ধর্ম ও জীবন

ইসলামে জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব

ফখরুল কবির খাঁ প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-০৪-২০১৯ ইং ০০:৫৫:০৪ | সংবাদটি ১১২ বার পঠিত

কুরআন ও হাদিসে ইল্ম তথা জ্ঞান অর্জনের উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসূল (সা.) এর উপর প্রথম যে ওহী (আল-কুরআন) আসে তার প্রথম শব্দ হলো ইক্রা। যার অর্থ হলো পড়।
আল-কুরআনে বলা হয়েছ : পাঠ কর তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন জমাট বাধা রক্ত থেকে। পাঠ কর তোমার রব মহিমান্বিত। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা, সে জানত না। (সূরা আলাক আয়াত নং-১-৫)।
বল হে প্রতিপালক। তুমি আমায় জ্ঞান-বৃদ্ধি করে দাও। (সূরা ত্বাহা আয়াত নং-১১৪)।
হে রাসূল (সা.) আপনি বলে দিন যারা জানে এবং যারা জানে না তারা সমান নয়। (সূরা জুম আয়াত নং-৯)।
তোমাদের মধ্য হতে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে,আল্লাহ তাদের মর্যাদা অনেক বাড়িয়ে দেন (সূরা মুজদালাহ আয়াত নং-১১)।
তিনি(আল্লাহ) যাকে ইচ্ছা হিকমত (জ্ঞান) প্রদান করেন এবং যাকে হিকমত প্রদান করা হয় তাকে প্রভূত কল্যাণ দান করা হয় (সূরা বাকারাহ আয়াত নং-২৬৯)।
হাদিসে বলা হয়েছে : একজন ফকীহ (বিধি বিশেষজ্ঞ) মহান দরবেশ অপেক্ষা শয়তানের প্রতি কটোর (তিরমিযি ও ইবনে মাজাহ)
এক মুহূর্ত বা কিছুক্ষন আল্লাহর সৃষ্টি বিষয়ে চিন্তা করা বছর ইবাদত অপেক্ষা উত্তম (আল-হাদিস)।
যে ব্যক্তি বিদ্যা অর্জনের জন্য বাড়ি হতে বের হয়, সে ফিরে আসা না পর্যন্ত আল্লাহর পথে থাকে (তিরমিযি)।
মূর্খ ব্যক্তির সারারাত ইবাদত অপেক্ষা একজন ফকীহর ঘুম উত্তম (আল-হাদিস)।
৬২২ থেকে ১৬২২ পর্যন্ত ১০০০ বছর ছিল মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্বের যুগ। এই সময় জ্ঞান বিজ্ঞানে মুসলিমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি ছিল। ফলে মধ্যেযুগে মুসলমানরা সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। মধ্যযুগের কয়েকজন শ্রেষ্ঠ মুসলিম মনীষী হচ্ছেন- ইবনে সীনা, আল রাজি, আল ফারাবী, আল কিন্দী, আল বেরূনী, মহাকবি ফেরদৌসী, জাবির ইবনে হাইয়ান, আল বাত্তাজি, আত তাবারী, আল মাসুদী, ইমাম গাজ্জালী, আল কেমী, ওমর খৈয়াম, খাওয়ারিজমী, ইবনে রুশদ, ইবনুল আরাবী, শেখ সাদী, কবি হাফিজ, আল ইয়াকুতী, জালাল উদ্দীন রুমী, নাসির উদ্দীন তুসী, আল রশিদ উদ্দীন, ইবনে বতুতা, ইবনে খালাদুন, আবুল হাসান, ইবনে হায়সাম, ইবনে বাজ্জাহ, ইবনে তোফায়েল প্রমূখ।
মনীষীদের কেউ কেউ একাধিক বিষয়ের পন্ডিত ছিলেন। যেমন- ইবনে সীন, আল-রাজী, আল-ফারাবী, ওমর খৈয়াম, আল-খাওয়া রিজমী, ইবনে খালাদুন প্রমুখ মনিষীরা একাধারে দার্শনিক, সাহিত্যিক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ছিলেন। মধ্যযুগে মুসলিম মনীষীদের সমতুল্য বা সমকক্ষ আর কোন মনীষী বিশ্বের কোথাও জন্ম গ্রহণ করেনি। অবশ্য প্রাচীন যুগে গ্রীসে ও রোমে এবং আধুনিক যুগে ইংল্যান্ডে বা ইউরোপে জন্মগ্রহণ করেছে, কিন্তু মধ্যযুগে নয়। ১৪৯২ সালে কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের আগে মানুষ জানতো পৃথিবীতে তিনটি মহাদেশ রয়েছে- এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা। আর মধ্য যুগে মুসলমানরা তাদের ইলম বা জ্ঞান, বুদ্ধি ও কৌশল দিয়ে এই তিন মহাদেশব্যাপী প্রথমে আরব মুসলমানরা (উমাইয়া ও আব্বাসীয় বংশের খলিফারা) পরে তুর্কি মুসলমানরা তিন মহাদেশ ব্যাপী উসমানীয়া খিলাফত (সাম্রাজ্য) গড়ে তোলে। তুর্কী মুসলমানদের ১৪৫৩ সালে বাইজেনটাইনদের তথা ইউরোপীয়দের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) বিজয়ের মধ্য দিয়ে ইউরোপীয়দের ঘুম ভাংগে এবং রেনেসার সূচনা হয়। ১৪৫৩ সালে মুসলমানদের এই বিজয়ের ফলে ইউরোপে মধ্য যুগের অবসান ঘটে এবং আধুনিক যুগের সূচনা হয়। রেনেসার ফলে আধুনিক যুগে ইউরিপীয়রা জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর হতে থাকে এবং মুসলমানরা পিছিয়ে পড়তে থাকে।
আধুনিক যুগ ছিল ইংরেজদের বিশেষত অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতক। এই সময় ইংরেজরা জ্ঞান বিজ্ঞানে বিশ্বের শ্রেষ্ট জাতি ছিল। ফলে ইংরেজরা সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। আধুনিক যুগের কয়েকজন শ্রেষ্ঠ ইংরেজ মনীষী হচ্ছেন শেক্সপিয়র, স্যার আইজ্যাক নিউটন, উইনস্টন চার্চিল, ডারউইন, জেমস ওয়াট, আলেকজান্ডার ফ্লেমিং, জর্জ স্টিফেনসন, বার্ট্রান্ড রাসেল, জর্জ বার্নার্ড শ, জেমস কুক, জোনাথন সুইফট, জোসেফ প্রিন্টলে, চার্লস ব্যাবেজ, চার্লি চ্যাপলিন, জন মিল্টন, টমাস ম্যালথাস, রোনাল্ড রস, অ্যাডাম স্মিথ, জন স্টুয়ার্ট মিল, জন এল বেয়ার্ড, উইলিয়াম জোন্স, লর্ড কেলভিন, ফ্রেডরিখ লিংগার, জনলক, ডেভিড, রিকার্ডো, স্টিফেন হকিন্স, বেঞ্জামিন ডিজরোলী, ডেভিড হিউস প্রমুখ।
ইংরেজী ভাষা হচ্ছে ইংল্যান্ডের। ইংল্যান্ড দেশটি আয়তনে ও জনসংখ্যায় বাংলাদেশের চেয়ে ছোট। এই ছোট দেশ ও জাতির লোকেরা তাদের জ্ঞান, মেধা, বুদ্ধি ও কৌশল দিয়ে অর্ধ পৃথিবী শাসন করেছে। ইংল্যান্ডের সাম্রাজ্যের কখনও সূর্য অস্ত যেতনা, কেননা এই সময় তারা এশিয়া ও আমেরিকায় বিভিন্ন দেশ শাসন করেছে। ইংরেজীতে প্রবাদ আছে- জ্ঞানই শক্তি, জ্ঞানই স¤পদ, জ্ঞানই আলো।
মোদ্দা কথা যখন যে জাতি জ্ঞান বিজ্ঞানে উৎকর্ষ সাধন করেছে। বিশ্বের নেতৃত্ব তাদের হাতে চলে গেছে। আজ বিশ্বে মুসলমানরা সবচেয়ে নির্যাতিত নিপিড়িত মানবেতর অবস্থায় রয়েছে; কাশ্মীর, ফিলিস্তিন, মায়নমার, উইঘুরু, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরাক বসনীয়া, চেচনিয়া সহ বিশ্বের সকল জায়গায় মুসলমানদের উপর অত্যাচারের ষ্ঠিম রোলার চলছে। মুসলমানকে বিভক্ত করে দাবায়ে রাখার ব্যাপারে সব পরাশক্তি তথা অমুসলিমরা ঐক্যবদ্ধ। তাই মুসলমানরা হাজার বছরের বিশ্ব শাসনের হৃত গৌরব ফিরে পেতে হলে জ্ঞান অর্জনের বিকল্প আর কোন পথ নেই।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT