উপ সম্পাদকীয়

সার্বজনীন বৈশাখী উৎসব

মাজেদা বেগম মাজু প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৪-২০১৯ ইং ০০:৫২:২০ | সংবাদটি ৬৩ বার পঠিত

পহেলা বৈশাখ বাংলা ও বাঙালির নববর্ষ। বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ বাংলাদেশ এবং ভারতবর্ষের একটি ঐতিহ্যবাহী সৌর পঞ্জিকা ভিত্তিক বর্ষপঞ্জি। বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ কবে এর শুরু কিভাবে এর বিস্তার লাভ করে তা আজও সঠিক ভাবে জানা যায়নি। অনেকেই মনে করেন, স¤্রাট আকবরের আমলে বাংলা সনের উৎপত্তি। আবার কেউ কেউ বলেন, স্বাধীন বাংলার সুলতানরা এর সূচনা ঘটান। আবার কারো মতে, শশাংক বা আরো পুরোনো কোনো নৃপতির কীর্তি এই বাংলা সন। তবে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞদের মতানুসারে স¤্রাট আকবরের শাসনামলেই বাংলা সন প্রতিষ্ঠা লাভ করে। বাংলা সনের মূল নাম ছিল ‘তারিখ-এ-এলাহী’। মোগল স¤্রাট আকবর ১৫৮৫ সালে তার রাজত্বকালের ২৯ তম বর্ষের ১০ কিংবা ১১ মার্চ তারিখে ‘তারিখ-এ-এলাহী প্রবর্তন করেন। পরবর্তীতে তারই রাজস্বমন্ত্রী টোডরমলের নেতৃত্বে গঠিত সংস্কার কমিটির সদস্য রাজদরবারের পন্ডিত ও অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজী বাংলা সন প্রতিষ্ঠা করেন।
পহেলা বৈশাখ বাংলা সনের প্রথম দিন তথা বাংলা নববর্ষ। বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরাসহ সারা বিশ্বের বাঙালিরা এই দিনটিকে নববর্ষ হিসেবে পালন করে থাকেন। বছরের প্রথম দিন নববর্ষে সবাই নতুন বছরকে বরণ করে নেয়, ভুলে যাবার চেষ্টা করে অতীত বছরের সকল দুঃখ গ্লানি। নববর্ষ একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তুলে ধরে। নববর্ষের উৎসব ব্যর্থতা ও হতাশা ভুলিয়ে মানুষকে নতুন আশায় উজ্জীবিত করে। তাইতো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় নানানভাবে বর্ষবরণ উৎসব পালিত হয়ে আসছে।
এই পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির ধারক এবং বাহক। ‘সংস্কৃতি’ হলো একটি দেশ বা সমাজের জীবনাচরণ। একটি জাতি বা জনগোষ্ঠীর পরিচয়জ্ঞাপক বৈশিষ্ট্য। ব্যাপকতর অর্থে সংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির অথবা সামাজিক গোত্রের বিশিষ্টার্থক আত্মিক, বস্তুগত, বুদ্ধিগত এবং আবেগগত চিন্তা ও কর্মধারার প্রকাশ। মানুষের অধিকার, মূল্যবোধ, ঐহিত্য, বিশ্বাস এবং জীবনধারাও সংস্কৃতির অঙ্গ। আমাদের বাঙালিদেরও রয়েছে এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। আর এই পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরই একটি অংশ। উৎসবের মধ্য দিয়ে বরণ করে নেয়া হয় বাংলা সনকে।
পহেলা বৈশাখকে ঘিরে চলে নানা আয়োজন। যা একসময় উৎসবে পরিণত হয়। চৈত্র মাস থেকেই মোটামুটি এই উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি চলতে থাকে। তারপর চৈত্রের শেষ দিন অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তিতে সূর্যাস্তের সাথে সাথে পুরাতন বছরকে বিদায় জানিয়ে পরদিন নতুন সূর্যোদয়ের মধ্য দিয়ে আগমন ঘটে নতুন বছরের। নতুন দিন দিয়ে সূচনা হয় নতুন বছরের।
বাংলা সন, তারিখ গণনার জন্য রয়েছে বিশেষ পঞ্জিকা। পঞ্জিকা বা পাঁজি বাঙালির কৃষ্টি সভ্যতারই একটি অভিন্ন অংশ। তিথি, নক্ষত্র, তারিখ, শুভাশুভ, কাল প্রভৃতি জ্ঞাপক পুস্তকের নাম পঞ্জি বা পঞ্জিকা বা পাঁজি-ইংরেজি Almanac (অ্যাল্ ম্যান্যাক) যার সাথে রয়েছে বাংলা সনের সম্পৃক্ততা। বাংলা পঞ্জিকা মুদ্রিতরূপে প্রকাশের প্রায় দু’শ বছর (আনুমানিক) পূর্ণ হতে চলেছে। কালপরিক্রমায় সংস্কার, পরিবর্ধন, পরিমার্জন করার পরও পঞ্জিকা তার স্বমহিমায় এখনও টিকে আছে বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্যে। বাংলা, বাঙালি, বাংলা সন ও নববর্ষের সাথে এখনো রয়েছে পঞ্জিকার নিগূঢ় সম্পর্ক।
হালখাতা বৈশাখী উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষঙ্গিক বিষয়। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত পয়লা বৈশাখ পালন হতো খাজনা আদায়ের উৎসব হিসেবে। পরে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে দিনটি মিশে গিয়ে হয়ে ওঠে আনন্দময় এক উৎসব। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর নববর্ষের মূল উৎসব হয়ে ওঠে হালখাতা। এটি পুরোপুরিই ব্যবসায়িক ব্যাপার। ব্যবসায়ীরা তাদের পুরোনো হিসাব পাতি সম্পন্ন করে নতুন হিসাবের যে খাতা খুলেন সেই অনুষ্ঠানের নাম হালখাতা বা নতুন খাতা। এতে তাদের ব্যবসায়িক লেনদেন, বাকি-বকেয়া, উসুল আদায় সবকিছুর হিসাব-নিকাশ লিখে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। হালখাতা উপলক্ষে তারা নতুন-পুরনো খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টিমুখ করান ও নতুন করে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করেন। চিরাচরিত এই উৎসব আজও ভারতের কলকাতা আর বাংলাদেশের গ্রাম এলাকায় প্রচলিত রয়েছে।
সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক ও সার্বজনীন উৎসব বৈশাখী মেলা। নববর্ষের উৎসব বাংলা গ্রামীণ জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর এই উৎসবের একটা বড় আকর্ষণ বৈশাখী মেলাকে কেন্দ্র করে। এটি কোন ধর্মীয় ঐতিহ্য, কিংবদন্তী কিংবা পালা-পার্বন নির্ভর অনুষ্ঠান নয়। সে কারণেই এটি সমস্ত বাংলা ও বাঙালির সার্বজনীন উৎসব। স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারুপণ্য, লোক শিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্প জাত সামগ্রী, সকল প্রকার হস্তশিল্পজাত ও মৃৎশিল্পজাত সামগ্রী, শিশুদের খেলনা প্রভৃতি এই মেলায় পাওয়া যায়। চিড়া, মুড়ি, খৈ, বাতাসা, বিভিন্ন প্রকারের মিষ্টি ইত্যাদির বৈচিত্রময় সমারোহ থাকে এই মেলায়। এখানে যাত্রা, পালাগান, কবিগান, জারিগান, গাজীর গান, সহ বিভিন্ন ধরনের লোকসঙ্গীত, বাউল-মারফতি, মুর্শিদি, ভাটিয়ালি ইত্যাদি আঞ্চলিক গান পরিবেশিত হয়। পুতুল নাচ, নাগরদোলা, সার্কাস, বায়োস্কোপ মেলার বিশেষ আকর্ষণ। এই মেলা বাঙালিদের কাছে এক অনাবিল মিলন মেলায় পরিণত হয়। চৈত্রসংক্রান্তি আর নববর্ষ উপলক্ষে বরিশালের ‘বাকালের মেলা’, যশোরের ‘নিশিনাথ তলার মেলা’, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার ‘ঘোড়াপীরের মেলা’, কপিলসুনির সপ্তাহব্যাপী ‘বারুণী মেলা’, বাগেরহাটের রামপালের ‘চড়কমেলা’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
এক সময় বাংলা নববর্ষ উৎসব শুধু গ্রাম বাংলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরিবর্তনশীল সমাজে এই উৎসব এখন গ্রাম-শহর, ধনীগরীব, ছোট-বড়, নারী পুরুষ সর্বোপরি ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে গোটা বাঙালি জাতির সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। আদিবাসীরাও আড়ম্বরপূর্ণভাবে এই উৎসব পালন করে থাকেন। তাইতো পাহাড়ে পাহাড়ে চলে উৎসবের বর্ণিল আয়োজন। পার্বত্য অঞ্চলে ১০ ভাষাভাষী ১১টি সম্প্রদায়ের বসবাস। প্রতিটি সম্প্রদায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উৎসব পালন করে থাকলেও বিজু উৎসব সবাই একই সময়ে পালন করে থাকেন। বিজু প্রতিটি সম্প্রদায়ের কাছে আলাদা আলাদা নামে পরিচিত। তবে কয়েক বছর ধরে উদযাপন রীতি ও দিন একই হওয়ায় বৈসু, সাংগ্রাই ও বিজু এই তিনটি নামের আদ্যক্ষর নিয়ে নাগরিক সমাজে এই দিনটি ‘বৈসাবি’ নামেই পরিচিত হয়ে উঠেছে।
বাঙালির বর্ষবরণের আনন্দ আয়োজনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। ১৯৮৫ সালে যশোরে ‘চারুপীঠ’ নামের একটি সংগঠন প্রথমবারের মতো বর্ষবরণ করতে আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন করে। এরপর ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় প্রথম আনন্দ শোভাযাত্রার। শিল্পী ইমদাদ হোসেনের নামকরণে ১৯৯৫ সালের পর থেকে এ আনন্দ শোভাযাত্রাই ‘মঙ্গল’ শোভা যাত্রা’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর বাংলা নববর্ষ বরণের বর্ণিল উৎসব ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা UNESCO কর্তৃক অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়।
বৈশাখী উৎসবের মধ্যে আরও যেগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সেগুলো হলো-প্রচলিত সামাজিক সমস্যা নিয়ে তৈরি লোকগীতি ও লোকনৃত্যের আঞ্চলিক অনুষ্ঠান গম্ভীরা, লাঠিখেলা, বলীখেলা, অষ্টকগান, পটগান, সঙসাজা ইত্যাদি।
কাল পরিক্রমায় যেসব বৈখাশী উৎসব বর্তমানে প্রায় বিলুপ্তির পথে সেগুলো হলো-পুণ্যাহ আমানি, আইখান, ঘুড়ি ওড়ানো, গরু ও ঘোড় দৌড়, ষাড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, পায়রা ওড়ানো, নৌকা বাইচ ইত্যাদি।
নাগরদোলার মতো চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে আবার আসে নতুন বছর। নববর্ষের এই দিনটির জন্য সারাবছর ধরে অধীর আগ্রহে চলে সবার কত আয়োজন। তবে সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতি যেন এই দিনটিকে গ্রাস করতে না পারে এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। অধিকাংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নূন আনতে পান্তা ফুরানোর দেশে ‘পান্তা ইলিশ’ নামক বিলাসিতার সংস্কৃতি বর্জন করে নববর্ষকে সত্যিকার অর্থে একটি সার্বজনীন উৎসবে পরিণত করতে হবে। এই দিনে শুধু একদিনের বাঙালি না সেজে বছরের প্রতিদিনই সবার মাঝে বজায় থাকুক শতভাগ বাঙালিয়ানা। নতুন বছর সবার জন্য সুখময় হোক, নিয়ে আসুক মঙ্গলবারতা, শুভ বাংলা নববর্ষ।
লেখক : প্রাবন্ধিক।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে হতাশা দূর করা জরুরি
  • দুর্নীতির কারণে বাড়ছে আয় বৈষম্য
  • রক্তরাঙা পীচঢালা পথ
  • কোন পথে এগোবে ভারত
  • পাটশিল্পের বিপর্যয় কেন?
  • চাকরি প্রার্থীদের নানান সমস্যা
  • শবে বরাত : আমাদের করণীয়
  • শিক্ষকের গায়ে কলঙ্কের দাগ
  • উন্নয়ন হোক দ্রুত : ফললাভ হোক মনমতো
  • হার না মানা জাতি
  • বাংলা বানান নিয়ে কথা
  • আলজেরিয়ার পর সুদানেও স্বৈরশাসকের পতন
  • দেশের সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার হাল-চাল
  • ইলিশ : অর্থনীতি উন্নয়নের বড় হাতিয়ার
  • নুসরাত ও আমাদের সমাজ
  • শিশুরাই আমাদের শিক্ষক
  • জ্ঞান বিকাশে সংবাদপত্রের ভূমিকা
  • প্রসঙ্গ : বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ এবং আমাদের জাতীয় ঐক্য
  • বজ্রপাত আতঙ্ক ও আমাদের করণীয়
  • সুদান : গণবিপ্লবে স্বৈরশাসক বশিরের পতন
  • Developed by: Sparkle IT