পাঁচ মিশালী

মেঘালয়ের পাহাড়ে

এখলাছুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৪-২০১৯ ইং ০০:০৩:৫৪ | সংবাদটি ১১১ বার পঠিত

উত্তর-ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জি। ম্যাপ বের করে হিসাব-নিকাশ করলে দেখা যায় বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে সোজাসুজি কুঁড়ি কিলোমিটারেরও কম। বাড়ির পাশেই বিশে^র বৃষ্টিবহুল এই এলাকা। ম্যাপে কুঁড়ি কিলোমিটার হলেও বাংলাদেশের তামাবিল থেকে চেরাপুঞ্জি যেতে পাহাড়চূড়ার আঁকাবাঁকা পথে প্রায় ৬০ কিলোমিটার ঘুরতে হয়। এরপর দেখা মেলে রূপের রাজা শিলংয়ের। বিশ^ভ্রমণের চাইতে শিলং-চেরাপুঞ্জিতে ভ্রমণে অসাধারণ অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়।
গত ৮ এপ্রিল সংক্ষিপ্ত ভ্রমণে ভাতিজা কবির আহমদকে নিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যর চেরাপুঞ্জি, শিলং পর্যটন এলাকা দেখার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। সিলেট থেকে বাসে ও সিএনজি যোগে তামাবিল যাওয়ার পর ভারতের পাহাড়গুলোর ঠিক পাদদেশে বাংলাদেশের প্রান্তে সমতলভূমিতে বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন-কাস্টম অফিস পাই। সেখানে যাওয়ার পর প্রথমে কিছুটা ভোগান্তিতে পড়লেও পরে অবশ্য পরিচয় পেয়ে ইমিগ্রেশন-কাস্টম অফিসের কর্তারা ভালো আচরণ করেন। বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন-কাস্টম অফিসের কাজ সেরেই স্থল সীমান্ত দিয়ে হেটে ভারতের ডাউকিতে প্রবেশ করে সেখানকার পাহাড়গুলোর ঠিক পাদদেশে ভারতের ইমিগ্রেশন-কাস্টম অফিসের কাজ সম্পাদন করি। এরপর যাত্রা শুরু হয় শিলংয়ের দিকে।
ডাউকি থেকে শিলং যেতে পাহাড়চূড়ার আঁকাবাঁকা পথ চলতে সঙ্গ দিয়েছে চারপাশের অসাধারণ সুন্দর সব পাহাড়। পাহাড়ের ঢালে সরু রাস্তার পাশেই গভীর খাদ। দৃশ্যটি ভয়ঙ্কর হলেও খুবই সুন্দর। আবার কখনও মেঘেরা আমার চারপাশ ঢেক দিয়েছিলো। তখন মনে হয়েছে প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়া যাযাবর। পথ পেরুতে সময় লাগে অন্তত ৩ ঘণ্টার মত। তবে এই দূরত্ব আরও বেশি হলেই বোধহয় ভালো ছিল। কিন্তু পথিমধ্যে খাটাআর মের নামের একটি সুন্দর স্পট দেখে প্রায় ৪ হাজার ফুট উপরে উঠে ছবি তোলা শুরু করি। তখন একটি ব্রিজের উপরে আমার হাতের ব্যাগটা রেখে ভুলে চলে আসি। ব্যাগের মধ্যে ছিলো পাসপোর্ট, টাকাসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। অনেক দূর পৌছার পর হঠাৎ হাত খালি দেখে শিউরে উঠি ব্যাগ কি করলাম। এরপর মনে হলো খাটাআর মের ব্রীজে ব্যাগটি ফেলে এসেছি। তখন গাড়ি চালককে ঘটনাটি বললে গাড়ী চালক বেডলাক বলে সম্মোধন করে গাড়ী ঘুরিয়ে ঐ ব্রীজের কাছে যায়। সেখানে গিয়ে আল্লাহর কৃপায় ব্যাগটি পেয়ে যাই তখন গাড়ী চালক গুডলাক বলে আবারো সম্মোধন করে। ব্যাগ পেয়ে মনের ক্লান্তি কেটে যায়।
পাহাড়ী পথ যেতে যেতে খোশগল্প করে মাতিয়ে তুলেন কোম্পানীগঞ্জের রাজু ভাই। তিনি জকিগঞ্জের মানিকপুর ইউনিয়নে আত্মীয়তা করেছেন। রাজু ভাই ও ভাতিজা কবির এর আগে কয়েকবার ঐ এলাকা ঘুরে বেড়িয়েছেন। এ কারণে উনাদের প্রচুর অভিজ্ঞতা রয়েছে। যাই হোক উনাদের খোশগল্পে মেতে উঠে এক সময় গিয়ে পৌছি মেঘেদের বাড়ি, কবিদের অনুপ্রেরনার ও চিত্রকরদের ক্যানভাসের জায়গা বেড়ানোর জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় স্পট মেঘালয়ের রাজধানী শিলং শহরে। শিলংয়ে পৌছে দেখি রাজ্যটি আসলেই ছবির মত সুন্দর। ক্যালচার ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ, মেঘের সমাবেশ, জীবনের কিছু রঙ্গিন মুহুত্ব কাটানোর জন্য উপযুক্ত জায়গা। মেঘালয় সেভেন সিস্টার খ্যাত উত্তর পূর্ব অঞ্চলে অন্যতম একটি সুন্দর রাজ্য। সিদ্ধান্ত নেই শিলংয়েই রাত কাটানোর। একটি ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে রুম বুকিং দেই। এরপর বাইরে ঘুরতে যাই। পুলিশ বাজারের পাশে গিয়ে দেখতে পাই পর্যটন বাসের কাউন্টার। সেখানে পরদিনের জন্য চেরাপুঞ্জিগামী বাসের টিকেট সংগ্রহ করি। সন্ধ্যার দিকে শিলং শহরে ঘুরে বেড়াই। তখন দেখি মেঘালয়ে সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষা খাসিয়া। পরদেশিদের সঙ্গে অবশ্য বাংলা, হিন্দি-ইংরেজি মেশানো মিশ্র ভাষায় এরা কথা বলেন। বাংলা ভাষা তারা ভালো বুঝেন। তাদের সাথে কথা বলে জানতে পারি, মেঘালয় পাঁচটি প্রশাসনিক জেলায় ভাগ হয়েছে- জয়িন্তা পাহাড়, পূর্ব এবং পশ্চিম গারো পাহাড়, পূর্ব এবং পশ্চিম খাসি পাহাড়। শিলং উত্তরপূর্ব ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পূর্ব খাসি পাহাড়। জেলার একটি শহর ও পৌরসভা এলাকা। এটি মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী।
শিলং বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার উত্তরে এবং ভুটান-ভারত সীমান্তের প্রায় ১০০ কি.মি দক্ষিণে অবস্থিত। এটি খাসি পাহাড়ে প্রায় ১৫০০শ মিটার উচ্চতায়। এখানে রয়েছে পাইন অরণ্য, জলপ্রপাত এবং পার্বত্য জলধারার সমারোহ। এক সময় এটি প্রাচ্যেও স্কটল্যান্ড নামে পরিচিত ছিল। ১৮৯৭ সালে এক ভূমিকম্পে শহরটি ধবংস হয়ে যায় এবং এরপর এটিকে পুনরায় গড়ে তোলা হয়। ভারত স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশ পরিবারদের জন্য এটি একটি জনপ্রিয় পাহাড়ি রিসোর্ট ছিল। এখানে এখনও প্রচুর ব্রিটিশ ধাঁচে নির্মিত কান্ট্রিহাউজ দেখতে পাওয়া যায়। শিলংয়ের আশেপাশের এলাকায় উৎপাদিত কমলা, তুলা, আলু ইত্যাদি কেনাবেচা হয়। খাসিয়া মহিলারাই দোকান পরিচালনা করেন। এখানে মাইকা, জিপসাম এবং কয়লার মজুদ থাকার সম্ভাবনা আছে, তবে এগুলি এখনও তেমন করে উত্তোলিত হয়নি। এখানে তেমন কোন বড় শিল্পকারখানা নেই। বনাঞ্চল উজাড়ের প্রবণতা বাড়ছে। শিলংয়ে খাবার জায়গা দেদার। রকমফেরও অঢেল। বার্গার, পিৎজা, মিল্কশেক, স্যাউইচের দোকান রাস্তার মোড়ে পাওয়া যায়। চীনে খাবার ও তিব্বতি মোমো-থুকপাও পাওয়া যায় বেশ কিছু রেস্তরায়। স্থানীয় খাবারের দোকান তেমন না থাকায় খোজ নিতে হয় ট্যুরিস্ট লজের ক্যান্টিনে।
ভারতের এই অংশে সাধারণত আমিষ খাদ্যের প্রচলন আছে। নিরামিষ খাবারের সন্ধান পাওয়া যায় মারওয়াড়ি ভোজনালয়ে ও শিলংয়ের কিছু বাঙালি রেস্তুরায়। বেড়ানো শেষে কেনাকাটা করি শিলংয়ের পুলিশ বাজারের দোকানে। এখানে দরদাম করাটাই দস্তুর। এ ছাড়া শহরে আছে বেশ কিছু অত্যাধুনিক শপিং মল। স্থানীয় উপজাতি মানুষের হাতে তৈরি জিনিসপত্রের সম্ভার পাওয়া যায় এখানে। শিলংয়ে রাত কাটিয়ে পরদিন সকাল ৮ টার দিকে পর্যটন বাসে বিশে^র সবচেয়ে বেশী বৃষ্টিপাতের এলাকা চেরাপুঞ্জির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। পাহাড়ের নির্জনে আশপাশে রয়েছে ভ্রমণের অনেকগুলো জায়গা। চেরাপুঞ্জি অঞ্চলে গ্রীষ্মে তাপমাত্রা ১৫ থেকে ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শীতকালে ৩.৯ থেকে ১৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। উত্তর পূর্ব ভারতের এই প্রান্তে বৃষ্টিপাতের হার বেশি। বর্ষাকাল ছাড়াও বৃষ্টি হয় যে কোন সময়। জানলা দিয়ে অবিশ্রান্ত ধারা দেখতে ভাল লাগলেও বাইরে বের হলে দরকার পড়ে ছাতা, বর্ষাতি ও রবারের জুতো। থাকে প্রচন্ড ঠান্ডা। কিছু কিছু স্থানে মনে হয় বরফ পড়ে। অতিরিক্ত ঠান্ডায় আমি সর্দি, কাশি, জ্বর, মাথাব্যাথায় আক্রান্ত হয়ে পড়ি। চেরাপুঞ্জি যাওয়ার পথশোভার তুলনা হয় না। চেরাবাজার ঘিরেই চেরাপুঞ্জি গ্রাম। এখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বসতি। রয়েছে কমলালেবু বাগিচা। খাড়া খাসি পাহাড়ের গা বেয়ে মেঘেরা উঠে আসছে ওপরে। পাহাড়ে বাধা পেয়ে চেরাপুঞ্জি ও মাওসিনরাম অঞ্চলে ঝরে পড়ে অবিশ্রান্ত ধারায় বৃষ্টি। খাসি সাহিত্য ও সংস্কৃতির শীর্ষস্থানও এই চেরাপুঞ্জি। এই স্থান খ্যাত তার চুনাপাথরের গুহা, কয়লা ও মধুর জন্য।
চেরাপুঞ্জির কাছে খাসি পাহাড়ের দক্ষিণ ঢালের মাওসিনরামে বছরে ২৩০০ মিমি বৃষ্টি হয়ে রেকর্ড গড়েছে। মাওসিনরামের আরেক দর্শনীয় স্থান হলো চেরাপুঞ্জির বিস্ময় এক প্রাচীন গুহায় স্ট্যালাগ মাধই পাথরের শিবলিঙ্গ। স্বাভাবিকভাবে এটি গড়ে উঠেছে। আরণ্যক পরিবেশের এই গুহাটির জন্ম-ইতিহাস আজও অজ্ঞাত। দৈর্ঘ্য ও গভীরতাও অজানা। জনশ্রুতি আছে, গারো পাহাড়ের সিজুগুহার সঙ্গে সংযোগ রয়েছে। বেশ কয়েকটি মনোলিথ পিলার তোরণ সাজিয়েছে প্রবেশপথে।
চেরাপুঞ্জির আরেক আকর্ষণ বাজার থেকে ৬ কিমি দূরে বিশ্বের চতুর্থ উচ্চতম জলপ্রপাত মোসমাই ফলস। হাজার দুয়েক ফুট উঁচু থেকে কয়েকটি পানির ধারা নামছে। চেরাবাজার থেকে ৩ কিমি দূরে পল কালিকাই ফলস। মোসমাই-এর থেকেও আকর্ষণীয় এটি। এখানে নানা ধর্মীয় আর্কিড ও প্রজাপতি মধুময় করে তুলেছে পরিবেশকে। আবার মেলার পথে ১০ কিমি গিয়ে কেইনরেম ফলসটিও দেখা যায়। এখানে পাহাড়ের মাথায় বিরাট প্রাসাদের সারিও দেখা যায়। দূর থেকে মনে হয় কোনো এক দুর্গ। কিন্তু দুর্গ নয়, এটি চেরাপুঞ্জির রামকৃষ্ণ মিশন। চেরাপুঞ্জির ডাবল ডেকার রুট ব্রীজে পৌঁছতে সকালে সিঁড়ি বেয়ে ২,৫০০ ফুট নিচে নামি আবার ২,৫০০ ফুট সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসি। হাঁটুর জোর থাকলে এ পথ খুবই সহজ। ডাবল ডেকার রুট ব্রীজের সামনেই ঝর্ণার পানি পড়ে। দেখেছি এই ঝর্ণায় গোসল করে পথের ক্লান্তি দূর করছেন অনেক পর্যটক। জামা-কাপড় বদলানোর জন্য ঝর্ণার পাশে আছে ছোট ঘর। চেরাপুঞ্জির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থানের মধ্যে অন্যতম হলো, রামকৃষ্ণ মিশন (স্কুল+মন্দির+মিউজিয়াম), সেভেন সিস্টার ফলস, মকটক ভিউ পয়েন্ট, মোসমাই কেইভ, ইকো পার্ক, খরম্মা স্টোন, থাংখারাং পার্ক, নোহকালিকাই ফলস, ডাবল ডেকার রুট ব্রীজ, রেইনবো ফলস, আরওয়া কেইভ। চেরাপুঞ্জিতে খাওয়া দাওয়ায় হালাল-হারাম বাছাই করে খাবার খাওয়া খুবই কঠিন। প্রতিটি খাবার রেস্তুরায় গিয়ে আগে জানতে হয় ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক জবাই করা হয়েছে কিনা। এরপর খাবার খেতে হয়। শিলং থেকে রওনা হওয়ার প্রায় পঞ্চাশ মিনিট পর ঝুলন্ত লোহার ব্রীজ পেরিয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ে। অদূরেই রয়েছে দুয়ানসিং সিয়েম ভিউ পয়েন্ট। এখান থেকে মাওডক ভ্যালির শোভা দৃষ্টিগোচর হয়। চেরাপুঞ্জির একটু আগেই সোহরাবাজার। এখানে কিনতে পাওয়া যায় কমলা লেবুর মধু, দারচিনি আর চেরি ব্র্যান্ডি।
চেরাপুঞ্জির দিকে এগিয়ে গেলেই দূর থেকে চোখে পড়ে রামকৃষ্ণ মিশনের ঘরবাড়ি এবং মন্দিরের চূড়া। এই অঞ্চলে শিক্ষার বিস্তার এবং সমাজসেবামূলক কাজে রামকৃষ্ণ মিশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। আশ্রম পরিসরে রয়েছে রামকৃষ্ণ মিশন, বিদ্যালয়, দাতব্য চিকিৎসালয় এবং নৃতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা। রামকৃষ্ণ মিশন দেখে পরবর্তী গন্তব্য নোহকালিকাই ফলস। এই জলপ্রপাতটি এশিয়ার দ্বিতীয় উচ্চতম বলে দাবি করে সেখানকার স্থানীয়রা।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT