পাঁচ মিশালী

পণতীর্থে গঙ্গা স্নান ও কিছু অভিজ্ঞতা

অপর্ণা গুণ সেবা প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০৪-২০১৯ ইং ০০:০৭:১৭ | সংবাদটি ১৩৪ বার পঠিত

ছোটবেলা থেকেই জেনে এসেছি সুনামগঞ্জ থেকে তাহিরপুর উপজেলার লাউড়েরগড় তথা পণতীর্থ পর্যন্ত কোন রাস্তা নেই। ২৫-৩০ বছর পূর্বে শুনতাম মানুষ ২-৩ দিন আগে থেকে শুকনা খাবার নিয়ে রওয়ানা দিত পুণ্য গঙ্গা¯œানের উদ্দেশ্যে। ১২-১৪ বছর পূর্বে দেখেছি মানুষ মোটর সাইকেল বা রিকশা যোগে কিছুটা পথ পাড়ি দিতেন। ৩ বছর থেকে শুনছি সরাসরি গঙ্গা ¯œানের জায়গা পর্যন্ত গাড়ী যায়। স্থানীয় কিছু সহকর্মীদের কথা শুনে এবার ২ এপ্রিল মঙ্গলবার আমি ও আমার স্বামী এডভোকেট মৃত্যুঞ্জয় ধর ভোলা, ভাই-বোনসহ পরিবারের প্রায় ১৫ জন গঙ্গা ¯œানের উদ্দেশ্যে সকাল প্রায় ৮টায় যাত্রা করি। ১০টায় সুনামগঞ্জ শহরে পৌঁছার আগেই দেখা গেল কয়েকশ’ বাসসহ হাজার হাজার প্রাইভেট গাড়ী দাঁড়ানো। জ্বালানী নেয়ার জন্য শ’শ’ গাড়ী পেট্রোল পাম্পের সামনে লাইনে।
সুনামগঞ্জ শহরের আব্দুজ জহুর সেতুর প্রবেশ পথে ৪-৫শ’ মোটর সাইকেল যাত্রী পরিবহনের জন্য অপেক্ষায়। সুনামগঞ্জ ছেড়ে তাহিরপুরের রাস্তায় উঠার ২৫ মিনিটের মধ্যেই গাড়ী জ্যামের মধ্যে থেমে গেল। আনুমানিক সকাল ১১টায় শুনা গেল একটি ব্রীজ ভেঙ্গে গেছে, এর জন্য গাড়ী ধীরে ধীরে যাচ্ছে। বিকাল প্রায় ৩টায় ভাঙ্গা ব্রীজটি আমরা অতিক্রম করলাম। কিন্তু এই ৪ ঘন্টা অতিক্রম করার জন্য দূরত্ব ছিল মাত্র ৩ কিলোমিটার। ভাঙ্গা ব্রীজটি অতিক্রম করার সময় এখানে কোন প্রশাসনের লোক যেমন পুলিশ, র‌্যাব, আনসার অর্থাৎ আইন শৃংখলার দায়িত্বে নিয়োজিত কোন ইউনিফর্মধারীর সন্ধান পেলাম না। স্থাানীয় কয়েকজন মুরব্বী ও যুবক ছেলেরা গাড়ীগুলো পার করে দিতে সাহায্য করছিল। আরো প্রায় ১ ঘন্টায় ৫-৬ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করে হাঁটতে শুরু করলাম, কারণ যতটুকু দেখা যাচ্ছে, কোন গাড়ীতে যাত্রী নেই। সবাই হাঁটতে শুরু করেছেন। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় গাড়ী রেখে নেমে পড়েছেন জমিনে। প্রায় ৫-৬ কিলোমিটার হেঁটে ৫টার দিকে কাংখিত স্থানে পৌঁছলাম। প্রকৃতির কাজ তো প্রকৃতি করবেই। হাঁটার সময় দেখা যাচ্ছে, ঝড় বৃষ্টির পূর্বাভাস। আমরা যাদুকাটা নদীর তীরে পৌঁছামাত্রই শুরু হলো প্রকৃতির তান্ডব। একটি শ্যাডের নিচে দাঁড়ালাম। সেখানে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি লোক।
যা-ই হোক অবশেষে গঙ্গা¯œান করা হলো। একটি শ্যাডের বাইরে লেখা দেখলাম ‘এখানে শুধু মহিলাদের কাপড় পরিবর্তনের জায়গা।’ এই লেখাটি দেখে আমরা মহিলারা কাপড় পরিবর্তনের জন্য গেলাম। ভিতরে গিয়ে দেখি মহিলাদের চেয়ে পুরুষের সংখ্যাই বেশি। আমি কাউকে উদ্দেশ্য করে নয়, এমনিই বললাম- লেখা আছে শুধু মহিলাদের জন্য কিন্তু ভেতরে দেখি পুরুষই বেশি। অনেকেই বললেন-এছাড়া কোন উপায় নেই, বৃষ্টির মধ্যে কোথায় গিয়ে কাপড় বদলাবো। তারপর মন্দিরে প্রণাম করে কিছু খাবার উদ্দেশ্যে-যখন এদিক ওদিক ঘুরছি কোথাও কোন খাবারের স্টল দেখা যাচ্ছে না। অনেক খোঁজাখুজির পর একটি স্টল পাওয়া গেল। সেখানে চেয়ার আছে ২০টি কিন্তু খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়ানো আছেন প্রায় ৪ শতাধিক অভুক্ত পুণ্যার্থী। সামান্য ভাত, ডাল ও সবজি, ১ থালা ১০০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। জানিনা হাজার হাজার অভুক্ত মানুষের কি অবস্থা হয়েছিল সেদিন।
প্রথমে ভেবেছিলাম এত প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ হয়তো নেই। কিন্তু পরে দেখলাম বিদ্যুৎ আছে। তবে প্রতি ঘন্টায় আলো জ্বলছে প্রায় ২০ মিনিট, আর অন্ধকার থাকছে ৪০ মিনিট। মোবাইলে কোনভাবেই নেট পাওয়া যাচ্ছে না। একসাথে হাজার হাজার মোবাইল ব্যবহার করা হচ্ছে কিন্তু টাওয়ারের সক্ষমতা তো সীমিত। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কোন অস্থায়ী টয়লেটের ব্যবস্থা পেলাম না। টয়লেট না থাকায় মানুষ যেখানে সেখানে প্রাকৃতিক কাজ সারতে বাধ্য হচ্ছে কিন্তু নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও চোখে পড়লো না। খাবার পানির কোন ব্যবস্থা তো দেখা গেলই না বরং কোন কোন স্টলে ১ লিটার পানি বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়।
সন্ধ্যা ৭টা থেকে শুরু হলো অপেক্ষার পালা। জ্যামে আটকা গাড়ী কখন আসবে জ্যাম পেরিয়ে আর কখন গাড়ীতে উঠব। অবশেষে রাত সাড়ে ১০টায় গাড়ীতে উঠে বসলাম। সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হলো। ঐ স্থান থেকে সুনামগঞ্জের দূরত্ব মাত্র ৩০ কিলোমিটার কিন্তু আমাদের পৌঁছতে সময় লেগেছিল ৮ ঘন্টা। রাস্তায় কয়েক জায়গায় চোখে পড়লো গাড়ীর মধ্যে অসুস্থ্য মানুষ, সঙ্গীরা সুস্থ্য করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। এখানকার মটর সাইকেল চালকদের দুর্দান্ত সাহস চোখে পড়ার মতো। খাড়া রাস্তার উপর থেকে নেমে যাচ্ছে অনায়াসে নিচের জমিনের মধ্যে। পিছনে বসা যাত্রী ঠিক আছে না ফেলেই চলে যাচ্ছে সেদিকে খেয়াল নেই। কারণ, যত কম সময়ে যাওয়া যাবে, তত বেশি যাত্রী পরিবহন করা যাবে।
পরদিন সকাল ১০টায় বাসায় এসে মোবাইলটি অন করার সাথে সাথেই দুঃসংবাদটি পেলাম। আমাদের প্রিয় ভাই কুমার গণেশ পালের মৃত্যু সংবাদ। স্বর্গীয় কুমার গণেশ পাল একজন সমাজকর্মী। সেখানকার অব্যবস্থাপনা কিছুটা লাঘব করার জন্য নিজেই নেমে পড়েছিলেন শৃংখলা আনার জন্য। বিধাতার কি নির্মম পরিহাস ভুক্তভোগী হাজার হাজার মানুষকে সামান্য সেবা দিতে গিয়ে তিনি নিজেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। পরম করুণাময়ের নিকট প্রার্থনা যে, স্বর্গীয় কুমার গণেশ পাল যেন তার সাধনোচিত ধামেই অবস্থান করেন এবং তার পরিবারবর্গকে এই শোক কাটিয়ে উঠার শক্তি প্রদান করেন।
পণতীর্থের এইসব অব্যবস্থাপনার মধ্যে বারবার চোখের সামনে ভেসে আসছিল ২০১৭ সালে দেখা পুণ্যধাম পুরীতীর্থে শ্রী শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রায় আগত লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর মধ্যে কিভাবে সেবা দিচ্ছেন স্থানীয় মানুষ, স্থানীয় প্রশাসন, জননেতা, বিভিন্ন সংগঠন। রথযাত্রা সুশৃংখলভাবে সম্পন্ন করার জন্য ১২ ঘন্টা আগে বন্ধ করে দেয়া হয় সব রাস্তা ও যানবাহন চলাচল। প্রায় ৫ কিলোমিটার পথ হেঁটে আসতে হয় সবাইকে। রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রী থেকে সাধারণ মানুষ সবাই প্রায় হেঁটে রথযাত্রার স্থানে আসেন। রাস্তায় আছে শুধু এম্বুল্যান্স, অক্ষম লোকের জন্য হাতেটানা ট্রলি, অতিরিক্ত গরমে ঘর্মাক্ত মানুষের উপর স্প্রে করে দেয়ার জন্য ফায়ার সার্ভিসের পানির গাড়ী। আমরা যে হোটেলে ছিলাম সেখান থেকে শ্রী শ্রী জগন্নাথ মন্দিরের দূরত্ব ছিল প্রায় ১ কিলোমিটার। এটুকু পথ হেঁটে যাওয়ার সময় চোখে পড়ে সেখানকার মানুষের সেবা তৎপরতা। সারি বেঁধে মানুষ বসে আছে পুণ্যার্থীদের সেবা প্রদানের জন্য। ড্রাম ভর্তি বিশুদ্ধ পানি নিয়ে বসে আছে, গ্লাসে করে পানি দিচ্ছেন যাত্রীদের। কেউ কেউ শরবতের গ্লাস হাতে তুলে দিচ্ছেন, কেউ তরমুজ বা আনারসের টুকরো তুলে দিচ্ছেন হাতে, কেউবা খিচুড়ী বা ডাল ভাতের থালা তুলে দিচ্ছেন দর্শনার্থীর হাতে। এসব কিছু সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তুলে দেয়া হচ্ছে হাতে হাতে। পূরীতীর্থে লক্ষ লক্ষ মানুষের সেবা আর পণতীর্থের মানুষের ভোগান্তি-এটা ভাবতেই অবাক লাগে।
আমাদের দেশে তুরাগ নদীর তীরে প্রতি বছর বিশ্ব ইজতেমা হয়। দেশী বিদেশী লক্ষ লক্ষ মুসল্লীর পদচারণায় মুখরিত হয় তুরাগ প্রাঙ্গন। বিশ্ব ইজতেমা সুন্দর ও সুশৃংখল করার জন্য সব শ্রেণীর মানুষের কী আপ্রাণ চেষ্টা। তুরাগ তীরে বসানো হয় অতিরিক্ত মোবাইল টাওয়ার, পুলিশ, র‌্যাব এর সার্বক্ষণিক টহলের ব্যবস্থা। সিটি কর্পোরেশন সাময়িক টয়লেট নির্মাণ করে, নির্মাণ করে ভ্রাম্যমাণ ব্রীজসহ যোগাযোগ ব্যবস্থা। আবর্জনা নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকে, পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ থাকে। বিদ্যুতের অতিরিক্ত ট্রান্সমিটার বসানো হয়। সর্বোপরি থাকে খাবার সুব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে বিশ্ব ইজতেমা কর্তৃপক্ষের কি অক্লান্ত চেষ্টা! সেখানে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকারী, বেসরকারী ও স্থানীয় প্রশাসনের এই অক্লান্ত চেষ্টা পণতীর্থের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে।
অবশেষে আমরা যারা সাধারণ পুণ্যার্থী, আমরা অনুরোধ করবো পণতীর্থে গঙ্গা¯œানের সাথে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীবৃন্দ, এলাকাবাসী, এমনকি সমস্ত দেশের হিন্দু সম্প্রদায়কে যারা নেতৃত্ব দেন, যেমন-ইসকন মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন, সৎ সঙ্গ আশ্রম। এছাড়াও বাংলাদেশের হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ পুজা উদযাপন পরিষদ আপনাদের সবার ঐকান্তিক পরিশ্রমে পণতীর্থ হতে পারে একটি আন্তর্জাতিক তীর্থক্ষেত্র। এই ‘মহাবারুনী’ তিথিটি এবং পুণ্য গঙ্গা¯œানের দিনটি কিভাবে সবার নিকট আনন্দঘন ও আকর্ষণীয় হয় সেই ব্যবস্থা করতে হবে। যে বিষয়গুলো মাথায় রেখে কাজ করলে জনসাধারণের ভোগান্তি কিছুটা কম হবে সেগুলো হলো-
বিদ্যুতের অতিরিক্ত ট্রান্সমিটার স্থাপন করে সার্বক্ষণিক বিদ্যুতের ব্যবস্থা রাখা, সাময়িক টয়লেটের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা, মহিলা, পুরুষ ও শিশুদের কাপড় পরিবর্তনের পর্যাপ্ত স্থানের ব্যবস্থা, সাময়িক মোবাইল টাওয়ার বসানো, অভিজ্ঞ ডাক্তার দ্বারা সাময়িক চিকিৎসা ব্যবস্থা, প্রশাসনের সার্বক্ষণিক টহলের ব্যবস্থা, গাড়ী পার্কিং-এর ব্যবস্থা। পরম করুণাময়ের অশেষ কৃপায় যারা পণতীর্থের সাথে সংশ্লিষ্ট আপনারা খুবই ভাগ্যবান। সংশ্লিষ্ট সবার নিকট অনুরোধ করছি, আমরা সাধারণ মানুষের উপরোক্ত সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে পণতীর্থের যাত্রীদের যাত্রা সুখময় ও মধুময় করে তুলবেন।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT