মহিলা সমাজ

হাতের রেখায় স্বপ্ন আঁকা

ইছমত হানিফা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৪-২০১৯ ইং ০০:২৭:৪১ | সংবাদটি ১৯৪ বার পঠিত

বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি, প্রতিদিন বৃষ্টি হচ্ছে, বর্ষার রূপ আগেই প্রকাশিত হয়ে যাবে। মর্জিনার বয়স সতেরো, মা নেই, আছে বলতে বাবা, আর তার দাদি। জন্মের সময় মা মারা যান, ওর বাবা আর বিয়ে করেননি। ওরা জেলে পাড়ার মানুষ, পানি হাওর আর মাছ এই নিয়ে জীবন। বয়সের সুন্দরের সাথে তার নিজের দেহের সুন্দর মিলে এমন সুন্দর রচিত হয়েছে। মর্জিনার দাদি প্রায়ই বলেন ও মর্জিনা দুইটা ডানা লাগাইলে তুই তো একেবারে পরি হয়ে যাবি। মর্জিনা শুনে বলে, দাদি তাল গাছে উঠে দুইটা গোলপাতা নিয়ে আস, আমি পিঠে লাগাইয়া উড়াল দেই। ফিক করে হেসে উঠে মর্জিনার দাদি। বাবা থাকলে ধমকের সুরে বলে, এতো জোরে জোরে দাদি নাতনি হাসে। এত শব্দ করে হাসতে নেই। মনে মনে বলে তোমাদের হাসিতেই আমার আলো। আর এই আলো দিয়েই আমি সুখ দেখি। লতা নামের মর্জিনার একটা কালো ছাগল আছে, এই ছাগলের সাথে ওর সব গল্প, সব আদর। এই ছাগলের মতো কালো কুচকুচে পাশের বাড়ির আনা। পাশের বাড়ির আনাকে এখন অনেক ভাল লাগে, একবেলা না দেখলে মন উচাটন করে। মর্জিনা থেকে মাত্র তিন বৎসরের বড় আনা সেই ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছে। কিন্তু আজকাল আনার শরীরের দিকে তাকালে একজন পূর্ণ পুরুষকে দেখা যায়। আর আনা যখন কথা বলে কি রকম এক সুর বাজে মর্জিনার কানে, দেহমন সেই সুরে নেচে উঠে। আজ সকালের আনার বলা কথাগুলো অনবরত বেজে যাচ্ছে, আর আষাঢ় মাসের মেঘে ঢাকা আকাশে যেমন আলো উকি দিয়ে একরকম লুকোচুরি খেলা খেলে, তেমনি লজ্জা এসে মর্জিনার মুখে বারবার লাল করে যাচ্ছে। হাত পা শীতল হয়ে আসছে।
তখনো পূর্ব আকাশে সূর্য চোখ খুলেনি। শুধু আলোর রেখা আকাশের জানালায় তাকিয়ে পৃথিবীকে ফর্সা করছে। মর্জিনা উঠোন ঝাড়– দিচ্ছিল এমন সময় হঠাৎ আনা এসে হাজির। ওর হাত ধরে টান দিয়ে বাঁশ ঝাড়ের পিছনে নিয়ে গেল, এখান থেকে দূরের হাওর দেখা যায়। আনা মর্জিনার হাতে দুইটা বাতাসা দিয়ে বলে জানিস মর্জিনা, কাল যখন রাতে টাঙ্গুয়ার হাওরে জাল ফেলি তখন তোর চেহারাটা মনের মধ্যে ঝিলিক মারছিল, বড় রুই মাছের পেটির মতো।
কেন ঝিলিক মারছিল?
টাঙ্গুয়ার চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। আকাশে একাদশির চাঁদ, যার আলো হাওরের পানিতে দোল খাচ্ছে। আর আমি দেখছিলাম তোর হাসি কেমনে দোলে কলিজায় যেন শিং মাছ ঘাই মারলো। কি যে ব্যথা-টক, মিষ্টি, তেতুলের আচারের মতো যত ঝাল লাগে, জিবে ততোই জ্বালা বাড়ে। এই ঝালে বুকের ভিতর জ্বলে কি রকম এক টান টান বেদনা বাড়ে। তোর হাসি ছুইয়া দেখবার না পারার বেদনা।
আমার হাসি তো ভাল না, দাদী খালি বকা দেয়, হাসি দিলে উঁচা দাঁত বের হয়ে যায়। জাল টানতে টানতে গরম লাগছিল, কিন্তু হঠাৎ করে দরিয়ার ঠান্ডা শীতল বাতাস সব ঠান্ডা করে দিল। এই বাতাস ছোট তিন ইঞ্চি লোহার মতো আমার বুকটা ফাঁকা করে দিচ্ছিল। তখন মনে হচ্ছিল দুনিয়াতে একটা মানুষ আছে। যে পাশে থাকলে আমার এই ঝাঁঝরা বুক ভরে যাবে। শিমুল বাগানের সেই লাল শিমুল রাঙ্গা শাড়ীর মতো রঙিন হয়ে যাবে চারপাশ, দূর থেকে কতদিন দেখেছি, তর দাদি চুল আচড়ে দিচ্ছে। চুল চিরুনিতে আটকে আছে। আমারও ইচ্ছা করছিল মনের মানুষকে এরকম বুকে আটকে রাখি।
জোয়ারের সময় নৌকা ভর্তি হয়ে গিয়েছিল মাছে। সবাই জাল গুটাইয়া রওয়ানা দিব, আমি বললাম, বইঠা তুল, নাও বাতাসে চলবো। কেউ কিছু বলার সাহস পেল না। ছুইয়ের উপরে সবাই বসে পড়লো, মানিক কিছু একটা বলতে গিয়ে চুপ করে রইলো। অথৈ পানিতে নৌকা ভাসছে হাওরের শাপলার মতো। নৌকা ভাসুক, ডুবোক কিছু যায় আসে না।
এই কথা শুনে মর্জিনার সারা শরীর কেঁেপ উঠে। মুখে বলে কি বল এইসব, তারপর কি হল।
শেষ রাত নৌকা ভাসছিল আর ঢেউগুলো এসে লাগছিল আমার বুকে। পানির ঝাটকা এসে কলিজায় আগুন ধরাইয়া দিচ্ছিল। যে আগুন তোর কথা মনে করে শুধু বাড়ে। তুই কি জানিস তখন এ নৌকায় কে কে আছিল।
কে
আমি।
কি বল এই সব আনা ভাই? আপনি কি নেশা করেছেন?
না রে মর্জিনা ঐ নৌকাটা আমি ছিলাম, আর হাওরের পানি ছিলে তুই। আমি ভাসতে ছিলাম টাঙ্গুয়ার হাওরের বুকে। একাদশি পূর্ণিমার ঢেউ একবার আমাকে ডানে নেয় আর একবার বায়ে। আমি নিজেকে সপে দিলাম এই অথৈ জলে। ইচ্ছে হচ্ছিল, চিকচিক এই পানিতে ডুব দিয়ে পাতালে চলে যাই, সেখান থেকে ঝিনুক তুলে আনি। যে ঝিনুকের মধ্যে ঘুমিয়ে আছে আমাদের মুক্তা মানিক। এই মুক্তা মানিক তোর বুকে তুলে দিবার স্বাদ জাগেরে মর্জিনা। বড় স্বাদ জাগে। ঢেউ আর হাওরের উদাসি শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। আর এই সব কিছু আড়াল করে আমার চোখে ভাসছিল শুধু তোর হাসি।
চুপ কর আনা ভাই বাড়িত যাও। সারা রাত টাঙ্গুয়ার হাওরের ভুত তোমাকে ধরছে। কেউ যদি এই ভোরবেলা আমাদের একসাথে দেখে তাহলে কি হবে? যান ঘরে গিয়া লম্বা ঘুম দেন। ঘুম কেমনে আসবে আমার, ঘুম যে তোর কাছে বন্ধি। আমার ঘুমকে মুক্তি দে মর্জিনা। লোকে আজ আমাদের একসাথে দেখলে দেখুক। আমি যে তোকে ছাড়া অন্য কিছু দেখি না, তোর ডাগর চোখ, খোলা কালো চুল, হাওরে ফুটা লাল শাপলার মত ঠোট। তোর হাসির সাথে শিমুল বাগানের শিমুল ফুল ঝরে পড়ে। আর তোর সাতে ঘুরে বেড়ানো লতার ম্যা ডাক, আমি এইসব কিছুকে ভালবেসে ফেলেছি। তাই আমি যেখানে যাই তুই ছায়ার মত আমার সাথে থাকিস। আমি এই ছায়াকে শিকার করতে চাই, যেমন করে হাওরের পানি টান দিলে মাছ শিকার করে তেমন করে। তুই আমার শিকার হ, আমাকে তোর মধ্যে ডুবে মার। আমি তোর মাঝে ডুবে মরতে চাই।
মর্জিনা অনুভব করে এই কথাগুলো ওর বুকে পানি ফলের কাঁটার মত বিদে। কাঁটা বিধে আর রক্তাক্ত হয় বুক। ওর শরীর কাঁপে। সারা দুনিয়া যেন ঘুরতেছে মর্জিনার মাথার ভিতর। হঠাৎ আনা মর্জিনার হাতটা তার হাতে নিয়ে বলে জানিস মর্জিনা এতোক্ষণ যে নৌকা আর হাওরের কথা বললাম ঐ নৌকাটা ছিলাম আমি, আর হাওর ছিলি তুই।
এক ঝাটকায় হাত সরাতে গিয়ে হাতের মুঠোয় থাকা বাতাসা মাঠিতে পড়ে যায়। মর্জিনার সেদিকে কোন খেয়াল নেই। শুধু স্থির চোখে বলে, আমার কেমন জানি লাগছে। শিরশির করছে তলপেট। আমাকে আপনি আউলাইয়া দিছেন। আপনি এখন বাড়িত যান। বাড়ি যে আমায় ডাকে না, যে ঘরে দরজার ওপাশে তুই নাই, ঐ ঘর দিয়া আমি কি করবো। আমার মাকে মা ডেকে তুই আমার ঘর হ, তুই আমার বাড়ি হ। তোর শরীরের প্রতিটা পশমে আমি শিমুল ফুলের লাল আবির দিয়ে রাঙ্গিয়ে দিব। তোর বুকের ধরফড়ানিতে আমার নাম লিখে দিব। আয়নায় চোখ রেখে তাকিয়ে দেখ, ঐ চোখে আমার তৃষ্ণা। তুই আয় মর্জিনা, আমি তোকে নিকা করবো। তোর পেটের জমিন আমাকে গর্জন দেয়। আমি চাষ করে তোর বুকে ফসল দিয়ে ভরে দিব। আমি নৌকা নিয়া প্রতিদিন হাওরের হাটে ঘাটে ঘুরে বেড়াই, জাল ফেলে মাছ ধরি, হাটে হাটে বিক্রি করি। কিন্তু সবশেষে তুই ছাড়া আমার কোন দুনিয়া নাই, কেউ নাই। যার বুকে জাল ফেলো, আমি মনের সুখ আটকাইয়া নৌকায় তুলবো। তোর বুকে আছে মুক্তা-মাণিক। তোর চোখে আছে শীতের রাতের ওম। তোর হাতের প্রতিটা রেখায় লিখা আছে আমার বেঁচে থাকার স্বপ্ন। তুই যদি আজ আমার সাথে নিকাহ করতে রাজি না হস তাহলে শিমুল গাছের পটকা ফুটে যেমন তুলো উড়ে যায়। আমি তেমনি উড়ে গিয়ে পড়বো হাওরের পানিতে। ওখানের অথৈ পানিতে ডুবে মরবো।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT