ইতিহাস ও ঐতিহ্য

মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস

ফারুখ আহমেদ প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-০৪-২০১৯ ইং ০০:৩৮:৫৫ | সংবাদটি ২৫৮ বার পঠিত

কেউ আম্রকানন বলেন, আবার কেউ বলেন আম বাগান। আমি আম বাগানই বললাম। এমন চমৎকার আম বাগানটির মালিক ছিলেন কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের ভবের পাড়ার জমিদার বৈদ্যনাথ বাবু। বৈদ্যনাথ বাবুর নামানুসারেই দিনে দিনে জায়গাটির নাম হয়ে ওঠে বৈদ্যনাথ তলা। আমবাগান বা বৈদ্যনাথ তলাতে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করেন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রীপরিষদের সদস্যরা, পাঠ করা হয় বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। শপথ গ্রহণ এবং ঘোষণাপত্র পাঠের পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ একটি বিবৃতি পাঠ করেন এবং বৈদ্যনাথ তলার নাম রাখেন মুজিবনগর। সেই থেকে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলার নাম হয় মুজিবনগর। সেদিন মুজিবনগরকে অস্থায়ীভাবে বাংলাদেশের রাজধানী ঘোষণা করা হয়। দেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধু জায়গাটি সঠিকভাবে সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশনার পর মুজিবনগর সরকারকে স্মরনীয় করে রাখার জন্য ১৯৭৪ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবসের দিন মুজিবনগর স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।
মূলত; মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ নির্মাণের মূল কাজ শুরু হয় ১৯৮৭ সালে। মুজিব নগরকে গুরুত্ব দিয়ে স্বাধীনতার স্মৃতি ধরে রাখতে ২৩ স্তরের স্মৃতিসৌধ গড়ে তোলেন। মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ উদ্ভোধন হয় তারই হাতে। স্মৃতিসৌধের নকশা স্থপতি তানভীর করিম।
১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার প্রধান হলে মুজিবনগর কমপ্লেক্স নির্মাণ কাজে হাত দেন। আজ আপনাদের নিয়ে যাব আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স্মরণীয় স্থান মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে তথা মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সে। স্থানীয় কাউকে এলাকার নাম বৈদ্যনাথ তলা বা আম্রকানন বললে মানতে নারাজ, সবার এককথা এ হল মুজিবনগর।
ভোর ৬টা নাগাদই হবে। শেষ শরতে কেমন কুয়াশাচ্ছন্ন চারিদিক। আগের রাতে আমরা কুষ্টিয়া মেহেরপুর হয়ে মুজিবনগর এসেছি। রাতেই বলা ছিল ভোরে বের হব। কথা মত বের হলাম। গন্তব্য মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ। বেশি দূরে নয়, আমাদের বাংলো থেকে পাঁচ মিনিটের পথ। আবু জাফর আর শাহেদ ভাইকে ডেকে বের হতে যাব দেখি অজয় সরকারও চোখ কচলে আমাদের সঙ্গী হয়েছেন।
পথে নামতেই ঠা-া বাতাসের ঝাপটা গায়ে এসে লাগল। আহা কি অসাধারণ সুন্দর চারিদিক। আবেশে আচ্ছন্ন হতে থাকলাম। একটু এগিয়েই পেয়ে গেলাম আমবাগান। এটাই বিখ্যাত আম্রকানন।
সূর্যের সমস্ত আলো সে সময় আমবাগান আলোকিত করেছে দেখে সত্যি বিমোহিত আমরা। চোখে শুধু অনাবিল মুগ্ধতা। সে মুগ্ধতা নিয়ে আরও মিনিট খানেক হেঁটে চলে এলাম মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধের কাছে। সেই সাত সকালে একজন সেবক পুরো স্মৃতিসৌধ ঝাড়– দিয়ে চলেছেন। আমার মুখ থেকে বের হওয়ার আগেই আবু জাফর বলল- ‘আরে সুভাষ মল্লিক যে।’
সংবাদপত্রের মাধ্যমে সুভাষ মল্লিকের কথা সবার জানা। সাদা মনের মানুষ হিসেবে পরিচিত সুভাষ মল্লিক পরিচ্ছন্নতা কর্মি নন। স্মৃতিসৌধ নির্মাণের পর থেকেই নিয়মিত পুরো ঝাড়– দিয়ে পরিষ্কার করে রাখেন। মেয়ে, মেয়ে-জামাই, নাতি আর স্ত্রী আন্না মল্লিককে নিয়ে তাঁর সংসার। থাকেন কাছেই ভবের পাড়ায়। কেউ তাঁকে স্মৃতিসৌধ পরিষ্কার করার জন্য বলেননি, নিয়োগ দেননি। নিজের তাগিদেই প্রতিদিন স্মৃতিসৌধ পরিষ্কার রাখেন। এর মধ্যে স্মৃতিসৌধ ঝাড়– দেওয়া শেষ হলে আমরা সুভাষ মল্লিকের সঙ্গে কথা বলি। তিনি আমাদের বলে চলেন মুক্তিযুদ্ধ সময়ের স্মৃতি। মুজিবনগরে শপথ গ্রহণের স্মৃতি। মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ নির্মাণ ও স্মৃতি-কমপ্লেক্সের কথা।
তারপর বলেন, ‘এই যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, সেই যুদ্ধে কত শহীদের অবদান ও আত্মত্যাগ। আমি তো কছিুই করতে পারি নাই। তাদের স্মৃতিঘেরা এই জায়গাটুকু পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করি। একটু ময়লা দেখলে আমার কলিজায় লাগে!’
আমরা মুগ্ধ হয়ে সুভাষ মল্লিকের কথা শুনি। তারপর তার সঙ্গে স্মৃতিসৌধ হয়ে হেঁটে হেঁটে পুরো মুক্তিযুদ্ধ কমপ্লেক্স ঘুরে দেখি!
প্রায় ৮০ একর জায়গার উপর দাঁড়িয়ে আছে মুজিবনগর কমপ্লেক্স। আম্রকাননের জায়গার পরিমাণ প্রায় ৪০ একরের মতো। এখানে আমগাছ রয়েছে ১৩শ’টি। তিনটি ধাপে ছয় স্তর বিশিষ্ট দুইটি গোলাপ বাগান। যা ৬ দফা আন্দোলনের রূপক।
বাগান দুটিতে গোলাপ আছে ২২শ’। এখানে আছে বঙ্গবন্ধু তোরণ, অডিটোরিয়াম, শেখ হাসিনা মঞ্চ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কেন্দ্র, মসজিদ, হেলিপ্যাড, ২৩টি কংক্রিটের ত্রিকোণ দেয়ালের সঙ্গে উদিয়মান সুর্যের প্রতিকৃতিকে প্রতীক করে মুজিব নগর স্মৃতিসৌধ, প্রশাসনিক ভবন, টেনিস মাঠ, পর্যটন মটেল, স্বাধীনতা মাঠ, স্বাধীনতা পাঠাগার, বিশ্রামাগার, পোষ্ট অফিস, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, শিশুপল্লী, ডরমেটরি ও মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ভিত্তিক বাংলাদেশের মানচিত্র।
মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধের পর এখানে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল বাংলাদেশের মানচিত্র। আমাদের যুদ্ধকালিন অবস্থার রূপক। কোথায়, কোন এলাকায় যুদ্ধ হয়েছে, শরণার্থীরা কীভাবে সে সময় ভারত গিয়েছিলেন বা দেশ ছাড়েন। বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান অনুযায়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরকে ভাগ করে দেখানো হয়েছে মানচিত্রে।
মানচিত্রের উত্তর দিকটা উচু থেকে ক্রমান্বয়ে দক্ষিণ দিকটা ঢালু করা হয়েছে। এবং সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলগুলোকে দেখানো হয়েছে পানির ওপর ভাসমান। মুজিবনগর কমপ্লেক্সের মাস্টার প্ল্যান করেছে স্থাপত্য অধিদপ্তর। মানচিত্রের নকশা বুয়েট স্থপতীদের সংগঠন বিআরটিসি’র করা।
কমপ্লেক্সের আরেক উল্লেখ যোগ্য বিষয় কিছু ভাস্কর্য। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ, ঐতিহাসক তেলিয়া পাড়া সম্মেলন, মুজিবনগর সরকারের শপথ অনুষ্ঠান, পাকবাহিনির আত্মসর্ম্পন, রাজাকার আল বদর, আল সামস’য়ের সহযোগিতায় বাঙালি নারী পুরুষের উপর পাক হানাদার বাহিনির নির্যাতনসহ খেতাব প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায় ৪শ’ বিভিন্ন ভাস্কর্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
স্মৃতিসৌধের মূল নকশা স্থপতি তানভীর করিম। স্মৃতিসৌধটি বাংলাদেশের অন্যতম স্থাপত্য নিদর্শন। স্থাপনার মূল বৈশিষ্ট ১৬০ ফুট ব্যসের গোলাকার স্তম্ভের উপর মূল বেদীকে কেন্দ্র করে ২০ ইঞ্চির ২৩টি দেয়াল। দেয়ালগুলো উদিয়মান সূর্যের প্রতীক। ৩০ লক্ষ শহীদকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য স্মৃতিসৌধের মেঝেতে ৩০ লক্ষ পাথর বসানো হয়েছে।
সৌধের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে লাল মঞ্চ, ২৩টি স্তম্ভ, ১ লক্ষ বুদ্ধিজীবির খুলি, ৩০ লক্ষ শহীদ, ১১টি সিঁড়ি, বঙ্গোপসাগর, ২১শে ফেব্রুয়ারি, রক্তের সাগর এবং ঐক্যবদ্ধ সাড়ে সাত কোটি জনতা।
স্বাধীনতার রক্তাত সূর্যের মাধ্যমে লালমঞ্চকে তুলে ধরা হয়েছে, সেখানে দাঁড়িয়েই অধ্যাপক ইউসুফ আলী, স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র পাঠ করেছিলেন। ২৩টি স্তম্ভ হল ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানের শাষণ নিপিড়নসহ বাঙালির আন্দোলন ও স্বাধীনতার প্রতীক।
স্মৃতিসৌধের মূল বেদীতে গোলাকার বৃত্তের মাধ্যমে শহীদ বুদ্ধিজীবির খুলি বোঝানো হয়েছে। বেদী তৈরিতে ব্যবহৃত পাথর দিয়ে ৩০ লক্ষ শহীদ মা-বোনকে সম্মান জানানো হয়েছে। স্মৃতিসৌধের মূল বেদীতে ওঠার জন্য মোট ১১টি সিঁড়ি ব্যবহার করতে হয়। মুক্তিযুদ্ধকালিন সারাদেশে মুক্তিযোদ্ধারা যে ১১টি সেক্টরে ভাগ হয়ে যুদ্ধ করেছেন ১১টি সিঁড়ি সেই ১১টি সেক্টরের প্রতীক।
আমাদের গর্ব বঙ্গোপসাগর হিসেব মতো দক্ষিন দিকে, মানে স্মৃতিসৌধের পেছনে থাকার কথা। তবে স্মৃতিসৌধটির সৌন্দর্য বিঘিœত হয় বা স্মৃতিসৌধ দেখতে বেখাপ্পা মনে হবে বিধায় তৎকালিন সরকার প্রধান বঙ্গোপসাগরের স্থান দিয়েছেন স্মৃতিসৌধের ঠিক সামনে।
দক্ষিণের বঙ্গোপসাগরের স্থান মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের উত্তরে। আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন বা ২১শে ফেব্রুয়ারির প্রতীক হলÑ স্মৃতিসৌধের মূল ফটক ধরে এগিয়ে চলা পথটি। পথটি শেষ হয়েছে রক্তের সাগর নামক ঢালু প্রান্ত ছুঁয়ে।
এই পথে সব ধরনের যানবাহন চলাচল নিষেধ। স্মৃতিসৌধের পাশ দিয়ে রক্ত প্রবাহটি হল রক্ত সাগর। তাছাড়া স্বাধীনতার লাল মঞ্চ থেকে যে ২৩টি দেয়াল সৃষ্টি হয়েছে, সে সব দেয়ালের ফাঁক-ফোঁকর বন্ধের করার জন্য অসংখ্য নুড়ি পাথর ব্যবহার করা হয়েছে, এই নুড়ি পাথরগুলো সাড়ে সাত কোটি ঐক্যবদ্ধ জনতার প্রতীক। পুরো বিষয়টাই সুভাষ মল্লিক তাঁর স্মৃতি থেকে বলে যান। পরবর্তিতে পুরো বিষয়টা আমরা একটি স্মৃতিস্তম্ভে লিপিবদ্ধ আকারে পাই।
কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের মুজিবনগরে অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের শপথ নেওয়ার কথা ছিলো না। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ভারতের আগর তলায় এক সভায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মুক্ত কুষ্টিয়া জেলার মহকুমা চুয়াডাঙ্গাকে বেছে নেওয়া হয় এবং ১৪ এপ্রিল অস্থায়ী সরকার শপথ গ্রহণের তারিখ চুড়ান্ত হয়।
কিন্তু শপথ গ্রহণের তারিখ সে সময় আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রে প্রচার হলে বিদেশি সাংবাদিকসহ পাকহানাদার বাহিনী ঘটনা জেনে ফেলে। চুয়াডাঙ্গার ওপর পাকবাহিনী আক্রোশে ফেটে পরে। ব্যাপক বোমা হামলা চালিয়ে পাকহানাদার বাহিনী চুয়াডাঙ্গা দখল করে নেয়।
হার্ডিঞ্জ সেতু উড়িয়ে দেওয়ার জন্য গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। চুয়াডাঙ্গা দখল ও পাকহানাদার বাহিনীর দ্বারা হার্ডিঞ্জ ব্রিজ আক্রান্ত হলে শপথ অনুষ্ঠানের সময় ও জায়গা পাল্টে যায়। পরে শপথ অনুষ্ঠানের জন্য ভারত সীমান্তবর্তী বৈদনাথ তলা বা মুজিবনগরকে বেছে নেওয়া হয়।
মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স আমাদের মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এরচেয়ে বড় উপহার আর কিছুই হতে পারে না।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বাঙালির ইতিহাসে দুঃখের দিন
  • ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা
  • সাংবাদিকদের কল্যাণে সিলেট প্রেসক্লাব
  • প্রাকৃতিক মমিতে নির্মমতার ইতিহাস
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় ও সুফি-সাধকদের কথা
  • ঐতিহ্যের তাঁত শিল্প
  • সিলেট প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে ভাবনা
  • খাপড়া ওয়ার্ড ট্রাজেডি
  • জাদুঘরে হরফের ফোয়ারা
  • ইতিহাস গড়া সাত শক্তিমান
  • ভেজাল খাবার প্রতিরোধের ইতিহাস
  • বর্ষাযাপন : শহর বনাম গ্রামগঞ্জ
  • বর্ষা এলো বর্ষা
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • নবীদের স্মৃতিচিহ্নে ধন্য যে জাদুঘর
  • দর্শনীয় স্থান ও পর্যটন কেন্দ্র
  • ঐতিহ্যে অম্লান গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়
  • বিলুপ্তির পথে গরীবের ‘শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত’ মাটির ঘর
  • হারিয়ে যাচ্ছে হিজল গাছ
  • তালের পাখা প্রাণের সখা
  • Developed by: Sparkle IT