সম্পাদকীয়

শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে চাই সচেতনতা

প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০৪-২০১৯ ইং ০০:০৫:৩৮ | সংবাদটি ৯০ বার পঠিত

আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস পালিত হলো সম্প্রতি বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও। মূলত শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষে দিবসটি প্রতি বছর পালিত হয়। শব্দ দূষণ একটি নীরব ঘাতক। শহর-নগর-বন্দর সর্বত্র মানুষ শব্দ দূষণের শিকার। দিন দিন এর মাত্রা বেড়ে চলেছে। এই শব্দ দূষণে যেমন স্বাভাবিক জনজীবন অতিষ্ট, তেমনি এ থেকে নানা রোগের জন্ম হচ্ছে মানবদেহে। শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন রয়েছে। আইনে শাস্তির বিধানও আছে। কিন্তু সেই আইনের প্রয়োগ নেই। আইনে যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ণ বাজানোর ওপর রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। তারপরও অহরহ বাজানো হচ্ছে তীব্র যন্ত্রণাদায়ক হাইড্রোলিক হর্ণ। ১৯৯৭ সালে প্রণীত আইন অনুযায়ী নীরব এলাকায় দিনে এবং রাতে যথাক্রমে ১৪ ও ৩৫ ডেসিবেল হচ্ছে শব্দের ধার্যকৃত সীমা বা মাত্রা। আবাসিক এলাকায় এর মাত্রা হচ্ছে- যথাক্রমে ৫০ ও ৪০ ডেসিবেল। কিন্তু এই আইন মানছেনা কেউই। অতিরিক্ত শব্দ যে দূষণ হিসেবে গণ্য হয় এবং এটা যে শাস্তিযোগ্য অপরাধ তা-ও জানেন না অনেকে।
বিশেষজ্ঞগণ বলেন, শব্দ দূষণ চোখে দেখা যায় না। তাই এর ক্ষতিকর দিকগুলোও আমরা উপেক্ষা করি। অথচ শব্দ দূষণ মাথার চুল থেকে শুরু করে পায়ের নখ পর্যন্ত শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি করে থাকে। মূলত উচ্চস্বরে মাইক বাজানো, যানবাহনের বিকট হর্ণ, কলকারখানার আওয়াজ, পাথর ভাঙ্গার যন্ত্রের শব্দ, মিক্সার মেশিনের শব্দ ইত্যাদিই শব্দ দূষণের জন্য দায়ী। বাস-ট্রাকসহ লক্কর ঝক্কর মার্ক যানবাহনের ইঞ্জিনের বিকট শব্দ সৃষ্টি করছে শব্দ দূষণ। যেখানে সেখানে যখন তখন মাইকের আওয়াজও শব্দ দূষণের জন্য দায়ী। যানবাহনের চালকেরা উচ্চ স্বরে হর্ণ বাজানোকে রীতিমতো বিলাসিতা হিসেবে মনে করে। অনেক সময় বিনাপ্রয়োজনেই এবং রাস্তায় দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের সামনেই উচ্চস্বরে হর্ণ বাজিয়ে থাকে চালকেরা। ট্রাফিক পুলিশ এতে কিছুই বলছে না। সাধারণ মানুষ পথচারীও মান ইজ্জতের ভয়ে এর প্রতিবাদ করছে না। অথচ যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ণ বাজানো আইনত নিষিদ্ধ। তাছাড়া, রাত দশটার পর উচ্চস্বরে মাইক বাজানোর ওপর কড়াকড়ি রয়েছে। শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন (২০০৬) অনুযায়ী যেকোন অনুষ্ঠানে শব্দের মাত্রা অতিক্রমকারী যে কোন যন্ত্রপাতি দৈনিক পাঁচ ঘন্টার বেশি ব্যবহার করা যাবে না এবং অনুমোদিত সময়সীমা রাত দশটা অতিক্রম করতে পারবে না। মানুষের জন্য শব্দের সহনীয় মাত্রা হচ্ছে ৩৫ থেকে ৫০ ডেসিবেল। কিন্তু প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশে বিভিন্নভাবে শব্দ হচ্ছে সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। সেটা সর্বোচ্চ একশ’ দশ ডেসিবেল পর্যন্তও হচ্ছে। আর এই শব্দ দূষণ থেকে মানবদেহে মারাত্মক রোগ ব্যাধিরও জন্ম হচ্ছে। মানুষের হার্ট, কিডনি এবং মস্তিষ্কের ওপর দারুণ ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করছে উচ্চমাত্রার শব্দ। তাছাড়া, শব্দদূষণের জন্য নগরবাসী বিভিন্ন ধরণের মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। হঠাৎ উচ্চ শব্দ কানের পর্দায় আঘাত হানলে তার প্রভাবে হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় এবং রক্তনালী সংকুচিত হয়ে আস্তে আস্তে চোখের মণি প্রসারিত হয়। পাকস্থলী, খাদ্যনালী ও শরীরে খিচুনীও দেখা দিতে পারে। এতে মানসিক অস্থিরতা এবং ¯œায়ুবিক উত্তেজনাও বাড়ে। ফলে দুর্বলতা, বিরক্তি, ক্রোধ, উদ্বিগ্নতা, হতাশা-উত্তেজনা, অবসাদসহ নানা রোগের জন্ম হচ্ছে। সেই সঙ্গে রয়েছে বদহজম, মেরুদ- ও হাড় বেঁকে যাওয়া এবং শাসকষ্ট বৃদ্ধির আশংকা। এক জরিপে দেখা গেছে, শব্দ দূষণের কারণে পুলিশ বাহিনীর ১০ থেকে ১২ শতাংশ সদস্য শ্রবণজনিত সমস্যায় ভুগছেন। তাছাড়া, মাত্রাতিরিক্ত শব্দ দূষণ শুধুমাত্র মানবজীবনেই নয় জীববৈচিত্র্যের জন্যও ক্ষতিকর।
শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রথমেই দরকার মানুষের সচেতনতা। যারা শব্দ দূষণ সৃষ্টি করছে তাদেরকেই সচেতন হতে হবে সবচেয়ে বেশি। তাছাড়া, এই সংক্রান্ত আইনেরও যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। আইনে রয়েছে মসজিদ, হাসপাতাল বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এলাকায় যানবাহনে হর্ণ বাজানো যাবে না। ইট পাথর ভাঙ্গার মেশিন ব্যবহার আবাসিক ভবন থেকে পাঁচশ মিটার দূরত্ব পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আবাসিক এলাকায় মিক্সার মেশিনসহ নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত অন্যান্য মেশিন সন্ধ্যে সাতটা থেকে সকাল সাতটা পর্যন্ত চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তাছাড়া এই ধরণের নির্মাণ কাজের আগে এলাকার হাসপাতাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আদালতের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু এই আইনের প্রয়োগ নেই। যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্ণ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হলেও এই হর্ণ বিদেশ থেকে ঠিকই আমদানী করা হচ্ছে। ইতোপূর্বে সর্বোচ্চ আদালত এই ধরণের হর্ণ ব্যবহার বন্ধে নির্দেশনা দেন। কিন্তু তার কোনো কিছুই কার্যকর হয় নি। সরকার শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে আদালতের নির্দেশমতে আইনানুগ সবধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলেই আমরা আশাবাদী।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT