ধর্ম ও জীবন

ইসলামের আলোকে বন্ধু নির্বাচন

মাজহারুল ইসলাম জয়নাল প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৪-২০১৯ ইং ০০:৫২:৫০ | সংবাদটি ১২৭ বার পঠিত

মানুষ সামাজিক জীব। সমাবদ্ধভাবে মানুষ বসবাস করে সৃষ্টির সূচনালগ্ন হতে। সামাজিক জীব হিসাবে মানুষ কখনো একা একা বাস করতে পারে না। সমাজবদ্ধভাবে বসবাসের জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক প্রেম-ভালোবাসা, সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি। জীবন চলার পথে অনেক মানুষের সাথেই গড়ে উঠে বন্ধুত্ব। পিতা-মাতার চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে বন্ধুর প্রভাব বেশি পরিলক্ষিত হয়। বন্ধুর প্রভাব মানুষের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন সৎ, আদর্শ, ভালোবন্ধুর প্রভাবে একজন খারাপ মানুষ ভালো মানুষে পরিণত হয়ে যায়। আবার একজন অসৎ, চরিত্রহীন, খারাপ বন্ধুর প্রভাবে একজন ভালো মানুষ খারাপ মানুষে পরিণত হয়ে যায়। সেজন্য কেমন মানুষকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করতে হবে, সে ব্যাপারে কুরআন, হাদীস ও সলফে সালেহীনদের রয়েছে সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা। কুরআন-হাদীস ও সলফে সালেহীনদের দিক নির্দেশনা মেনে বন্ধু নির্বাচন করতে পারলেই মানুষের জীবন সৎ, আদর্শবান হয়ে উঠে।
কুরআনের আলোকে বন্ধু নির্বাচন :
সৎ বন্ধু ও তার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘‘আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নর-নারী তারা একে অপরের বন্ধু, তারা ভালো কাজের আদেশ দেয় ও অন্যায় কাজ হতে নিষেধ করে, আর তারা সালাত প্রতিষ্ঠা করে আর যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করে তাদের উপর আল্লাহ শীঘ্রই দয়া করবেন, নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (আত-তাওবাহ-৯/৭১)।
আলোচ্য আয়াতে বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ তায়ালার স্পষ্ট নির্দেশনা হচ্ছে, বন্ধু তাকেই নির্বাচন করতে হবে, যে নিজে ভালো কাজ করে এবং যাবতিয় মন্দ/খারাফ কাজ হতে বিরত থাকে, নিয়মিত সালাত আদায় করে। অতএব কোন বেনামাজি, মদখোর, সুদখোর, জুয়ারী, অন্যায় আচরণকারী কোন ব্যক্তিকে বন্ধু হিসাবে নির্বাচন করা যাবে না।
কোনো মানুষকে বন্ধু হিসেবে নির্বাচন করতে হলে যে গুণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে তা বর্ণনা করতে গিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও (সুরা তাওবা আয়াত-১১৯)
মহান আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্যই সততাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা সৎ বন্ধু কখনো তার বন্ধুকে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বিপদে ফেলবে না, অপরদিকে অসৎ বন্ধু তার নিজের স্বার্থরক্ষার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বন্ধুকে বিপদে ফেলবে। সৎ বন্ধু সুখে-দুঃখে পাশে থাকে আর অসৎ বন্ধু সুখের সময় তথা সুদিনে পাশে থাকে আর দুর্দিনে তথা বিপদে দূরে থাকে। অতএব বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্যই সততাকে প্রথম গুরুত্ব দিতে হবে।
সৎ বন্ধু মানুষকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যায় আর অসৎ বন্ধু মানুষকে জাহান্নামের পথে নিয়ে যায়। মহান আল্লাহ-তায়ালা বলেন, ‘‘হায়! আমার দুর্ভোগ!! আমার আফসোস!!! যদি আমি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম। অবশ্যই সে আমাকে বিভ্রান্ত করেছিল আমার নিকট উপদেশ বাণী (কুরআন) পৌঁছার পর, আর শয়তান হল মানুষের জন্য মহাপ্রতারক’, (আল ফুরকান আয়াত-২৭-২৮)
আলোচ্য আয়াত হতে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে নিজেদের কল্যাণের জন্য ভালো, সৎ বন্ধু খুঁজে নেওয়া খুবই জরুরী, কারণ কিয়ামতের দিন অসৎ বন্ধুর জন্য আফসোস করতে হবে। একজন মুমিন-মুসলমানের উচিত সততা ও তাকওয়ার আলোকে বন্ধু নির্বাচন করা। বিশেষ করে যার মধ্যে কুরআন হাদীসের ভালোবাসা বা অনুভূতি নেই, ইসলাম তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে নিষেধ করেছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘‘মুমিনগণ যেন অন্য মুমিনকে ছেড়ে কোনো কাফিরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। আর যারা এরূপ করবে, আল্লাহর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না। (সুরা ইমরান-২৮)
এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন যে, মুমিনের বন্ধু হবে মুমিন। আর অন্য ধর্মের মানুষের সাথে সম্পর্ক হবে দুনিয়ার স্বার্থে অর্থাৎ যে কোন ধর্মের মানুষের সাথে সদাচারণ, ভালো ব্যবহার, আমানতদারিতা, সুসম্পর্ক অবশ্যই রাখতে হবে একজন মানুষ হিসেবে। মানুষ মানুষের জন্যই সুতরাং অন্য ধর্মের মানুষের সাথেও ভালো আচরণ করা ইমানের দাবি।
হাদীসের আলোকে বন্ধু নির্বাচন :
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওয়াসাল্লাম বলেন, মানুষ তার বন্ধুর রীতিনীতির অনুসারী হয়। কাজেই তোমাদের প্রত্যেকের খেয়াল রাখা উচিত যে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছ? (আবু-দাউদ-৪৯৩৩)
বন্ধু গ্রহণের ক্ষেত্রে কেমন মানুষকে বন্ধু হিসাবে নির্বাচন করতে হবে সে ব্যাপারে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, তিনি বলেন, ‘সৎ ও অসৎ বন্ধুর উদাহরণ আতর বিক্রেতা ও কামারের ন্যায়। আতর বিক্রেতা হয়তো তোমাকে একটু আতর লাগিয়ে দিবে, অথবা তুমি তার কাছ হতে আতর ক্রয় করবে, অথবা তুমি তার কাছে আতরের ঘ্রাণ পাবে। আর কামার হয়তো তোমার দেহ বা কাপড় পুড়িয়ে দেবে, নয়তো তার কাজ থেকে খারাপ গন্ধ পাবে। (বুখারী ও মুসলিম)
প্রিয় নবী (সা:) সৎ সঙ্গী গ্রহণে উৎসাহিত করেছেন এবং অসৎ সঙ্গী থেকে দুরে থাকতে তাকিদ দিয়েছেন। আতর বিক্রেতার উদাহরণ হচ্ছে সৎ বন্ধু, যে বন্ধু সবসময় তার বন্ধুকে ভালো কাজের আদেশ আর খারাপ কাজ হতে বিরত থাকার পরামর্শ প্রদান করে। আর অসৎ বন্ধু সমসময় তার বন্ধুকে খারাপ বা মন্দ কাজের দিকে ধাবিত করে।
বন্ধু গ্রহণের ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত জাত-বংশ, টাকা-পয়সা, রূপ-লাবণ্য, নিজ দলের লোক কিনা ইত্যাদি বিষয়কে গুরুত্ব দেই। অথচ প্রিয় নবী (স:) বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমলদার সৎ ব্যক্তিকেই গুরুত্ব দিতেন।
এ সম্পর্কে প্রিয় নবী (স:) বলেছেন, ‘‘সাবধান! অমুক বংশের লোকেরা আমার বন্ধু নয়। বরং আল্লাহ এবং নেককার মুমিনগণ হলেন আমার বন্ধু। (মুসলিম-৪০৭)
বন্ধু নির্বাচনে সলফে সালেহীনদের দিক নির্দেশনা :
১। হযরত আলী (রা:) বলেছেন, নির্বোধের বন্ধুত্ব থেকে দূরে থাকো। কারণ সে উপকার করতে চাইলেও তার দ্বারা তোমার ক্ষতি হয়ে যাবে।
২। হযরত ইমাম জাফর আস-সাদিক (রহ:) বলেছেন, পাঁচ ব্যক্তির সাথে বন্ধুত্ব করা সমীচীন নয় তারা হলো-মিথ্যাবাদী, নির্বোধ, ভীরু, পাপাচারী ও কৃপণ ব্যক্তি।
৩। আল্লামা রুমী (রহ:) বলেন, ‘সোহবতে সালেহ তোরা সালেহ কুনাদ, সোহবতে তালেহ তোরা তালেহ কুনাদ’। অথ্যাৎ, সৎ মানুষের সঙ্গ আপনাকে সৎ বানাবে এবং অসৎ মানুষের সঙ্গ আপনাকে অসৎ বানাবে। বাংলা প্রবাদে বলা হয়, সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।
৪। ইমাম গাজ্জালী (রহ:) বলেন, যার মধ্যে তিনটি গুণ আছে তাকে বন্ধু বানাতে হবে। গুণগুলো হলো:- ১। বন্ধুকে হতে হবে জ্ঞানী ও বিচক্ষণ, ২। বন্ধুর চরিত্র হতে হবে সুন্দর ও মাধুর্যময় ৩। বন্ধুকে হতে হবে নেককার ও পুণ্যবান। এ তিনটি গুণ যার মধ্যে পাওয়া যাবে তাকেই বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করতে হবে।
৫। হযরত আব্বাস (রা:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, একবার রাসুল (সা:) কে প্রশ্ন করা হয়েছিল আমাদের মজলিসে সর্বোত্তম বন্ধু কে? রাসুল (সা:) বলেছেন, যাকে দেখলে আল্লাহর কথা মনে হয় সেই সর্বোত্তম বন্ধু।
কুরআন, হাদীস ও সলফে সালেহীনদের বক্তব্য হতে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইমানদারিতা, সততা, জ্ঞানের বিচক্ষণতা, আমানতদারিতা, তাকওয়া, পরহেজগারিতা, সর্বোপরী কুরান-সুন্নাহর অনুসরণকারী ব্যক্তিকেই বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। তাহলে এ বন্ধুত্ব দুনিয়ার জীবনে যেমন উপকারী হবে, ঠিক তদ্রুপ পরকালের নাজাতের জন্য এ বন্ধুত্ব উসিলা হবে। সেজন্য আমাদের উচিৎ উত্তম, ভালো, নেককার বন্ধু খুঁজে বের করা। কেননা কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তায়ালা উত্তম বন্ধুদেরকে তার আরশের নিচে ছায়া দান করবেন।
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল (সা:) বলেছেন, ‘‘কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা বলবেন, ‘আমার মর্যাদার আনুগত্যকারীরা কোথায়? আজ আমি তাদেরকে আমার ছায়াতলে আশ্রয় দিব। যেদিন আমার ছায়া ব্যতিত আর কোনো ছায়া থাকবে না। (মুসলিম)
একজনের সাথে আরেকজনের বন্ধুত্ব শুধু দুনিয়ার জন্যই নয় বরং পরকালের মুক্তির জন্যও বটে। শুধুমাত্র দুনিয়ার স্বার্থে নয় বরং আসুন, কুরআন-সুন্নাহর নীতিমালার আলোকে এক মুসলমান আরেক মুসলমানের সাথে পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও বন্ধুত্ব গড়ে তুলি।। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে একমাত্র তার সন্তুষ্টির জন্যই পরস্পরের মধ্যে সুসস্পর্ক, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা গড়ে তুলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT