মহিলা সমাজ

ভাটি বাংলার রূপ মাধুর্য

সৈয়দা মানছুরা হাছান (মিরা) প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৪-২০১৯ ইং ০০:২০:৩৯ | সংবাদটি ২৪ বার পঠিত

ধন ধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা/ তাহার মাঝে আছে দেশ একÑ সকল দেশের সেরা/ ও সে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে দেশ স্মৃতি দিয়ে ঘেরাÑ
গীতিকবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এর সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে আমিও বলতে চাই, ধন ধান্য পুষ্প ভরা বাংলার প্রকৃতিতে রূপ, রস, গন্ধ অবিরত রং বদলায়। ঋতুবৈচিত্রে বাংলার প্রকৃতি সাজে নানান সাজে। অফুরন্ত এ রূপ সর্বদা নব নব সাজে সজ্জিত হয়। বাংলাদেশ নদীমাতৃক ও হাওর প্রধান দেশ। এদেশে ছোট বড় মিলিয়ে সাতশ’ নদ নদী রয়েছে। মায়ের মতো ¯েœহ দিয়ে নদ নদীগুলো এদেশ ঘিরে রেখেছে। তাই এ দেশকে নদীমাতৃক দেশ বলা হয়। বাংলাদেশের হাওর বেষ্টিত অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকাগুলোকে ভাটি অঞ্চল বলা হয়ে থাকে।
বৃহত্তর সিলেটের সুনামগঞ্জের প্রায় সম্পূর্ণ এবং হবিগঞ্জের অধিকাংশ থানা হাওর বেষ্টিত। হাওর অধ্যুষিত এই ভাটি বাংলার রূপ যারা অন্তর্চক্ষু দিয়ে অবলোকন করেছেন, তারাই হয়েছেন ভাবুক। আর এই ভাবের সাগরে ডুব দিয়ে যারা এর রস আস্বাদন করেছেন, তাদেরকেই আমরা বলি মরমী সাধক। তারা আমাদেরকে উপহার দিয়েছেন অজ¯্র মরমী গান এবং বাউল গান। উল্লেখ্য যে, সুনামগঞ্জ জেলায় রয়েছে অসংখ্য হাওর। যেমনÑনলুয়ার হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, শনির হাওর, সাংগাইর হাওর প্রভৃতি। আর তদসংলগ্ন এলাকাকেই বলা হয় ভাটি বাংলা বা ভাটি অঞ্চল। অধিকাংশ সময় জলমগ্ন থাকায় এই অঞ্চলের মানুষের স্বভাব চরিত্রেও এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। যার কারণে ঐসব এলাকার মানুষ সহজ, সরল ও উদার প্রকৃতির হয়ে থাকে। ভাটি অঞ্চলের মানুষগুলোর মধ্যে এই অপরূপ প্রকৃতির প্রভাব ভাবের উদ্রেক করে। আর এই ভাব থেকেই তাদের প্রাণে সুর আসে এবং সেই সুরে আমরা মুগ্ধ হই, আন্দোলিত হই। আর এই সুরের অমিয়ধারাকে বলা হয় মরমী গান তথা বাউল গান। সুরের অমিয়ধারায় আমাদেরকে যারা সিক্ত করেছেন তারা হলেন মরমী কবি হাছন রাজা, বাউল শাহ আব্দুল করিম, দুর্বিন শাহ এবং রাধারমন দত্ত।
ভাটির মানুষের প্রাণপ্রিয় মরমী গানের সাধক কবি হাছন রাজা। যিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর তৎকালীন সিলেট জেলার সুনামগঞ্জ শহরের নিকটবর্তী সুরমা নদীর তীরে লক্ষণছিরি (লক্ষণশ্রী) পরগনার তেঘরিয়া গ্রামে। হাছন রাজা জমিদার পরিবারের সন্তান। উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি বিশাল ভূ-সম্পত্তির মালিক ছিলেন। এই ভাটি অঞ্চলের প্রকৃতির প্রভাব হাছন রাজার জীবনেও ছিলো। তিনি প্রায়ই নৌকা বিহারে যেতেন এবং আমোদ প্রমোদ করতেন। এর মধ্যেই বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে তিনি প্রচুর গান রচনা করেছেন। নৃত্য এবং বাদ্যযন্ত্রসহ এসব গান গাওয়া হতো। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এসব গানে জীবনের অনিত্যতা সম্পর্কে, ভোগ বিলাসের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
হাছন রাজার কোনো কোনো গানে স্থান কাল পাত্রের পরিচয় চিহ্নিত আছে। লক্ষণছিরি ও রামপাশা তাঁর জন্মস্থান জমিদারী এলাকার উল্লেখ বারবার এসেছে। পাওয়া যায় সুরমা ও আঞ্চলিক নদী কাপনার নাম। এ থেকে বুঝা যায়, মরমী সাধনায় পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রভাব রয়েছে। হাছন রাজার জনপ্রিয় কিছু গান বিশেষ করে ‘লোকে বলে, বলে রে, ঘরবাড়ি ভালা নায় আমার’, ‘মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়ারে’, ‘মরণ কথা স্মরণ হইল না হাছন রাজা তোর’, ‘আমি যাইমুরে যাইমু আল্লাহর সঙ্গে’Ñ সমাদৃত ও লোকপ্রিয় শুধু নয়, সংগীত সাহিত্যের মর্যাদাও লাভ করেছে। হাছন রাজার প্রথম জীবন বিলাসবহুল হলেও শেষ জীবনে আধ্যাত্মিক ভাবধারায় ডুবে গিয়ে তিনি লিখেছেনÑ‘একদিন তোর হইবরে মরণ/ রে হাছন রাজা/ একদিন তোর হইবরে মরণ।’
এভাবেই আস্তে আস্তে বিলাসী জমিদার হাছন রাজা হয়ে ওঠলেন মরমী সাধক। আর আমাদের বাংলা গানের ভান্ডারে যোগ হলো অজ¯্র মরমী গান।
উল্লেখ্য যে, হাছন রাজার চিন্তাভাবনার পরিচয় পাওয়া যায় তার গানে। তিনি কতো গান রচনা করেছেন তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। হাছন উদাস গ্রন্থে তাঁর ২০৬টি গান সংকলিত হয়েছে। এর বাইরে আরও কিছু গান ‘হাছন রাজার তিন পুরুষ’ এবং ‘আল ইসলাহ’সহ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৩০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘হিবার্ট লেকচারে’ রবীন্দ্রনাথ ‘The religion of Man’ নামে যে বক্তৃতা দেন তাতেও তিনি হাছন রাজার দর্শন সংগীতের উল্লেখ করেন।
ভাটি বাংলার আরেক মরমী সাধক শাহ আব্দুল করিম, যিনি বাউল হিসেবে আমাদের কাছে পরিচিত। তাঁর জীবনের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, আব্দুল করিমের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা কালনী নদী তাঁর জীবনে তথা গানে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। এই কালনী নদী তাঁকে মরমী গানের রসদ যুগিয়েছে। শাহ আব্দুল করিম ১৯১৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই থানার ধল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দারিদ্র্য ও জীবন সংগ্রামের মাঝে বড় হওয়া বাউল শাহ আব্দুল করিমের সংগীত সাধনার শুরু ছেলেবেলা থেকেই। ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি তাঁর গান কথা বলে সকল অন্যায়, অবিচার, কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। তিনি তাঁর গানের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন প্রখ্যাত বাউল স¤্রাট ফকির লালন শাহ, পুঞ্জু শাহ এবং দুদু শাহ এর দর্শন থেকে। ২০০১ সালে শাহ আব্দুল করিম একুশে পদক লাভ করেন। ২০০০ সালে তিনি কথা সাহিত্যিক আবদুর রউফ চৌধুরী পদক এবং রাগীব-রাবেয়া সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। এছাড়া আরও অনেক পুরস্কার তিনি পেয়েছেন।
বাংলা একাডেমি তাঁর দশটি গানের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করে। শাহ আব্দুল করিমের এ পর্যন্ত ৭টি গানের বই প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে পরিবেশ প্রকৃতির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। প্রকৃতির বিচিত্র সৌন্দর্য মানুষের মনে প্রশান্তি এনে দেয়। প্রকৃতি যেন মানুষের পরম আত্মীয়। মনোরম প্রকৃতির আহবান শুনে মানুষের মন আন্দোলিত হয়। জড় প্রকৃতি আর জীব প্রকৃতির মধ্যে যে নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান সেই সম্পর্কের সৌন্দর্য ও আনন্দ অনুভব করেন কবি গীতিকবি। তাদের কবিতা, ছড়া, গানের খাতা ভরে ওঠে প্রকৃতির সেই সৌন্দর্য ও আনন্দের পঙক্তিমালায়।
অন্যদিকে, বাংলার ভাটি অঞ্চলের জলময় মন উদাস করা প্রকৃতি যেন শ্যামল বাংলার আরেক রূপ। এই রূপের মাধুর্য উপভোগ করেই হাছন রাজা, শাহ আব্দুল করিমের মতো মরমী সাধকরা সাধনা করে গেছেন। আজও সেই হাওরে কান পাতলে যেন তাঁদের গানের সুর ভেসে আসে। আমরা আবেগাপ্লুত হয়ে যাই। যুগ যুগ ধরে তাঁদের সেই সুরের ধ্বনি আমাদের মাঝে বহমান থাকুক।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT