বিশেষ সংখ্যা

নববর্ষ নিয়ে আসুক শান্তি

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৪-২০১৯ ইং ০০:৪৯:৫১ | সংবাদটি ২৬৩ বার পঠিত

পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন। এ দিনটি বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বের বাঙালিরা ‘নববর্ষ’ হিসেবে পালন করে। নববর্ষ বাঙালির সর্বজনীন লোক উৎসব। এদিন আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে নেওয়া হয় নতুন বছরকে। কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক হলো ‘নববর্ষ’। অতীতের ভুল ত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদযাপিত হয় নববর্ষ।
বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় মূলত মোগল স¤্রাট আকবরের সময় থেকেই। তারপর থেকে মোগল জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হওয়া পর্যন্ত পহেলা বৈশাখ পালন করতেন। সে সময় কৃষকরা চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত জমিদারদের খাজনা পরিশাধ করতো। পরদিন জমিদাররা প্রজাদের মিষ্টি মুখ করাতেন। এ উপলক্ষে তখন মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। ক্রমান্বয়ে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে মিশে পহেলা বৈশাখ আনন্দময় ও উৎসবমুখী হয়ে ওঠে এবং বাংলা নববর্ষ শুভদিন হিসেবে পালিত হতে থাকে। বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব হলো ‘হালখাতা’ (হাল আরবি শব্দ-খাতা ফারসি শব্দ) ইংরেজ আমলে দেশীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে খেরোর খাতা বা লাল সালু বাঁধানো খাতায় সারা বছরের জমা-উসুলের হিসাব রাখা শুরু হলো। এটি মূলত পুরোপুরি অর্থনৈতিক ব্যাপার আবার মাঙ্গলিকতা ও সম্প্রীতি ও এর মধ্যে জড়িয়ে আছে।
বাঙালির একান্ত নিজস্ব বৈশাখী মেলা আর হালখাতা অনুষ্ঠানের সূচনা তো নতুন বছরে শুভারম্ভেই। পুরনো বছরের ধারদেনা, আর কায়-কারবারের পাওনা-গন্ডায় হিসেব-নিকেশ শুরু হয় হালখাতা উৎসবকে কেন্দ্র করে। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে-বন্দরে বৈশাখী মেলার আয়োজন চলে নানাভাবে। শুধু তো মেলা নয় বৈশাখের আবাহনে আকর্ষণীয় নৃত্যগীতের অনুষ্ঠান, বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান। সব কিছুর মধ্যে যেন নাগরিক মন খুঁজে ফিরে নতুন বছর শুরু করার প্রেরণা। নববর্ষ তাই বাঙালির শত বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। যা ধারণ করে আছে সুদূর প্রপিতামহকূলের আশীর্বাদ ও উত্তরাধিকার সূত্রে।
নববর্ষ উদযাপনের মধ্যে সব দেশের সব জাতির মতো বাঙালিরও নিজস্ব সংস্কৃতির পরিচয় পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। চৈত্রের দাবদাহ যাত্রা শুরু করে ছয়টি ঋতুর লীলা বৈচিত্র্যের কখনও বৈরাগ্য দেখতে দেখতে বছর কেটে যায়। নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জাতীয় জীবনে হতাশা-নৈরাজ্য। কিন্তু সেগুলিই সব নয়। পুরাতন গ্লানি থেকে শিক্ষা আর প্রেরণা নিয়ে সার্থক হয়ে ওঠে জীবনের প্রয়াস। কোনো কিছুই নিরর্থক নয়, হারিয়ে যাওয়া নয়। বৈশাখী মুকুল যেমন নবীন আকাক্সক্ষার প্রতীক হয়ে দেখা দেয়, তেমনিই চৈত্র শেষের ঝরাপাতাও রেখে যায় বিগত বছরের স্মৃতি আর স্বাক্ষর।
নববর্ষের উৎসব গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণত নববর্ষে সকল বাড়ি-ঘর-ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়ে থাকে। ব্যবহার্য সামগ্রী ধোয়া-মোছা করে এবং সকালে ¯œান করে নতুন কাপড় পরে দেবালয়ে যাওয়া এবং বড়দের আশীর্বাদ নেওয়া। ঐ দিনটিতে ভালো খাওয়া-দাওয়া করা, ভালো কিছু পরতে পারা এবং ভালো থাকাটা ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক মনে করা হয়। নববর্ষের ঘরে ঘরে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীদের আগমন ঘটে। মিষ্টি, পিঠা পুলি, পায়েস, দই সহ নানা ধরনের লোকজন খাবার তৈরির ধুম পড়ে যায়। একে অপরের সঙ্গে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় হয় এবং প্রিয়জনকে নববর্ষের উপহার সামগ্রী দেওয়া হয়। নববর্ষকে উৎসব মুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। এটি মূলত সর্বজনীন মেলা অত্যন্ত আনন্দঘন হয়ে থাকে। স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারুপণ্য, লোক শিল্পজাত পণ্য, কুঠির শিল্পজাত সামগ্রী এছাড়া শিশু-কিশোর-কিশোরীদের খেলনা-পুতুল তাদের সাজসজ্জার সামগ্রী ইত্যাদি পাওয়া যায়। মেলায় চিত্ত বিনোদনেরও ব্যবস্থা থাকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোক গায়কদের উপস্থিতি থাকে। তারা যাত্রা গান, আঞ্চলিক গান, জারি-সারি, গম্ভিরা গান, গাজীর গান, বাউল গান-ভাটিয়ালী, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, নাটক, পুতুল নাচ, নাগরদোলা, সার্কাস ইত্যাদি দেখে বৈশাখী উৎসব উদযাপন করে।
আজ চৈত্রের শেষ উদ্দাম ঝড়ো হাওয়া উড়িয়ে নিয়ে যাক বিগত বছরের সব আবর্জনা। রৌদ্র ঝলসিত সুনীল আকাশের তলে বাঙালিকে এই একটি দিনে একত্রিত করে পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখ সবার জীবনে নিয়ে আসুক সুখ-শান্তি সমৃদ্ধি আর মানুষে মানুষে গড়ে ওঠুক সম্প্রীতি সকলের প্রতি জানাই শুভ নববর্ষের শুভেচ্ছা-আর অনন্ত ভালোবাসা।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT