিভিন্ন শহরে নানাবিধ আয়োজনের মধ্য দিয়ে এ উৎসব ছড়িয়ে পড়ে। পাক শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের এ দেশীয় দোসররা নববর্ষ উদযাপনকে ভালভাবে গ্রহণ করেনি এবং এর মধ্যে হিন্দুয়ানি গন্ধ খুঁজতে থাকে। তারা অবশ্য সঠিকভাবেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে, এর মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা ক্রমশ শানিত হয়ে উঠবে। তাই এ উৎসব উদযাপন নিরুৎসাহিত করতে তৎপরতা শুরু করে। ছায়ানটের প্রধান সংগঠক ডঃ সন্জীদা খাতুন, যিনি ছিলেন ইডেন কলেজের অধ্যাপক তাঁকে রংপুর কারমাইকেল কলেজে বদলি করে দেয়। কিন্তু নিপীড়ক শাসকশ্রেণী বুঝতে পারেনি, জনসম্পৃক্ত কোন আন্দোলনকে নিষ্পেষণ করে অবদমিত করা যায়না, বরং ক্রমশ দাবদাহে পরিণত হয়। শুধু পাকিস্তানি শাসক ও তাদের তাবেদাররাই নয়, বর্তমান স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশেও একটি গোষ্ঠী বাংলা নববর্ষকে মনে প্রাণে গ্রহণ করে না আর তারই বহিঃপ্রকাশ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি ২০০১ সালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অুষ্ঠানে নৃশংস বোমা হামলার মধ্যে। তবে আনন্দের বিষয় যে, এ জঘন্য হামলার পর থেকে বর্ষবরণ সারাদেশের আনাচে কানাচে আরও পরিব্যাপ্ত হয়ে পড়েছে যাতে সকল শ্রেণী পেশার মানুষ উৎসাহ ভরে অংশ নিচ্ছে।
বর্ষবরণ আমাদের প্রধান ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় উৎসব। বসন্ত উৎসব, শরৎ উৎসবও তেমনি ধর্মনিরপেক্ষ ও সর্বজনীন। প্রকৃতির বৈচিত্র্যপূর্ণ আচরণকে ঘিরেই এসব অনুষ্ঠানের সূচনা। আমাদের জীবন জীবিকা প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রকৃতি যেমন আমাদের মনকে আন্দোলিত করে, তেমনি আমাদের অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করে। তাই এসব উৎসবের কোন ধর্মীয় অনুষঙ্গ নেই। যারা এসবের মধ্যে ধর্মীয় গন্ধ খুঁজে বেড়ান, তারা পরোক্ষভাবে সাম্প্রদায়িক বিভাজনকেই উস্কে দেন। কবি জয় গোস্বামী লিখেছেন-রৌদ্র নিয়ে বৃষ্টি নিয়ে প্রতি বছর / সবার চোখ আড়াল দিয়ে, প্রতিবছর / কে জন্মায়, হে বৈশাখ / কে জন্মায়?
কবির প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়-সূর্যের প্রখরতা নিয়ে, ঝড়-বৃষ্টির ঘোমটা পরে নববর্ষ জন্ম নেয় বৈশাখের রাঙা প্রভাতে। কখনো রৌদ্র¯œাত, কখনো চন্ডরূপ বৈশাখি প্রকৃতিরই বৈশিষ্ট্য। এ বৈচিত্র্য ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে সমানভাবে আলোড়িত করে। এ রূপবৈচিত্র্যের সামগ্রিকতা নিয়েই বৈশাখ ও নববর্ষকে আমরা অন্তর দিয়ে বরণ করে নেই। তবে যন্ত্রসভ্যতার বৈরি আচরণের ফলে পরিবেশ ও প্রকৃতি যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কতদিন এর বিচিত্র রূপ অক্ষুন্ন থাকবে, সেটাই এখন ভাবার বিষয়।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, এমসি কলেজ।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সম্ভাবনার ক্ষেত্র এবং নতুন প্রযুক্তি
  • গণমানুষের মুখপত্র
  • জাহালম কি আরো আছে!
  • নারী নির্যাতন ও আমাদের বাস্তবতা
  • সিলেটের ডাক : কিছু স্মৃতি কিছু কথা
  • বর্ষাঋতুতে শিশুদের যত্ম
  • কোটি মানুষের মুখপত্র
  • ৩৬ বছরে সিলেটের ডাক
  • প্রত্যয়ে দীপ্ত ‘সিলেটের ডাক’
  • পাঠকের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি
  • এরশাদ : এক আলোচিত পুরুষের প্রস্থান
  • প্রাসঙ্গিক ভাবনায় ২০১৯-২০ অর্থ বছরের বাজেট
  • মেঘালয়ের মেঘমালা
  • পরিবেশ সংরক্ষণে সামষ্টিক উদ্যোগ
  • বর্ষা মানেই কি জলাবদ্ধতা?
  • শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধ
  • রেলের প্রতি জনগণের আস্থা বিনষ্ট করা যাবে না
  • প্রকৃতির দায় শোধে বৃক্ষ রোপণ
  • ঋণ দেয়া-নেয়ায় প্রাসঙ্গিক ভাবনা
  • কান্ডারী হুঁশিয়ার!
  • Developed by: Sparkle IT