পাঁচ মিশালী

টেংরাটিলা: সম্ভাবনাময় পর্যটন ও শিল্প এলাকা

মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০৪-২০১৯ ইং ০০:০৮:৪২ | সংবাদটি ১৭১ বার পঠিত

টিলা আর হাওর-বাঁওড় বেষ্টিত প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর দোয়ারাবাজার উপজেলার টেংরাটিলা দেশের বৃহত্তর পর্যটন ও শিল্প এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক সুবিধাজনক অবস্থানের কারণে উপজেলার টেংরাটিলা এমনিতেই পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলার মতো এক অতুলনীয় এলাকা। ২০০৫ সালে কানাডিয়ান কোম্পানী টেংরাটিলায় গ্যাস ক্ষেত্রটি পুনঃ খননের সময় দুই দফা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে রিজার্ভ গ্যাসের বড় ধরণের ক্ষয়ক্ষতি সহ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এখানকার জনজীবন। এর পর থেকে এখানে প্রচুর পরিমাণ রিজার্ভ গ্যাস ও তৈল জাতীয় পদার্থ বিদ্যামান থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক মামলাজনিত কারণে বর্তমানে গ্যাস ক্ষেত্রটি সম্পূর্ণভাবে অঘোষিত পরিত্যাক্ত রয়েছে। এই অচলাবস্থার ফলে অযতœ-অবহেলায় বিনষ্ট হতে যাচ্ছে গ্যাস ফিল্ডের মূল্যবান মেশিনারী, যন্ত্রাংশ ও জিনিসপত্র। দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস উত্তোলন বন্ধ থাকায় দেশের জাতীয় সম্পদ টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ডটি এখন ধ্বংসের মুখে রয়েছে। সরকারি উদ্যোগে নাইকো কর্তৃক পুনরায় গ্যাস ক্ষেত্রটি চালু করতে পারলে ওই এলাকা দেশের বৃহত্তর পর্যটন ও শিল্প এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ মহল।
প্রাকৃতিক মনোমুগ্ধকর অবস্থানের কারণে টেংরাটিলা দেশের অনন্য পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিচিত। কেননা দোয়ারাবাজার উপজেলার উত্তর দিকে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের সুউঁচ্চ মেঘালয়-খাসিয়া পাহাড়। প্রকৃতির লীলাভূমি হিসেবে খ্যাত ভারতের চেরাপুঞ্জির পাদদেশে অবস্থিত টেংরাটিলা। মেঘালয় থেকে নেমে আসা ছোট-বড় অনেক নদ-নদী বিস্তৃত টেংরাটিলার চারিদিকে যেন সবুজের হাতছানি। উত্তরে দাঁড়িয়ে থাকা কালো পাহাড়, বাংলাদেশের সীমানায় সমতল ভূমিতে হাওর-বাঁওড় নদীর জলরাশির মনোমুগ্ধকর দৃশ্য যেন পর্যটকদের মন ছুঁয়ে যায়। এখানে টিলার উপর দাঁড়িয়ে বর্ষায় হাওরের উত্তাল তরঙ্গ দেখলে মনে হবে সাগরের অবতারণা । আর শুষ্ক মৌসুমে টেংরাটিলা সম্ভাবনাময়ী পর্যটন এলাকায় পড়ন্ত বিকেলে হাওর কিংবা ছোট-বড় টিলায় বসে মধুময় সময়টি কাটবে গভীর আনন্দে।
টেংরাটিলা গ্যাস ফিল্ড এলাকা ছাড়াও উপজেলার ব্রিটিশ ট্রামরোড, পান্ডারখাল বাঁধ, বাঁশতলা, হকনগর শহিদ স্মৃতিসৌধ, আদিবাসী পাহাড়, মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের সমাধি পর্যটনের সম্ভাবনাময়ী অনন্য এলাকা। বিশেষ করে টেংরাটিলায় আগন্তুক পর্যটকদের নজর কাড়ে গ্যাস ফিল্ড ও দৃষ্টিনন্দন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি শহিদ স্মারক ও ‘স্মৃতি দীপ্তিমান’। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের অসামান্য কীর্তি স্মরণীয় করে রাখতে নির্মিত দুটি স্মৃতিফলক যেন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
অন্য দিকে উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষা বাংলাবাজার ইউনিয়নের কলাউড়া গ্রাম পেরুলেই আকাশের সঙ্গে পাহাড়ের মিলনমেলা চোখে পড়ে। বাঁশতলা-হকনগরে রয়েছে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালীন শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ১১টি সেক্টরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ৫নং সেক্টরের হেডকোয়ার্টার বাঁশতলা-হকনগর। ভারত থেকে নেমে আসা চিলাই নদীর ওপর নির্মিত মনোরম স্লুইচ গেট, তিনদিকে মেঘালয় পাহাড়ে ঘেরা বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ, পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি ¯্রােতস্বিনী নদীর কলতান আর পাখির কলরবে মুখরিত হয়ে ওঠে সমগ্র এলাকা।
টেংরাটিলা বিশ^ পরিচিতি পাওয়া এক ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর, শিক্ষা-দীক্ষায় অগ্রসরমান ওই এলাকাটি প্রকৃতির অপরূপ দান। সুরমা নদী ও কনছখাই হাওর ঘেঁষে সুউঁচ্চ টিলায় গ্যাস ক্ষেত্র এবং আশপাশে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছোট-বড় টিলা থাকায় সঙ্গত কারণে দেশের সম্ভাবনাময়ী পর্যটন ও শিল্প এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এখানে গ্যাস ক্ষেত্র এবং নয়নাভিরাম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আগে থেকেই একটি পর্যটন এলাকা হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিচিতি রয়েছে। অন্তত ১৫ বা ২০টি ছোট বড় টিলা রয়েছে যেখানে পর্যটন রিসোট প্রতিষ্ঠা সহ পরিকল্পিত ফলদ ও বনজ বৃক্ষের বাগান করা যাবে। সরকারি উদ্যোগে এই অঞ্চলে শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠা সহ নিজস্ব বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব।
এই এলাকায় টিলার ফাঁকে ফাঁকে প্রায় ৩ সহ¯্রাধিক মৎস্য খামার রয়েছে। যেখান থেকে স্থানীয়রা প্রতি বছর লাখ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করে থাকেন। এখানকার ফিসারী খাদ্যের চাহিদা মেটাচ্ছে ক্ষুদ্র পোলট্রি শিল্প। সরকারীভাবে পরিকল্পিত উদ্যোগ ও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে টেংরাটিলায় ‘ফিস প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি’ গড়ে তোলা যাবে।
টেংরাটিলা প্রাকৃতিকভাবে খনিজ সম্পদে ভরপুর একটি অঞ্চল। এখানে বিসিক শিল্প এলাকা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি, গ্যাস, নদীপথ, সড়ক যোগাযোগ ও আকাশ পথের সুবিধা রয়েছে। উপজেলার একমাত্র হেলিপ্যাড রয়েছে টেংরাটিলায়। সুনামগঞ্জ জেলার এই এলাকায় শিক্ষা-দীক্ষার হার সন্তোষজনক। চারিদিকে ছোট-বড় টিলা, হাওর, নদী বেষ্টিত টেংরাটিলা ও আশপাশের এলাকাজুড়ে ব্যাপকভাবে মাছ চাষসহ কৃষি ফসল উৎপাদন হয়ে থাকে। পাহাড়ী নদী খাসিয়মারা ও চিলাই নদীর উপর রাবারড্যাম প্রকল্প স্থাপন করে হাজার হাজার হেক্টর জমি চাষাবাদের আওতায় এসেছে। এছাড়া কৃষি পণ্যের জন্য সুখ্যাতি রয়েছে টেংরাটিলা এলাকার।
এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস মওজুদ রয়েছে। যা দিয়ে বর্তমান সরকারের সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা অনুযায়ী সর্ববৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন সম্ভব। সুরমা নদীর তীর ঘেঁষে প্রায় ১৭ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কাংলার হাওর ও কনছখাই হাওর বিস্তীর্ণ থাকায় বিসিক শিল্প এলাকা প্রতিষ্ঠা করা যাবে।
টেংরাটিলা গ্রামের প্রকৌশলী আব্দুল হালিম বীরপ্রতীক বলেন, টেংরাটিলায় মাটির নীচে মজুদ গ্যাসের পাশাপাশি প্রচুর ‘ক্রোডওয়েল’ বা তেলের মেটেরিয়েল রিজার্ভ রয়েছে। এখানকার পাহাড়ী নদীগুলোতে নুড়িপাথর, বালি, সিলিকা বালির প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। যা দিয়ে দেশের বৃহৎ শিল্প কারখানা গড়ে তোলা যাবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT