সাহিত্য

বাঙালির উৎসব, বাঙালির পার্বণ

অথির চক্রবর্তী প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৪-২০১৯ ইং ০০:৪৪:৩৬ | সংবাদটি ৯৭ বার পঠিত

পহেলা বৈশাখ : পহেলা বৈশাখ বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে বলা যায় প্রায় অনাদিকাল ধরে! বৈশাখ ঘিরে মেলা, শোভাযাত্রা, হালখাতা এমন কত কী! একই অঙ্গে যেন তার বহুরূপ। পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই যেখানে ঋতু চারটি, ঋতুবৈচিত্র্যের কারণে আমাদের এখানে হয়ে গেল ছয়টি। যে জন্য এ দেশকে ষড়ঋতুর দেশ বলেও অভিহিত করা হয়। এখানকার জল ও হাওয়া, মাটি, প্রকৃতি অন্য দেশ থেকে আলাদা। ভৌগোলিক কারণেই সাধারণত এমনটি হয়ে থাকে। নাতিশীতোষ্ণময় এর আবহাওয়া। ফলে নিজেদের ঋতুবৈচিত্র্যকে মর্যাদা দিতে একটি সন খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। আর সে কারণেই সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০/১১ মার্চ বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। শ্রুতি আছে যেতাঁর সিংহাসন আরোহণের সময়ই অর্থাৎ ৫ নভেম্বর ১৫৫৬ সালে তা কার্যকর হয়। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌর সনকে ভিত্তি করে এই বাংলা সনটি প্রবর্তিত হলো। নতুন এই সনটি প্রথমে ‘ফসলি সন’ নামেই পরিচিত ছিল সর্বমহলে। পরে তা বঙ্গাব্দ বলেই লিখিতরূপ পায়। একটা সময় পহেলা বৈশাখ জমিদারদের পুণ্যাহের দিন বলেও পরিচিত ছিল। কৃষকরা ওই দিনটিতে যার যার খাজনা পরিশোধ করে ঋণমুক্ত হতো। এই ঋণ পরিশোধ পুণ্য অর্জনের মতো ছিল অনেকটা। তাই নাম হয়েছিল ‘পুণ্যাহ’। কিন্তু আকবরের আমলে এসে যখন অধুনা বাংলা সনটি প্রবর্তিত হলোতা পরিণত হলো সর্বজনীন আনন্দের উৎসবে। বর্ষবরণের উৎসবে বদলে গিয়ে তা জমিদার ও প্রজার মধ্যে বছর বছর চলে আসা শ্রেণি-বৈষম্যেরও ইতি ঘটাল। কারণ এই পহেলা বৈশাখ জমিদার-প্রজা, ধনী-নির্ধন, হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে সবার। এটা বাঙালিরই উৎসব। তার গল্পে, বর্ণমালায়, পুঁথিতে, লোকাচারে, গানে, কবিতায়, শোভাযাত্রায়, মেলায়, নৌকা বাইচে, মোরগ লড়াই বা ষাঁড়ের লড়াইয়ে সবকিছুতেই এই নববর্ষ আপন মহিমায় জায়গা করে নিয়েছে।
ঈদুল আজহা : এই দিনটিতে বিশেষ একটি মাহাত্ম্য লুকিয়ে আছে। আত্মত্যাগের গল্পই এই ঈদুল আজহার বড় অর্জন। এই আত্মত্যাগ মানুষের প্রতি মানুষের। কারণ আত্মত্যাগ ব্যতীত মানুষ কখনো সম্পূর্ণ হয় না। প্রস্ফুটিত হয় না তার হৃদয়বাগানের ফুল। শাখা-পল্লবে যেমন গাছ দীর্ঘ ও প্রশস্ত হয়ে ওঠে, মানুষকেও তেমন দীর্ঘ হতে হয়। মুসলিম সম্প্রদায়ের দুটি বড় উৎসবের একটি হলো এই ঈদুল আজহা। আজহা শব্দের ব্যপত্তিগত অর্থ হলো উৎসর্গ করা। ঈদুল ও আজহা দুটোই আরবি শব্দ। কিন্তু এই শব্দ দুটি এখন বাঙালি ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। ত্যাগের সৌন্দর্যে, আচারে এটি এই ভৌগোলিক এলাকায়ও ব্যঞ্জনাময় ও অর্থবহ হয়ে উঠেছে। আচারের চিরাচরিত রূপ পাওয়া এই ঈদুল আজহার আয়োজনযজ্ঞে, সব ধর্ম-বর্ণের মানুষেরই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে একটা নিবিড় সংযোগ রয়েছে। ঈদুল আজহার শুরুটা হয়েছিল অনেকটা এভাবে আল্লাহর নির্দেশে ইব্রাহিম তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাইলকে মক্কার নিকটতম স্থান মিনাতে ৩৮০০ (সৌর) বছর পূর্বে কোরবানি দিতে উদ্যত হন। পরে আবার আল্লাহর নির্দেশেই প্রাণপ্রিয় পুত্রের বদলে পশু কোরবানি দেন। সেই থেকে দেশে দেশে এই ঈদ পালিত হয়ে আসছে। যেন এই ত্যাগের গল্পই বয়ে বেড়াচ্ছে বছরের পর বছর। নিজের মনের পশুত্বকে কোরবানি করাই হচ্ছে এর ভেতরের গল্প। নির্ধনদের মাঝে গোশত বিলিয়ে দেয়া কোরবানির পরবর্তী অনুষ্ঠিত কাজের একটি। এখানে আনন্দকে ভাগাভাগি করে নেয়ার সূত্রটিও নিহিত। ঈদুল আজহা ১০ জিলহজ, যেদিন হাজিরা হজব্রত পালনকালে মিনাপ্রান্তরে পশু কোরবানি করেন এবং তৎপরবর্তী দুই দিন, বা তিন দিনব্যাপীও অনুষ্ঠিত হয়। এই দিনটিতে সবাই নতুন পোশাক পরিধান করে। পারস্পরিক কোলাকুলি, কুশল বিনিময় এইসব এই বঙ্গদেশে সম্প্রীতির দারুণ উদাহরণ।
শারদীয় দুর্গাপূজা : শারদীয় দুর্গাপূজা এখন সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। অশুভকে প্রতিহত করে শুভকে প্রতিষ্ঠিত করাকেও এই দেবীপূজার অন্যতম প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। শরৎকালে হয় বলেই এই পূজাকে শারদীয় দুর্গাপূজা বলে অভিহিত করা হয়। এই পূজা এখন বাঙালির সংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে উঠেছে। ঢাকের তালে তালে বেশ আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যদিয়েই এই পূজা সম্পন্ন হয়। দশভুজা দেবী একেক সময় একেক বাহনে করে আসেন। বলা হয়ে থাকে দেবীর বাহনও আলাদা তাৎপর্য বহন করে। দীর্ঘদিন ধরে পালিত হয়ে আসা এই পূজা নিয়ে আছে নানারকম গল্প। আছে দেবীকে নিয়েও নানা গল্প। জানা যায় দুর্গম অঞ্চলে মহিষাসুরকে বধ করার কারণেই এই দেবীর নাম হয়েছে দুর্গা। আর মহিষাসুর ব্রহ্মার বরে অবধ্য হয়ে ওঠে। সকল দেবতাদের ভীত-সন্ত্রস্ত হওয়ার কারণও হয়ে ওঠে সেইসঙ্গে। দেবতাদের অস্ত্রে সজ্জিত এই দেবী দ্বারাই শেষপর্যন্ত নিধন হয় এই মহিষাসুর। দুর্গাপূজার প্রচলন সম্পর্কে জানা যায় পুরাকালে রাজ্য হারিয়ে রাজা সুরথ একদিন মেধস মুনির আশ্রমে যান। মুনির পরামর্শ অনুযায়ীই তিনি দেবী দুর্গার পূজা করেন। পূজায় দেবী তুষ্ট হলে রাজা সুরথ আবার তার রাজ্যপাট ফিরে পান। বসন্তকালে হয়েছিল বলে এর আরেক নাম বাসন্তী পূজা। কৃত্তিবাসের রামায়ণ বলেরামচন্দ্র রাবণবধের জন্য অকালে অর্থাৎ শরৎকালে দেবীর পূজা করেন। তখন থেকে এর নাম হয় অকালবোধন বা শারদীয় দুর্গাপূজা। বাসন্তী পূজার সময় হলো চৈত্রের শুক্লপক্ষে আর শারদীয় পূজার সময় সাধারণত আশ্বিন বা কার্তিকের শুক্লপক্ষে। বঙ্গদেশে এই পূজার প্রচলন শুরু হয় সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে। প্রচলন করেন রাজশাহী জেলার তাহিরপুরের রাজা কংস নারায়ণ মতান্তরে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় ( ১৭১০-১৭৮৩)। তবে জীমূতবানের দুর্গোৎসব নির্ণয় (আনু. ১০৫০-১১৫০), বিদ্যাপতির দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী (১৩৭৪-১৪৬০), শূলপাণির দুর্গোৎসব বিবেক (১৩৭৫-১৪৬০) কৃত্তিবাস ওঝার রামায়ণ (আনু. ১৩২১১৪৬১) ইত্যাদি গ্রন্থে দুর্গাপূজার যে বিস্তৃত বর্ণনা পাওয়া যায়, তাতে অনুমিত হয় বাংলায় দুর্গাপূজা দশম বা একাদশ শতক থেকেই প্রচলিত।
বসন্তবরণ : বসন্ত যেন স্বর্গের একটি দ্বার উন্মুক্ত করতেই আসে। শীতের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সে সদর্পে প্রকৃতির মঞ্চে এসে হাজির হয়। পহেলা ফাল্গুন বা বসন্তকে বরণ করে নেয়ার জন্য সবাই যার যার মতো তাকে স্বাগত জানায়। কেউ রবীন্দ্রনাথের গানের কথায় তাকে স্বাগত জানায় ‘আজ দখিন দুয়ার খোলা, এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত।’ সত্যি বাঙালির এই বসন্তবরণ অপরূপ হয়ে ওঠে সৌন্দর্যকে মনেপ্রাণে গ্রহণের বাসনা থেকেই। তারুণ্যের উচ্ছলতায় অবাধ আবেগের ঢেউ ছড়িয়ে সর্বত্র। এখানে ওখানে বেজে ওঠে কতরকম সংগীত। কতরকম আবৃত্তি। বাংলাদেশ যেমন নদীমাতৃক, ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ, তেমনি সে তো গানেরও দেশ। যে গানে আছে উজ্জ্বল উদ্ধার। ঢাকার চারুকলায় বকুলতলায় বসন্তবরণের এক অন্যরকম শোভা আছে। মেয়েরা বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে নৃত্যগীতের মাধ্যমে বসন্তকে বরণ করে নেয়। আর ছেলেরা পরে হলুদ রঙের পাঞ্জাবি। সারাদেশ সেই হলুদ ও বাসন্তী রঙে ছেয়ে যায়। এই ঋতুকে বরণ করে নেয়ার মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। তার সঙ্গে যুক্ত হয় অজস্র তরুণপ্রাণ। ঋতুবৈচিত্র্যে এই ঋতুর তুলনা নেই। সে শুধু ভালোবাসা জাগিয়ে যায়। ফুলের পরাগমাখা কোনো পতঙ্গের হঠাৎ উড়ে যাওয়ায়ও এই ঋতুর ভালোবাসার প্রকাশমহিমা আছে। ফুলে ফুলে প্রকৃতির গাছপালা অনবদ্য সাজে সেজে ওঠে। অশোক, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া, কাঞ্চন, পারিজাত, মাধবী, গাঁদা। অজস্র ফুলে, রঙে, সৌরভে ভোলাতে এই ঋতু আসে। আর তার স্পর্শে সব সজীব হয়ে ওঠে। বসন্তকে বরণ করার মধ্যে দিয়ে বাঙালির সৌন্দর্যচেতনা অনেকটাই আঁচ করা যায়। আঁচ করা যায় বাঙালির ভালোবাসার উত্তাপও।
চৈত্রসংক্রান্তি : চৈত্রের শেষদিনে চৈত্রসংক্রান্তি পালিত হয়। এই চৈত্রসংক্রান্তিকে ঘিরে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসে মেলা। নাড়ু, সন্দেশ, বাতাসা, দই ইত্যাদি বহু লোভনীয় খাদ্য নিয়ে জমে ওঠে মেলা। তার সঙ্গে পাওয়া যায় বাঁশ, বেত, প্লাস্টিক, মাটির তৈরি বিভিন্নরকম খেলনা। এই মেলাতে আসে সবাই। চড়কগাছকে কেন্দ্র করে মেলা বসে মূলত। সন্ন্যাসীরা যেমন চড়ে এই চড়কগাছে, চড়ে সাধারণ লোকেরাও। একটি বিখ্যাত প্রবাদও আছে এই চড়কগাছকে নিয়ে। ‘চক্ষু চড়কগাছ’। হ্যাঁ চড়কগাছ মানুষের বানানো গাছ (উঁচু করে পোঁতা কাঠ)। এই গাছকে ধর্মীয় জ্ঞানে পূজা করা হয়। শূলফোঁড়া, বাণফোঁড়া ও বড়শিগাঁথা অবস্থায় চড়কগাছে ঘুরতে দেখা যায় ভক্তদের। চড়ক গাজন উৎসবেরই আরেকটি অঙ্গ। এই উপলক্ষে এক গ্রামের শিবতলা থেকে শোভাযাত্রা বের হয়ে আরেক গ্রামের শিবতলায় গিয়ে শেষ হওয়ারও একটা ব্যাপার থাকে। মূলত দুজনই শোভাযাত্রাকে আলোকিত করে রাখে। শিব ও গৌরী (গৌরী অবশ্য পুরুষই কেউ সেজে থাকে)। আর শিব ও গৌরীকে ঘিরে নৃত্য করতে থাকে নান্দী, ভৃঙ্গী, ভূতপ্রেত ও দৈত্যদানব। শ্মশানচারী শিবের যত সহচর থাকে সব। শিব ও গৌরীর গল্পই অভিনয়ে মূর্ত করে তোলার প্রয়াস থাকে। গোটা চৈত্রমাস জুড়ে থাকে বিভিন্ন আচার, উপবাস, ভিক্ষান্নভোজন প্রভৃতি। বাংলাদেশে বহুকাল থেকে এই চৈত্রসংক্রান্তির মেলা হয়ে আসছে। থাকে মেলার পাশেই পুণ্যস্নান। এই মেলা উৎসবমুখর একটা সামাজিক মেলবন্ধন তৈরি করে আসছে বছরের পর বছর। গ্রামের মানুষের চিত্ত বিনোদনের মেলাও এটি। বায়োস্কোপ, সার্কাস, পুতুলনাচ, ঘুড়ি ওড়ানো এই সবকিছু মেলাতে থাকে। সবকিছু মিলিয়ে চৈত্রসংক্রান্তি এখন বাঙালির লোকউৎসবে পরিণত হয়েছে। এই দিনকে কেন্দ্র করে কোথাও কোথাও কালীনাচও হয়। অসুরবধই এই নৃত্যের বিষয় হিসেবে প্রাধান্য পেয়ে থাকে। এই দিনে অতিথি সমাগমও ঘটে ঘরে ঘরে। এটা বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে ছোটদের আশীর্বাদের একটা দিনও বটে।
ঈদুল ফিতর : এটি মুসলিম সম্প্রদায়ের দুটো বড় উৎসবের একটি। রমজানের এক মাস চলে সিয়াম সাধনা। বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় খাবার-দাবারের আয়োজন করা হয় বাড়ি বাড়ি। সবাই একসঙ্গে বসে ইফতার খাওয়ার যে আয়োজনটি, সেটা সত্যি অনেক আনন্দের। সবাইকে একই শামিয়ানার নিচে নিয়ে আসে। যারা রোজা রাখেন না, তাঁরাও এই আনন্দে সামিল হন। একইসঙ্গে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটি একান্নবর্তী পরিবারের কথা মনে করিয়ে দেয়। মসজিদ থেকে আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে এলে রঙিন শরবতে রোজা ভাঙার এই রেওয়াজটি কঠিন নিয়মানুবর্তিতা বা কৃচ্ছ সাধনার কথা স্মরণে আনে। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আমাদের একান্নবর্তী পরিবার ক্রমশ ভেঙে যাচ্ছে। রোজার এই সান্ধ্য আয়োজনটি একটি চমৎকার একান্নবর্তী পরিবারের আনন্দ নিয়েই যেন উপস্থিত হয় আমাদের সবার মাঝে। দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার পর যখন আকাশে এক ফালি চাঁদ দেখা যায়, তখন সবার মুখে ফুটে ওঠে হাসি। হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুসারে শাওয়াল মাসের এক তারিখ ঈদুল ফিতর পালিত হয়। ঈদের আগের দিনের রাতটি ধর্মীয় দৃষ্টিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এই রাতকে ধর্মীয় পরিভাষায় বলা হয় লাইলাতুল কদর অর্থাৎ পুরস্কারের রজনী। আধুনিককালে অনেক দেশে গাণিতিক নিয়ম অনসারে ঈদ পালিত হলেও বাংলাদেশে এই ঈদ পালিত হয় শাওয়ালের চাঁদ দেখেই। কারণ আজ চাঁদ উঠলেই পরদিন ঈদ। এটা এদেশে প্রবাদসম। চাঁদ দেখার জন্য ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সবাই অপেক্ষা করে। তবে কোথাও কোথাও সৌদি আরবের ঈদকে অনুসরণ করা হয়। সেই হিসেবে দেখা যায় দু’দিন ঈদ পালিত হচ্ছে এদেশে। কিন্তু অধিকাংশই শাওয়ালের চাঁদের ওপরই নির্ভর করে। ঈদের এই আনন্দ নজরুলের ‘গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নয়, নহে কিছু মহীয়ান’-এর সঙ্গে তুলনীয়। ঈদের আরেকটি সৌন্দর্য হলো এর কোলাকুলি পর্ব। সবাই সবাইকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে কুশল বিনিময় করছে। করছে ভালোবাসার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। সেমাই, মিষ্টি, পিঠা, সন্দেশের দাওয়াত থাকে বাড়ি বাড়ি সবার। সম্প্রীতির সুন্দর এক বীজ বোনা আছে ঈদের মর্মে। নতুন পোশাকে পোশাকে বাংলার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত যেন রঙিন হয়ে ওঠে। প্রায় সবগুলো দৈনিক পত্রিকা ঈদের এই আনন্দকে আরো বাড়িয়ে দিতে বের করে ঈদসংখ্যা। চমৎকার লেখায় আর রঙিন অলঙ্করণে ঈদসংখ্যার পাতার পর পাতা হয়ে ওঠে বর্ণিল। পাঠকও এই ঈদসংখ্যার জন্য অপেক্ষা করে এই সময়টায়।
পৌষসংক্রান্তি : বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে পৌষসংক্রান্তি একটি বিশেষ দিন। এটি এখন একটি লোকউৎসবে পরিণত হয়েছে। বাংলা পৌষ মাসের শেষদিন এই দিবসটি পালন করা হয়। হরেক রকম পিঠার আস্বাদ দিতে এই দিনটি বাঙালির কাছে বছর ঘুরলেই আসে। নতুন চাল, খেজুরের গুড়, নারিকেল দিয়ে নকশাকাটা পিঠা, দুধপুলি, ক্ষীরপুলি, মালপোয়া, পাটিসাপটা, চিতই, ভাপাপিঠা এরকম নানান মুখরোচক পিঠা তৈরির দিনই যেন এই পৌষসংক্রান্তি। ভারতের জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী সংক্রান্তি একটি সংস্কৃত শব্দ। এর দ্বারা সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ করাকে বোঝানো হয়ে থাকে। বারো রাশি অনুযায়ী মোট বারোটি সংক্রান্তি রয়েছে। মহাকাব্য মহাভারতেও এই দিনটির কথা উল্লেখ আছে। তাই এই দিনটির আলাদা একটি গুরুত্ব রয়েছে। পশ্চিম ভারতের গুজরাটে দিনটি বেশ ঘটা করে উদযাপিত হয়। কথিত আছে, মানুষ সূর্য দেবতার কাছে তার সুন্দর আকাঙক্ষা বা ইচ্ছেগুলোই রঙিন ঘুড়ি করে উড়িয়ে নিবেদন করে। ঘুড়ি মূলত এখানে প্রতীক বা রূপক হিসেবে ব্যবহৃত। এই দিনটিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুড়িউৎসব পালিত হয়ে থাকে। উৎসবে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বেশেষে সবাই অংশগ্রহণ করে। এই ঘুড়ি উৎসবটি মোগল আমল থেকে এদেশে পালিত হয়ে আসছে। পুরান ঢাকায় এই দিনটিতে সারাদিনব্যাপী নানা কর্মসূচি থাকে। বিশেষ করে ঘুড়ি উৎসবকে কেন্দ্র করে। পুরান ঢাকায় পালিত পৌষসংক্রান্তিকে বলা হয় ‘সাকরাইন’। এই সংক্রান্তি উপলক্ষে গ্রামে-গঞ্জেও বসে চমৎকার সব মেলা। সেইসঙ্গে ঢোল, করতাল, একতারা, দোতারা সহযোগে বসে বাউল গানের আসর। এটি বাঙালির শেকড়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT