উপ সম্পাদকীয়

আমাদের জীবনে মিডিয়ার প্রভাব

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৪-২০১৯ ইং ০০:১৬:৩৪ | সংবাদটি ২৬ বার পঠিত

ছোটবেলায় আমাদের বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রায়ই একটা রচনা লিখতে হত-‘আমাদের জীবনে মিডিয়ার প্রভাব।’ তবে সেই দিন আর আজকের দিনের মধ্যে প্রভুত পার্থক্য। বলা যায়, মিডিয়াই আজ সর্বেসর্বা। আমাদের জীবনে অজান্তেই মিডিয়া প্রবেশ করেছে। আর অনেকটাই নিয়ন্ত্রণও করেছে বটে। তা সত্ত্বেও ওই রচনাটি আজও প্রাসঙ্গিক। মিডিয়ার ভালো দিক যেমন আছে, খারাপ দিকও তেমনি আছে। সত্যিই তো, আমাদের জীবন মিডিয়া ছাড়া আজ অসম্পূর্ণ। আমাদের অধিকাংশ সময়টাই চলে যায় কোনও কোনও সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটে। হয় ফেসবুক, নয় টুইটার, নয় তো হোয়াটস আপ-এ। আমাদের প্রতিদিনকার ছোট থেকে ছোট কথা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সোশাল নেটওয়ার্কিং-এ সেরে ফেলছি।
বর্তমানে ভার্চুয়াল লাইফটা কি আমাদের গ্রাস করে ফেলল? বিশেষ করে নতুন প্রজম্মকে? এখানে আমার একটা প্রশ্ন রয়েছে। কোনটাকে ভার্চুয়াল লাইফ বলছি আমরা? আমরা কি আজকাল আর আড্ডা মারতে বেরই? আমাদের কি সময় আছে? রক-কালচার আমাদের ছোটবেলায় অসম্ভব জীবন্ত ছিল। এখন তো রকই আর নেই। আড্ডাটাও অবলুপ্তির পথে। আড্ডা মারা বা রিল্যাক্স করার সময় নেই আমাদের। এই রকম একটা সময়ে দাঁড়িয়ে সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইট-এর সাহায্য তো আমাদের নিতেই হয়। প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা মারতেও আমাদের আজ দরকার চ্যাট বক্স। তা হলে কেন আমরা সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইট-কে ভার্চুয়াল লাইফ বলব? আমার এক বন্ধু আছেন, তিনি গুরুতর অসুস্থ। বাইরে বেরোতে পারেন না। তাঁর জীবনটাই এখন ফেসবুক। আজকে ফেসবুক না থাকলে তাঁর আড্ডা মারার বা দুটো সামান্য কথা বলারও লোক থাকত না।
কোনো কিশোরী আত্মাহত্যা করলে এ-নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে, সেই কিশোরীর আত্মাহত্যার কারণ কী? প্রেমে প্রত্যাখান। বয়ঃসন্ধির সময়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার যন্ত্রণা সবচেয়ে প্রবল। তাই-ই হয়েছিল বলে সে বেছে নিয়েছে আত্মহত্যার পথ। অন্যদিকে আমরা। আমরা বলছি ভারচুয়াল লাইফে আকৃষ্ট হয়ে মেয়েটি আত্মাহত্যা করল। আমরা কিন্তু মেয়েটির আবেগকে এক অর্থে অপমানই করছি। আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি না মেয়েটির দ্বিধা, দ্বন্ধ ও মানসিক যন্ত্রণাকে। কী অসম্ভব মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে সে গিয়েছে, তার পর্যালোচনা না-করে , আমরা একটি মাধ্যমকে দায়ী করছি। এখানে ফেসবুক বা টুইটার জরুরি না, জরুরি একজন বয়ঃসন্ধি কিশোরীর প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার যন্ত্রণা। বয়ঃসন্ধি ছেলেমেয়েদের দরকার বন্ধুতা। সে বাবা- মাই হোক বা সমবয়সি বন্ধু। একটা ভরসা করার মানুষ, যাকে সব কথা বলা যায় নির্দ্ধিধায়। কিন্তু এই বয়সি ছেলেমেয়েদের উপর সবচেয়ে বেশি বাধা-নিষেধ আরোপ করে বাবা-মা। বাইরে বেরিয়ে আড্ডা মারা তো নৈব নৈব চ। বাড়িতে বসে পড়াশুনা করা ছাড়া বাবা-মায়েদের সব কিছুতে বাধা। কিন্তু কথা বলা প্রয়োজন বয়ঃসন্ধিতেই। বাবা-মায়ের নিষেধ অবজ্ঞা করার মতো সাহস না-থাকার দরুন সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটে চুপিসারে তারা চ্যাট করছে।
মহারাষ্ট্রের এই কিশোরীর সারাদিনই হয় মোবাইলে না হয় ফেসবুক-এ দিন কাটত। মা-বাবা অতি বিরক্ত ছিলেন। একদিন মেয়েটি ফেসবুক ব্যবহার করার অনুমতি চেয়েছিল মা-বাবার কাছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই সে অনুমতি দেননি। আবার খোঁজও নেননি এর পেছনে গভীর কারণটি। কিন্তু বকুনি দিতেন, বাধা দিতেন। ফল কী হল? মেয়েটি আত্মহত্যা করল। কিন্তু মেয়েটির আত্মহত্যার কারণ কী? শুধু কি ফেসবুক করার অনুমতি না-মেলা? তা তো নয়। মেয়েটির কথা বলার প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজন ছিল নিজেকে মেলে ধরার। সে পাড়ার মাঠ হোক কী ফেসবুক। মেয়েটির নিজের কথা বলার অধিকার এক অর্থে ছিনিয়ে নিলেন তারই বাবা-মা। বাবা-মা কোনও দিনই জানতে পারেননি মেয়ের মনের খবর। কিন্তু আমার প্রশ্ন, বাবা-মায়ের তাঁদের ছেলেমেয়েদের মনের কথা, যন্ত্রণার কথা জানবেন না কেন? ক্লাস টেস্ট ছাড়াও তাদের আরও বড় কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তার খোঁজ বাবা-মা‘রা রাখবেন না কেন? এ তো বাবা-মায়েরই অক্ষমতা বা অযোগ্যতা। সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটে অপরিচিত মানুষদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ বেশি নিঃসন্দেহে। কিন্তু বাড়িতে যখন কোনও অপরিচিত মানুষ আসেন, তাঁকে কি আমরা আমাদের বাড়ির অন্দরমহলে নিয়ে যাই? তা তো নয়। বৈঠক খানাতেই বসাই।
আমরা একটু একটু করে, বেশ কিছুটা সময় ধরে তাকে চিনি, তারপর উপযুক্ত সখ্য হলে তাকে আমাদের অন্দরমহলে নিয়ে যাই। সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটে তা হলে এই নিয়ম খাটবে না কেন । মেলামেশার পদ্ধতি তো বাবা-মায়েদেরই শেখাতে হবে ছেলেমেয়েদেরকে। এই শিক্ষা আমাদের প্রত্যেকের জীবনে প্রয়োজন। আমরা যদি একটু ভেবে দেখি, তা হলে দেখব ফেসবুক-এর মাধ্যমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে আত্মাহত্যা যেমন করছে, তেমনই কিন্তু দশজন এই সোশাল নেটওয়ার্কিং-এ চাকরিও পাচ্ছে। আমরা এই সত্যকে অস্বীকার করতে পারি না। আবারও ফিরে যাই সেই মূল প্রশ্নে। সেই ছেলেবেলার রচনা-‘আমাদের জীবনে মিডিয়ার প্রভাব’। আবারও বলব সেই একই কথা, সব জিনিষের-ই সুফল বা কুফল আছে। খারাপ বলে বাতিল করে দেওয়া তো আদতে মূর্খামি। আমাদেরই বেছে নিতে হবে আমাদের পথ।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে হতাশা দূর করা জরুরি
  • দুর্নীতির কারণে বাড়ছে আয় বৈষম্য
  • রক্তরাঙা পীচঢালা পথ
  • কোন পথে এগোবে ভারত
  • পাটশিল্পের বিপর্যয় কেন?
  • চাকরি প্রার্থীদের নানান সমস্যা
  • শবে বরাত : আমাদের করণীয়
  • শিক্ষকের গায়ে কলঙ্কের দাগ
  • উন্নয়ন হোক দ্রুত : ফললাভ হোক মনমতো
  • হার না মানা জাতি
  • বাংলা বানান নিয়ে কথা
  • আলজেরিয়ার পর সুদানেও স্বৈরশাসকের পতন
  • দেশের সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার হাল-চাল
  • ইলিশ : অর্থনীতি উন্নয়নের বড় হাতিয়ার
  • নুসরাত ও আমাদের সমাজ
  • শিশুরাই আমাদের শিক্ষক
  • জ্ঞান বিকাশে সংবাদপত্রের ভূমিকা
  • প্রসঙ্গ : বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ এবং আমাদের জাতীয় ঐক্য
  • বজ্রপাত আতঙ্ক ও আমাদের করণীয়
  • সুদান : গণবিপ্লবে স্বৈরশাসক বশিরের পতন
  • Developed by: Sparkle IT