মহিলা সমাজ

বাবা-মায়ের অধিকার

সিরাজ প্রামাণিক প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৪-২০১৯ ইং ০০:২২:৫৪ | সংবাদটি ২৩ বার পঠিত

বাবা-মা যেন সন্তানের অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার না হন সে জন্য রয়েছে আইন। এমনকি বৃদ্ধাশ্রমে বা অন্য কোথাও থাকলেও বাব-মাকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না। সব বাবা-মা সন্তানের মঙ্গল চান। কিন্তু পরিস্থিতি যদি এমন হয়- কোনো সন্তান বাবা-মাকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তা হলে তারা আইনের আশ্রয় নিয়ে তাদের অধিকার আদায় করতে পারেন।
বাবা তার মৃত সন্তানের সম্পত্তিতে তিনভাবে উত্তরাধিকারী হয়ে থাকেন। ক. যদি মৃত সন্তানের ছেলে, ছেলের ছেলে এভাবে যত নিচে হোক না কেন, কোনো ছেলের অস্তিত্ব থাকে, তবে মৃত সন্তানের বাবা পাবেন তার সম্পত্তির ১/৬ অংশ। খ. যদি মৃত সন্তানের কেবল মেয়ে সন্তান বা তার ছেলের মেয়ে সন্তান থাকে তবে বাবা তার সম্পত্তির ১/৬ অংশ পাবেন। এ ক্ষেত্রে মেয়েদের ও অন্যদের দেয়ার পর অবশিষ্ট যে সম্পত্তি থাকবে তাও বাবা পাবেন। গ. আর যদি মৃত সন্তানের কোনো ছেলেমেয়ে বা ছেলের সন্তান কিছুই না থাকে, তবে বাকি অংশীদারদের তাদের অংশ অনুযায়ী দেয়ার পর অবশিষ্ট যা থাকবে তার সবটুকুই বাবা পাবেন।
মা-ও তার মৃত সন্তানের সম্পত্তিতে তিনভাবে অংশ পেয়ে থাকেন। ক. মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান বা ছেলের সন্তানাদি (যত নিচেই হোক) থাকলে অথবা যদি মৃত ব্যক্তির বৈমাত্রেয় বা বৈপিত্রেয় ভাইবোন থাকলে তবে মা ১/৬ অংশ পাবেন। খ. মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান বা ছেলের সন্তানাদি যত নিম্নের হোক, না থাকলে এবং যদি একজনের বেশি ভাই বা বোন না থাকে; তবে মা ১/৩ অংশ পাবেন। গ. কোনো সন্তান বা ছেলের সন্তানাদি যত নিম্নের হোক, না থাকলে অথবা কমপক্ষে দুইজন ভাইবোন না থাকলে এবং যদি মৃত ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রীর অংশ বাদ দেয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকবে তার ১/৩ অংশ মা পাবেন। মৃত ব্যক্তির এক ভাই থাকলেও মা ১/৩ অংশ পাবেন।
একজন বিধবা নারীকে তার স্বামীর মৃত্যুর পর কোনোভাবেই তার বাসস্থান থেকে জোর করে বের করে দেয়া যাবে না। স্বামীগৃহ, যেখানে তিনি বসবাস করছেন, এ গৃহে তার বাস করার অধিকার রয়েছে। এ ক্ষেত্রে তার প্রাপ্য সম্পত্তি তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে। তবে তিনি স্বেচ্ছায় অন্য কোথাও থাকতে চাইলে তাকে বাধা দেয়া যাবে না। তিনি অন্যত্র বিয়ে না করলে তার সন্তানদের তত্ত্বাবধান করার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন না। একজন বিধবা স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তির সন্তান থাকা অবস্থায় ১/৮ এবং সন্তান না থাকলে ১/৪ অংশ পাবেন।
একজন নারী তার স্বামীর মৃত্যুর পর ইদ্দতকালীন (চার মাস ১০ দিন) সময় পার করার পর নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী অন্য সাধারণ নারীর মতো স্বাভাবিক স্বাধীন জীবনযাপন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে কোনোভাবে তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা যাবে না। তিনি অন্যত্র বিয়ে করবেন কি করবেন না, এটি তার স্বাধীন সিদ্ধান্তের ব্যাপার।
দেনমোহর ঋণের মতো, স্বামীর অবর্তমানে স্বামীর উত্তরাধিকারীরা তা পরিশোধ করতে বাধ্য। দেনমোহর পরিশোধ না করা হলে স্বামীর মৃত্যুর তিন বছরের মধ্যে পারিবারিক আদালতে মামলা করে তিনি তা আদায় করতে পারবেন। এ ছাড়া স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত অংশ একজন বিধবা স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে পারবেন কিংবা দখলে রাখার অধিকার রয়েছে বলে বিবি বাচান বনাম শেখ হামিদ (১৮৭১) ১৪ এমআইএ পৃষ্ঠা-৩৭৭ এ উল্লেখ রয়েছে। একজন বিধবা মা তার সন্তানের কাছ থেকে ভরণপোষণ পেতে হকদার। সন্তানেরা ভরণপোষণ না দিলে আদালতে যাওয়ার সুযোগ আছে। (জমিলা খাতুন বনাম রুস্তম আলী, ৪৮ ডিএলআর (আপিল বিভাগ), পৃষ্ঠা-১১০।

দেনমোহরের দাবিতে কোনো বিধবা স্ত্রী তার স্বামীর সম্পত্তি দখল করে থাকলে যদি তাকে অন্যায়ভাবে সেই সম্পত্তি থেকে বেদখল করা হয়, তবে সে দখল পুনরুদ্ধারে মামলা করতে পারবেন। (মজিদ মিয়া বনাম বিবি সাহেব (১৯১৬) ৪০ বম. পৃষ্ঠা-৩৪)
স্বামী কিংবা স্ত্রী একে অপরের মৃত্যুতে সবসময়ই উত্তরাধিকারী হবেন। এ ক্ষেত্রে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী বা স্ত্রীর মৃত্যুর পর স্বামী অন্য কাউকে বিয়ে করলেন কি না, উত্তরাধিকারী হওয়ার ক্ষেত্রে এটি কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। অন্যত্র বিয়ে করলেও তাকে কোনোভাবেই স্বামীর উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। অন্যত্র বিয়ে করার দোহাই দিয়ে কোনো স্বামী বা স্ত্রীকে যদি সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়, সে ক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ পক্ষ দেওয়ানি আদালতে মামলা করে তার অংশ আদায় করে নিতে পারবেন। বাবা-মায়ের ভরণপোষণ আইন-২০১৩, কতগুলো বাধ্যবাধকতার নির্দেশ দিয়েছে। একাধিক সন্তান থাকলে নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ নিশ্চিত করবে এবং তাদের একই সাথে একই স্থানে বসবাস নিশ্চিত করবে। বাবা বা মা অথবা তাদের উভয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধনিবাস কিংবা অন্য কোথাও একত্রে কিংবা আলাদা আলাদাভাবে বসবাস করতে বাধ্য করা যাবে না। প্রত্যেক সন্তান তার বাবা-মায়ের স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখবে। একই সাথে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও পরিচর্যা করবে। যে ক্ষেত্রে বাবা বা মা জীবিত নেই, সে ক্ষেত্রে দাদা-দাদী অথবা নানা-নানী জীবিত থাকলে এ আইন অনুযায়ী তাদেরও ভরণপোষণ দিতে হবে।
কোনো সন্তান এ আইনের বিধান লঙ্ঘন করলে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে এবং ওই অপরাধের জন্য অনূর্ধ্ব এক লাখ টাকা অর্থদ-ে দ-িত হবে; বা ওই অর্থদ- অনাদায়ের ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব তিন মাস কারাদ-ে দ-িত হবে।
লেখক : আইনজীবী।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT