পাঁচ মিশালী

দ্বীনের আলোয় আলোকিত মানুষ

নওরোজ জাহান মারুফ প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৪-২০১৯ ইং ০০:১৭:১১ | সংবাদটি ১৫৮ বার পঠিত

বাংলাদেশ কুরআন প্রশিক্ষণ পরিষদের বরেণ্য সদস্য দ্বীনের গরীব-দুঃখী মানুষের বন্ধু সাইদুর রহমান সাহেব ২৬ মার্চ ২০১৮ সুন্দর এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পাড়ি জমালেন পরপারে।
মৃত্যুর সময় আল্লাহর এ বান্দার বয়স হয়েছিল প্রায় ৮০ বছর। সময় দ্রুতই চলে যায়। দেখতে দেখতে চোখের পলকেই তাঁর মৃত্যুর এক বছর চলে গেল।
সৈয়দ সাইদুুর রহমান পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তাবলিগ জামাতের সাথী হয়ে লন্ডন, আমেরিকা, কানাডা, ভারত, চাদ, ঘানা, বালি, সৌদিআরবসহ বহু দেশ ভ্রমণ করার সুযোগ পেয়েছেন এবং সেসব দেশে তাবলীগ জামাতে অংশগ্রহণ করেন।
সৈয়দ সাইদুর রহমান বাংলার পাশাপাশি উর্দু, হিন্দি, ফারসি, ইংরেজী ভাষায় কথা বলতে পারতেন। ঢাকা কাকরাইল মসজিদে নিয়মিত যাতায়াতের সুবাদে তাবলীগের বড় বড় আলেম ওলামাদের সাথে তাঁর ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল।
সৈয়দ সাইদুর রহমানের পিতা ছিলেন বড় মৌলানা। তাঁর নাম সৈয়দ হাবিবুর রহমান। হাবিবুর রহমান ভারতের বোম্বেতে বাস করতেন। বোম্বের একটি নামকরা মসজিদে তিনি ইমামতি করতেন। ছোট কালেই মাতৃহারা সাইদুর রহমান পিতার সান্নিধ্য পাওয়ার লক্ষ্যে বোম্বেতে কিশোরকাল কাটান। কিশোর বয়সে বোম্বেতে বেড়ে ওঠার সুবাধে তিনি ভালভাবে উর্দু, হিন্দী, ফারসি ভাষা রপ্ত করেছিলেন। তাঁদের গ্রামের বাড়ি ছিল জকিগঞ্জ উপজেলার বারহালের মাইজগ্রামে। তাঁদের বাড়ির একটা বড় পরিচিতি ছিল। মাইজগ্রামের বড় মৌলানাসাব (বড় মলইছাব) ছিলেন সৈয়দ সাইদুর রহমানের চাচা। বড় মলইছাবের পুরো নাম সৈয়দ ইসহাক আলী। তাঁদের বাড়িসংলগ্ন একটা মসজিদ তৈরি করেন বড় মলইসাব। যার সার্বিক তত্ত্বাবধানেও তিনি ছিলেন। বড় মলইছাব খুবই আধ্যাত্মিক চিন্তা চেতনার অধিকারী ছিলেন।
মূল প্রসঙ্গে ফিরে যাই। সৈয়দ সাইদুর রহমান সৎ, নিরীহ, পরোপকারী, নির্লোভ ও সাহসী লোক ছিলেন। তিনি ধৈর্য্য এবং নিষ্ঠার সাথে সব কাজ সমাধান করতেন। সৈয়দ সাব মজুমদারীতে বসবাস করেন প্রায় ৫০ বছর থেকে। মজুমদার বাড়ীর লোকজনের তিনি আস্থাভাজন ব্যক্তি ছিলেন। মজুমদার বাড়ির ওয়াকফ এস্টেটের নানা ধরনের কাজে কামে সৈয়দ সাহেবের ডাক পড়তো। মজুমদার বাড়ির পারিবারিক ঐতিহ্যের সাথে সৈয়দ সাবের পরিবারেরও একটা যোগসূত্র বহুদিন থেকে ছিল বিধায় মজুমদারীতে জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করেন তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সৈয়দ সাইদুর রহমান মজুমদারিতেই ছিলেন। সৈয়দ সাইদুর রহমান স্ত্রী, ১ ভাই, ১ বোন, ৩ ছেলে ও ৩ মেয়েসহ অসংখ্য নাতী নাতনী রেখে গেছেন।
সৈয়দ সাইদুর রহমান মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কুরআন শিক্ষা পরিষদের কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করে যান। তারই তত্ত্বাবধানে সুদীর্ঘ ২৩ টি বছর আম্বরখানা সরকারী কলোনী স্কুলেই (রমযান মাসে) পবিত্র কুরআনের বিশুদ্ধ শিক্ষা প্রদানের কাজ চলতে থাকে। তিনি কলোনি স্কুলের সভাপতি ছিলেন। গত ৫ থেকে ৬ বছর ধরে বাগবাড়িতে পরিষদের নিজস্ব ভূমিতে বিল্ডিংয়ে কুরআন শিক্ষার কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। সাইদুর রহমান নানাভাবে কুরআন শিক্ষা পরিষদে সহয়তা করেছেন। কখনো ফান্ডে টাকার অভাব দেখা দিলে তিনি নিজ তহবিল থেকে টাকা কড়ি দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতেন। প্রায় সময়ই ৭০ থেকে ৮০ জন ছাত্র শিক্ষকের খাবারের ব্যবস্থা নিজের টাকায় সম্পন্ন করেছেন। পরিষদের রান্না-বান্নায় তার স্ত্রীর অবদান ছোট করে দেখার নয়। বাবুর্চি বা রান্না-বান্নায় কাজের লোকের অভাব দেখা দিলে মাঝে মধ্যে সৈয়দ সাবের স্ত্রীর মাধ্যমেই তা সম্পন্ন করা হতো।
সৈয়দ সাইদুর রহমান প্রতি রমযান মাসে মসজিদে এ’তেকাফ পালন করতেন। মৃত্যুর আগের বছরও (২০১৭ সাল, ১৪৩৮ হিজরী) রমযানে বাগবাড়ীস্থ কুরআন প্রশিক্ষণ পরিষদ সংলগ্ন মসজিদে তিনি এ’তেকাফরত অবস্থায় মারাত্মক পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হলে অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। উপস্থিত অনেকেই তাঁকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিতে পারেন নি। তিনি দৃঢ় মনোবলের অধিকারী ছিলেন। তাই এতো অসুস্থাবস্থায়ও ভেঙ্গে পড়েননি। তাঁর প্রচুর মানসিক শক্তি দেখে সবাই অবাক হয়েছেন। পেটের ব্যথায় কষ্ট পেলেও নামাজ রোজা ছাড়েননি। বারবার তাকে বলা হয়েছে আপনি অসুস্থ্য রোজা বাদ দেন, সুস্থ হলে তা রাখবেন। অন্তত আজকের রোজাটি না রাখলে আপনার কিছু হবেনা। তিনি শুনেননি কারও কথা। আমরা খবর পেয়ে গেলাম তাঁকে দেখতে। এমতাবস্থায় তাঁকে গিয়ে দেখি কুরআন শরীফ তেলাওয়াতে নিমগ্ন। তাঁকে ভিষণ ক্লান্ত ও দুর্বল দেখালেও তিনি তা আমলে নেননি। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া যাবেনা। তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। কোরআন পরিষদের সেক্রেটারী মাওলানা আবদুল হাকিম (বড় হুজুর) সাহেবও ঐ মসজিদে এ’তেকাফ করেছিলেন। তিনি সৈয়দ সাবের মনের জোর আর অবিচল আস্থা দেখে বললেন আপনারা আর উনাকে জুরাজুরি করবেননা। তিনিও বার কয়েক সৈয়দ সাহেবকে বাসায় ফিরে যেতে বলছিলেন।
তাঁর মৃত্যুর পর আবারও রমযান মাস এলো। ঐ বছরের এ’তেকাফে তিনি হয়তো আধ্যাত্মিকভাবেই টের পেয়ে গিয়েছিলেন যে এটি তাঁর জীবনের শেষ এ’তেকাফ। তাই তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে শেষবারের রোজা এ’তেকাফ সম্পন্ন করেছিলেন। এই সুন্দর এবং শিক্ষণীয় ঘটনাটি হাকিম সাহেব (বড় হুজুর) সৈয়দ সাইদুর রহমানের মৃত্যুর পর তাঁর বাসায় দোয়ার সময় স্মরণ করে তাঁর রুহের মাগফেরাত কামনা করেন।
মজুমদারীতে প্রতিবছরই তাবলীগের জামাত আসতো। কোন কোন সময় তাবলীগ দলে মহিলা সদস্যরাও আসতেন। সাইদুর রহমান আগেই এইসব জামাতে থাকা ও খাবারের দায়িত্ব নিয়ে নিতেন। কখনো তাঁর বাসায়, কখনো টিফিন ক্যারিয়ারে করে খাবার মসজিদে তাবলীগের লোকদের জন্য পাঠিয়ে দিতেন।
সৈয়দ সাহেবের বাসার উপর তলায় এটাস্ট বাথরুমসহ বড় একটি বেডরুম হুজুর এবং তাবলীগ জামাতের লোকদের জন্য বরাদ্দ রেখেছিলেন। কখনো কখনো আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও আলেম উলামাদের কেউ কেউ এই ঘরে থাকতেন। তাঁর বাসায় থেকে অনেকেই লেখাপড়া করার সুযোগ পেয়েছেন। অনেক আত্মীয়-স্বজনের তিনি নিজ উদ্যোগে বিয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
তাঁর বাসায় দিনে রাতে খাবারের আগে কিছু সময় হলেও তালীম করা হতো। তালীম কখনো নিজে কখনো ছেলেমেয়েদের দিয়ে পাঠ করাতেন। তালীম শেষে মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে খাবার খেতে তিনি খুবই পছন্দ করতেন। কারো অসুবিধা হলে চেয়ার-টেবিলে বসে খেতে পারতেন এতে তিনি কিছু বলতেন না।
আমরা সৈয়দ সাইদুর রহমানকে বেহেশতের শ্রেষ্ঠতম ও প্রসংশিত স্থান জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করার জন্য মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি। আমীন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT