পাঁচ মিশালী

লজিং জীবন

সৈয়দ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ২০-০৪-২০১৯ ইং ০০:২৭:১৭ | সংবাদটি ২৪৬ বার পঠিত

বাংলাদেশের উত্তর সীমান্ত ঘেষা ভারতের আসাম রাজ্যের চেলাবাজার সংলগ্ন খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়গুলোর পাদদেশ হতে উৎপন্ন চেলা নদীটি সীমান্ত থেকেই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে মূল অংশ নরসিংপুর ও ইসলামপুর ইউনিয়নের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ছাতকবাজার সংলগ্ন ‘ছাতক সিমেন্ট কোম্পানীর’ কাছে সুরমা নদীতে মিলিত হয়েছে। অন্য অংশটি সীমান্ত গ্রাম শীমুলতলা বা উত্তর কলাউড়ার নিকট ‘মরাচেলা’ নামে বাংলাদেশে প্রবেশ করে কুশিউরা ও বাংলাবাজারের উত্তর পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ‘মরাচেলা’ নামে ভূলাখালীর নিকট চিলাই নদীর সহিত মিলিত হয়ে বাংলাবাজার ইউনিয়নের পশ্চিম পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চিলাই নদী নামে দোয়ারাবাজারের নিকট সুরমা নদীতে মিলিত হয়েছে। তখনকার সময়ে ছোট ছোট ঝরনাধারা থেকে নেমে আসা জলধারার চতুর্পাশে নির্জন গাছপালা ঘেরা নদীর পানি ছিল স্বচ্ছ। গভীরতা না থাকলেও বালুকাময় চকচকে নৈসর্গিক পরিবেশে প্রবাহিত পাহাড়ি নদীবাহিত পানির বৈশিষ্ট্যই আলাদা। যেন দিগন্ত বিস্তৃত ক্যানভাসে আঁকা বাঁকা পথে পাহাড়ি ঝর্ণার স্বচ্ছ পানি বুকে নিয়ে প্রকৃতির আপন খেয়ালে বয়ে চলা রং তুলি দিয়ে আঁকা তার নিজস্ব গতিময় ¯্রােত। বর্ষাকালের বৃষ্টিতে পাহাড়ি এই মরাচেলা নদীর যৌবন ফিরে আসতো। তখন পাহাড় থেকে নেমে আসা পাথর, সিঙ্গেল, বালু যেন আমাদের দেশের বারকী শ্রমিকদের প্রাণের স্পন্দন বাড়িয়ে দিত। তারা বারকী নৌকা দিয়ে প্রতিযোগিতা করে পাথর, সিঙ্গেল সংগ্রহ করে দোয়ারাবাজার এলাকায় পাথর সংগ্রহকারী কন্ট্রাক্টরদের নিকট বিক্রি করে ভাল আয় রোজগার করতো। ষাট সত্তর দশকে বর্ষাকালের চার পাঁচ মাস নদীটি খর¯্রােতা থাকতো এবং পাহাড়ী স্বচ্ছ পানির আধার হিসাবে গণ্য করা হতো। আমরা স্কুলগামী ছাত্ররা ফিরার পথে সহপাঠীদেরকে নিয়ে নদীতে সাঁতার কাটতাম এবং কানামাছি ও সাঁতার প্রতিযোগিতা খেলতাম। তখনকার সময় নদীপথে ছাতক, সুনামগঞ্জ, দোয়ারাবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত ও ব্যবসা বাণিজ্যের সহজ উপায়। বর্ষাকালে বড় বড় নৌকা দিয়ে ব্যবসায়ীরা গ্রাম থেকে ধান, চাউল, বালু, পাথর ক্রয় করে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে নিয়ে যেতো। কেননা তখন এই মরাচেলা নদীই ছিল অত্র অঞ্চলের একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। আমাদের কুশিউরা গ্রাম থেকে মাত্র তিন চার জন ছাত্র নদী পার হয়ে প্রায় এক কিলোমিটার দূরত্বের জাহাঙ্গীরগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তে যেতাম। আমরা ছোটবেলাতেই সাঁতার শিখেছিলাম বলেই নদী পারাপারে আমাদের পিতামাতা ও অভিভাবকবৃন্দের কোন প্রকার চিন্তার কারণ ছিলাম না।
১৯৬৩ সালে বাংলাবাজর ইউনিয়নের বড়খাল গ্রামের স্বশিক্ষিত, বিত্তশালী, বিনয়ী ও দানশীল ব্যক্তিত্ব এবং তৎকালিন দোয়ারাবাজার ইউনিয়নের সর্বশেষ চেয়ারম্যান (১৯৬৫-৭০) দানবীর মরহুম হাজি মফিজ আলীর দানকৃত জমিতে ও তাঁর অনুদান ও প্রচেষ্টায় তারই বাড়ির পার্শ্বে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ঐতিহ্যবাহী এই জাহাঙ্গীরগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্ণিত এই বিদ্যালয়েই আমার প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয়েছিল। ১৯৭২ সালে দানবীর মরহুম হাজি মফিজ আলী কর্তৃক পুনরায় জমি প্রদানসহ অনুদানের মাধ্যমে এবং স্বনামধন্য ও জাতীয় শ্রেষ্ঠ শিক্ষক এবং বর্তমান দোয়ারাবাজার উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ মোঃ ইদ্রিস আলী (বীর প্রতীক) ও এলাকাবাসীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় উক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন ‘বড় খাল উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ’ নামের বিদ্যালয়টিও তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। উল্লেখিত দুইটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই বাংলাবাজার ইউনিয়নবাসীদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে। অথচ ১৯৬০-৭০ দশকে ছাতক-দোয়ারা অঞ্চল তো বটেই বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলাতেও ছাতক মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, গোবিন্দগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় ও সুনামগঞ্জ জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় ছাড়া কোথাও পূর্ণাঙ্গ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল না। স্বাধীনতার পর হতে বর্তমানে প্রায় প্রতিটি গ্রামেই একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যদিও আমাদের কুশিউরা গ্রামে এখনো একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। শুধু কি তাই, প্রতিটি উপজেলাতে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ প্রচুর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধির ফলে আমাদের দোয়ারাবাজার অঞ্চলে শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে বেশি।
বর্তমান সময়ের মত তখন অত্রাঞ্চলে কোনো রাস্তাঘাট ছিল না ফলে রিক্সা গাড়ীও চলাচল করতো না। তখন মোবাইল যোগাযোগ ছিল স্বপ্নের মতো। সিলেট-সুনামগঞ্জ বর্তমান আন্তঃজেলা যোগাযোগের মহাসড়কটি ছিল কাঁচা সড়ক। ফলে প্রতি ২ থেকে ৩ ঘন্টা অন্তর একটি করে হেন্ডেল চালিত মুড়ির টিন খ্যাত বাস চলাচল করতো। তখন ছাতকবাজার হতে সড়ক পথে সিলেট জেলা সদরে আসতে ৩ থেকে ৪ ঘন্টারও বেশি সময় ব্যয় হতো। তাই সড়ক পথে চলাচলকারী যাত্রীর সংখ্যা ছিল নিতান্তই কম। তখন কিন্তু ছাতক থেকে রেল যোগাযোগ নিরাপদ, দ্রুত ও সহজ ছিল। তাই যাত্রীরা তাড়াহুড়া ও দৌড়ঝাপ করে হলেও রেল গাড়ীতে সিলেট আসতে চেষ্টা করতো। বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর মত মোবাইল, ইন্টারনেট, যোগাযোগতো দূরের কথা টেলিফোন যোগাযোগও ততটা সহজ ছিল না। তখনকার সময় কোনো ব্যক্তি সিলেট, সুনামগঞ্জ বা ঢাকায় প্রয়োজনীয় কোনো কাজে বা আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে বেড়াতে বাহির হলে পুনরায় যথারীতি সহি সালামতে বাড়িতে ফিরে না আসা পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ-খবর মিলতো না। ফলে সফরকারী ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনরা পুনরায় বাড়িতে ফিরে না আসা পর্যন্ত উদ্বিগ্ন ও দুঃশ্চিন্তায় থাকতে হতো। দীর্ঘ সফর বা চাকুরীর ক্ষেত্রে কর্মস্থল থেকে চিঠিপত্রের মাধ্যমই ছিল একমাত্র যোগাযোগের ভরসা। তাই তখনকার সময় জনপ্রিয় একটি গান মানুষের মুখে মুখে বেশি শুনা যেতো। গানটি ছিল, ‘নাই টেলিফোন, নাইরে পিয়ন, নাইরে টেলিগ্রাম। বন্ধুর কাছে মনের খবর কেমনে পৌঁছাইতাম।’ প্রেমিক প্রেমিকাদের লেখা চিঠি যদি কোন কারণে অভিভাবকের হাতে পড়তো তখন তাদের বিড়ম্বনার সীমা থাকতো না। বর্তমান সময়ে মোবাইল, ফেইসবুক ও ইন্টারনেটসহ আধুনিক যোগাযোগের কারণে প্রেমিক প্রেমিকাদের তেমন সমস্যায় পড়তে হয়না।
আমাদের বাংলাবাজার ইউনিয়ন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার যে কোনো গ্রাম থেকে তখন কেউ বিশেষ প্রয়োজন বা জরুরি কাজ ছাড়া সিলেট আসার কথা চিন্তাও করতো না। সিলেট, ছাতক তো দূরের কথা সুনামগঞ্জ মহকুমা সদরের সাথেও বাংলাবাজার ও দোয়ারবাজার উপজেলার কোনো রাস্তাঘাট ছিল না। ফলে ফসলি জমির আইল দিয়ে পায়ে হেঁটে দোয়ারাবাজার, ছাতকবাজার ও সুনামগঞ্জ যেতে হতো। আর সেখান থেকে লঞ্চ ও নৌকাযোগে অথবা সড়কপথে সিলেটসহ দেশের অন্যান্য স্থানে যেতে হতো। তাই সিলেট আসতে হলে আগে থেকেই পরিকল্পনা করতঃ দিন তারিখ ঠিক করে অন্ততঃ দুই বা তিন দিনের সময় নিয়ে আসতে হতো। অন্যথায় প্রয়োজনীয় বাজার বা অফিসের কাজকর্ম করা সম্ভব হতো না। ব্যবসায়ীরা নৌ-পথে তাদের দোকানের প্রয়োজনীয় মালামাল নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হতো। তাই আশির দশক পর্যন্ত অত্র অঞ্চলের মানুষ যেমন সহজে বাড়ি থেকে বের হতে চাইতো না তদ্রুপ কেহ বের হলেও তার খবরাখবর মিলতো না। ১৯৯০ সালের শুরু থেকেই ছাতক দোয়ারা অঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়ন শুরু হয়েছিল। ফলে আমরা এখন মাত্র দেড় দুই ঘন্টার মধ্যেই সিলেট থেকে ছাতক-দোয়ারা অঞ্চলে আসা যাওয়া করতে পারছি। প্রতিটি গ্রাম ও ইউনিয়ন ছাতক ও দোয়ারা বাজার সদরের সাথে পাকা সড়ক দ্বারা যোগাযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই এখন মানুষের যাতায়াতব্যবস্থা যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি ব্যবসায়ীরা ছোট ছোট ট্রাকের মাধ্যমে তাদের ব্যবসা সংক্রান্ত মালামাল পরিবহন করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। অন্যদিকে কৃষকের উৎপাদিত আনাজ তরকারী ও কৃষিপণ্য গ্রাম থেকে দ্রুত শহরে পৌঁছে যাচ্ছে। গ্রাম থেকে যুবক-যুবতীরা কাজের সন্ধানে শহরে আসা সম্ভব হচ্ছে। ফলে অত্র এলাকার বেকার ও গরীবের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে এবং শিক্ষা ও উন্নয়নের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।
১৯৮৬ সাল। আমি, আমির উদ্দিন, তাজ উদ্দিন, ফজর আলী, ধনমিয়াসহ আমরা কয়েকজন বর্ণিত জাহাঙ্গীরগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে ৫ম শ্রেণি থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে উন্নীত হলাম। তখন আমাদের ধারেকাছে তো বটেই বর্তমান দোয়ারাবাজার উপজেলার কোথাও মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল না। ফলে আমাদের অভিভাবক ও পিতামাতা আমাদের ভবিষ্যৎ লেখাপড়া নিয়ে শঙ্কার মধ্যে পড়েছিলেন। ইতিমধ্যে আমাদের গ্রামের বড় ভাইদেরকে স্কুলের অভাবে লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়ে কৃষি কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে। কিন্তু আমার পিতামাতা ছিলেন শিক্ষিত। তিনি কুরআনে হাফেজ ছিলেন এবং বৃটিশ আমলে আসামের নওগাঁ জেলা শহরের একটি মাইনার স্কুলের শিক্ষকতা করতেন। তিনি শিক্ষার মর্ম বুঝতেন বলেই আমাকে নিয়ে ভীষণ চিন্তার মধ্যে ছিলেন। আমাদের পাশের গ্রাম কিরণপাড়ার বাসিন্দা আমার ক্লাসমিট জনাব তাজ উদ্দিনের কাছে জানতে পারলাম আমাদের পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন লক্ষ্মীপুরের কান্দাগাঁওবাজার সংলগ্ন একটি নতুন জুনিয়র হাইস্কুল খোলা হয়েছে। সে নাকি উক্ত বিদ্যালয়ে ইতিমধ্যে ভর্তি হয়েছে। আমাকে উক্ত বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য সে আমন্ত্রণ জানালো। প্রয়োজনে সে সর্বপ্রকার সহায়তা করতে পারবে বলেও আশ্বাস দিয়েছিল। আমার পিতাকে উক্ত জুনিয়র স্কুলের কথা জানালে তিনি ভর্তি হওয়ার জন্য অনুমতি দিলেন। কিন্তু আমাদের গ্রাম থেকে উক্ত স্কুলে যাওয়ার পথে দুইটি নদীসহ ফসলি জমির বিরাট দুইটি হাওর রয়েছে, যা বর্ষাকালে পানিতে ভরে থাকে। তাছাড়া রাস্তাঘাট না থাকায় কাদামাটি দিয়ে হেঁটে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া সম্ভব নয়। তিন চার মাইল দূরত্বের ‘কান্দাগাঁও জুনিয়র উচ্চ বিদ্যালয়ে’ পড়তে হলে নিকটস্থ কোনো গ্রামে লজিং ছাড়া লেখাপড়া করা সম্ভব নয় বিধায় বাধ্য হয়েই নিকটস্থ একটি গ্রামে লজিং (Lodging) এর ব্যবস্থা করে তারপর উক্ত বিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। এখান থেকেই আমার লজিং (Lodging) জীবন শুরু হল। প্রথম লজিং জীবনের অভূমতি ও অভিজ্ঞতার কথা পরবর্তীতে জানানো হবে ইনশাল্লাহ।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT