ধর্ম ও জীবন

 ইসলামের আলোকে শোক পালন

আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৪-২০১৯ ইং ০১:১০:৩৬ | সংবাদটি ১০১ বার পঠিত

পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে’ (সূরা : আল-ইমরান, আয়াত : ১৮৫)।
জন্ম-মৃত্যু মহান আল্লাহর চিরন্তন বিধান। যে কারো জন্ম আমাদেরকে আনন্দ দান করে এবং যে কোনো মুমিনের মৃত্যুতে আমরা শোকে কাতর হয়ে যাই। অর্থাৎ জন্ম আমাদেরকে আনন্দ দান করে এবং যে কোনো মুমিনের মৃত্যুতে আমরা শোকে কাতর হয়ে যাই। অর্থাৎ জন্ম আমাদেরকে আনন্দ দান করে এবং মৃত্যু আমাদেরকে শোকাহত করে। কারো দুঃখে দুঃখিত হওয়া, কারো মৃত্যুতে শোকাহত হওয়াটা স্বাভাবিক। ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘মানুষ ধন-সম্পদ প্রার্থনায় কোনো ক্লান্তিবোধ করে না, কিন্তু যখন তাকে দুঃখ-দৈন্য স্পর্শ করে তখন সে অত্যন্ত নিরাশ ও হতাশ হয়ে পড়ে’ (সূরা : হামীম আস-সাজদা, আয়াত : ৪৯)।
অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছেÑ ‘যখন আমি মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করি তখন সে মুখ ফিরিয়ে লয় ও দূরে সরে যায় এবং তাকে অনিষ্ট স্পর্শ করলে সে তখন দীর্ঘ প্রার্থনায় রত হয়’ (সূরা : হামীম আস সাজদা, আয়াত : ৫১)।
কারো দুঃখে দুঃখ প্রকাশ করা বা শোক প্রকাশ করার বিষয়টি পবিত্র কুরআন দ্বারা স্বীকৃত। কারো মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করার বিষয়টি অগণিত হাদিস দ্বারা সুষ্পষ্ট প্রমাণিত। হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, ‘আমরা রাসুল (সা.) এর কন্যা উম্মে কুলসুমের দাফনে হাজির হলাম। রাসুল (সা.) তখন কবরের পারে বসা আছেন, আমি দেখলাম তখন তাঁর দুচোখ অশ্রু বিসর্জন করছিল’ (বুখারী, মিশকাত শরীফ : পৃষ্ঠা-১৪৯)।
হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, একদিন আমরা রাসুল (সা.) এর সাথে আবু সায়েফ কর্মকারের কাছে পৌঁছলাম। সে রাসুল (সা.) এর পুত্র ইব্রাহিমের ধাত্রীর স্বামী ছিলো। রাসুল (সা.) ইব্রাহিমকে গ্রহণ করলেন এবং তাকে চুম্বন করলেন ও তার ঘ্রাণ শুঁকলেন। এরপর আরো একবার আমরা তার কাছে গেলাম। তখন ইব্রাহিম প্রাণ ত্যাগ করেছিলেন। এ সময় রাসুল (সা.) এর চোখ অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছিল। এটা দেখে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনিও? তখন রাসুল (সা.) বললেন, হে ইবনে আউফ! এটা হল দয়া। অতঃপর রাসুল (সা.) আবার অশ্রু বিসর্জন দিলেন এবং বললেন, চোখ অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে এবং অন্তর দুঃখিত হচ্ছে, তথাপি আমি প্রকাশ করছি যাতে আমার প্রভু খুশি থাকেন। হে ইব্রাহিম! তোমার বিচ্ছেদে আমরা শোকার্ত’ (বুখারী ও মুসলিম)।
হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) এর কন্যা আবুল আসের স্ত্রী হযরত যয়নব তার কাছে একটি লোক মারফত বলে পাঠালেন যে, আব্বাজান! আমার একটি শিশু ওষ্ঠাগত প্রাণ, আপনি আমাদের এখানে আসুন! উত্তরে রাসুল (সা.) লোক মারফত সালাম পাঠিয়ে বললেন, আল্লাহ যা গ্রহণ করেন, তা তারই। আর যা দান করেন, তাও তারই এবং প্রত্যেকেই দুনিয়াতে থাকবে তার কাছে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। সুতরাং সবর করবে এবং তার কাছে সওয়াবের আশা রাখবে। অতঃপর যয়নব তাকে কসম দিয়ে পাঠালেন যে, তিনি যেন অবশ্যই তাদের সেখানে যান। এবার রাসুল (সা.) চললেন এবং তাঁর সাথে সাদ ইবনে উবাদা, মাআজ ইবনে জাবাল, উবাই ইবনে কাব, যায়েদ ইবনে সাবিত এবং আরো কতক লোক চললেন। শিশুটিকে রাসুল (সা.) এর কাছে উঠিয়ে আনা হলো। তখন তার প্রাণ ছটফট করছিলো। রাসুল (সা.) এর দুচোখ অশ্রু বিসর্জন করতে লাগল। এ সময় সাদ (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এটা কী? রাসুল (সা.) বললেন, (এটা অশ্রু বিসর্জন) এটা দয়া। আল্লাহ পাক এটা তার বান্দাদের অন্তরে স্থাপন করেছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ দয়া করেন তার বান্দাদের মধ্যে দয়াবানদেরকে’ (বুখারী ও মুসলিম)।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর (রা.) থেকে বর্ণিতÑ তিনি বলেন, ‘যখন (৮ম হিজরিতে) মুতার যুদ্ধ হতে আমার পিতা জাফর (রা.) এর মৃত্যু সংবাদ পৌঁছল তখন রাসুল (সা.) সাহাবায়ে কেরাম ও আমাদের আত্মীয় স্বজনদেরকে বললেন, তোমরা জাফরের পরিবারের জন্য খাদ্য তৈরি করে প্রেরণ কর। কেননা তাদের কাছে এমন দুঃসংবাদ পৌঁছেছে যা তাদেরকে খানা তৈয়ার করা হতে বিরত রাখবে’ (তিরমিজী, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, মিশকাত : পৃষ্ঠা-১৫১)
উক্ত হাদিসের আলোকে আল্লামা তীবি (রা.) বলেন, ‘আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশিদের জন্য মুস্তাহাব ও মানবিক কাজ হলোÑ মৃত্যুর ঘরে রান্না করা খাবার প্রেরণ করা। কেননা পরিবার-পরিজন ঐ সময় শোকে থাকেন। তাই তারা রান্না-বান্না করার সুযোগ পান না। সেজন্য অন্ততঃ একদিনের খাদ্যদ্রব্য প্রেরণ করা উত্তম।’ কোনো কোনো হাদিস বিশারদগণ বলেছেন, ‘যেহেতু শোক পালনের সীমা হল তিন দিন। তাই তিন দিন পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ করাই উত্তম’ (মিশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা : ১৫১, হাশিয়া নম্বর : ৫-৬)
কোন মুসলমানের মৃত্যুতে শোক পালন করার বিষয়ে ইসলামী শরিয়তের স্থায়ী আইন রয়েছে। আর তা হলোÑ স্ত্রী ব্যতিত অন্য কেউ তিন দিনের বেশি শোক পালন করতে পারবে না। অর্থাৎ- একমাত্র স্ত্রী তার স্বামীর মৃত্যুতে চার মাস দশ দিন শোক পালন করতে পারবে। অন্য কেউ কারো মৃত্যুতে তিন দিনের বেশি শোক পালন করতে পারবে না। ইসলামী ফিকাহ শাস্ত্রের এ বিধানটি বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা সুস্পষ্ট প্রমাণিত। রাসুলে পাক (সা.) ইরশাদ করেনÑ ‘যারা আল্লাহ ও আখিরাতের উপর ঈমান রাখে, তাদের কেহই কারো মৃত্যুতে তিন দিনের বেশি শোক পালন করতে পারবে না। কেবলমাত্র স্ত্রী তার স্বামীর মৃত্যুতে চার মাস দশ দিন শোক পালন করতে পারে’ (বুখারী ১ম খন্ড : পৃষ্ঠা-৪৫, বুখারী ২য় খন্ড : পৃষ্ঠা- ৮০৩, মুসলিম ১ম খন্ড : পৃষ্ঠা- ৪৮৭, তিরমিজী ১ম খন্ড : পৃষ্ঠা- ২২৭, নাসায়ী ২য় খন্ড : পৃষ্ঠা- ১০১, আবু দাউদ : পৃষ্ঠা-৩১৪, ইবনে মাজাহ : পৃষ্ঠা-১৫১।
হাদিসের সকল কিতাবাদীতেই এ বিষয়ে অনুরূপ হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
কোন মুসলমানের মৃত্যুতে তিন দিনের বেশি শোক পালন করা যাবে না। এটাই ইসলামের চুড়ান্ত বিধান। মৃত্যুর তিন দিন পর শোক পালন করা বা প্রতি বছর মৃত্যুর তারিখে শোক দিবস পালন করা সম্পূর্ণরূপে ইসলামের পরিপন্থী।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT