ধর্ম ও জীবন

পানাহার : বান্দার উপর আল্লাহর অনুগ্রহ

মাওলানা ছালিকুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৪-২০১৯ ইং ০১:১২:৩৫ | সংবাদটি ২২২ বার পঠিত

ইমাম ও খতিব ছন্দানীটুলা জামে মসজিদ
আল্লাহর বান্দাদরে উপর যতগুলি অনুগ্রহ আছে তার মাঝে অন্যতম প্রধান অনুগ্রহ হল পানাহার। মানুষরে শরীর গঠন, বর্দ্ধন ও টিকে থাকার মূল উপাদান হচ্ছে পানাহার। এই নেয়ামতরে দাবি হল এর দাতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। আর এ কৃতজ্ঞতা আল্লাহর প্রশংসা এবং তাঁর দেয়া বিধান পালন করার মাধ্যমে আদায় করা যেতে পারে। এ নেয়ামতের আরো একটি দাবি হচ্ছে, এর সহাতায় আল্লাহর নাফরমানি করা যাবে না।
পানাহাররে অনকেগুলো আদব ও বিধান রয়েছে, যাকে দুইভাবে ভাগ করা যেতে পারে :
প্রথমত : যে বিষয়গুলোর গুরুত্ব দেয়া আবশ্যক। যেমন : ১. খাদ্য এবং পানীয় জাতীয় জিনিসের এহতেরাম করা আর এই বিশ্বাস রাখা যে এগুলি আল্লাহর নেয়ামত যা আল্লাহ তা’আলা তাকে দিয়েছেন। ২. খাদ্য জাতীয় জিনিসকে অবহলো-অসম্মান না করা; ডাস্টবিন ও ময়লা আর্বজনার ভিতরে না ফেলা। ৩. খাবার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা। বিশুদ্ধ অভমিত হল : খাবার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা ওয়াজিব, কেননা অনেকগুলো সহীহ এবং সুস্পষ্ট হাদিস এ নির্দেশই করে। আর এ নির্দেশের বিপরীত কোন হাদিস নেই। এ মতের বিরুদ্ধে সর্বসম্মত ঐক্যমত্যও সৃষ্টি হয়নি যে, এর প্রকাশ্য অর্থ থেকে বের করে দেবে। আর যে ব্যক্তি পানাহারের সময় বিসমিল্লাহ বলবে না তার পানাহারে শয়তান শরীক হবে। র্অথাৎ পানাহাররর শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা ওয়াজিব। হযরত আমর বিন আবু সালামা থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছেন : হে বৎস! বিসমিল্লাহ বল এবং ডান হাত দিয়ে খাও। আর খাবার পাত্রের যে অংশ তোমার সাথে লাগানো সে অংশ থেকে খাও। অন্য একটি হাদিসে হুযাইফা (রা.) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, শযতান ঐ খাবারকে নিজের জন্য হালাল মনে করে যার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা হয় নি। বান্দা খাবার পাত্রের যেদিকে তার সাথে লাগানো সেদিকে থেকে খাবে। উপরে বর্ণিত উমর বিন আবু সালামা (রা.) -এর হাদীসের কারণে। আর খাবার যদি বিভিন্ন ধরনের হয় তা হলে অন্যদিকে যা তার সাথে লাগোয়া নয়- থেকে খাওয়াতে কোন দোষ নেই। যদি খাবারের কোন লোকমা পড়ে যায় তবে উঠিয়ে খাবে, যদি ময়লা লাগে ধুয়ে ময়লা মুক্ত করে খাবে। কারণ এটইি সুন্নত এবং এর মাধ্যমইে রাসূলুল্লাহর নির্দেশের অনুসরণ করা হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলনে : যদি তোমাদের কারো খাবারের লোকমা পডে যায় তবে তার থেকে ময়লা দূর করবে এবং তা খেয়ে ফেলবে, শয়তানের জন্য রেখে দেবে না। খাবারের প্লেইট পরিস্কার করবে,তার ভিতর যা কিছু থাকবে মুছে খাবে। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আঙুল এবং প্লেইট চেটে খেতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন তোমরা জানো না কোনটায় বরকত রয়েছে কোনটায় নেই। আনাস (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নিদেশে দিয়েছেন যে, আমরা যেন প্লেইট পরিস্কার করে খাই। তিনি বলেনÑ তোমরা জানো না তোমাদের খাবারের কোন অংশে বরকত রয়েছে। বরকত দ্বারা উদ্দশ্যে হল যার দ্বারা উপকার এবং পুষ্টি লাভ হয়। আঙুল ধোয়ার পূর্বে চেটে খাবে কো’ব বিন মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন : আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি, তিনি তিনি আঙুল দিয়ে খাচ্ছেন এবং খাওয়া শেষে আঙুল চেটে খাচ্ছেন। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে মারফু হাদীসে বর্ণিত, যখন তোমরা কেউ খাবার খাবে তার উচিত আঙুল চেটে খাওয়া কেননা সে জানে না কোন আঙুলে বরকত রয়েছে। আলেমগণ বলনে : নির্বোধ-মূর্খ লোকদের আঙুল চেটে খাওয়াকে অপছন্দ করা ও একে অভদ্রতা মনে করাতে কিছু যায় আসে না। তবে হ্যাঁ খাওয়ার মাঝখানে আঙুল চেটে খাওয়া উচিত নয়। কেননা আঙুল আবার ব্যবহার করতে হবে আর আঙুলে লেগে থাকা লালা ও থুতু প্লেটের রয়ে যাওয়া খাবারের সাথে লাগবে আর এটি এক প্রকার অপছন্দনীয়ই বটে। খাবারের প্রশংসা করা মুস্তাহাব, কেননা এর মাধ্যমে খাবার আয়োাজন ও প্রস্তুতকারীর উপর একটা ভাল প্রভাব পড়বে। সাথে সাথে আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কখনো এমন করতেনÑ জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় পরিবারের নিকট তরকারি চাইলেন। তারা বললেন, আমাদের কাছে সিরকা ছাড়া আর কিছু নেই। তিনি সিরকা আনতে বললেন এবং তার দ্বারা খেতে লাগলেন। অতঃপর বললেন, সিরকা কতইনা উত্তম তরকারি; সিরকা কতইনা উত্তম তরকারি। পানি পানকারীর জন্য সুন্নত হল : তিন শ্বাসে পান করা। একটু পান করার পর পাত্র মুখ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে শ্বাস নিবে। অতঃপর দ্বিতীয়বার এরপর একই ভাবে তৃতীয়বার। যেমন আনাস (রা.) -এর হাদীসে এসেছেÑ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পান করার মাঝে তিন বার শ্বাস নিতেন। মুসলিম শরীফের অপর এক বর্ণনায় আছে, তিনি বলতেন : এইভাবে পান করা অধিক পিপাসা নিবারণকারী অধিক নিরাপদ অধিক তৃপ্তিদায়ক। পানাহারের শেষে আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ স্বরূপ তাঁর প্রশংসা করবে। সর্বনিম্ন স্তর হচ্ছে অন্তত আলহামদুলিল্লাহ বলা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : যে ব্যক্তি খাবারের পর আল্লাহর প্রশংসা করে। অনুরূপ পান করার পর আল্লাহর প্রশংসা করে। আল্লাহ সে বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হন। আর যদি হাদীসে বর্ণিত কোন দোআ পড়ে তাহলে তা হবে সর্বোত্তম। যখন অনেক লোকের সাথে বসে পান করবে আর পান করার পর কাউকে দিতে চাইবে তাহলে ডান পাশ্বে বসা ব্যক্তিকে দিবে, সে যদি বয়সে ছোট হয় আর বাম পার্শ্বস্থজন তার থেকে বড়, তবুও। হ্যাঁ, যদি ছোট থেকে অনুমতি নিয়ে বড়কে দেওয়া হয় তাহলে কোন দোষ নেই। আর যদি অনুমতি না দেয় তাহলে তাকেই দিবে কারণ সেই আগে পাওয়ার বেশি অধিকার রাখে।
আর এক হাদীসে আনাস (রা.) বর্ণনা করেন এক মজলিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ডানে ছিলেন এক বেদুঈন সাহাবী এবং বামে আবু বকর আর উমর ছিলেন তাঁর সোজাসুজি। যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পান শেষে করলেন উমর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আবু বকরকে দিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডানে বসা উক্ত বেদুঈনকে দিলেন এবং বললেন : (নিয়ম হচ্ছে) আগে ডান অতঃপর ডান। র্অথাৎ প্রথমে ডান পাশরে জন পাবে অতঃপর তার ডান পাসের জন এবং এভাবেই ।
মুসলিম শরিফের এক বর্ণনায় আছে, তিনি বলেন, ডান দিকের লোক ডান দিকের লোক ডান দিকের লোক। আনাস (রা.) বলেন : এটইি সুন্নত, এটিই সুন্নত, এটিই সুন্নত।
দ্বিতীয়ত : যে বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক :
১। পানাহারে অহেতুক খরচ করা, আল্লাহ তা’আলা বলেনÑ খাও ও পান কর এবং অপব্যয় করো না। তিনি অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না।
২। প্রয়োজন ছাড়া বাম হাতে খাওয়া হারাম। বেশ কিছু হাদীস এর প্রমাণ হিসাবে পেশ করা যেতে পারে। বাম হাতে খাওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞাÑ যেমন জাবের (রা.)-এর হাদীসে মারফুতে এসেছে : তোমরা বাম হাতে খেয়ো না, কেননা শয়তান বাম হাতে খায়। ডান হাতে খাওয়ার ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশেÑ যেমন ইবনে উমর (রা.) কর্তৃক বর্ণিত মারফু হাদীসে এসেছেÑ তোমরা কেউ যখন খাবে ডান হাতে খাবে যখন পান করবে ডান হাতে পান করবে, কেননা শয়তান বাম হাতে খায়। বাম হাতে পান করে। এই ধরনের নির্দেশের অর্থ হল বাম হাতে খাওয়া হারাম।
বাম হাতে খেলে শয়তানের সাথে সাদৃশ্য হয়। যেমন পূর্বের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে এবং অমুসলিমদের সাথেও সাদৃশ্য হয়। আর শরীয়তের নির্দেশ মোতাবেক উভয়টিই নিষিদ্ধ ও হারাম। বাম হাতে খাবার গ্রহনকারী জনৈক ব্যক্তিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বদ দোআ করা এবং এর কারণ বর্ণনা করা যে এটি অহংকারমূলক কাজ। সালামা বিন আকওয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াাসাল্লাম- এর সামনে বাম হাতে খাচ্ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি ডান হাতে খাও। সে বলল আমি পারব না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : আর কখনও পারবেও না। একমাত্র অহংকারই তাকে ডান হাত দিয়ে খাওয়া থেকে বিরত রাখল। বর্ণনাকারী বলেন : এরপর সে আর কখনো মুখের কাছে হাত উঠাতে পারেনি।
৩। দাঁড়িয়ে পানাহার করা মাকরূহ, সুন্নত হল বসে পানাহার কার্য সম্পন্ন করা। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের দাঁড়িয়ে পান করতে নিষেধ করেছেন। কাতাদাহ (রা.) বলেন : আমরা বললাম তাহলে দাঁড়িয়ে খাওয়ার হুকুম কি? আনাস বললেন সেটাতো আরো বেশি খারাপ আরো বেশি দূষণীয়।
৪। কোন কিছুর উপর হেলান দিয়ে আহার করা মাকরূহ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনÑ আমি হেলান দিয়ে আহার করি না। ইবনে হাজার (রহ.) বলেন : খাওয়ার জন্য বসার মোস্তাহাব পদ্ধতি হচ্ছে। দুই হাটু গেড়ে, দুই পায়ের পঠিরে উপর বসা। অথবা ডান পা খাড়া করে বাম পা বিছিয়ে তার উপর বসা।
৫। খাওয়ার পাত্রে ফু দেয়া এবং তার ভিতর নিঃশ্বাস ফেলা মাকরূহ। র্অথাৎ, ইবনে আব্বাস (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাবার পাত্রে ফু দেওয়া বা শ্বাস ফেলতে নিষেধ করেছেন। আবু কাতাদাহ (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন : তোমাদের কেউ যেন প্রস্রাব করার সময় পুরুষাঙ্গ ডান হাত দ্বারা স্পর্শ না করে এবং ডান হাত দ্বারা যেন ইস্তেনজা না করে। অনুরূপ খাবার পাত্রে যেন শ্বাস না ফেলে।
৬। খাবারের দোষ বের করা ও বর্ণনা করা মাকরূহ। বরং আগ্রহ হলে খাবে, মনে না চাইলে দোষ ধরা ব্যতিত বাদ দেবে। আবু হুরাইরা (রা.) বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনও কোন খাবারের দোষ বের ও বলাবলি করেন নি, মনে চাইলে খেতেন। অপছন্দ হলে রেখে দিতেন।
আমরা যদি আমাদের জীবন চলার পথে রাসুল (সা.)-এর সুন্নাতগুলো পূর্ণতার সঙ্গে জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তাহলে আমাদের জীবন হবে সুন্দর থেকে সুন্দরতম। আমাদের শেষ পরিণাম হবে মধুময়। সুখ-শান্তির আভায় ভরপুর। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমনি!

 

শেয়ার করুন
ধর্ম ও জীবন এর আরো সংবাদ
  •   সুস্থতা আল্লাহ তা’আলার মহান নেয়ামত
  • মুমিনের মেরাজ
  • যে আমলে মিলবে জান্নাতের ফল লাভ
  • তাফসিরুল কুরআন
  • মুসলমানদের পারস্পরিক সর্ম্পক ভ্রাতৃত্বের
  • মসনবি শরিফের একটি ঘটনা
  • ইসলামে বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব
  • বাইতুল্লাহর সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর বন্ধন
  • তাফসিরুল কুরআন
  • আরাফাহের খুতবা : মুসলিম জাহানের অনবদ্য দিকনির্দেশনা
  • কোরবানি ও প্রাসঙ্গিক মাসাইল
  • পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারার মর্যাদা
  • তাফসিরুল কুরআন
  • সাবাহি মক্তবের আধুনিক সংস্করণ
  • মুসলিম উম্মাহর একতার নিদর্শন হজ্ব
  • তাফসিরুল কুরআন
  • ন্যায়বিচার একটি ইবাদত
  • সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় : স্নেহ-ভালবাসা
  • মধুর ডাক
  • তাফসিরুল কুরআন
  • Developed by: Sparkle IT