পাঁচ মিশালী

সুখ ও ইতিবাচক চিন্তা

সামছুল আবেদীন প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০৪-২০১৯ ইং ০০:০৬:৪৬ | সংবাদটি ১৯৯ বার পঠিত



মানুষের প্রবলতম চাহিদা হচ্ছে সর্বোচ্চ সুখ লাভ করা। তাই সুখের সন্ধানে ঋষি-মনিষীগণ গহীন জঙ্গল থেকে শুরু করে অসীম অন্তরীক্ষ, মহাসাগরীয় অতল গহ্বর পর্যন্ত ছুটে বেড়িয়েছেন। কিন্তু সুখ নামের মহামূল্যবান এই পরশপাথরের অস্তিত্বের সঠিক অবস্থান সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করা সম্ভব হয়নি। কবি, গবেষক, মনোবিজ্ঞানী, দার্শনিক, সাধু-সন্ন্যাসীগণ সুখ নামের মনস্তাত্ত্বিক বস্তুটিকে সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করার জন্য একযোগে কাজ করেছেন। কেউ অর্থ-সম্পত্তি, কেউ পদ-পদবী বা সামাজিক মর্যাদা, কেউ বহু বন্ধু-বান্ধব, কেউ আর্থিক সচ্ছলতা, সামাজিক অবস্থান বা নেতৃত্বে এমনকি কেউ জৈবিক চাহিদা পূরণের মধ্যে সুখের সংজ্ঞা খোঁজে পেয়েছেন। কেউ কেউ উপরোক্ত বিষয়গুলোর মাঝে সমন্বিতভাবে সুখ খোঁজে পেয়েছেন। আবার কেউ এসব বিষয় উপেক্ষা করে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘কপালে সুখ লেখা না থাকলে সে কপাল পাথরে ঠুকেও লাভ নেই। এতে কপাল যথেষ্টই ফুলে কিন্তু ভাগ্য একটুও ফুলে না।’
প্রকৃতপক্ষে, জীবন হচ্ছে আনন্দ ও বেদনার একটা মানদ- মাত্র। মানুষের জীবনে সুখ ও দুঃখ ঠিক সমান সমান; একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া। উদাহরণ স্বরূপ ধরুন, আপনার হাতে দুই গ্লাস পানি আছে। এক গ্লাসে সুপেয় বিশুদ্ধ পানি (সুখ) এবং অপর গ্লাসে তেতো দুর্গন্ধযুক্ত পানি (দুঃখ)। আপনাকে ১ ঘণ্টায় (এক জীবন) উভয় গ্লাসের সবটুকু পানি পান করা হবে। আপনি যদি অল্প অল্প করে উভয় গ্লাসের পানি পান করতে থাকেন তাহলে একই সাথে উভয় গ্লাসের সব পানি শেষ করতে পারবেন। আর যদি কোনো এক গ্লাসের পানি একবারেই শেষ করে ফেলেন তাহলে বাকি এক গ্লাস পানি পুরো সময়ে পান করতে হবে।
একজন মানুষের জীবনও সুখে-দুঃখে গড়া ঠিক দুই গ্লাস (মিষ্টি ও তেতো) পানির মতো। আপনি যদি জীবনের সূচনালগ্নে সুখ ভোগ করে থাকেন, বাকি জীবন নিশ্চয়ই কষ্টের (বিষয়টা স্বাভাবিক ধরে নিন) তেতো স্বাদে কাটাতে হবে। আর যদি আপনার প্রাথমিক জীবন কষ্টে কাটে তাহলে বাকি জীবন অনাবিল সুখে-শান্তিতে কাটাতে পারবেন-এতে অন্তত মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি আস্থাশীল হতে পারেন। যদি জীবনটা কিছু সুখ আর কিছু দুঃখের মিশ্রণে সামঞ্জস্যতা বজায় রেখে চলতে থাকে তাহলে আপনি জীবনকে অনেক বেশী উপভোগ্য মনে করবেন। এটা নিশ্চিত।
আব্রাহাম লিংকন বলেছেন, ‘মানুষ যতটা সুখী হতে চায়, সে ততটাই সুখী হতে পারে। ইচ্ছে করলেই আমরা সুখকে আকাশ অভিসারী করে তুলতে পারি।’ সুখ একটি মানবিক কেন্দ্রীয় অনুভূতির নাম। সুখ মানুষের মনের একটি অবস্থা বা অনুভূতির মাধ্যমে প্রকাশ পায় যা ভালোবাসা, তৃপ্তি, আনন্দ বা উচ্ছ্বাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। জৈবিক, মানসিক, মনস্তাত্ত্বিক, দর্শনভিত্তিক এবং ধর্মীয় দিক থেকে সুখের সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং এর উৎস নির্ণয়ের প্রচেষ্টা সাধিত হয়েছে। মোটকথা, সঠিকভাবে সুখ পরিমাপ করা অত্যন্ত দুরূহ, কষ্টসাধ্য ও অনির্ণেয় গবেষণার বিষয়। তবে নিজেকে সুখী মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষে কিছু চিন্তাশীল পদক্ষেপ নিতে পারেন। কারণ, মানুষ তার চিন্তাশক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
তাহলে আমরা কীভাবে সুখী হতে পারি!
প্রথমেই আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে যে, আপনি একজন সুখী মানুষ, নিজের প্রতি আস্থাভাজন হোন এবং প্রগাঢ় মনোবল বাড়ান। এবং আপনাকে এটা জোর করে হলেও মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতে হবে যে, সক্ষমতার মধ্যে আপনি সবকিছু করতে পারেন, কিন্তু তা থেকে বেছে শুধু নিজের প্রয়োজনীয়টাই আপনি করে যাচ্ছেন। এজন্য আপনি অপরাপর আপনার চেয়ে কম ধনী (সুখী) মানুষের সান্নিধ্যে আসতে পারেন এবং নিজের সাথে তুলনা করতে পারেন। তাদের সাথে মনখোলা কথা বলুন, করমর্দন করুন, খোঁজ খবর নিন। দেখবেন, তাদের চেয়ে নিজেকে সুখী মনে হচ্ছে এবং আপনি আত্মতুষ্টি অনুভব করছেন। এক্ষেত্রে আপনার অবস্থানের চেয়ে নিচের সারির; এমনকি হত দরিদ্র লোকদের সাথে মিশতে পারেন।
জীবন থেকে সব নেতিবাচক চিন্তা বাদ দিন। কারণ আপনার সুনির্দিষ্ট চিন্তা ও যথাযথ কাজ আপনাকে লক্ষে পৌঁছে দিবে। আপনি যেখানে সফল নয় সেখানে অন্যেরা সফল হবে, আর অন্যেরা যেখানে সফল নয় সেখানে আপনি সফল হবেন, এটা মাথায় রাখুন। ভেবে দেখুন, মাইকেল ফ্যারাডে প্রমাণ করেন যে, ‘চুম্বকত্ব আলোক রশ্মিকে প্রভাবিত করে’ এবং এটাকে কাজে লাগিয়ে টমাস আলভা এডিসন ‘বৈদ্যুতিক বাতি’ আবিষ্কার করেন। অথচ বস্তুর ব্যবহার এক কিন্তু আবিষ্কারের ক্ষেত্র ভিন্ন।
বিভিন্নরকম সামাজিক কর্মকান্ডে অংশ নিতে পারেন। দান-খয়রাত করলে মন প্রফুল্ল থাকে, আত্মার পরিশুদ্ধি ঘটে, হৃদয় প্রশস্থ হয় এবং সমাজে আপনার সম্পর্কে ইতিবাচক একটা ধারণা সৃষ্টি হয়। ফলে ভালোলাগার বিষয়টুকু অন্তঃপুরে সুখের বাঞ্ছা তৈরি হয়।
মানুষের সাথে মাঝে মধ্যে রসিকতা করুন, প্রাণ খুলে হাসুন, খেলাধুলা করুন, একটু ঘুরতে যান। মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে আড্ডার সময় খাওয়াতেও পারেন। এককথায়, একাকী থাকবেন না, সঙ্গীপ্রিয় হোন। এভাবে প্রতিটা মুহূর্ত কেটে যাবে কিন্তু আপনি টেরই পাবেন না।
মানুষকে সহযোগিতা করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। তবে ক্ষেত্রবিশেষে আগ বাড়িয়ে নয়। এসময় ‘বিনিময়’ চিন্তাটা মাথা থেকে বাদ দিতে হবে। ‘কেন দিলাম’ এই ধরণের ভাবনা থাকলে কাউকে ঋণ না দেওয়াই উত্তম। এতে করে নিজে মানসিক দুশ্চিন্তায় ভুগবেন আর অন্যেরও কাজটা সিদ্ধিলাভ করতে সমস্যা হতেও পারে। যদি মনে করেন টাকাটা আপনার খুব প্রয়োজন, এখন সহায়তা করলে আপনি সমস্যায় পড়ে যাবেন, তাহলে এ পর্যায়ে বিকল্প উপায়ে তাকে সহযোগিতা করতে পারেন।
মনে রাখবেন, সমাজের সব মানুষ আপনার শুভাকাক্সক্ষী হবে না। কিছু মানুষ আপনাকে আঁড় চোখে দেখবে, আপনার কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের পাঁয়তারা করবে, কেউ আপনাকে এড়িয়েও চলবে। আপনিও তাদেরকে সোজা এড়িয়ে চলুন এবং তাদের থেকে সতর্ক থাকতে ভুল করবেন না। কারণ, সে সময় ও সুযোগ বুঝে আপনার ক্ষতি করে ফেলতে পারে
সৃষ্টিকর্তার পর বাবা-মা ছাড়া আর কারোরই উপর শতভাগ বিশ্বাস রাখবেন না। অন্যের উপর ৭০%-৮০% বিশ্বাস করতে পারেন, তবে ২০%-৩০% হাতে রেখে দিবেন এই জন্য যে, ঘটনা বিপক্ষেও আসতে পারে। কারণ, যেকোনো কাজে ইতিবাচক ফলাফলের সাথে নেতিবাচক ফলাফলও আসতে পারে এ ধরণের মানসিকতা তৈরি করতে হবে। যাতে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন না হলে আপনি মনোবল শক্ত রাখতে পারেন।
সমাজে চলতে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই মতের অমিল হতে পারে। কারো সাথে এধরণের সমস্যা হলে বুকের মধ্যে কথা চেপে না রেখে আপনার ক্ষোভের কারণ প্রকাশ করে ফেলুন এবং সেই সাথে ঘটনার মীমাংসা সাপেক্ষে সব অভিযোগ-অনুযোগ মন থেকে মুছে ফেলুন এবং হাসুন। অন্যথায় এটা আপনার বাকি সব কাজের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করবে। যেকোনো কাজ শুরু করার আগে মনে মনে এর পক্ষে-বিপক্ষে মানসিক প্রস্তুতিও নিয়ে রাখুন।
আপনার প্রতিদিনের অর্পিত দায়িত্ব নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে সেরে ফেলুন। কাজ জমিয়ে রাখলে এটা আপনাকে মানসিক চাপ প্রয়োগ করতে থাকবে। সমালোচনা কানে নেবেন না।
প্রকৃতির পারিপার্শ্বিক দিক বিবেচনায় আপনারও কিছু মানুষকে অপছন্দ হতে পারে। যে মানুষগুলোকে আপনার একদম পছন্দ হয় না তাদেরকে নির্বাচন করুন, প্রথমেই তাদেরকে আপনার তালিকা থেকে বাদ দিন এবং যথাসম্ভব তাদেরকে এড়িয়ে চলুন।
ঋণ করার প্রবণতা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন। কারণ, ঋণ মানুষকে সমাজে কুক্ষিগত করে রাখে। ঋণ প্রবণতা এতই খারাপ যে, এটা আপনার শুধু স্বাস্থ্যহানীর কারণই নয়, আপনাকে মানসিক বিকৃত করে তোলে। এ সম্পর্কে উইলিয়াম শেকসপিয়ার বলেছেন, ‘আমি সবসময় নিজেকে সুখী ভাবি, কারণ আমি কারো কাছে কোন কিছু প্রত্যাশা করি না। কারো কাছে প্রত্যাশা করা দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়’ যদি ঋণ করেই ফেলেন তাহলে ঋণদাতার কাছ থেকে যথেষ্ট সময় চেয়ে নিবেন, যাতে নির্ধারিত সময়ের পূর্বে ঋণ পরিশোধ করতে পারেন।
মূলকথা হলো, দৈনন্দিন চলার পথে আমাদেরকে একনিষ্ঠভাবে সৎ ও নিষ্ঠাবান হতে হবে। ভালোমন্দ যাচাই-বাছাই করে সুন্দর ও নির্মল কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা সুখী হতে পারি। এ সম্পর্কে ফরাসি দার্শনিক ও মনোবিজ্ঞানী আবু নসর আল ফারাবি বলেন ‘বৃক্ষের সার্থকতা যেমন ফল ধারণে, সেইরকম নৈতিক গুণাবলির সার্থকতা শান্তি লাভে। চরম ও পরম শান্তি লাভের পথ হচ্ছে ক্রমাগত সৎ জীবনযাপন করা।’
অর্থ-প্রতিপত্তি একজন মানুষকে আয়েশ দিতে পারে, খায়েশ মিটাতে পারে, কিন্তু সুখ পেতে হলে তাকে আত্মোপলব্ধি করা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। তাকে আগে মানতে হবে যে সে সুখী, তবেই সে সুখ নামের সোনার হরিণের সন্ধান লাভ করতে সক্ষম হবে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT