সাহিত্য

বাক্সবন্দী দীর্ঘশ্বাস আর কিছু ছেঁড়া পংক্তি

আবদুস সবুর মাখন প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৪-২০১৯ ইং ০০:৪৬:৩২ | সংবাদটি ২৪০ বার পঠিত

চিরায়ত বাংলার ছায়াঘেরা সবুজ শ্যামল গ্রামের অপরূপ বর্ণনা ফুলে ওঠেছে পল্লী কবি জসিম উদ্দীনের অমর সৃষ্টি ‘নিমন্ত্রণ’ কবিতায়। তিনি তাঁর ‘ছোট গাঁয়ে’ সকলকে নিমন্ত্রণ দিয়ে আদতে গোটা বাংলাদেশকেই উপভোগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। কবি আনোয়ার হোসেন মিছবাহ তেমনি ‘নিমন্ত্রণ’ শিরোনামের কবিতা দিয়ে তার সুখ-দুঃখ, প্রেম-রোমাঞ্চ-বিরহ সংমিশ্রণে রচিত কাব্যগ্রন্থ ‘এক বাক্স দীর্ঘশ্বাস’-এর সুখপাঠ্য কবিতার রাজ্যে বিচরণের আহ্বান জানিয়েছেন পাঠকদের। এবারের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তার এই একশ’ ১২ পৃষ্ঠার কাব্যগ্রন্থটি। একই সঙ্গে বেরিয়েছে তার অপর একটি কাব্যগ্রন্থ ‘ছেঁড়া পংক্তি’। ৭২ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে প্রতিটি চার পংক্তির প্রায় চারশ’টি ‘মিনি কবিতা’ স্থান পেয়েছে।
সাহিত্যের একটি অতি জনপ্রিয় ও ‘উর্বর’ শাখা হচ্ছে কবিতা। গল্প উপন্যাস যতোই লেখা হোক না কেন, এর কয়েক গুণ বেশি লেখা হয়েছে কবিতা। বাংলা সাহিত্যের আদি থেকে এ পর্যন্ত বিখ্যাত বা স্বল্প পরিচিত কতোজন কবির আবির্ভাব হয়েছে কিংবা কী পরিমাণ কবিতা তারা সৃষ্টি করেছেন, তার পরিসংখ্যান দুরূহ। কবিতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বিশিষ্ট গবেষকগণ বলেছেন অনেক কিছু। এর সার কথা হলো- ছন্দ ও তাল সমন্বয়ে নান্দনিক শব্দগুলোর মাধ্যমে ভাব অনুভূতি প্রকাশ; যা পাঠকের মনের গহীনে স্থান করে নেয়। যেমন একজন গবেষকের মতে- ‘সাহিত্যের সুর কবিতা, আমার মতে ছন্দোবদ্ধ ভাষায় যে সকল পদ্য লেখা হয় তাকে কবিতা বলে।’ কেউ কেউ বলেন- ‘কবিতা হচ্ছে শ্রুতিনান্দনিক শব্দের সমন্বয়ে তালে ও ছন্দে বিন্যস্ত, আবেগঘন অর্থ প্রকাশ কথন বা লেখন।’ আরও সহজ ভাষায় বললে- কবিতা শব্দে, মাত্রায়, মর্মে-ছন্দে-উপমায় চিত্রে ও অনুভূতির মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠিত কবিদের সৃষ্টিকর্মে কবিতার সবগুলো বৈশিষ্ট্য সার্থকভাবে পরিস্ফুট হয়েছে, এটা ঠিক; তবে যে আনোয়ার হোসেন মিছবাহদের মতো কবিদের লেখায় উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো একেবারেই অনুপস্থিত, সেটা বলা যাবে না। এর একটা উদাহরণ হতে পারে তার ‘একবাক্স দীর্ঘশ্বাস’ কাব্যগ্রন্থ। এর ভূমিকায় কবি ও প্রাবন্ধিক ফজলুর রহমান বাবুল যথার্থই উল্লেখ করেন- ‘কবিতার পথে সৌন্দর্য্যরে গান গাওয়ার জন্য যে সামর্থ্যরে প্রয়োজন তা মিছবাহ-র আছে।’
মূলত প্রেম, বিরহ, স্বপ্ন কিংবা দুঃস্বপ্ন এই সব কিছু নিয়েই একবাক্স দীর্ঘশ্বাস। কবি প্রেমের কাছে যেমন আত্মসমর্পিত, বিরহেও তেমনি কাতর। যেমন ‘বিশ্বাস করো তখনও নিঃশ্বাসেরা অবিশ্বাস রকমের/ শোঁ শোঁ শব্দ ভয়ে কানের উপকূলে ট্রলার ভিড়াচ্ছিল’/ (দৌড়)। আরও একটু নিজেকে সমর্পণ করা- ‘চোখের মাঝে চোখ পড়েছে/ চোখের মাঝে চোখ/ তোমার চোখে ডুবতে আজি নিচ্ছি আমি ‘ঝোঁক’।- (চোখ)। এমনি একটি সাহসী ঝোঁক নিতে পারে যে প্রেমিক তার মুখেও উচ্চারিত হয় কিছুটা ক্ষেদ; ক্ষোভও বলা যায়। যেমন- ‘চোখের ভেতর চোখ গলাবি বন গলাবি প্রেম জ্বরে/ তোকে আমি জানান দেবো জ্বালিয়ে আগুন তোর ঘরে/’ (পিরিতের পূঁজ)। এর নাম বিরহ। বিরহেই বুঝি প্রেমের সার্থকতা। তাইতো সাহিত্যের অমর সব সৃষ্টির উপজীব্য হয়ে ওঠেছে এই বিরহ কিংবা ট্র্যাজেডি। ‘একবাক্স দীর্ঘশ্বাস’ গ্রন্থে তেমনি ‘দীর্ঘশ্বাস’ মেশানো কিছু কবিতা স্থান পেয়েছে। ‘দু’ঠোঙার গল্প’ কবিতায় কবি অনবদ্য উপমায় কষ্টের মুহূর্তকে বর্ণনা করেছেন এভাবে- ‘এভাবেই শূন্যের উদরে উড়ে যায় প্রপঞ্চের ডানা মেলা ঘুড়ি/ উড়তে উড়তে-পড়তে পড়তে/ ঠোঙার বাদামের সংসার সংলাপ ছিঁড়ে যায়/’ আর এভাবেই ফিরে আসে একজন কবি- একজন প্রেমিক নিজ কক্ষপথে। ‘আমি তখন তাহার নির্দেশে মানুষের পথচলা পথে চলে এলাম নীরবে।’ (ফিরে আসা)।
কল্পনার রাজ্য আপাদমস্তক যার বিচরণ সে তো জগৎ-সংসার, জীবন-বাস্তবতা, রাজনীতি কিংবা সমাজের কঠিন মারপ্যাঁচ নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাবে না বলেই আপাতদৃষ্টে মনে হতে পারে। কিন্তু সাহিত্যকর্ম আর মননশীলতা সবকিছুর ভিত্তি হচ্ছে জীবন, দৃষ্টির সীমায় যা কিছু আসে সবই। কল্পনা থেকে যদি কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটকের সৃষ্টি হয়, তবে তার চরিত্রগুলো চলমান জীবন থেকে ধার নেয়া। তেমনটি না হলে সেটা কোন সফল শিল্পকর্ম নয়। কবি আনোয়ার হোসেন মিছবাহ’র ‘একবাক্স দীর্ঘশ্বাস’ কাব্যগ্রন্থেও সন্নিবেশিত কবিতাগুলোতে ওঠে এসেছে এই সমাজের দৃশ্যমান চরিত্র, না জানা অনেক কথা, গল্প। কয়েকটি উদাহরন এমনি- ‘শ’ আটাশি দেশের বুকে/ মাতৃভাষা পাই/ একুশ এখন বিশ্বদিবস/ সবই মানে তাই।’ (বাংলা কোথায় পাই)। ‘সালিশ কিনে আমার প্রতি/ বড্ড খাটান জোর/ আমরা আতেল বুঝতে থাকি/ আপনি হলেন চোর।’ (সালিশ নালিশ)। বইয়ের শেষ প্রান্তে সিলেটের ইতিহাস, সংস্কৃতি কৃষ্টির পরিচয় তুলে ধরে দেড়শ পংক্তির কবিতাটি নিঃসন্দেহে অনবদ্য। এতে চমৎকার একটি চিত্রকল্প ভেসে আসে পাঠকের সামনে। যার পুরোটাই বাস্তব। ‘বন্ধুরে নয়তো তুমি পর’ শিরোনামের কবিতার শেষ পংক্তিগুলো এরকম ‘বাংলার ম্যাপের উত্তর-পূর্বে/ যেদিকে না সূর্য ডুবে/ দেখবে আমি ণপেক্ষাতে/ তোমার বন্ধুবর।/ বন্ধুরে নয়তো তুমি পর।’
মানবজীবনের প্রেম-অনুভূতি, আকুলতা, চাওয়া-পাওয়া, আবেগ-উচ্ছ্বাস সংবলিত প্রতিটি চার পংক্তির শিরোনামহীন কবিতাগুলোর সমন্বয়ে তৈরি ‘ছেঁড়া পংক্তি’ কাব্যগ্রন্থ। প্রতিটি কবিতারই পৃথক পৃথক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, আছে স্বতন্ত্র ভাব-অনুভূতি। কিšুÍ সবগুলো কবিতারই নেপথ্যে একই সুর অনুরনিত। সেটা হলো প্রেমের জন্য ব্যকুলতা। তাই সবগুলো কবিতাকে যদি একটি কবিতা মনে করা হয়, তবে ‘ছেঁড়া পংক্তি’ কাব্য গ্রন্থকে একটি ‘মহাকাব্য’ বলে অভিহিত করার অবকাশ রয়েছে। ছন্দ- মাত্রার হিসেবে কবির যথেষ্ট মুন্সিয়ানা রয়েছে। যা পরিস্ফুট হয়েছে ছেঁড়া পংক্তি কাব্যগ্রন্থে। যেমন- ‘তুমি আমার ধানের শিষের/ মনভোলানো হাসি/ ধান ক্ষেতের ওই আলে আলে/ পাগলা হাওয়ার বাঁশি।’ আরেকটি অনবদ্য ছন্দের চার পংক্তি এরকম- ‘তোমার কাছে বসলে সখী/ চাঁদ রবি যায় ডুবে/ আশায় থাকি আরেক দিনের/ সূর্য আসুক পুবে।’
বাসিয়া প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থ দু’টির প্রচ্ছদ মানানসই। অফসেট পেপারে মুদ্রিত গ্রন্থ দুটিতে মুদ্রণ প্রমাদ নেই বললেই চলে। আশা করি এগুলো পাঠক-প্রিয়তা লাভ করবে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT