ইতিহাস ও ঐতিহ্য

হারিয়ে যাচ্ছে গুম্বুজওয়ালা মসজিদ

মো. আব্দুশ শহীদ নেগালী প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৪-২০১৯ ইং ০০:৩৩:৪২ | সংবাদটি ১১১ বার পঠিত

এক সময় মসজিদের শোভা বর্ধনের জন্য গুম্বুজ যেন ছিলো অপরিহার্য। মেহরাবের মতো গুম্বুজও ছিলো মসজিদের প্রধান আলামত। কালের বিবর্তনে গুম্বুজওয়ালা মসজিদ হারিয়ে যাবার পথে। ‘শত বছর’ পূর্বে নির্মিত আমার গ্রামের সেই গুম্বুজওয়ালা মসজিদ যেন এখনও আত্মার সাথে মিশে আছে। ‘আটারো শতাব্দীর’ শেষের দিকে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মোগলাবাজার থানাধীন ঐতিহ্যবাহী নেগাল গ্রামের আমাদের পূর্বপাড়া মহল্লার পূর্ব পুরুষগণ গ্রামের দক্ষিণ সীমানায় নির্মাণ করেছিলেন ঐ সে গম্বুজওয়ালা মসজিদটি। মসজিদের নির্মাণ সামগ্রী ছিলো মুরুব্বিদের ভাষায় চুনা চুরকি। দু’দিকের পরিবেশ মসজিদকে চমৎকার একটি সৌন্দর্য্যরে আসনে বসিয়েছিলো। মসজিদের উত্তর দেয়াল ঘেষে পূর্ব পশ্চিমে লম্বা সবুজ শ্যামল ছায়া ঘেরা সেই ঐতিহাসিক নেগাল গ্রাম। এবং মসজিদের দক্ষিণে সেই বিশাল শাইলকার হাওর। অর্থাৎ হাওর পাড়ে মসজিদ। সবুজের মধ্যখানে শুভ্র সাদা সেই মসজিদটি হাওরের গভীর থেকে মানুষের নযর কাড়তো।
চুনচুরকির সমন্বয়ে নির্মিত গুম্বুজওয়ালা মসজিদের স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্য ছিলো, যেগুলা অন্যরকম মসজিদের বেলায় খুজে পাওয়া যায়নি। ঐ মসজিদটি বাইর থেকে অনেক বড় সড় দেখা গেলেও ভিতর তেমন বড় ছিলনা। মসজিদের দেয়ালগুলোর পরিধি ছিল পৌনে দু’হাত। মূলত দেয়ালগুলো ভিতরের অনেক জায়গা দখল করে রেখেছিল। সে জন্য তুলনামূলকভাবে ভিতর ছিলো ছোট। মসজিদের একটি মাত্র বড় গুম্বুজ ছিলো, চতুর্কোণে ছিলো সেই চুনা-চুরকির চারটি মধ্যম আকৃতির স্তম্ভ বা পিলার। পিলারগুলোর উপরিভাগ ছিলো গুম্বুজ আকৃতির এবং হালকা কারুকার্যের বেষ্টনির মধ্যখানে। মসজিদের ভিতরে গুম্বুজের নিচে ছিলো চাঁদ তারা অংকিত। চাঁদ তারা ভালোবাসেনা এমন কোনো মানুষ কি আছে? ছোটবেলায় নামাযের কাতারে বসে প্রায়ই উপরের দিকে তাকিয়ে চাঁদ তারার সৌন্দর্য্য উপভোগ করতাম। মনে হতো আকাশের চাঁদ তারা যেন মাথার উপর চলে এসেছে। তখনকার যুগে রং আর ডিস্টেম্বার ছিলো মানুষের কাছে অজানা এক বস্তু। এর বিকল্প ছিলো চুনা আর নীল। বছর দু’এক পর নারিকেলের আঁশ আর লোহার ব্রাশ দিয়ে মসজিদের বাইর ভেতর ঘষামাজা করে পরিস্কার করতেন মিস্ত্রী। উৎফুল্ল হৃদয়ে সে কাজে সহযোগিতা করতাম আমরা মক্তব পড়–য়া ছাত্ররা, কারণ কিছু দিনের মধ্যে মসজিদের চুনকাম করা হবে, মসজিদটি একটি নতুন রূপ ধারণ করবে, সে আনন্দে সবাই আত্মহারা। দেয়ালের ময়লা পরিস্কারের পর বড় ড্রামে চুন আর নীল পানিতে মিশিয়ে মসজিদের বাইরে ভেতরে চুনকাম করা হচ্ছে। কিছু দিন পর ঐ মসজিদটি ধারণ করলো একটি ধব ধবে সাদা রূপ। স্বল্প সময়ে স্বল্প খরচে দু’তিন বছর পর পর নীল সাদা রূপ ধারণ করে মহল্লাবাসীর সম্মুখে উপস্থিত হতো ঐ সে গুম্বুজওয়ালা মসজিদটি।
বাদশা শাহজাহান হয়তো এ রকম ঝলমলে সাদা গুম্বুজওয়ালা মসজিদকে অনুস্মরণ করেই নির্মাণ করেছিলেন প্রিয় সহধর্মিনীর সমাধিস্থলে ‘আগ্রার তাজমহল’। ঐ তাজমহলের দিকে তাকালেই হৃদয়ের মণিকোঠায় জেগে ওঠে গুম্বুজওয়ালা মসজিদের আকৃতি। আগ্রার তাজমহলের শুভ্রতা, চুন কামওয়ালা মসজিদের শুভ্রতার কাছে যেন ম্লান ছিল। রাতের আধাঁরে দূর থেকে মসজিদের দিকে তাকালে মসজিদের উজ্জ্বল শুভ্রতা দৃশ্য পটে ভেসে ওঠতো। মসজিদের আগছালা বা বারান্দার উপর ছিলো ঢালাইর ছাদ। ছেহেন বা বারান্দার তিন দিক ছিলো ইটের দেয়ালের পরিবর্তে বালি আর সিমেন্টের তৈরি ৪ ফুট উচুঁ ফুলের নাইছরা। তার উপর স্থাপন করা হয়েছিলো গুলাকৃতির লিন্টার। মসজিদের ছেহেন বা আগছালার তিন দিকে ফুলের তৈরি নাইছারার দেয়াল যেন ছিলো মসজিদকে সৌন্দর্য্য মন্ডিত করার আরেকটি ধাপ। রোদ বৃষ্টি আর কুয়াশার ছোঁয়ায় দু’এক বছর পর পর মসজিদে জং ধরলেও মনে হতো এটি জং নয়, সুরমা রঙয়ের প্রলেপ যেন মসজিদের উপর এটে দেওয়া হয়েছে।
গুম্বুজওয়ালা চুনা চুরকির তৈরি মসজিদ যে সকল বৈশিষ্টের অধিকারী তাহলো প্রচন্ড গরমের সময় বা মৌসুমে মসজিদের ভিতর ছিলো আরামদায়ক ঠান্ডা। আবার প্রচন্ড ঠান্ডার সময় মসজিদের ভিতর থাকতো আরামদায়ক গরম। গরমের সাথে পাল্লা দিয়ে ঠান্ডা এবং ঠান্ডার সাথে পাল্লা দিয়ে গরম যেন মসজিদের ভিতরে সদা-সর্বদা বিরাজমান থাকতো। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মসজিদ বা মার্কেটের কিছু না কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া রয়েছে। যেমন হঠাৎ প্রবেশ বা বের হওয়ার বেলায় মাথা ব্যাথা, হ্যাঁচি, অসহনীয় ঠান্ডা বা তাপ ইত্যাদি। কিন্তু এরকম মসজিদগুলো ছিলো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া থেকে মুক্ত। নামাযের সময় মুসল্লিগণ আগে আগে মসজিদে প্রবেশ করার চেষ্টা করতেন। নামায শেষে মসজিদের দেয়ালে হেলান দিয়ে তাসবিহ পড়তে পড়তে অনেকে আবার ঘুমিয়ে পড়তেন। মসজিদ থেকে বের হওয়ার ইচ্ছাই যেন হতো না। মসজিদটির ছিলো দু’টি দরজা ও একটি জানালা। গরমের মৌসুমে দক্ষিণের দরজাখুলে দিলেই হাওর থেকে মুসল্লিদের প্রাণ জোড়ানো বাতাস মসজিদের ভিতরে ধুঁ ধুঁ করে প্রবেশ করতো। ইমাম সাহেব যখন নামাযে কেরাত ও খুৎবা পাঠ করতেন, তখন মসজিদের ভিতর থেকে নতুন একটি আওয়াজ সৃষ্টি হয়ে ইমাম সাহেবের আওয়াজের সাথে সংযুক্ত হতো যা বর্তমান যুগের সাউন্ড সিস্টেমের অনুরূপ। এটা একমাত্র গুম্বুজওয়ালা মসজিদের বৈশিষ্ট্য হতে পারে। কারণ দরজা জানালা অপ্রতুল হওয়ার দরুণ আওয়াজ বাইরে না গিয়ে মসজিদের ভিতরে ঘুরপাক খেয়ে সুমিষ্ট ও বড় একটি আওয়াজের সৃষ্টি হতো যার কারণে বড় জামাতের বেলায়ও কোন মুকাব্বিরের প্রয়োজন হতো না।
নামায শেষে আমরা মসজিদের এ পাশে ও পাশে অনেক সময় কুরআন শরিফ তেলাওয়াতে বসে যেতাম। মসজিদের আওয়াজ কণ্ঠের আওয়াজকে করে তুলতো কোমল ও সুমিষ্ট যা বেশি করে তেলাওয়াত করার আগ্রহ অন্তরে জাগিয়ে দিতো। রাতের বেলায় মোমবাতির ¯িœগ্ধ আলৈা মুসল্লিগণের এবাদতের একাগ্রতা যেন আরও বাড়িয়ে দিতো। ছোটবেলার কথা, মসজিদের সামনে ক্ষেতের মাঠ ওখানে উচুঁ আওয়াজে কথা বললে বা কাউকে ডাকা ডাকি করলে অথবা হু হা শব্দ করলে মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসতো আকর্ষণীয় প্রতিধ্বনি। আমরা সমবয়সীরা আযানের জন্য একে অন্যে তাড়াহুড়া করতাম কারণ আযানের প্রতিটি বাক্যের শেষে আঙ্গুলির অগ্রভাগ ফাঁক করে শ্রবণ করতাম সে সকল মনোমুগ্ধকর প্রতিধ্বনী। মাইক ছিলো না। বিদ্যুৎ ছিলো গ্রামাঞ্চলের লোকদের কল্পনার জগতে। মুখে উচ্চারিত সে আযানের ধ্বনি বুরো চাষে মুরব্বিরা যখন শ্রবণ করতেন তখনই বিলে ঝিলের পানিতে অযু করে হাওরের বাঁধে দাড়িয়ে নামায পড়ার দৃশ্য আমাদের মনে কতোই না আনন্দ যোগাতো। সে সকল কারণে মসজিদের প্রতি মুসল্লিগণের ছিলো আকর্ষণ। তাহলো মসজিদটি হাওর পারে থাকায় মনে হতো যেন মসজিদটি সৌন্দর্যের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে হাওরের ভিন্ন রকম সাজ মসজিদের ছেহেনে বা পুকুর পারে দাড়িয়ে প্রত্যক্ষ করতেন মসল্লিরা। বিশেষ করে মাগরিব, এশা এবং ফজরে চলে আসতাম মসজিদে।
শীত ও বসন্ত ঋতু, এশার নামায পড়ে মসজিদের পুকুর ঘাটে বসে তাকিয়ে দেখতাম সে নিবর নিস্তব্দ হাওর। কেহ দেখছেন হাওরের গভীরে হঠাৎ জ্বলে ওঠা শয়তান মামার বাতি। কেহ তাকিয়ে দেখতেছি ফেঞ্চুগঞ্জ (বিআইডিসি) সার কারখানার উচুঁ দালানের বাতির আলো। আবার অনেকে তাকিয়ে রয়েছি অন্তহীন আকাশে মিট মিট করে জ্বলতে থাকা তারকারাজির প্রতি। সব মিলিয়ে শুরু হতো অনেক নতুন পুরাতন গল্প। মুরুব্বি দু’একজন এ আসরে থাকলে তো আর আনন্দের সীমা নেই। কারণ তাদের মুখ থেকে শুনতে পাবো এ হাওরের বা বিল বাদালের অনেক কিচ্ছা কাহিনী। তাঁরই ফাঁকে কেহ আবার দিয়াশলইর কাঠি দিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে মসজিদে পড়ছেন এশার নামায। নামায শেষে উনিও যোগ দিচ্ছেন আমাদের এ আসরে। গল্পগুজব শেষে মনে হতো মসজিদটাকে একা অন্ধকার রেখে মর্মাহত হৃদয়ে চলে যাচ্ছি যার যার গন্তব্যের দিকে। ইমাম সাহেবদের জন্য মসজিদের কোন কক্ষ ছিলো না। ওরা থাকতেন গ্রামের নিকট টঙ্গি ঘরে। এভাবেই গড়িয়ে যেতো দিনের পর দিন। গ্রামটি ছিলো উজান ভাটির মাঝামাঝি। এজন্য যথেষ্ট পরিমাণ নৌকা ছিলো না গ্রামটিতে। বর্ষার বা বন্যার মৌসুমে আমরা অনেকে তৈরি করতাম কলা গাছে ভুরা, সে ভুরা বেয়ে এশার নামাযে চলে আসতাম মসজিদে। নামায শেষে মসজিদের ছেহেনে দাড়িয়ে অনেক্ষণ তাকিয়ে থাকতাম হাওরের প্রতি। আবার অনেকে ভুরা নিয়ে বেরিযে যেতেন হাওরে। সকলে মিলে উপভোগ করতাম অথৈ জলরাশির উপর চাদের আলোর চমৎকার দৃশ্য। ঝড়ের সময় দূর থেকে চলে আসা তরঙ্গমালা আচড়ে পড়তো মসজিদের পুকুর পারে। মনে হতো আমরা সাগর পারে দাড়িয়ে আছি। আশ্বিন-কার্তিক মাসে সবুজ ধানের শীষে, অগ্রহায়ণ মাসে পাকা ধানের সাড়া জাগানো আমেজের আনন্দ উপভোগ করতেন মুসল্লিরা মসজিদে এসে। তাছাড়া মসজিদের পূর্ব দক্ষিণ দিকে হাওরপাড়ে রয়েছে মোকামবাড়ি, তেতইর তল, ও টাকার তল নামে তিনটি কবরস্থান। যেগুলো মসজিদের অনতিদূরে অবস্থিত।
হাওরের দূরত্ত থেকে ও চোখের জ্যোতিতে ভেসে আসতো ঐ ঝকঝকে সাদা মসজিদটি। যেন এটি নেগাল গ্রামের একটি নিশান। এতো কিছুর পর বলতে হচ্ছে ঐ মসজিদটি এখন আছে শুধু প্রবীণদের স্মৃতির আয়নায়। যুগের বিবর্তনে হারিয়েগেছে ঐ মসজিদটি। গ্রামের মানুষ কলাগাছের ভুরা আর নৌকা চড়ে ভবিষ্যতে মসজিদে যাবে না। গ্রামের লোকসংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গুম্বুজওয়ালা মসজিদ কি দু’তলা হয়? এ সকল চিন্তা ভাবনার ফল স্বরূপ ১৯৯৭ খ্রি. সনে মসজিদটিকে ঐ চমৎকার স্থান থেকে ১০০ গজ উত্তরে গ্রামের প্রধান রাস্তার পাশে স্থানান্তরীত করা হয়েছে। শত বছর স্বগৌরবে দাড়িয়ে থাকা মসজিদটি এখন আর ওখানে নেই। হাওরের সৌন্দর্য্য দেখতে ওখানে আর সমাগম ঘটেনা মুসল্লিদের। মসজিদটি বিলুপ্ত করে চুনা চুরকি নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। নেগাল গ্রাম থেকে মোগলাবাজারের দূরত্ব প্রায় দেড় কি.মি. বাজারে যাবার বেলায় রাস্তার পাশে আরও দু’টি গুম্বুজওয়ালা মসজিদের দেখা মিলতো। একটি হলো গুপালগাঁও জামে মসজিদ এবং অপরটি ছিলো রাঘবপুর জামে মসজিদ। এগুলোও বিলুপ্ত করে আমাদের গ্রামের নতুন মসজিদের মতো নতুন আঙ্গিকে দ্বিতল বহুতল ছাঁদওয়ালা মসজিদে রূপান্তরীত করা হয়েছে। এক সময় হয়তো গুম্বুজওয়ালা মসজিদ মানুষের কাছে হয়ে যাবে সম্পূর্ণ অপরিচিত।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT