উপ সম্পাদকীয়

বৈশাখের বিচিত্র রূপ

মো. ফজলুর রহমান ফজলু প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৪-২০১৯ ইং ০০:১৮:৩৫ | সংবাদটি ১২৪ বার পঠিত

বাংলা সনের প্রথম মাস হচ্ছে বৈশাখ। আর পহেলা বৈশাখ হচ্ছে বাংলা নববর্ষ। বাংলা নববর্ষকে উপলক্ষ করে শহরে বন্দরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বর্তমান প্রজন্ম বর্ণিল আয়োজনে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করে। এখন গ্রামের তুলনায় শহরে বৈশাখী অনুষ্ঠান হয় বেশি। বাংলা নববর্ষ আর বর্ণিল অনুষ্ঠানের কাহিনী আলোচনা করা আমার অভিপ্রায় নয়। আমার অভিপ্রায় আমার দেখা বৈশাখ মাসের বিচিত্র রূপ সম্পর্কে আলোকপাত করা। তাহলে খুলেই বলি।
আশির দশকের কথা। তখন আমি পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। দাদী-নানী, পিতা-মাতা, ভাই-বোন সকলের সাথে গ্রামে বসবাস করি। আমাদের ঘরটি ছিল কাঠের তৈরী টিনের ছাউনি। অন্যান্য ঘর ছিল বাঁশের তৈরী ও খড়ের ছাউনি। গ্রামের প্রায় সকল মানুষের ঘর ছিল বাঁশ বেত ও খড়ের ছাউনি। আর সে যুগে ঝড় বাদলের মাত্রা ছিল এখন থেকে অনেক অনেক বেশি। ঋতুভেদে যদিও ফাল্গুন চৈত্র কে বসন্তকাল আর বৈশাখ জৈষ্ঠ কে গ্রীষ্মকাল বলা হয় কিন্তু প্রকৃত পক্ষে চৈত্র বৈশাখ কে গ্রীষ্মকাল ধরে নিতে হয়। গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহে কালবৈশাখীর সূচনা হয়। চৈত্র হতে পুরো বৈশাখ পর্যন্ত প্রায় দু মাস কালবৈশাখীর প্রচন্ড তান্ডব চলে। রোজ দুই তিন বার বজ্র সহ ঝড় শিলা বৃষ্টি হয়েছে এমন অনেক নজির আমি নিজ চক্ষে দেখেছি। দুই মাসের মধ্যে দু চার দিন ছাড়া প্রায় সব দিনই কম বেশি ঝড় বাদল হয়েছে। বৈশাখের দিনে কাল বৈশাখীর প্রচন্ড তান্ডবে শত শত ঘর বাড়ি ধ্বংস হয়। উপড়ে পড়ে শত শত গাছ। কাঁচা ঘরের চালা উড়ে যায় অনেক দুরে। রাতের অন্ধকারে প্রচন্ড ঝড়ে মানুষ আতংকিত হয়ে প্রাণ বাঁচাতে খাটের নীচে আশ্রয় নিত। অনেকে ভয়ে জোরে জোরে আজান দিত কিন্তু ছালাহ আর ফালাহ বলতো না। কেহ কেহ সোলায়মান নবীর দোহাই দিত। একবার এক প্রচন্ড কাল বৈশাখী ঝড় রাতের অন্ধকারে বয়ে যায়। দাদী সম্পর্কের এক বৃদ্ধা মহিলা জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরের তাকিয়ে বলেন-আমি নিজ চক্ষে দেখেছি এইমাত্র সোলায়মান নবীর সাতটি সওয়ারী আমাদের উঠানের উপর দিয়ে চলে গেছে। আমরা ভয়ে আতকে উঠি। পরদিন সকালে দেখি ধান শুকানোর কাজে ব্যবহৃত সাতটি ডাম (চাটাই) দক্ষিণের গোয়াল ঘরে রাখা ছিল তা বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে অনেক দুর ফেলে দিয়েছে। তখন আমি রসিকতা করে বললাম দাদী আপনার সোলায়মান নবীর তক্তে সোলায়মানী আটকা পড়ে গেছে। আরেক দিন আসরের পর শুক্রবারে অমাবশ্যার মতো কালো আকৃতি ধারণ করে বজ্রসহ কাল বৈশাখী ঝড় আসে। মনে ভাবি শুনেছি শুক্রবারে আসরের পরে দুনিয়া ধ্বংস হবে। আজ কি সেই দিন। পরক্ষণে মনে হয় শুক্রবার আর আসরের সময় হলে কি হবে। আজতো মহররম মাসের দশ তারিখ নয়। এমনি ভাবনায় বিভোর থাকা অবস্থায় আমাদের সকলের চক্ষের সামনে আমাদের গোয়াল ঘরটি পড়ে যায়। ঘরটিতে হালের দুটি গরু বাঁধা ছিল। খড়ের চাল তাদের পিঠের উপরে। দাদী প্রচন্ড ঝড়কে উপেক্ষা করে তাড়াতাড়ি দা দিয়ে গরুর গলার রশি কেটে দেন। তাতে ঘর পড়ে গেলেও গরুর কোন ক্ষতি হয়নি। একদিন মধ্যরাতে আমরা সবাই ঘুমিয়ে আছি এমন সময় প্রচন্ড কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়। আমি খাটের উপর শুয়েছিলাম দেখি আমার পা উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে আর মাথা নীচের দিকে। আমি চিৎকার দিয়ে বললাম ঝড়ের সাথে ভুমিকম্প হচ্ছে। প্রায় ২০ মিনিট পর ঝড় থামল। ঘর থেকে বেরিয়ে উঠানে গিয়ে দেখি ঘরের পিছনের আমগাছ কাঁঠাল গাছ কিছুই নেই। রাত পোহালে দেখি ঘরের উপরে শায়িত কাঁঠাল গাছটি সমুলে কে যেন অনেক দুরে সরিয়ে দিয়েছে। বড় দুটি গাছের মধ্যখানে দৈত্যরা যেন ভেঙ্গে দিয়েছে। যার প্রভাবে প্রায় একশো টি র উপরে সুপারী গাছ ভেঙ্গে যায়। শুবার খাট উপরে উঠার কারণ খাটের নীচ পর্যন্ত গাছের শিকড় ছিল। সমুলে গাছ উপড়ে পড়াতে এমন হয়েছে।
বৈশাখ মাসের বৃষ্টিতে পুকুর থেকে কৈ মাগুর পুঁটি সহ বিভিন্ন জাতের মাছ বের হয়। গ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় এ জাতীয় মাছ ধরাকে উজাই ধরা বলা হয়। খাল নালা আর মাঠের পানিতে গিয়ে ডিম ছাড়ে তারা। এ সব মাছ ধরার জন্য আমরা ফুফি ব্যবহার করতাম। যে সব নালা দিয়ে পানি যায় সে সব নালাতে ফুফি বসিয়ে রাখতাম। পরদিন সকালে ফুফি তুলে কৈ, মাগুর, শিং, ভেড়া, টেংরা, পুঁটি সহ প্রচুর মাছ পেতাম।
একদিন বৈশাখ মাসের সন্ধ্যার দিকে প্রচুর বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হয়। মাঠ শুকনো ছিল। বৃষ্টিতে মাঠে পানি জমে তা পুকুরে আলতো ভাবে প্রবেশ করতে শুরু করে। আমি টর্চ লাইট নিয়ে পুকুরের পাড়ে গিয়ে দেখি কাতার বন্দি হয়ে কৈ মাছ বেরিয়ে যাচ্ছে। নিজ হাতে বাইশ হালি কৈ ধরে লুঙির কোচে রাখি। বাদবাকী দৌড়ে মাঠের পানিতে চলে যায়। ঘরে গিয়ে মাছগুলি রেখে গোসল করে কাপড় বদলাই। পরদিন দেখি আমার দু উরুতে এলার্জির মত লাল বর্ণের অসংখ্য দাগ আর তাতে প্রচুর বেদনা। আমি এটাকে রোগ ভেবে ডাক্তারের কাছে যাই। ডাক্তার সাহেব বলেন এটাতো কোন রোগের লক্ষণ বলে মনে হয়না। আপনি স্বরণ করুন দু চার দিনের মধ্যে আপনি কি কি কাজ করেছেন। তখন আমার মনে পড়ে পুর্ব দিনের কৈ ধরার কথা। বিষয়টি ডাক্তার সাহেবকে খুলে বললে তিনি মুচকি হেসে বলেন এর উপযুক্ত ঔষধ হচ্ছে কৈ মাছ ভাজি করে খেয়ে তৈলাক্ত হাত দিয়ে ঐস্থান মুছে দেয়া।
তখনকার দিনে গ্রামে প্রচুর আমের ফলন হতো। বৈশাখী ঝড়ে আম গাছের নীচে আম স্তুপাকারে পড়ে থাকত। তখন কার আম কে খায়। আমি নিজে বাল্যকালে আমার বাড়ীতে যত আম কাঁঠাল দেখেছি তার একশো ভাগের এক ভাগ এখন আর নেই। পাকা আমের মৌসুমে যে কোন সময় যে কোন গাছের নীচে চার পাঁচ হালি আম পাওয়া যেত। আমরা আমগাছ কে আমের কোয়ালিটি অনুসারে বিভিন্ন নামে অভিহিত করতাম। কপলী গাছ, মিটা গাছ, চটই গাছ, মালদই গাছ, গন্ধি গাছ, টেংগা গাছ, ভেদা গাছ প্রভৃতি। আমার দাদী আর নানী পাকা আম দিয়ে আমের ফুটি বানাতেন। তখন বাজারে আমের হালি ছিল মাত্র আট আনা। গ্রামের লোকেরা টুকরি আর দা নিয়ে আম খেতে বসতেন। আমের মধ্যে হাতির আকৃতির কালো পোকা থাকত। অনেকে সাঁতার শিখিবার জন্য পোকা আম খেতেন। আমের পোকা নিয়ে ধাঁ ধাঁ ছিল “লটকনীত থাকে চটকনীত খায়-কাটিয়া দিলে আটিয়া যায়”। কাঁঠালের গাছ সংখ্যায় ছিল পাঁচ থেকে সাতটি। প্রতিটি গাছে ন্যূনতম একশো দেড়শো করে কাঁঠাল ধরতো। এখন কাঁঠালের গাছ আছে অনেক কিন্তু সব মিলিয়ে পুর্বের এক গাছের কাঁঠালও ধরেনা।
আমাদের এলাকায় আউশ আমন দু প্রকারের ধান উৎপন্ন হয়। বোরো ধান আমাদের এলাকায় নেই। বিধায় বৈশাখ মাসের বোরো ধান তুলার চিত্র উপস্থাপন করা আমার পক্ষে সম্ভব হলনা। বৈশাখ মাসে গ্রামের লোকেরা বিরনী ধানের খই, মটর ভাজি, চাল ভাজি করে খেত। কেহ কেহ বিরনী চালের সাথে তিসি মিশিয়ে ভাজি করে খেত। সোজা কথায় তখন গ্রামীণ চিত্র ছিল সম্পুর্ণ প্রাকৃতিক। আগে বজ্রপাত ছিল বেশি কিন্তু প্রাণহানি ছিল কম। এখন বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা বেশি। একবার আমার এলাকার জনৈক লোক কালবৈশাখীর দিনে ঠেলা গাড়িতে লাকড়ী নিয়ে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে বজ্র সহ ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়। বজ্রের এক বিকট শব্দে সে জ্ঞান হারিয়ে ঠেলা গাড়ির লাকড়ির উপর পড়ে যায়। এতে তার মুখের নীচ অংশ লাকড়িতে কেটে রক্তাক্ত হয়। অল্প পরে জ্ঞান আসার পর সে নিজের শরীরে রক্ত দেখে চিৎকার করতে থাকে আমার উপর বজ্র পড়ে গেছে। লোকটাকে নিকটস্থ ফার্মেসীতে নেবার পর মুল রহস্য ধরা পড়ে।
এখন বৈশাখ মানে কারুকার্য, নতুন ড্রেস পরিধান। এসো হে বৈশাখ নামাঙ্কিত গেঞ্জি পরিধান। বাচ্চাদের হাতে বাংলা নববর্ষ অংকিত ব্যাজ। হলুদ কিংবা লাল রংগের শাড়ী পরিধান। রাস্তা ঘাটে রংগের ছড়াছড়ি। দোকানে রেস্তোরায় কুলা, পাখা, চালইন ইত্যাদি কারুকার্য। কোথাও রং বেরংগের মাটির কলসী, হাড়ি, পাতিল ইত্যাদি। নববর্ষকে উপলক্ষ করে স্থানে স্থানে বাউল গানের মেলা। আর হোটেলে পান্তা ভাত ও ইলিশ মাছ। এটা আসলে বৈশাখের বাস্তব রূপ নয়। বৈশাখকে উপলক্ষ করে এটা মনগড়া কালচার।
বৈশাখের বাস্তব রূপ হলো উজাই ধরা, কৈ ভাজি, পুঁটি ভাজি, বিরনী ধানের খই, শাক নালিতা সহ অনেক কিছু। বৈশাখের চিত্র হলো উপড়ে পড়া শত শত গাছ, কর্দমাক্ত মাঠ, ডানা ভাঙ্গা নীড় হারা পাখি। প্রকৃতির রুদ্র তান্ডব। শিলা বৃষ্টিতে ফসল হানি। উড়ে যাওয়া ঘরের চাল, রাতভর ব্যাঙের ডাক, বজ্রপাতে প্রাণহানি। আসলে এ সবের পিছনে কাজ করে প্রত্যেকের ব্যক্তি মানস। আমাদের জাতীয় সঙ্গীতে বিশ্ব ক্িব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন “ওমা ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে”। এ স্থানে আমার ব্যক্তি মানসের ধারণা হলো ফাগুনে আমের বনে ঘ্রাণ থাকেনা বৈশাখ জৈষ্ঠে আমের বনে ঘ্রাণ থাকে। আর ফাগুন যদি ঠিক থাকে তবে আমের বনের পরিবর্তে ফুলের বনে উল্লেখ থাকাটা অধিক সঙ্গত। কিন্তু কথা হচ্ছে কৈ মিস্টার লিয়াকত আলী আর কৈ জুতার কালি। থাক আর বলবনা। বৈশাখের বিচিত্র রূপ শীর্ষক লিখনীর এখানেই যবনিকা টানছি।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, জকিগঞ্জ সাহিত্য সংসদ।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • সম্ভাবনার ক্ষেত্র এবং নতুন প্রযুক্তি
  • গণমানুষের মুখপত্র
  • জাহালম কি আরো আছে!
  • নারী নির্যাতন ও আমাদের বাস্তবতা
  • সিলেটের ডাক : কিছু স্মৃতি কিছু কথা
  • বর্ষাঋতুতে শিশুদের যত্ম
  • কোটি মানুষের মুখপত্র
  • ৩৬ বছরে সিলেটের ডাক
  • প্রত্যয়ে দীপ্ত ‘সিলেটের ডাক’
  • পাঠকের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি
  • এরশাদ : এক আলোচিত পুরুষের প্রস্থান
  • প্রাসঙ্গিক ভাবনায় ২০১৯-২০ অর্থ বছরের বাজেট
  • মেঘালয়ের মেঘমালা
  • পরিবেশ সংরক্ষণে সামষ্টিক উদ্যোগ
  • বর্ষা মানেই কি জলাবদ্ধতা?
  • শিষ্টাচার ও সৌজন্যবোধ
  • রেলের প্রতি জনগণের আস্থা বিনষ্ট করা যাবে না
  • প্রকৃতির দায় শোধে বৃক্ষ রোপণ
  • ঋণ দেয়া-নেয়ায় প্রাসঙ্গিক ভাবনা
  • কান্ডারী হুঁশিয়ার!
  • Developed by: Sparkle IT