শিশু মেলা

আপুর সাথে আড়ি

এম. আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-০৪-২০১৯ ইং ০০:০৭:০২ | সংবাদটি ৭৯ বার পঠিত

বাড়িটা সাজানো হয়েছে। সামনের গেইট থেকে ভিতর বাড়ি পর্যন্ত সারি সারি মরিচ লাইট জ্বলছে সন্ধ্যা থেকে। এগুলোর ফাঁকে ফাঁকে সাদা আলোর টিউবলাইট। গেইটটা পাতলা কাপড়ে মোড়ানো। মেয়েদের হালকা ওড়নার মত কী নামের নানা রঙের কাপড় দিয়ে উত্তমরূপে সাজানো গেইটটি নয়ন কাড়া। শেবুল পরখ করে। গেইটে ঢোকার মুখে দুটি সার্চ লাইট। আলো ফেলে এলাকাটা দিনের আলোর মত উজ্জ্বল করে তুলেছে।
শেবুল শুনেছে আপুর বিয়ে। সে চিন্তা করে পায় না এটা আবার কী? অনেক লোক আসবে। অচেনা-অজানা। খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন চলছে। নিজেদের আত্মীয়-স্বজন আসতে শুরু করেছে। আজ রাতের মধ্যেই মামা-মামীরা, ফুফা-ফুফুরা এসে যাবে। ওদের সাথে এক গাদা ভাইবোন। সে ভেবে পায় না এতগুলো লোক জড়ো হয়ে কী করবে? সন্ধ্যার পর থেকে আপুর কাছে একটিবারও যেতে পারেনি। ওকে ঘিরে আপুর সমবয়সীরা বসে আছে। হাতে মেহেদী লাগাচ্ছে। একটু পর নাকি গায়ে হলুদ। কিন্তু গায়ে হলুদ দিবে কেন? তাও আবার শুধু আপুকে। এমনিতেই শেবুল আপু ছাড়া থাকতে পারে না। খাওয়ার সময় আপু। ঘুমাতে গেলেও আপু। পড়তে গেলেও আপু। গোসলের সময়ও আপু। শুধু স্কুলে যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ আপু থাকে না-কলেজে চলে যায়। তখন মা-মণি থাকতো সাথে। আজ কাছে ঘেষতেই পারছে না। ওখানে গেলেই রেহেনা আপু ধমক দেয়। হেই তুই যা তো এখান থেকে। শাড়ি পাল্টাবে, ব্লাউজ পাল্টাবে ইত্যাদি নানা অজুহাতে শেবুলকে ধমক দেয়। শেবুল দেখে আপুও কিছু বলে না। কাছেও ডাকে না। শুধু সাজছে আর সাজছে। কী জানি বাপু-মনে হয় আপু আমাকে ভুলে গেছে ওর সইদের পেয়ে। একলা থাকলে একটা চিমটি কেটে দৌড় দিতাম। মনের দুঃখে ওর বুকের ভিতর কান্না জমে উঠল। কাউকে কিছু বলতেও পারছে না। অগত্যা নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে থাকলো সে।...
প্রফেসর আসিফের একমাত্র মেয়ে শিউলী। মা আয়শা গৃহিণী। সিলেটের মেজরটিলায় ওদের বাড়ি। মেজরটিলা বাজার হতে একটু পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে বাম দিকে যে গলিটা ঢুকেছে- সেই গলি ধরে একটু আগালেই ওদের তিনতলা বাড়িটি চোখে পড়ে। ওর বাবা একজন সৌখিন লোক। প্রায় পঁচিশ ডিসিমেল জায়গার উপর নির্মিত বাড়িটির সামনে বাগান ও গাড়ির গ্যারেজ, চাকর-বাকরদের থাকার স্থান। বাগানে দেশি বিদেশী ফুলের সমাহার। অনেক দেশী ফলের গাছও রয়েছে। ইচ্ছা করলে আম, আঙ্গুর, বাউ কূল ইত্যাদি হাত বাড়িয়ে খাওয়া যায়। খুব বেশি না পাকলে অবশ্য ফলগুলো পাড়া হয় না। প্রফেসর আসিফ বলেন- ‘খাওয়ার চেয়ে দেখায় সৌন্দর্য বেশি। তাই তিনি এগুলো পাড়তে দেন না। কিন্তু দুষ্টু শেবুল এসব কিছু মানে না। আম পাকলেই সে পেড়ে খায়। এর জন্য অবশ্য শেবুলের আম্মুকে বেশ কথা শুনতে হয়। কিন্তু সরাসরি আসিফ তাঁর ছেলে মেয়েকে বকেন না। যদি ওরা বেজার হয়ে যায়! ওদের খুশির জন্যই তো এসব কিছু। ওদের বেজার করে কী লাভ!
শিউলী এ বছর বি.এ পরীক্ষা দিয়েছে। প্রফেসর আসিফেরও বয়স হয়েছে। উনি চান তার মেয়েকে পাত্রস্থ করতে। শিউলী ফর্সা- সুন্দরী নয়। শ্যামলা সুন্দরী। ওর উচ্চতা, দেহের গড়ন, অঙ্গ-সৌষ্ঠব অনেক আকর্ষণীয়। কিন্তু পাত্রদের পছন্দ ফর্সা সুন্দরী। বেশ কয়েকটি প্রস্তাব এলেও ওদের কনে পছন্দ হয়নি। এতে অবশ্য প্রফেসর আসিফ হতাশ নন। একটি মাত্র মেয়ে। আজ হোক কাল হোক-একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
অবশ্য ঘটকদের দৌরাত্মে উনি বেশ বিরক্ত। মেয়ে বিয়ে দিতে গিয়ে ঘটকদের ভেলকীবাজির শিকার হয়ে নিজেকে বড়ই ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হয়-কেন যে মেয়ের বাবা হলাম।
যাই হোক- অবশেষে মনির ঘটকের বিশেষ তত্ত্বাবধানে শিউলীর বিয়ের কথাবার্তা পাকা হয়ে গেল। পাত্র ব্যবসায়ী। সিলেটের লামাকাজীর ছোট্ট গ্রাম মাহতাবপুরে বরের বাড়ি। রড সিমেন্টের বড় দোকান সিলেট সুনামগঞ্জ রোডে। লাফার্জ সিমেন্ট হোল সেলার। বি.এ পাশ করেই পৈত্রিক ব্যবসায় বসল আরজু। সেই থেকেই ঝানু ব্যবসায়ী। দিন দিন উন্নতি লক্ষণীয়। উভয় পক্ষের পছন্দ মোতাবেক বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হয়ে গেল। বিয়ের আগের দিন গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান। প্রফেসর সাহেবের একমাত্র মেয়ে। তিনি আত্মীয় স্বজন সবাইকে দাওয়াত দিয়েছেন। কোন কার্পণ্য করেননি। এদিকে শেবুলের ফুফুতো, মামাতো ভাইবোনেরা জড়ো হয়েছে। সারা বাড়ি লোকে লোকারণ্য। কথাবার্তায়, আলাপচারিতায় কেবল গমগম শব্দ হচ্ছে। শেবুলের সমবয়সীরা ওজে খুঁজছে। কিন্তু পাচ্ছে না। শেবুলের আবার একটা সমস্যা আছে। ও রেগে গেলে বেহুশ হয়ে পড়ে। সেন্স থাকে না। এখানে রাগারাগির অবশ্য কিছুই হয়নি। তবে সে এই পরিবেশে রাগ ঝাড়তে পারেনি। শিউলীর সইদের সামনে তেমন কিছু প্রকাশ করল না। পোষা বেড়াল রাগলে যে রকম হয়-ঠিক তেমনি রাগ অন্তরে চেপে গরগর করতে করতে নিজের রুমে চলে গিয়েছিল শেবুল। তাই কেউ ওকে খুঁজে পাচ্ছে না। একান থেকে ওকান করতে করতে শেষ পর্যন্ত কনের কানে পৌঁছল খবরটি। শিউলি আর ঠিক থাকতে পারলো না। সে গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান থেকে ছুটল শেবুলের খুঁজে। সমস্ত রুমগুলো খুঁজে অবশেষে পৌঁছল সেবুলের রুমে। সেবুল অজ্ঞান হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। হাউ মাউ করে কেঁদে উঠল শিউলী। কয়েক মিনিটেই সমস্ত ঘর ভরে গেল পুরুষ-মহিলা বাচ্চা কাচ্চায়। কোন একজন পানি নিয়ে এলে শিউলী ওর চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিল। শেবুল জ্ঞান ফিরে পেয়ে আপুকে জড়িয়ে ধরল। আর বলল- আপু তুমি কোথায় ছিলে? এমন তো তুমি ছিলে না। আজ শাড়ি-চুড়ি পরেই আমাকে ভুলে গেলে?
-নারে না। তোকে কী করে ভুলবো বল। তুই যে আমার হৃদয়। তুই যে আমার পালস্। তুই যে আমার হার্টবিট।
-মিথ্যে কথা। সেই বিকেল থেকে দেখছি। তুমি একটিবারও আমাকে ডাকনি- আদর করনি। খেয়াল করনি। তোমার সইগুলো নিয়েই ব্যস্ত ছিলে....
-লক্ষ্মী ভাই রাগ করে না। আর এরকম হবে না। তুই শান্ত হ:....
-আচ্ছা শান্ত হলাম। এবার আমাকে আদর কর।
-শিউলি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
অবস্থা বুঝে মেহমানরা যার যার কাজে গেল।
পুরো রাত শেবুল শিউলীর আঁচল ধরে থাকলো। গভীর রাতে ঘুমিয়ে পড়ল শেবুল। কিন্তু শিউলীর ঘুম এলো না। এই অবোধ ভাইটিকে ফেলে কী করে যাই! কাল যখন বর আমাকে নিতে আসবে তখন ওর অবস্থা কী হবে.... ভেবে ভেবে সারা রাত চোখের পানি ফেলে শিউলী। এ মায়ার বাঁধন বড় শক্ত। দু’হাতে টেনে ইলেকট্রিকের তার যেমন ছেড়া যায় না তেমনি ভাই বোনের বাঁধন ছেড়া বড় কঠিন। তারপরও মেয়েদের এই অমোঘ নিয়ম মানতে হয়। মা-বাবা কত আদর যতœ করে বড় করেন- অথচ সেই প্রাণপ্রিয় মা বাবাকেই ফেলে যেতে হয়। হায়রে নিঠুর নিয়তি! কেনইবা মেয়ে করে জন্ম দিলে?
ভোরে ওঠে শেবুল আপুর আঁচল ধরে ধরে হাঁটে। ও যেখানে যায় শেবুলও সেখানে যায়। শেবুলের মনে একটি ভয় জেগেছে। ওর আপু আজ ওকে ফেলে চলে যাবে ভিন গাঁয়ে। এটা কেমন করে সইবে শেবুল! যাকে ছাড়া একটা মুহূর্তও কাটে না তাকে কীভাবে ভুলবে সে। ভিন গাঁ থেকে এসে ওকে ধরে নিবে কেন? আর কাউকে পেল না?
যথাসময়ে বর উপস্থিত হলো কনের বাড়িতে। সবাই বরযাত্রীদের খাওয়া দাওয়া নিয়ে ব্যস্ত। শেবুলের সে দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। সে শিউলীর পাশে ঘুরঘুর করছে। অনেক দাদী নানীরা মস্করা করছে ওকে নিয়ে। কেউ বলছে ওর জন্যও একটা কনে দেখো।
-একীরে বাবা। ও শুধু কনের পাশে ঘুরঘুর করে। ছোট্ট দেখে একটা কনে আনো; ওর সাথে বেঁধে দেই। লজ্জা পেয়ে শেবুল-এদিকটা ছেড়ে পালালো। ওর বন্ধুরা খাওয়া দাওয়া করছে। শেবুলও ওদের সাথে একটু আধটু খেলো। তবে ওর মন ভীষণ খারাপ। সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না আপুর বিয়ে.....?
কনে বিদায়ের সময় উপস্থিত হলে শেবুল আপুর কান্না দেখে সেও কাঁদতে শুরু করল। সে কিছুতেই আপুকে হাতছাড়া করতে চায় না। শিউলী অনেক বুঝিয়ে ‘সুজিয়ে বলল- শেবুল তুই ভাবিস না। একদিন পর আবার আসব। আর তোকে ছেড়ে যাবো না।
-সত্যি বলছ আপু?
-হ্যাঁ, সত্যিই বলছি। তুই একটা দিন ধৈর্য্য ধর।
এ্যাশ কালারের একটা হাইয়েছ গাড়িতে কনেকে তুলে দেয়া হলো। শেবুল শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো। চোখের কোনে তখনও ঝড়ের পূর্বাভাস। যেকোন সময় বৃষ্টি শুরু হতে পারে....

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT