ইতিহাস ও ঐতিহ্য

জুরাসিক যুগের পৃথিবী

মো. বেলাল আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৪-২০১৯ ইং ০০:১৩:৪০ | সংবাদটি ৩০১ বার পঠিত

পৃথিবীর আধুনিক ইতিহাসকে যেমন নানা যুগে ভাগ করা হয়েছে তেমনি পৃথিবীর প্রাগৈতিহাসিক সময়কেও ভাগ করা হয়েছে কয়েকটি ভূতাত্ত্বিক যুগে। ভূবিজ্ঞানীদের মতে, আজ থেকে প্রায় ১৪ কোটি ও ২১ কোটি সময়সীমার মধ্যে পৃথিবীতে ছিল জুরাসিক যুগ। জুরাসিক নামটি এসেছে ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডের জুরা পর্বতমালা থেকে। কারণ এখানে জুরাসিক যুগের পাথর পাওয়া গেছে প্রচুর পরিমাণে। পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসে এই যুগটি ছিল সরীসৃপের যুগ। এই যুগেই পৃথিবীর বুকে দাপিয়ে বেড়াত দৈত্যকার ডাইনোসর। সে সময় ছিল না বনমানুষ, ছিল না সিংহ বা হাতি। তখন পৃথিবীতে ছিল সাপ, কুমির সামুদ্রিক সরীসৃপ, নানা রকম মাছ অমেরুদন্ডী প্রাণী। পৃথিবীতে তখনো তিমি জন্ম নেয়নি। তবে পেসিয়োসর ও ইকথিয়োসর নামে দুই সামুদ্রিক সরীসৃপ তিমির মতো সারা সমুদ্রে দাপিয়ে বেড়াত। এ দুটি প্রাণী ছিল সরীসৃপ জাতিয়। তাই এরা ডিম পাড়ত কিন্তু বাচ্চার জন্ম দিত না।
উল্লেখ্য, পৃথিবীতে প্রথম পাখির দেখা মেলে এ যুগেই। আশ্চর্য এ পাখির নাম আর্কিয়োপটেরিক্স। শব্দ ভেঙে অর্থ করলে দাঁড়ায়, আর্কিয়ো কথার মনে প্রাচীন আর টেরিক্স শব্দ পাখা। এই প্রথম পাখির ফসিল পাওয়া গেছে দক্ষিণ জার্মানির ব্যাভেরিয়ায় চুনাপাথরের মধ্যে। আর্কিয়োপটেরিক্সের আকার তেমন বড় ছিল না। কাকের চেয়েও সামান্য বড়, তবে শরীর ছিল শক্তপোক্ত। তা ছাড়া লম্বা মাথার সামনের দিকটা সরু হয়ে ঠোঁটের আকার নিয়েছিল। সেই ঠোটের মধ্যে ছিল বেশ কয়েকটা দাঁত। এ যুগের পাখির অবশ্য দাঁত নেই। তাই লম্বা শক্ত লেজ থেকে ডাইনোসরের সাথে আর্কিয়োপটোরিক্সের আত্মীয়তা বোঝা যায়। আকাশে তখন শুধু যে আর্কেয়োপটেরিক্সের দেখা মিলত তা কিন্তু নয়। আকাশের অনেকটা জায়গাই দখল করে থাকত টেরোস নামের এক ধরনের উড়ন্ত টিকটিকি। তবে এদের চেহারা ও ভাবসাব ছিল বিদঘুটে বাদুড়ের মতোই। লম্বায় এরা ২০ ফুট ছাড়িয়ে যেত। জুরাসিক যুগে পৃথিবীর আবহাওয়া ছিল মৃদু ঠান্ডা। তাই সে সময় মেরু অঞ্চলেও ভরে উঠেছিল প্রচুর গাছপালায়।
এ সময় যে গাছ সবচেয়ে বেশি পরিমাণে জন্মাত তার মধ্যে বলতে ফার্ন সাইকোড জিংকগো কনিফার ইত্যাদি গাছের নাম উল্লেখযোগ্য। জিংকগো গাছগুলো যথেষ্ট লম্বা হতো। প্রায় তিন ফুট ব্যাসের এই গাছগুলো লম্বায় হতো ৭৫-৮০ ফুট। জুরাসিক যুগে সমুদ্রে নানা ধরনের অমেরুদন্ডী প্রাণীও ছিল। যেমন শামুকের মতো অ্যামোনাইট বেলেমনাইট ইত্যাদি সমুদ্রের তলদেশে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াত। এ ছাড়া সে যুগের সমুদ্রে ছিল অগুনতি নানা ধরনের কাঁটাওয়ালা মাছ ও হাঙর। তা ছাড়া বেশ কিছু সাঁতারু টিকটিকি। যেমন-পেসিয়োসর ও ইকথিয়োসর। এদের কথা তো আগে বলাই হয়েছে। এ যুগেই পৃথিবীতে প্রথম ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ শোনা যায়। জুরাসিক যুগে ডাইনোসর ছিল কয়েক ধরনের।
তবে দুই ধরনের নাম জানতে পারা যায়। সরিসিয়া ও অর্নিথিয়া। সরিসিয়া ধরনের ডাইনোসরের আকার ছিল বিরাট। তবে খাবার অভ্যেসের দিক দিয়ে কেউ কেউ মাংসাশী আবার কেউবা নিরামিষাশী। ফলে ফলমূল খেয়েই দিন কাটাত। উল্লেখ্য, এ দলের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ডাইনোসরের নাম টিরানোসরাস। প্রায় ৫০ ফুট (১৬ মিটার) লম্বা এই ডাইনোসর মাটির ওপর দাঁড়ালে উচ্চতা হতো প্রায় ২০ ফুট। বিরাট মাথাওয়ালা মাংসাশী এই ডাইনোসরের মুখের হা ছিল বিশাল, যা দেখলে ভয় পেত না এমন কোনো প্রাণী ছিল না সে যুগে। সে যুগের আরেক দৈত্যকার ডাইনোসরের নাম ব্রন্টোসরাস। এটি লম্বায় টিরানোসরাসের চেয়েও বড় ছিল (প্রায় ৭০ ফুট) তবে শ্লথগতির এই ডাইনোসরটি ছিল নেহাতই নিরামিষাশী। আর তেমন লড়াকু স্বভাবের নয়।
জুরাসিক যুগে গিরগিটিদের অবস্থা রমরমা থাকলেও স্তন্যপায়ীরাও জন্ম নিয়েছে। তবে সংখ্যায় কম ও আকারে ছোট। স্তন্যপায়ী হলেও কোনো কোনো প্রাণী ডিম পাড়ত। সে এক আশ্চর্যের ব্যাপার। আবার সে যুগে সরীসৃপ হওয়া সত্ত্বেও কোনো কোনো ডাইনোসরের বাচ্চা হতো। তবে ডাইনোসরের ডিম পাওয়া গেছে স্তরীভূত পাথরের মধ্যে। ভূবিজ্ঞানীদের ধারণা, এ যুগের শেষ দিকে আকাশ থেকে পৃথিবীর বুকে খসে পড়েছিল এক বিরাট উল্কা। সেই বিরাট উল্কার সাথে সংঘর্ষে পৃথিবীর বুকে সৃষ্টি হলো বিরাট ফাটল। আর আকাশ বাতাস চার দিক এত ধুলোয় ঢেকে গেল যে, সূর্যের মুখ দেখাই কঠিন হয়ে পড়ল। আর অন্য দিকে বিরাট ফাটল ধরে পৃথিবীর বুক থেকে বেরিয়ে এলো প্রচুর লাভা গ্যাস আর ছাই। সেই প্রতিকূল পরিবেশে খাপখাওয়াতে না পেরে সদলবলে হারিয়ে গেল ডাইনোসরেরা। সমাপ্তি ঘটল জুরাসিক যুগের পৃথিবীর।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • হবিগঞ্জের লোকসাহিত্যে অধুয়া সুন্দরীর উপখ্যান
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঢাকা উত্তর মোহাম্মদপুর উচ্চ বিদ্যালয়
  • সিলেটে ফারসি চর্চা
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • আদিত্যপুরের গণহত্যা
  • জালালাবাদের ইতিহাস ঐতিহ্য
  • বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ
  • সিলেটে আরবি ভাষাচর্চা
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয় এবং সুফি-সাধকদের কথা
  • ঐতিহ্যবাহী গ্রাম আজিজপুর
  • সিলেটের গণভোটের অগ্রনায়ক মৌলানা ছহুল উসমানী
  • বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আরেক অধ্যায়
  • কোচিংনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঐতিহাসিক নানকার আন্দোলন
  • গৌড়-বঙ্গে মুসলিম বিজয়
  • শত বছরের ঐতিহ্যের ধারক দাউদিয়া মাদরাসা
  • পৃথিবীর প্রাচীন লাইব্রেরিগুলো
  • আল হামরা : ইতিহাসের অনন্য কীর্তি
  • Developed by: Sparkle IT