উপ সম্পাদকীয়

বাংলা বানান নিয়ে কথা

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৪-২০১৯ ইং ০০:১৫:২২ | সংবাদটি ৮৬ বার পঠিত

১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর ইউনেস্কোর ৩১তম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে ঘোষণা করা হয়। ফলশ্রুতিতে ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বিশ্বের ১৮৮টি দেশে পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ৫ ডিসেম্বর ২০০৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এ দিবসটি স্বীকৃতি পায়। বিশ্বের ১২৪টি দেশে উত্থাপিত রেজুলেশনটিতে সমর্থন দেয়।
সেদিন থেকে বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষার গুরুত্ব অবশ্যই বেড়ে গেছে। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষি মানুষের কাছে বাংলা ভাষা শিখার আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়টি অনুসন্ধানী গবেষকরা তাদের গবেষণার বিষয় হিসাবে নিচ্ছেন। বাংলাদেশের নামকরা ইউনিভার্সিটি বা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পার্শ্ববর্তী অনেক দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া করছে। এ সকল শিক্ষার্থীদের বাংলা ভাষা শেখার প্রতি দুর্বলতা রয়েছে। যেহেতু এ দেশে দীর্ঘ দিন থাকতে হচ্ছে-কাজেই এদেশের ভাষা ও সংস্কৃতি শেখার একটা দুর্বার আকর্ষণ তাদের মধ্যে রয়েছে। সুদূর ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশ থেকে অনেক শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য অধ্যয়ন করছে। বিশ্বব্যাপী এই আগ্রহটাকে ধরে রেখে ইংরেজী-আরবী-হিন্দি ভাষার মত বাংলা ভাষাকেও ছড়িয়ে দেয়ার মত একটা গুরু দায়িত্ব আমাদের বাংলা ভাষাভাষী পন্ডিত ব্যক্তিদের উপর বর্তায়-এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়। কিন্তু আমাদের জ্ঞানী-গুণী পন্ডিতরা এ বিষয়ে কতটুকু সচেতন-এ বিষয়টি নিয়ে একটু আলোকপাত করতে চাই :
ইংরেজি ভাষা চর্চা আমাদের দেশে কম নয়। শুধু আমাদের দেশই নয়-বিশ্বের খুব কম দেশই আছে, যেখানে ইংরেজি চর্চা নেই বা ইংরেজি ভাষা চলে না। ইংরেজি ভাষা জানলে কোথাও আপনি ঠেকবেন না। তাই ইংরেজি পৃথিবীর সহজতর ভাষার মধ্যে একটি এবং এটি আন্তর্জাতিক ভাষা হিসাবে ১ম স্থান অধিকার করে বসে আছে। এখানে একটি জিনিস লক্ষ্যণীয় যে ইংরেজি ভাষার বর্ণমালা রয়েছে ২৬টি। এই ২৬টি বর্ণমালা দ্বারা (স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ) গঠিত ইংরেজি ভাষার বানানগুলো সেই আদ্যিকাল থেকে এই পর্যন্ত হুবহু চলে আসছে। যে কারণে একশ বছর আগেরও শিখা বানান আর আজকের বানানের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। ফলে নতুন প্রজন্ম বা পুরনো প্রজন্মের মধ্যে বানান নিয়ে কোন সংঘাত নেই। এতে দেশী বিদেশী যারাই যেভাবে যে শব্দটি শিখেছে এটাকে আর নতুন করে শিখতে হচ্ছে না। কিন্তু আমরা বাংলা বানানরীতি বার বার পরিবর্তন করছি। এতে খোদ আমাদের দেশেই নতুন এবং পুরাতন সিলেবাসের শিক্ষিত মানুষদের মধ্যে এক ভুল বুঝাবুঝির সূত্রপাত হয়েছে। পুরাতনরা বানান লিখলে নতুনরা সেখানে ভুল ধরে। তাহলে পুরাতনরা পূর্বে ভুল শিখেছিল? আর তাদের শিক্ষকরা ভুল শিখিয়েছিলেন?
এমনিতে বাংলা ভাষার বর্ণমালা পঞ্চাশটি। আবার এগুলোতে া, ,ে ,ি ী, ু, ূ, ৃ, ে া ইত্যাদি অনেক কার রয়েছে। তাছাড়া যুক্তবর্ণতো আছেই। বাংলা ভাষাভাষীরাই বানান শিখতে হিমসিম খাচ্ছে তার উপরে যদি শিক্ষার্থী হয় বিদেশী তাহলে এ ভাষার বানান শিখা যে কত বড় কষ্টসাধ্য তা ভুক্তভোগীরাই জানেন।
আমরা যারা পঞ্চাশোর্ধ তারা যখন বানান শেখেছি (যেমন-বাড়ী, গাড়ী, শাড়ী, পাখী, একাডেমী, লীগ, সরকারী, শহীদ, ঈদ) আজ এখন এসে নতুন করে বাংলা বানান শিখতে হচ্ছে। যেমন-বাড়ি, গাড়ি, শাড়ি, পাখি, একাডেমি, সরকারি, শহিদ, ইদ ইত্যাদি। এর কারণ কি? বাংলা একাডেমীর পন্ডিত ব্যক্তিরা এগুলো পাল্টে কি লাভ করলেন? দীর্ঘ ই-কার যুক্ত বানানগুলো কি অর্থের কোন পার্থক্য করেছে?
অর্থের যদি কোন পার্থক্য না হয় তাহলে বানান রীতি প্রবর্তনের দরকার কি? অন্যদিকে বিদেশী শব্দ যেমন শহীদ, রাহীম এগুলো যদি হ্রস্ব ই-কার দিয়ে লেখা হয় তাহলে অর্থের পার্থক্য হয়ে যায়। যেমন-শহিদ অর্থ স্বাক্ষী আর শহীদ অর্থ দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জীবন উৎসর্গকারী, রাহিম অর্থ আত্মীয়তা আর রাহীম অর্থ করুণাময়। এভাবে হাফিজ অর্থ রক্ষক আর হাফীয অর্থ মহারক্ষক। আলিম মানে জ্ঞানী কিন্তু আলীম মানে সর্বজ্ঞ। এখন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মাথায় একটা আসলো আর অমনি প্রমিত বানান বলে চালিয়ে দেয়া কি সমীচিন?
কলকাতার বাংলা আকাদেমী বা বাংলাদেশে বাংলা একাডেমীতে হ্রস্ব-ই কার সংযোজন করে কি লাভ হলো যেখানে ‘একাডেমী’টা পর্যন্ত পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি-সেখানে প্রমিত বানানের নামে ভাষা শুদ্ধি অভিযান কতটুকু জটিল আকার ধারণ করছে-বিষয়টি ভাববার সময় এসেছে। হ্রস্ব ই-কার দীর্ঘ ঈ-কার হ্রস্ব উ-কার, দীর্ঘ-ঊ কার ইত্যাদি ভাষার উৎকর্ষ সাধনে প্রতিবন্ধক নয়। বার বার বানান রীতি পরিবর্তন না করে বরং বানানগুলো চিরাচরিত নিয়মে থাকলে বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষা শিক্ষা করা মানুষের জন্য সহজ হবে।
বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়ে বিভিন্ন ভাষার শব্দ সংযোজনের মাধ্যমে। আসলে দেশী শব্দ বলতে গুটি কয়েক শব্দকেই আমরা বুঝি। আর্যদের আগমনের পূর্বে এদেশের আদিম অধিবাসীরা যে ভাষায় কথা বলত তাদের ভাষা থেকে যে শব্দ পাওয়া যায় ওগুলোই দেশী শব্দ। যেমন-কুলা, ডালা, ঢেঁকি, খোকা, খুকী, ডাব, ডিঙ্গা, ঢোল, ছাই ইত্যাদি। এছাড়া বাংলা ভাষায় যেসব শব্দ রয়েছে তাহলো-আরবী, ফারসি, ইংরেজী, পর্তুগীজ, ওলন্দাজ, ফরাসী, জাপানী, গুজরাটি, চীনা, বর্মী, তুর্কী, পাঞ্জাবী, গ্রীক, রুশ ইত্যাদি।
এছাড়া সংস্কৃত ভাষার এক বিরাট শব্দ ভান্ডার বাংলা ভাষায় রয়েছে। এই শব্দগুলো যুগের পর যুগ, কালের পর কাল ধরে বাংলা ভাষাভাষি মানুষের চোখের সামনে প্রতিনিয়ত ভাসমান। হঠাৎ এই নিয়ম ঐ নিয়ম করে দৃষ্টিভ্রম করার কোন মানে হয়? আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পৃথিবীর দ্বিতীয় সহজ ভাষা হচ্ছে আরবী। আর বাংলার স্থান রয়েছে সেখানে অষ্টম। এছাড়া বিশ্বের সবচেয়ে বেশী মানুষ কথা বলে চাইনিজ ভাষায়। ওরা কি কিছুদিন পর পর বানান পরিবর্তনে লেগেছে?
মোদ্দাকথা-প্রতিনিয়ত আঞ্চলিক ভাষা থেকে উঠে আসা শব্দসমূহ বাংলাভাষাকে সমৃদ্ধ করছে। আঞ্চলিক ভাষায়ই মূলত একজন মানুষ সুশিক্ষিত হতে পারে। আঞ্চলিক ভাষার যোগান ছাড়া মূল ভাষার সমৃদ্ধি ও টিকে থাকা মুশকিল। কাজেই আঞ্চলিক ভাষা থেকে উঠে আসা নতুন শব্দগুলো যে অঞ্চল হতে যেভাবে বানান সমেত উঠে আসছে-ওগুলোকে সংরক্ষণ করাই হোক বাংলা একাডেমীর কাজ। বাংলা ভাষা বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু অংশে প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় চার কোটি মানুষ সিলেটী ভাষা ব্যবহার করে। যেহেতু এগুলো প্রমিত ও উচ্চাঙ্গ বাংলা সাহিত্যের ভাষা নয়-তারপরও কী এগুলো ফেলে দিবেন? অবশ্যই না। প্রতিটি নৃগোষ্ঠীর ভাষাও বাংলাকে সমৃদ্ধ করে চলেছে।
প্রতিটি শব্দ প্রতিটি বানানে হাত দেয়ার আগে এর লাভ-লোকসান মাথায় রাখতে হবে। বাংলা ভাষাভাষির সৌভাগ্য যে আজ আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের ভাষাদিবস পালিত হচ্ছে। এই ভাষা দিবস কেন হলো? কিভাবে হলো? কোথায় কি ঘটনা ঘটেছিল ইত্যাদি বিশ্বজুড়ে জানার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে সমবেতভাবে বাংলাকে সহজবোধ্য করতে হবে।
তাই বাংলাদেশের বাংলা একাডেমী, পশ্চিমবঙ্গের বাংলা আকাদেমী, আনন্দবাজার, প্রথম আলো প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধন করতে গিয়ে যাতে ধু¤্রজাল সৃষ্টি না করেন সেটাই বাংলা ভাষাভাষিদের প্রত্যাশা। মাটির ঘ্রাণ মাখানো শব্দগুলো যাতে বাংলা অভিধানে স্থান পায়। পাশাপাশি পূর্বতন আমাদের শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক গুরুজন ড: মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. সুনীতিকুমারদের ডিঙ্গিয়ে বানানের ক্ষেত্রে অন্য কিছু ভাববার আমাদের অবকাশ নেই। ইংরেজী আরবী, চায়না ইত্যাদি ভাষার বানান নিত্য নতুন সংস্কার না করে ওতো বিশ্বব্যাপী টিকে আছে। আমাদেরও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার এখনই সময়।
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মজিদ
  • বাজারে ভেজাল : ভোক্তারা অসহায়
  • শিশু নির্যাতনের ভয়াবহতা
  • আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ কি আসন্ন?
  • বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বাজেট
  • পাকা ধানে আগুন নিভিয়ে দিতেই হবে
  • রমজানের সাধনা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশ
  • আমাদের নজরুল
  • বালিশাচার
  • পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষ রোপণ
  • নিরাপদ পানির বিকল্প নেই
  • মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ফারুক আহমদ চেয়ারম্যান
  • আমাদের জীববৈচিত্র্য, খাদ্য ও স্বাস্থ্য
  • এবার বোরো ধানে চাল নেই
  • পারমাণবিক বর্জ্যের ক্ষতিকর প্রভাব
  • মায়েদের ভালো থাকা
  • দুধেও ক্ষতিকর রাসায়নিক!
  • ইরান-আমেরিকা সম্পর্ক : যুদ্ধ কি অনিবার্য
  • নগরীর দৃশ্যমান সমস্যা ও প্রতিকার প্রসঙ্গে
  • যুদ্ধে যেতে হবে ভেজালের বিরুদ্ধে
  • Developed by: Sparkle IT