সাহিত্য

তৃষিত প্রহর

আনোয়ার হোসেন মিছবাহ প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-০৪-২০১৯ ইং ০০:১৫:৫৬ | সংবাদটি ২৫৮ বার পঠিত

শরীর গিলে খাওয়া অকাতর চোখগুলো দেখার সময় হয়ে ওঠেনি প্রদীপের। পড়ার টেবিলে সময় ব্যয় করা ছাড়া সে রকম সময় খুঁজে পাওয়া ভার। প্রতিদিন রুটিন করে পড়ানোই তার পেশা। নতুবা দরোজার ওপাশের চোখগুলো দেখাটাও তার পেশা কিংবা নেশা হতো। আজও সে আঁড় চোখে সেই চোখগুলো দেখে। প্রথম দিনের মতো আজও দুটি চোখ সরে যায়। চোখের ওপর চোখগুলো আজও দাঁড়াতে চায় না। পড়লেই সরে যায়। এভাবে প্রতিদিন সরে গেলেও তেমন আগ্রহী হয়ে ওঠেনি তার মন। মনে হতো চোখগুলো হয়তো কোন ¯েœহময়ীর পাহারাদারি চোখ। স্থির দাঁড়িয়ে থাকে আবার প্রশ্রয় দিলে সরে যায়। আজ ফিক করা হাসিতে তার বোধনে দ্যুতি খেলে- না, এ চোখ কোন ¯েœহময়ীর নয়। এচোখ পাথর সেঁচে জল তোলা চোখ। এ চোখ চাওয়ার লাগামে প্রশ্রয় দেওয়া চোখ। খুব করে তাকালে সরে যায় আবার আঁড় চোখে তাকালে দরোজার ফাঁক গলে অভিমানের সলমা ঝরে।
এ রকম করে দিন যায়। দিন আসে। লটকে থাকে মনের বাতায়ন। চোখ পাঠে খানিক প্রশ্রয়ী হয়ে ওঠে সে। উসখুস করে কামনার বারিধারা।
একদিন খসখস করে চলছিলো অংকের খাতা। অন্যদিকে জল তেষ্টায় তৃষিত মৌরি জলপানের অনুমতি চাইলে পানের ইচ্ছায় সম্মতি দিলে চলে যায় মৌরি। এদিকে মৌরি যেতে না যেতেই একটি ভাঁজ করা কাগজ এসে পড়ে প্রদীপের টেবিলে। প্রদীপের পানে ছোটে আসা কাগজটি হাতে নেয় সে। এবার ভাঁজ খুলে দেখতে পায় একটি দুরভাষ নম্বর ০১৭১০০০০০৬৭। নিচে সুইসাইড নোটের মতো ছোটকরে লেখা ‘আজ আপনার ফোনের অপেক্ষায় থাকবো।’ প্রদীপ কাগজটি হাতে নিয়ে গোটা ঘরময় মশা খোঁজার মতো অপলক দেখে নেয় কেউ দেখে ফেললো কিনা। সে কাগজটি পকেটে চালান করে কাঁপতে থাকে। তার হাঁটু কাঁপে। বুক কাঁপে। ধক ধক করে জ্বলে বুকের ডিবি। গ্যাস্ট্রিক পাওয়া রোগীর মতো পেটের উপরাংশে চিন চিন ব্যথা বাড়ে। এক কলস তৃষ্ণা বাড়ে। ঠোঁট কাঁপে। ঘাবড়ে যায় তার অন্তর মম। হায়! হায়! মৌরি কি তাহলে দেখে ফেললো? সে আঁড় চোখে মৌরিকে দেখে। এই মাত্র এসেছে মৌরি। প্রদীপ মৌরিকে পড়াবে কি ভুলে যায় বীজ গণিতের সূত্র। সে জল চায়। সে কাঁপা ঠোঁটে মৌরিকে বলে
-আমাকে এক, গ্লাস জল খাওয়াও মৌরি।
ওদিকে বুকে সাহস আনার চেষ্টা করতে থাকে। সাহস আর আসছে কই? বরং নার্ভাস হয়ে পড়ছে সে। জল হাতে মৌরি এসেই বললো-
-ঘাবড়াবার কিছু নেই স্যার! দিদি যে কাগজটি দিয়েছে- আমি তা দেখেছি। আমার সামনেইতো বিজ্ঞান খাতা ছিঁড়ে লিখলো। আমি বারবার বলেছি, আমার খাতা ছিঁড়তে স্যার বকবে। তারপরও ছিঁড়লো। আপনি ভাববেন না স্যার- দিদি বলেছে, কাউকে যেনো না বলি। আমি বলবো না।
এবার যেনো আরো জলতেষ্টা বাড়ে প্রদীপের। জল চাইতেও লজ্জা আসছে তার। পড়াতে কোন ভাবেই মনোযোগ আসছে না। আজকের মতো বাসায় ফেরা ছাড়া কোন গত্যন্তর না পেয়ে মৌরিকে ছুটি দিয়ে বেরিয়ে আসে প্রদীপ।
রোববার হতে চারদিনের মতো টিউশনি কামাই হচ্ছে প্রদীপের। এদিকে পরীক্ষা সমাগত মৌরির। এ চারদিন নিয়মিত হলে উৎপাদক চ্যাপ্টারটি শেষ করে দিতে পারতো। কিন্তু সংকোচে বাঁধা পড়েছে সে। যতোটুকু না চিরকুটের জন্য ততোটুকু মৌরির জন্য। যাই ভাবা যাক না কেনো, ওতো ছাত্র। তাও ছোট ক্লাস নয় একেবারে ক্লাস নাইনে পড়–য়া। কিছু বুঝুক কিবা নাই বুঝুক অন্তত প্রেম-ভালোবাসা বোঝার মতো বয়স হয়েছে মৌরির। এই ভাবনায় প্রদীপকে যখন কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিলো, তখন কণিকা দেবীর ফোন;
-হ্যালো! মাস্টার সাহেব আমি মৌরির মা কণিকা বলছি। কেমন আছেন? আপনার কি শরীর খারাপ? -
না, মাসি, আমি ভালো আছি।
তোমার মা বাবা ভালো তো?
-জ্বি, ভালো।
-ভাই বোন?
-জ্বি, তারাও ভালো।
-সে ই যে রোববারে গেলে আর আসছো না। ভাবলাম, তোমার কোন সমস্যা কি না! তাই ফোন দিলাম। তাছাড়া তোমার মেসো বললো, একটু খুঁজ নিতে। এছাড়া আগামী ১৩ তারিখ থেকে মৌরির পরীক্ষা। মৌরিও আফসেট। ও আবার শ্রাবণীর কাছেও পড়তে বসে না। বলো তো কী করি? তুমি কি আসবে বাবা?
-জ্বি, ঠিক আছে মাসি। আমি আসবো।
ঘড়ির কাঁটা ঠিক সন্ধ্যা ৭টায় দেব পাড়ায় উপস্থিত হলো প্রদীপ। প্রতিদিনের মতো শক্তি দিয়ে নয়, একটু আমতা আমতা করে বললো;
-অংকগুলো কষে ছিলে?
-জ্বি স্যার। নোট বই দেখে দেখে। একটিও বুঝিনি। দিদির কাছে গেলাম- ও বললো, ভাল্লাগছে না তার। আপনি যাওয়ার দিন থেকে দরোজা আটকিয়ে কী সব জানি গান শুনছে আর কান্না করছে। কিছু জিজ্ঞেস করলে ঝাড়ি মেরে তাড়িয়ে দিচ্ছে।
-ও আচ্ছা। ঠিক আছে উৎপাদকের চ্যাপ্টারটি বের করো। আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি।
বলে যেই খাতায় মনোযোগ বসাতে যাবে অমনি কম্পিউটার থেকে ফুল ভলিয়্যুমে হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে আসে রবি ঠাকুরের গান-
‘ভালোবাসি ভালোবাসি
এই সুরে কাছে দূরে
জলে স্থলে বাজায়
বাজায় বাঁশি
ভালোবাসি।
আকাশে কার বুকের মাঝে ব্যথা বাজে
দিগন্তে কার কালো আঁখি
আঁখির জলে যায় ভাসি
ভালোবাসি
ভালোবাসি ভালোবাসি.....’।
আজকেও মনোযোগ আসছে না প্রদীপের। অংক কষানো বাদ দিতে বাধ্য হলো সে মৌরিকে বললো ইংলিশ বইটি বের করতে। মৌরি ইংলিশ বইটি বের করতেই দরোজার অপাশে চোখ পড়ে যায় প্রদীপের। দেখে শ্রাবণী দাঁড়িয়ে। চোখ ইশারায় কী জানি জানতে চায় সে। প্রদীপও বুঝে ফোনের কথাই বুঝাতে চাচ্ছে শ্রাবণী।
সে বাসায় এসে পায়চারি করে আর ভাবতে থাকে ফোন করা উচিত হবে কিনা। বিজ্ঞাপন দিয়ে জোগাড় করা টিউশনিটা অবশেষে টেকানো যাবে কি যাবে না এসব। তার মাথায় নানা প্রকারের চিন্তার জটা পাক খায়। এরই মধ্যে অচেনা নম্বরে বেজে ওঠে দূরভাষ। সে কলটি নিরিখ করে দেকে নম্বরটিতো তার চেনাই। এতো সেই চিরকুটের নম্বর। সেই ০১৭১০০০০৬৭। অর্থাৎ কলটি মৌরির বড় বোন শ্রাবণীর। সমাজকর্ম নিয়ে পড়–য়া ছাত্রী এস এম কলেজের। যে ফিক করা হাসির লাগাম ধরে রাখতে পারেনি। দরোজার আঁড়ালে চোখ ফেলে সুমনের গান দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে-
‘প্রথমত আমি তোমাকে চাই,
দ্বিতীয়ত আমি তোমাকে চাই,
তৃতীয়ত আমি তোমাকে চাই
শেষ পর্যন্ত তোমাকে চাই......’
প্রদীপ কলটি রিসিভ করে তার ছেঁড়া দুতরার মতো স্বর তুলে বলে,
-হ্যালো! কে বলছেন?
ওপর প্রান্ত সুনসান। চুপচাপ। আবার বলে;
-হ্যালো! কে বলছেন?
ওপর প্রান্ত আবারও চুপচাপ।
প্রদীপ এবার তার টানা দুতরার মতো অনেক শক্ত করে বলে,
-ঠিক আছে, কথা না বললে রেখে দিচ্ছি।
এবার আধঘুমো আধজাগা কন্ঠের মতো স্বর এলো;
-আমি। আমি শ্রাবণী বলছি। এতোদিন এলেন না কেনো? জানেন, আমি অপরাধবোধে ভুগেছি।
জানেন, আপনি এলে আমার বুকে কলকল নদী জল বয়ে যায় নিরবধি। ঢেউয়ে ঢেউয়ে সুরবীণা বাজে রক্তের শোণিতে শোণিতে। অচেনা এক শক্তিতে আমি আকন্ঠ নিমজ্জিত থাকি। হৃদয় আমার গেয়ে ওঠে ‘ভালোবাসি, ভালোবাসি’।
শ্রাবণীর কথা শুনে আরেকটু শক্তি পায় যেনো প্রদীপ। সে বলে,
-অপরাধী হবেন কেনো? আমি না হয়ে অন্য কেউ হলেও অপরাধ নিতো না। কিন্তু আপনি জানেন না বলেই আমাকে ভালোবাসতে চাইছেন। আমি গরীবের ছেলে। বাবা কৃষিকাজ করে যা পান তা দিয়ে আমাদের সংসার চলে। আমি কলেজের টিউশন, বইপত্র ও পকেটের খরচ চালাই আপনার বাসার টিউশনি দিয়ে। তাছাড়া এই দ্রব্যমূল্যের বাজারে অন্য একটি টিউশনি বা চাকরি পাওয়া দুষ্কর। তাই আপনার কাছ থেকে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা।
-কী বাঁচতে পেরেছেন? আপনি হয়তো বাঁচার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমি পারছি না। আপনার কন্ঠ মাধুর্য্য আমাকে গ্রাস করে ফেলেছে। আপনার চেহারা, আপনার ব্যক্তিত্ব আমাকে পাগল করেছে। জলে আপনি। স্থলে আপনি। যেখানে যাচ্ছি যেনো আপনার ছায়া নিয়ে যাচ্ছি পড়ায় মন বসছে না। উড়ো উড়ো বকসারির মতো মন উড়ে যাচ্ছে আপনার পানে। আপনাকে ভালোবাসা ছাড়া কোন দিক পাইনি। আপনাকে চাওয়া ছাড়া অন্য উপায় খুঁজিনি। আপনি যদি আমাকে না বুঝেন তবে আমি আমাকে আমার মতো রাখবো না। আমি আপনাকে ভালোবাসি। আপনার মাঝেই আমি লীন হতে চাই।
কথাগুলো মুখস্ত বিদ্যার মতো পাঠ করে থামে শ্রাবণী।
এদিকে তোলপাড় শুরু হয় প্রদীপের। মন প্রাণ জুড়ে সে নিজেকে নিয়ে ভাবে। সে বুঝে উঠতে পারে না এ কথার উত্তরে কী বলা উচিত। আমিও তোমায় ভালোবাসি? না, আমাকে ক্ষমা করে দাও? ভালোবাসতে পারবো না। কিন্তু সে পারেনি। এখন রাত্রি জেগে নিজেকে নিজে পাহারায় বসায়। মনকে বলে স্থির হও। মন ততো অস্থির হয়ে ওঠে। এক সময় বুকের ড্রইংরুমে আদালত বসায়। আদালত সাক্ষী জেরা না করেই রায় দিয়ে দেয়। না, ভালোবাসতে পারো তুমি। যদি তোমার জন্য মেয়েটি কিছু করে বসে তবে এর দায় নিতে পারবে তো? ফোনটি হাতের মুঠোয় ধরে সে। নেটটি চালু করে ইমোতে ভিডিও কল দেয়-
-হ্যালো! কেমন আছো? একি তোমাকে অমন দেখাচ্ছে কেনো?
-কই নাতো! থ্যাংকয়ূ। কল দেয়াতে খুব খুশি হয়েছি। প্রিয় আমার, খুব খুশি হয়েছি।
বলে উল্লাসে ফেটে পড়ে শ্রাবণী। প্রদীপ বলে;
-তোমাকে অস্বীকার করার মতো বুকের পাটা হয়নি শ্রাবণী। আমিও তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। কিন্তু এ ভালোবাসা পান্ডুর মতো যদি দুজনের সাক্ষাৎ না হয়। এবার শ্রাবণী বলে,
-এই তো সাক্ষাৎ হচ্ছে ভ্রমচারি। আমরা দুজনে সাক্ষাতেই তো কথা বলছি।
-না। এ সাক্ষাৎ আমি মানি না। আমি তোমায় ছুঁয়ে দেখতে চাই। যাকে ভালোবাসলাম তাকে ছুঁয়ে দেখলাম না এওকি হয়?
-ঠিক আছে প্রাণজ পরম আমার- কাল কলেজে যাচ্ছি। ঠিক ১০টায় অপেক্ষায় থাকবেন, আমি আসবো কলেজ গেটে।
-ও কে! তবে একটি কথা বলতে চাই, আজ থেকে আমরা দুজন তুমি-আমি। আপনি-আপনি বা আপনি-তুমি নয়।
এদিকে সাক্ষাতের দিন ঠিক হয়ে এলেও দাঁড়িয়ে আছে যেনো রাত্রি। আকাশে হেলান দেওয়ার সময় পাচ্ছে না বিবস্ত্র চাঁদ। আকাশটাই যেনো ভুলে গেছে চাঁদকে বয়ে বেড়ানোর কথা। সিঁথি পেরুনো রাতেও ঘুম তালাশে ব্যস্ত দুজন। কিন্তু রাতকে দেওয়া যাচ্ছে না এক হালি চোখের ঘুম। প্রদীপ দূরভাষে কল দেয় শ্রাবণীকে। এদিকে শ্রাবণীও ফোনের তাড়ায় যেনো উদগ্রীব ছিলো। কল বাজতেই তর সয়নি তার।
-হ্যালো! কি করছো জানু?
-কেনো? তোমার কথাই ভাবছি।
-ওহে মাঝি ভিড়াও তোমার অচেনা তরী। আমি জলের কিনার ছোঁব। জলের তরীতে হোক না দুজনার অনন্ত মাখামাখি।
-বাহ্! খুব সুন্দর করে বলেছো। আমি যদি তোমার মতো করে বলতে পারতাম।
-তুমিও বা কম কিসে? তুমিও তো বলো কতো কিছু। তোমার মন কথা বলে। তোমার চোখ, মুখ, নাক কথা বলে। তোমার ভুবন মোহন ঠোঁট কথা বলে। কথা বলে তোমার অনন্ত যৌবনা শরীর। কল্পনায় আমি নাইতে নামি। আবার ভেজা শরীরে ভিজতে ভিজতে ওঠে আসি। এ জন্যেই তো তোমার প্রেমে পড়েছি। কাল কি পরছো তাহলে?
-কী পরবো, তুমিই বলো।
-শাড়ি পরবে। শাড়িতে তোমায় আরো অপ্সরীর মতো দেখায়।
-তাই নাকি? তুমি আবার দেখলে কখন?
-কেনো, সীমাদের বাড়ি? ওখানেতো আমিও ছিলাম। নীল শাড়িতে তোমায় খুব মানিয়েছিলো জানু আমার। অবশ্য তোমাকে যে কোন জামাতেও ভালো মানায়। এমন কি জামা ছাড়াও....!
-ছিঃ! অসভ্য কোথাকার!
-আমি অসভ্য হলে তোমাকেও ভ্রমচারণ করাবো সখী। গতদিনের শাড়িটা পরো কিন্তু। সাথে কপালে নীল টিপ। ঠোঁটের কথা বলবো না। চাইলে মাখতে পারো। না চাইলে না।
-কেনো খোকা? ওটা দিয়ে কোল্ডড্রিংস খাবে না কি?
-তুমি চাইলে কোল্ডড্রিংস কেনো কৌন আইসক্রিমও খেতে পারি।
-যা! তুমি একটা ইয়ে।
-কী?
-পাজি। হুলো বেড়াল।
-হুম। ঠিক আছে, আমি না হয় পাজিই থাকবো। থাকবো হুলো বেড়াল! তুমি থেকো আমার মিনি পুষি। আমি কোলে কোলে নিয়ে তোমায় বেড়াবো তবেই না তুমি আমি, আমি তুমি দুজন মিলে ভেসে ভেসে যাবো ফেনায় ফেনিল নোনা জলে।
-এই যা! মা উঠলেন মনে হয়। এখন রাখি। দেখাতো হচ্ছে কাল।
অপেক্ষায় আটকে থাকে সময়। যেমন প্রদীপ ও শ্রাবণীর রাতের সময় ফুরনোর কথা ছিলো না। কিন্তু সময় তার নির্ধারিত পথেই ধাবমান। তদ্রুপ আয় আয় করে ডেকে আনা সকালও এসেছে কড়া নাড়া দরোজায়। কিন্তু এক আকাশ অন্ধকার নিয়ে বৃষ্টির হাজিরা বড়ো বেমানান করে দিলো অপেক্ষার প্রারম্ভিকা। চৈত্রের শেষেও কাল বোশেখীর গর্জন নিয়ে এলো সে। এই অন্ধ আবহাওয়ায় দুজনের দেখা মাটি হয়ে যায় কিনা এ নিয়ে ভাবতে ভাবতে গোসল সেরে শ্রাবণী যেই নাস্তার টেবিলে বসবে ওমনি মা কনিকা দেবী এসে শুনালেন আরেক কথা-
-আজকের আকাশের যা অবস্থা, এর মধ্যে তুই কলেজে যাবি? কেমনে যাবি? এদিকে মৌরিরও পরীক্ষা। আকাশের এই অবস্থায় ওকে নিয়ে বেরোই কেমনে? সাজুকে বলেছি ওর স্কোটারটা নিয়ে আসতে। ও আসলে মৌরিকে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছি। তোর বাবা অফিসে যাবে। ভাতটা বেড়ে দিস। আর বাসায় থাকিস। স্কুল থেকে আসার পথে তোর পিসির বাসা হয়ে মৌরিকে নিয়ে ফিরবো।
কথাগুলো বলতে বলতে চৈতালি মেঘ একটু জিরিয়ে নিচ্ছে মনে হয়। এদিকে স্কোটার ড্রাইভার সাজু এসে ডাক দেয়; চাচি আসেন এই সময়টা কাজে লাগাই। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ি। কনিকা দেবীও দুগ্গা দুগ্গা বলে বেরিয়ে পড়লেন। বাসায় শুধু বাবা চৈতন্যদেব আর শ্রাবণী ছাড়া কেউ নেই। একসময় তিনিও অফিসের টানে বেরিয়ে পড়লে বুদ্ধি আঁটে শ্রাবণী। না, আজকের দেখা কলেজ গেটে নয়, বাসাতেই দেখা হতে পারে দু’জনের।
শ্রাবণী ফোন টিপতে থাকে-
-হ্যালো! প্রদীপ। আজ কলেজে যাচ্ছি না। কথাটি শুনে নড়ে ওঠে প্রদীপ।
-মানে?
-মানে কী? কলেজ গেটে দেখা হচ্ছে না। তাহলে?
-দেখা হচ্ছে না, সোনা! মা বাবা কেউ বাসায় নেই। বাসা পাহারা দিচ্ছি।
-মৌরিও তো পরীক্ষায়।
-হুম! মা’র সাথে গেছে।
-তাহলে আমাদের দেখা হচ্ছে।
-কোথায়?
-কেনো; তোমাদের বাসায়।
-বাসায় না সোনা। কেউ দেখে ফেলবে।
-যা! কেউ দেখবে না। তুমি যখন একা অন্ধকার আকাশ মেঘ বৃষ্টি আমাকে আটকাতে পারবে না। বৃষ্টি আসার আগেই পেছনের গেট দিয়ে আসছি। দরোজা খুলে রেখো। দেয়াল ঘড়িটা ঢং করে জানালো সকাল ১১টা। সুনসান বাসায় কালো হয়ে আসছে মেঘের বারান্দা। আকাশে বিজলী চমকাচ্ছে। এদিকে টিপ টিপ করে উঠছে শ্রাবণীর বুক। মরু তৃষ্ণার মতো তৃষ্ণা পেয়েছে তার। অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে তার পা যুগল। এরই মধ্যে পেছনের দরোজা টকটক করে ওঠে। শ্রাবণী প্রথমে সামনের দরোজাগুলোর সিটকিনি পরীক্ষা করে জানলার ফাঁক গলে উঁকি দেয় কাউকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে কি না। কিন্তু না। বাইরে অন্ধকার আকাশ ছাড়া কিছুই দেখতে না পেয়ে অবশ পায়ে পেছনের দরোজায় গেলো আর অমনি মায়ের ফোন;
-কি রে শ্রাবণী ভয় পাচ্ছিস?
-না মা।
-দরোজা জানালা লাগিয়ে দে। বৃষ্টির মধ্যে বের হোস না কেমন?
-ঠিক আছে মা।
বলে আবার ভালো করে লোকচক্ষু পরখ করে দরোজা খুলে দেয় এবং সন্তর্পণে সিটকিনি আটকিয়ে থর থর করে কাঁপতে থাকে। কথাগুলো কেমন জানি দলা পেকে আটকে গিয়েছে গলায়। প্রদীপ হাতে করে আনা ফুলটি শ্রাবণীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে সোফাতে বসিয়ে দেয়। এদিকে শ্রাবণী কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। সে প্রদীপের হাতখানি ছাড়িয়ে সোফা থেকে ওঠে পড়ে। বলে,
-আমার ভয় করছে প্রদীপ। এখন যদি কেউ এসে পড়ে। এবার প্রদীপ শ্রাবণীর হাত ধরে আবারও পাশে বসায়। শ্রাবণী আনত চোখে চেয়ে থাকে প্রদীপের মুখ পানে। শুধু এ ক্ষণ মুখ চাওয়াচাওয়ি ছাড়া বাকহীন যেনো দুজন। এমন সময় আকাশটা কেঁপে ওঠে। দড়াম! ওমনি কিছু একটা না ভেবেই প্রদীপের বুকে লুটিয়ে পড়ে শ্রাবণী। ওদিকে প্রদীপ মায়ার বাঁধনে শক্ত করে ধরে রাখে তার শ্রাবণীকে। আস্তে আস্তে উত্তাপে গলতে থাকে মোম। ভারি হয়ে ওঠে দুজনের নিঃশ্বাস। অন্ধকারের উপরে আলো মাখে প্রদীপের পিট। বারবার আলো মেখেই যায়। সবশেষে লুপ্ত চেতনা বিকশিত হয়ে ওঠে শ্রাবণীর। অসম্ভব ভালো লাগায় লজ্জা লাগে তার। প্রদীপের দিকে তাকানোটা কঠিন হয়ে যায়। লজ্জায় যেনো পেঁচিয়ে রেখেছে শরীর। এ লজ্জা যেনো ভালো লাগার লজ্জা। এ লজ্জা ভালোবাসার লজ্জা। সে প্রদীপের বুকে কতোক্ষণ মুখ গুঁজে রেখেছে জানে না। হঠাৎ চেতন ফিরলে শুনে পুরান ঘড়িটার ১টা বাজার ধ্বনি। প্রদীপও ধড়মড়িয়ে ওঠে পড়ে। অবিরত আকাশের কান্না জলে ভিজতে ভিজতে বেরিয়ে যায়। ভেজা শরীরে আরো ভিজতে যায় শ্রাবণী। দিন গড়ায়। শ্রাবণীর শরীরও দিনে দিনে অচেনা হয়ে ওঠে। শরীরটা কেমন জানি অন্যরকম লাগতে শুরু করে। সে বুঝতে পারে কিছু একটা হচ্ছে। হতে শুরু হয়েছে। সে প্রদীপকে ফোন দেয়।
-তুমি কোথায়? কলেজে আসো। তোমার সাথে কথা

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT