শিশু মেলা

বুলবুলিটা ডাকেনি

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৪-২০১৯ ইং ০০:৩৩:১৮ | সংবাদটি ১০০ বার পঠিত

ভোরের আযান ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। আদনান তখনও ঘুমে। টেরই পায়নি সে। হঠাৎ একটা বুলবুলির আওয়াজ কানে গেল- ‘আদনান উঠি... যাও’ আদনান উঠি ..... যাও’। লাফ দিয়ে উঠল আদনান। লাইট জ্বালিয়ে ঘড়ি দেখল। ভোর পাঁচটা। এখনও সূর্য উঠার ১৭ মিনিট বাকি। দ্রুত ওয়াশ রুমে ঢুকে প্রাকৃতিক কাজ সেরে অযু করল সে। তড়িঘড়ি ফযরের নামায পড়ে কুরআন তেলাওয়াতে লেগে গেল আদনান।
তেলাওয়াত সেরে বসতেই মা নাশতা নিয়ে হাজির।
-মা, তুমি কখন উঠলে? এরই মধ্যে নাশতাও তৈরি করে ফেলেছ?
-হ্যাঁ, রে, নাশতা তো আমাকেই বানাতে হবে।
আর নাশতা বানানোর কে আছে? কাজের বুয়া সেই যে গেল-আর এলো না। তোর বাবা তো আযানের সাথে সাথে মসজিদে গেছেন। আমি ঠিক তার পরপরই উঠেছি। নামায পড়লাম, তেলাওয়াত করলাম, নাশতা বানালাম.....।
-মা, এত কিছু করলে অথচ আমাকে ডাকলে না। জানো মা-আজ যদি বুলবুলিটা না ডাকত তাহলে কিন্তু আমি ফযরের নামাযই কাযা করতাম।
আদনানের আম্মা হতবাক হয়ে প্রশ্ন করেন-তোকে বুলবুলি ডাকলো কীভাবে?
-ঐ দেখো আমার জানালার পাশে বরই গাছটা-ওখানে বসে বুলবুলিটা ডাকছিল ‘আদনান উঠি.... যাও আদনান উঠি.... যাও।
মা হাসতে হাসতে বললেন তুই কি পাখির ডাক বুঝিস?
আদনান মাথা নেড়ে বলল-হ্যাঁ।
আল ফালাহ একাডেমির ৫ম শ্রেণির ছাত্র আদনান। বাবা স্কুল মাস্টার, মা গৃহিণী।
ওর বোনও একটা আছে। নাম মিষ্টি। তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী সে। আল ফালাহ একাডেমীর সব কিছুই আধুনিক। সকল ভালো স্কুলের সাথে পাল্লা দিয়ে ভালো রেজাল্ট করছে। খেলাধুলা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্কাউটিং সবকিছুতে ওদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। আজ আল ফালাহ একাডেমী সবার জন্য একটা মডেল-একটা উদাহরণ। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
স্কুলের একাডেমিক বিষয়ের সাথে নৈতিক বিষয়টাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতাবৃন্দ এই মর্মে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে বাচ্চারা শুধু শিক্ষিত হলে হবে না-তার নৈতিক চরিত্র গঠনও করতে হবে। একজন চরিত্রবান লোক সমাজের একটা সম্পদ। একজন উচ্চ শিক্ষিত লোকের চরিত্র ভালো না থাকলে সে শিক্ষা মূল্যহীন। কাজেই স্কুল প্রশাসন হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান সবাইকে যার যার ধর্ম পালনের তাগিদ দেন। তাই আদনানও সেই ছোট্টটি থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে। অবশ্য ওর বাবা-মাও নামায পড়েন এবং বাচ্চাদেরও নামাযে উৎসাহী করেন।
সেদিন মিষ্টি ঘুম থেকে উঠতে দেরি করছে। আদনান ওর রুমে ঢুকে ডাকল- মিষ্টি, এ্যাই মিষ্টি-তাড়াতাড়ি উঠ। মিষ্টি হাই তুলে হাত পা লম্বা করে তারপর অদ্ভুত সুরে বলে-কী হয়েছে?
-আরে তাড়াতাড়ি উঠ। আমাদের বরই গাছে একটা বুলবুলি এসেছে-ভারি সুন্দর। ওর দেহটা কালো কিন্তু পুচ্ছের কাছাকাছি একটু জায়গায় লাল। জানিস মিষ্টি-আজ ঐ বুলবুলিটা ভোরে আমাকে ডেকে দিয়েছে নামায পড়ার জন্য।
এরই মধ্যে মিষ্টি বিছানায় উঠে বসে ভাইয়ার কথাগুলো শুনছিল। হঠাৎ বলল-বুলবুলিটা এখনও আছে? হ্যাঁ..... জলদি আয়।
আদনান ও মিষ্টি দৌড়ে গেল জানালার পাশে।
-ঐ তো বুলবুলিটা-আদনান আঙ্গুল নির্দেশ করে দেখায়।
মিষ্টি খুব খুশি হয়। হ্যাঁ ভাইয়া খুব সুন্দর। দাঁড়া মিষ্টি। আমি ওর জন্য চাল নিয়ে আসি বলে দৌড়ে কিচেনে যায়। চালের ড্রাম হতে এক মুট চাল নিয়ে দৌড়ে এলো সে। জানালা দিয়ে ছুড়ে মারল চাল। কিন্তু চাল দেখে বুলবুলি তো এলোই না বরং অন্যদিকে উড়ে গেল। মিষ্টি বলল-দূর বোকা বুলবুলি চাল খায় নাকি? দেখলে না তোর চাল দেখে ওটা পালিয়ে গেল।
-তুই দেখিস-আবার এসে চাল খাবে।
-উম-আসবে না কচু। বুলবুলিটা ভাগিয়ে দিয়েছে। কিচেন থেকে মা ডাকলেন-মিষ্টি, এ্যাই মিষ্টি, হাত মুখ ধুয়ে আয়। এসে নাশতা কর।
ইতোমধ্যে আদনানের বাবা আলী হোসেন ঘরে ঢুকলেন। নামায পড়ে মর্নিং ওয়াক করে তারপর ঘরে এলেন। আদনান বাবাকে দেখে দৌড়ে গেল। বাবা বাবা জানো একটা বুলবুলি এসেছিল-আমাদের বরই গাছে। বুলবুলি দ্বারা এই পর্যন্ত যা ঘটেছে সবই খুলে বলল আদনান।
বাবা বললেন- তুমি ঠিকই ধরেছ আদনান। মানুষ জাগার আগেই বনের পশুপাখি জেগে উঠে আল্লাহর ইবাদাতের জন্য। ওদের কেউ ডাকতে হয় না। তুমি খেয়াল করলে দেখবে- ভোরের আজানের ও আগে থেকে ফিঙ্গে ডাক শুরু করে দেয়। ঠিক তখনই বুঝতে হবে আযানের সময় প্রায় সমাগত। এরপর মোরগের ডাক। মানুষ আযান দেয়ার আগেই মোরগ তার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ বলতে শুরু করে। গভীর রাতে শিয়ালও ডাকে। পৃথিবীর যত সৌন্দর্য, যত সুধা- সবকিছুই মানুষের আনন্দের জন্যই আল্লাহ তৈরি করেছেন। আর পৃথিবীর যত জীব-জানোয়ার সবকিছুই মানুষের অধীন করে দিয়েছেন। এই পৃথিবীর সমস্ত কিছু আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল থাকে। ব্যতিক্রম শুধু মানুষ। সবকিছু জেনে বুঝেও অধিকাংশ মানুষ আল্লাহর ইবাদাত করে না। কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে না।
আদনান বলল বাবা- কেন ওরা কৃতজ্ঞ হয় না? সেটা তুমি এখন বুঝবে না বাবা। বড় হলে এগুলো জানতে পারবে। বেশি বেশি জানতে হলে কী করতে হবে জানো?
-কী বাবা?
-বই পড়তে হবে। দুনিয়ার যত মনিষী আছেন ঋষি আছেন- সবাই তাদের চিন্তা চেতনা তাদের বইতে লিপিবদ্ধ করে গেছেন। ওগুলো পড়লেই তুমি আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে জানতে পারবে। সাথে সাথে কুরআন-হাদীসও পড়বে। বাইবেল, গীতা, বেদ, পুরান, মহাভারত ইত্যাদিও পড়বে।
-এত এত বই? আমি পড়তে পারবো?
-হ্যাঁ, হ্যাঁ অবশ্যই পড়তে পারবে। কিন্তু এক দিনে নয়, এক মাসে নয়, এক বছরেও নয়। পাঠ্য পুস্তক পড়ার পাশাপাশি আউট বই পড়ার অভ্যাস করতে হবে। অন্তত দিনে একঘন্টা এ ব্যাপারে বরাদ্দ রাখতে হবে।
পরের দিন ঠিক ভোরের আযানের সময় ঘুম ভাঙলো আদনানের। সে কান পেতে খেয়ার করে বুলবুলিটা ডাকছে কি না? হ্যাঁ ঐতো ডাকছে বরই গাছটায়। ‘আদনান উঠি ..... যাও-আদনান উঠি .... যাও’। এর সাথে আরো ডাকছে টুনটুনি, ফিঙ্গে, ঘুঘু সহ আরও অনেক নাম না জানা পাখি। সে দূরে কোথাও মোরগের উচ্চ শব্দের ডাকও শুনল। অযু করে বাবার সাথে মসজিদে চলে গেল আদনান।
সেদিন আদনান ও মিষ্টির স্কুল বন্ধ ছিল। পাশের বস্তি থেকে দুই কিশোর এলো তাদের পাড়ায়। মাথায় লম্বা চুল। উসকো খুশকো। গায়ে ঢোলা জামা, পরনে ঢোলা প্যান্ট। পেন্টের বেশ খানিকটা জুতার নিচে। দেখে মনে হয়- অনেক দিন গোসল করেনি- কাপড় চোপড়ও ধোয়নি। আদনানদের বাসার গেট খোলা ছিল। ওরা চুপি চুপি ঢুকল তাদের বাসায়। আদনান কোন কিছু বুঝার আগেই একটি ছেলে পকেট থেকে কী যেন বের করে বরই গাছের দিকে তাক করল (সাদা তিন কোণা কাঠের টুকরার মধ্যে কালো বেল্ট বাঁধা)। অস্ফুট একটা শব্দ হলো। ঠিক সেই মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানো ছেলেটি লাফ দিয়ে উঠল- হ্যাঁ মরেছে- মরেছে-এই তো বুলবুলি। সাথে সাথে ওরা পাখিটাকে জবাই করল একটা ধারালো ব্লেড দিয়ে.......।
আদনান দেখল ওরা পাখিটা নিয়ে বের হয়ে গেল তাদের সামনের গেট দিয়ে। সে কিছুই বলতে পারল না। মনের মধ্যে ছ্যাৎ করে উঠল আদনানের। কী যেন অতি আপন সে হারিয়ে ফেলেছে। মনের অজান্তে দু’ফোটা অশ্রু ঝরে পড়ল ওর চোখ বেয়ে.... ধারালো ব্লেড ওর আত্মাকে যেন ফালা ফালা করলো....।
পরদিন ভোরের আযান শুনলো না আদনান। যখন ঘুম ভাংলো তখন সকাল ৭টা। আজ নামায কাযা হয়েছে। ভোরের পাখি সেই বুলবুলিটার কথা মনে পড়ল আদনানের। আজ ও ডাকেনি... ‘আদনান উঠি .... যাও আদনান উঠি ..... যাও।’ মনটা বিষিয়ে উঠল আদনানের। ওরা এত নিষ্ঠুর কেন? এত সুন্দর পাখিটাকে মেরে ফেলল ওরা......?

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT