সম্পাদকীয় তিনটি কাজ আল্লাহর কাছে খুব প্রিয়। তোমার মুসলিম ভাইকে খুশী করা, তার ঋণ আদায় করে দেয়া, তাকে রুটি সাহায্য হিসেবে দেয়া। - আল হাদিস

ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস

প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৪-২০১৯ ইং ০০:২৯:২১ | সংবাদটি ১১৩ বার পঠিত

আজ ১৭ই এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। আমাদের গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে যে ক’টি দিন স্বর্ণাক্ষরে লিখিত, তার মধ্যে আজকের দিনটি অন্যতম। ১৯৭১ সালের এই দিনে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করে। আর এই সরকারেরই নেতৃত্বে পরিচালিত হয় দীর্ঘ ন’মাসের মুক্তিযুদ্ধ। যার ফলে আমরা আজকের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ লাভ করেছি। একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে এদেশের মানুষদের স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করার জন্য অনন্য ভূমিকা রেখেছিলো যেসব ঘটনা, তার অন্যতম হচ্ছে এই মুজিবনগর সরকার গঠন। আর তাই প্রতি বছর ১৭ই এপ্রিলকে জাতি শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করে। জাতি স্মরণ করে সেই সরকারের রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রীবর্গসহ সংশ্লিষ্টদের। কারণ আমাদের প্রয়োজনেই এই সত্যকে মেনে নিতে হয়, স্মরণ করতে হয়। স্মরণ করা উচিত দেশপ্রেমিক প্রতিটি নাগরিকের। এই দিনটিকে মর্যাদা দেয়া উচিত এদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহনকারী প্রতিটি সরকারেরই। কারণ, তারা তো এই মুজিবনগর সরকারেরই উত্তরসূরী।
স্বাধীনতাকামী ও স্বাধীনতার পক্ষের মানুষের কাছে নিঃসন্দেহে এটি একটি অবিস্মরণীয় দিন। একাত্তরের পঁচিশে মার্চের কালোরাতে অপারেশন ‘সার্চ লাইট’ নামে বাঙালি নিধনযজ্ঞ শুরু করে পশ্চিমা হানাদার বাহিনী। ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মমতম এই হত্যাযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর থেকে বসে থাকেনি বাঙালি দেশপ্রেমিক জনতা। তারা বিশ্বের স্বীকৃত সেরা যোদ্ধাদের সামনে দাড়ায় খালি হাতে, তারা অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের সামনে বুক পেতে দেয়। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। প্রাথমিক পর্যায়ে এই যুদ্ধ চলতে থাকে বিচ্ছিন্নভাবে। কিছুদিন এভাবে চলার পর এক পর্যায়ে গঠিত হয় অস্থায়ী মুজিবনগর সরকার। ভারতের আগরতলায় ১০ই এপ্রিল (১৯৭১) গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার এবং ১৭ই এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় শপথ গ্রহণ। সেদিন বর্তমান মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথ তলার আমবাগানে এই সরকার শপথ গ্রহণ করে। ফলে এই এলাকার নামকরণ হয় মুজিবনগর। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী গণপ্রতিনিধিরাই গঠন করে এই সরকার। মুজিবনগর সরকার গঠন করার পর থেকেই এই সরকারের মাধ্যমে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হতে থাকে সুপরিকল্পিতভাবে। অথচ এই সরকার গঠনের প্রক্রিয়াটি ছিলো অত্যন্ত অনাড়ম্বর। বৈশাখের রৌদ্রকরোজ্জ্বল দুপুরে বৈদ্যনাথতলার ভবেরপাড়া গ্রামে আমবাগানে সাদামাটা একটা মঞ্চ সাজিয়ে রাখা হয় বাংলার স্বাধীনতা ইতিহাসে একটি নবদিগন্ত উন্মোচন করতে। সেই মঞ্চে চেয়ার টেবিল নিয়ে আসলেন গ্রামবাসীরা। সে কারণে সেই গ্রামবাসীর সঙ্গে সঙ্গে কাঠের চেয়ার টেবিলগুলোও হয়ে উঠলো গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের একটি অংশ। সকাল ১১টা দশ মিনিটে শুরু হয় অনুষ্ঠান। বৈশাখের খরতাপ উপেক্ষা করে সেই মঞ্চের পশ্চিম দিক থেকে একে একে এলেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীবর্গ। সেই অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানীদের হাতে বন্দী থাকায় তাঁর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথগ্রহণ করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। আর সেদিন থেকেই মুজিবনগর স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী হিসেবেও স্বীকৃতি লাভ করে।
এটা ঐতিহাসিক সত্য যে, ১৯৭১ সালের আজকের এই দিনে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠের মাধ্যমে যে সরকারের জন্ম হয়েছিলো সেটিই হচ্ছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সূচনা। যদিও শপথ গ্রহণ শেষ হওয়ার আধঘন্টার মধ্যেই শত্রুরা এই ঐতিহাসিক মঞ্চ তছনছ করে দেয়। তারপরেও বাঙালিদের স্বাধীনতা অর্জনের অদম্য স্পৃহাকে দমাতে পারেনি তারা। বরং প্রবাসে আগরতলা থেকে এই মুজিবনগর সরকার মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। মুক্তিযুদ্ধ এবং মুজিবনগর সরকার একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। প্রবাসে থেকে নিজের দেশের যুদ্ধ সুপরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা একটা নজিরবিহীন ঘটনা তখনকার সময়ে। এই ঘটনার জন্ম দিয়েছেন যারা, অর্থাৎ সেই মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রীসহ অন্যান্য কলাকুশলীদের অস্বীকার করা, অবমূল্যায়ন করা স্বাধীনতার স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাসকে অস্বীকার করার নামান্তর। অন্তত নতুন প্রজন্মকে মুজিবনগর সরকার গঠনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও ইতিহাস সম্বন্ধে অবহিত করা উচিত। মুজিবনগর সরকারের ইতিহাসকে কলুষিত করে এমন কোন কর্মকান্ড হবে রীতিমতো রাষ্ট্রের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT