মহিলা সমাজ

প্রতিশোধ

জুঁই ইসলাম প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-০৪-২০১৯ ইং ০০:২৮:০৮ | সংবাদটি ১৮৯ বার পঠিত

আজ প্রচন্ড গরম। রাস্তায় রিক্সা একেবারে কম। মিতালি অনেক সময় ধরে রিক্সার অপেক্ষায় কিন্তু রিক্সা না পাওয়াতে হেঁটেই চলছে ।
সে হাঁটতে হাঁটতে গলির মোড় থেকে বের হয়ে প্রায় বড় রাস্তা পর্যন্ত এলো, তারপরও রিক্সা নেই। এই মধ্য দুপুরে রোদের মাঝে বের হওয়ার কোন ইচ্ছা ছিল না তার কিন্তু বের না হয়ে উপায়ও নাই। অন্যদিন ব্যাগে ছাতা থাকে, আজ সাথে ছাতাও নেই, আগুনপোড়া রোদে হাঁটা অনেক কষ্টের।
এই রিক্সা যাবে?
চালক : যামু। কই যাবেন আপা?
মিতালী : যেখানে আমি যাব সেখানে।
চালক : বুজলাম তো জায়গার নাম বলেন আপা।
মিতালী : চাঁদে যামু! নিয়ে যাবে?
চালক : আপা আপনার কি মাথা খারাপ?
চাঁদে গেলে প্লেন লাগে, রিক্সা তো আর উড়ে না আপা। আপনি প্লেন বা রকেট খুঁজেন।
মিতালি মনে মনে ভাবল সত্যি তো সে ড্রাইভারকে কেন এসব বলছে? নিজেকে শোধরিয়ে বলল ভাই কিছু মনে করবেন না আমি জিন্দাবাজার যাবো।
মিতালী : ভাড়া কত?
চালক : ৫০ টাকা দিবেন আপা। আজ খুব রোদ, গরম বেশি। একটা ঠান্ডা খাবো।
মিতালী : আচ্ছা যাও দিবো। তোমাদের তো একটা অভ্যাস বা অজুহাত। একটু রোদ বেশি হলে ভাড়া বেশি, আবার একটু বৃষ্টির দিন হলেও ভাড়া বেশি, সরকার কেনো যে কিলো: প্রতি ভাড়া নির্ধারণ করে দেয় না, তাহলে তোমরা বাঁচো সাথে আমরাও।
চালক : আপা ভালো বলছেন কিন্তু এই দেশে এটা হবে না।
মিতালী : কেন হবে না?
চালক : আমাদের দেশে কোন নিয়ম মানা হয়? নিয়ম করলে ক’দিন ভালো চলে তারপর শেষ। আমাদের কর্তাব্যক্তিরা যেখানে নিয়ম মানে না সেখানে সাধারণ জনগণ কি আর করবে? আমাদের সততা নাই, কিছু বলার অধিকার নাই যেনো বোবা।
মিতালী : তুমি তো দেখি অনেক জানো!
চালক : জি আপা আমি ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছি। অভাবের কারণে পড়তে পারিনি।
মিতালী : অহ তুমি পড়তে চাও?
চালক : জি খুব শখ, পড়ালেখা করে কিছু করি আমার পরিবারের জন্য, এই সমাজের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য। মিতালী : শুনে খুব খুশি হয়েছি ভাই, ঠিক আছে আমি তোমাকে সাহায্য করবো দিনে রিক্সা চালাবে আর রাতে নাইটস্কুলে পড়বে।
চালক : সত্যি, কি বলছেন আপা?
মিতালী : হু সত্যি, তোমার নাম কি?
চালক : সজল?
মিতালী : বয়স কত?
চালক : ১৮ বছর ৩ মাস।
মিতালী আর সজল রিক্সায় নানা কথা বললো।
কিন্তু রাস্তা তো শেষ হয় না- মিতালির আজ বিশেষ দিন। সেই কাঙ্খিত সময়। অনেক দিনের স্বপ্নের অবসান হবে আজ। সেই কাঙ্খিত মানুষকে আজ দেখবে। কত রঙিন সোনালি স্বপ্ন বুনেছে এই প্রতীক্ষিত মানুষটিকে নিয়ে। দিনের পর দিন সে অপেক্ষার প্রহর গুনেছে।
রাশেদের সাথে পরিচয় হয় ফোনে। মিতালি একদিন ভুল করে রাশেদকে ফোন দেয় সেই সুবাদে দু’জনার পরিচয়। পরিচয় থেকেই ভালোবাসাবাসির সম্পর্ক গড়ে উঠেছে দু’জনার মধ্যে। মিতালি রিক্সায় কত কি ভাবছে? রাশেদ কেমন হবে? ওর চুল কেমন? ও হাঁটে কেমন? ওর হাসি কেমন? ওর সব কিছু নিয়ে খুব ভাবছে। ইচ্ছা করলেই এখন মুহূর্তে হুয়াটসঅ্যপে কিংবা ইমু, মেসেঞ্জারে দেখা যেতে পারত রাশেদকে। কিন্তু মিতালী চায়নি এসবের কিছুই হোক। মুহূর্তে কেনো ভালোবাসা হাতের মুঠোয় চলে আসবে? আগের যুগের মতো থাক না কিছু নিজের মধ্যে। যুগের সাথে সাথে সব স্বাদ সহজে পেতে হবে কেনো? ভালোবাসাটা গাঢ় হোক, মনের টান বাড়–ক এই জন্যই সে শুধু কথাই বলেছেÑ ইচ্ছে করেই রাশেদকে দেখেনি। যদিও রাশেদ দেখতে চেয়েছে কিন্তু মিতালী সবসময় চেয়েছে ভালোবাসার টান হলে মানুষ দেখতে যেমনই হোক সেটা উহ্য, মনের মিল হল আসল।
ইস্ রাস্তায় এতো জ্যাম কেন? ১২টায় দেখা হওয়ার কথা সেখানে পৌনে একটা। সজলের সাথে কতো কথা হলো তারপরও রাস্তা শেষ হচ্ছে না আজ। গত পাঁচ মাস থেকে মিতালী আর রাশেদ দু’জনার মাঝে পরিচয় হয়। প্রতিদিনই একবার কি দু’বার কথা হবেই, কখন যে রাশেদ মিতালীর অসম্ভব ভালো লাগার একজন মানুষ হয়েছে তা নিজেই বুঝেনি। মিতালী একদিন কথা না বলে থাকতে পারে না। রাশেদ একজন ব্যাংকার। তাই কাজের ফাঁকে দিনে কথা হয়। বাসায় এসে নানা কাজে সে ব্যস্ত। তাই রাতে খুব কম কথা হয়। মিতালী এ নিয়ে অনেক ঝগড়া করে বাসায় এসে ফোন দিতো। কিন্তু রাশেদ সবসময় বলে রাতে কথা বলা যাবে না। নানা কাজ ও পরিবারকে সময় দিতে হয়, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে বলে মিতালী তোমার যাতে পড়াশুনা নষ্ট না হয় সেজন্য কম কথা বলা উচিৎ। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। তাই সবার আগে তোমার ভালো চাই। এ কথা শুনে মিতালী আর কিছু বলতে পারে না রাশেদকে।
মিতালী এখন ইংরেজিতে অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। মিতালী আজ হলুদ রঙের একটা ড্রেস পড়েছে। হলুদ রঙ তার খুব প্রিয় রঙ। এই রঙ রাশেদ খুব পছন্দ করে। হাতে লাল গোলাপ। মিতালীর খুব ইচ্ছা এই ফুলগুলো সরাসরি হাতে তুলে দিয়ে তার ভালো লাগার কথা বলবে। ইস্ বাংলা সিনেমায় নায়ক-নায়িকাদের প্রথম দেখাতে কতো কী ঘটে? মিতালী মনে মনে ভাবে রাশেদ যদি তার হাত নাও ধরে সে ধরবে কারণ তার খুব ইচ্ছা রাশেদের হাত ধরা। রাশেদকে সে কি পরিমাণ ভালোবাসে রাশেদ বুঝুক। রাশেদ কথায় কথায় বলে মেয়েরা ভালোবাসা কী বুঝে না। খাঁটি প্রেম তারা করে না। মেয়েরা টাইম পাস করে। এই সবগুলো ভাবনা তার দূর করে দিতে হবে। কারণ মেয়েরা সত্যি সত্যি প্রেম করে মিথ্যা না। আর রাশেদকে সে সত্যি ভালোবাসে। মেয়েরা আবেগি হয়। মিতালীর এতটা আবেগি হওয়া ঠিক না জানে। কিন্তু রাশেদ তার জীবনে প্রথম ভালো লাগার মানুষ তাই একটু ছোঁয়া পেতে চায়। একটু অনুভব করে জানতে চায় বুঝতে চায় ভালোবাসায় কেন মানুষ এত পাগলামো করে? স্মরণীয় করে রাখতে চায় দিনটিকে। যদিও মিতালী খুব লজ্জাবতী মেয়ে। কিন্তু ভালোবাসার ঢেউয়ের কাছে লজ্জা যেন অবনত। গত পাঁচ মাস থেকে যতোটুকু জেনেছে রাশেদকে তার মতে রাশেদ খুব ভালো একটা ছেলে তার কোনো তুলনা হয় না। মিতালী যা পছন্দ করে সব গুণ রাশেদের মধ্যে আছে। এখন শুধু দেখার পালা’।
অবশেষে মিতালি গন্তব্যস্থলে পৌঁছালো। রিক্সা ভাড়া দিয়ে নামল সাথে সজলকে তার ঠিকানাও দিল যোগাযোগ করার জন্যে। দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল রাশেদের জন্য। অপেক্ষা জিনিষ খুব খারাপ। হঠাৎ একটা ছেলে বলল আপা আমাকে চিনেন?
না! আপনি কে?
আমাকে চিনবেনও না আপনি। এই চিঠিটা নিন। মিতালী খুব অবাক-এই যুগে চিঠি! এখন কি আর কেউ চিঠি লিখে? আর কে দিল চিঠি?
কি হল আপা? নিন চিঠি। মিতালী চিঠিটা হাতে নিল।
ছেলেটা বলল চিঠি এখন খোলা যাবে না। আমি যাওয়ার পর দেখবেন। মিতালী উত্তর দেওয়ার আগেই ছেলেটা প্রায় দৌড়ে চলে গেল।
মিতালী ভাবতে লাগলো কি আছে এই চিঠিতে? ভয়ে ভয়ে চিঠি খুলেই দেখলো নাম রাশেদের।
সুপ্রিয়, তোমার সামনে এসে কথা বলার মানসিকতা আমার নাই। দিনের পর দিন তোমার সাথে মিথ্যা বলেছি কারণ একটা প্রতিশোধ।
তোমার হয়তো মনে আছে তোমার প্রিয় লেখকের একটা বই আর একটা চিঠি আমি তোমাকে উপহার দেওয়াতে তুমি আমার সব বন্ধুদের সামনে আমাকে একটা চড় দিয়েছিলে। তখন তুমি ক্লাস টেন-এ পড়। আর আমি বোটানি ২য় বর্ষ। তোমার নিশ্চয় মনে আছে আমি তোমার স্কুল যাওয়ার পথে প্রায় দিন তোমাকে এক নজর দেখার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে রোদে পুড়েছি, বৃষ্টি এলে ভিজেছি, কিন্তু তুমি নিরব। আমি সেই মাহবুব। সেদিন তোমাকে কিছুই বলিনি শুধু নিজের গালের আঘাতকে যতœ করে পুষে রেখেছিলাম। অনেকদিন পর যখন সেদিন তোমার সাথে আমার আবার রঙ নাম্বারে কথা হয় তখন দুই দিন কথা বলে আমি বুজতে পারি সেই তুমি, যে আমার যৌবনের শুরুতে আদর না দিয়ে চড় দিয়েছিল। তাই সুযোগ পেয়ে হাতছাড়া করলাম না, ভাবলাম তোমার সরল মনে একটা আঘাত করি, যে আঘাত তুমি আমাকে অনেক আগেই দিয়েছিলে। পুরুষত্বের আক্রমণাত্মক ব্যবহার আমাকে মুহূর্তে গ্রাস করেছিল সেদিন।
সেদিন সত্যি ভালোবেসে চিঠি দিয়েছিলাম। অনেক কষ্ট পেয়েছি। তোমার আঘাতের পর অনেক কেঁদেছি অপমানিতবোধ হয়েছি। বন্ধুরা অনেক দিন আমাকে ক্ষ্যাপিয়েছে-চড় খাওয়া মাহবুব উপাধি দিয়েছে।
মিতালি তুমি আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছিলে। আজ আমার সুখের সংসার আছে। আমার ছোট্ট পৃথিবীতে একটা মিষ্টি মেয়েও আছে। সেদিনের সেই কষ্ট আমাকে অনেক তাড়া করে আজও। সেই কষ্টের কিছু অনুভুতি না হয় আজ তুমি পেলে।
আমাকে ক্ষমা করে দিও।
ইতি
রাশেদ (চড় খাওয়া..)
মিতালীর চোখের পানি ঝরঝর করে পড়ছে... যেন বাদলা দিনের বৃষ্টি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT