বিশেষ সংখ্যা

মে দিবস পালনের মতাদর্শগত ভিত্তি

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৫-২০১৯ ইং ০০:৪৪:৫২ | সংবাদটি ২০৭ বার পঠিত



১৮৬৬ সালের মে মাসে আমেরিকার শ্রমিক শ্রেণি ৮ ঘন্টা কাজের দাবিতে যে ধর্মঘট শুরু করে, শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামকে দমন করার জন্য মালিক শ্রেণির রাষ্ট্রশক্তি শ্রমিকদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শিকাগো শহরের হে মার্কেটে একটি শ্রমিক সমাবেশে পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ে গুলি চালায়, গ্রেফতার করা হয় শ্রমিক নেতাদের। বিচারের প্রহসনে চারজন শ্রমিক নেতাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। কমরেড এঙ্গেলসের নেতৃত্বে ১৮৯০ সালে প্রতি বছর ১ মে দিবসে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস’ পালনের আহ্বান জানানো হয়। সেই দিন থেকেই পৃথিবীর দেশে দেশে শ্রমিকশ্রেণী ১ মে দিনটিতে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস হিসাবে পালন করে চলেছে। আজকের সমাজব্যবস্থা হল পুঁিজবাদী সমাজব্যবস্থা। এই সমাজে মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তি সমগ্র উৎপাদন যন্ত্র এবং উৎপাদিকা শক্তির মালিক। আর বেশির ভাগ লোকই হল তারাই যারা পুঁজিপতিদের কাছে তাদের শ্রমশক্তি বিক্রয় করে বেঁচে থাকে। গুটিকয়েক রাষ্ট্র বাদে তাই আজকের সমাজ একটি শ্রেণি বিভক্ত সমাজ শোষক-শোষিত, অত্যাচারী-অত্যাচারিত।
পুঁজিবাদী সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট হল মুনাফার ভিত্তি হল শ্রমিক শোষণ। প্রথমদিকে শ্রমিক শোষণের ক্রুরতম পদ্ধতি ছিল মাত্রাতিরিক্ত সময় কাজ করিয়ে অধিক উৎপাদন করিয়ে নেওয়া অথবা কম মজুরিতে অধিক উৎপাদন করিয়ে নেওয়া।
কাজের ঘন্টা কমাবার দাবি তাই ছিল শ্রমিক আন্দোলনের প্রথম দাবি। পুঁজিবাদী বিকাশের প্রথম পর্যায়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল শ্রমিককেই ১৬/১৮ ঘন্টা কাজ করতে বাধ্য করা হতো। শিশু শ্রমিকদেরও রেহাই ছিল না। পুঁজির-বিকাশের সাথে সাথে শ্রমিকশ্রেণীর সংখ্যাগত বৃদ্ধি ঘটতে থাকে, যে সংখ্যাগত বৃদ্ধি তাকে সংগ্রামের শক্তি জোগায়।
ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগে, বিশেষ করে ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের মধ্য দিয়েই পুঁজিবাদের জন্ম। পরবর্তী কালে তা ধাপে ধাপে সমগ্র ইউরোপে এই যন্ত্র বিপ্লব এবং উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা ছড়িয়ে পড়ে। আমেরিকা আবিষ্কারের ফলে ইউরোপ আফ্রিকা থেকে হাজার হাজার অভিবাসী মানুষ আমেরিকায় পাড়ি দেয়। ইউরোপের পুঁজিপতিরা আগে আমেরিকার কাঁচামালকে তাদের শিল্পোৎপাদনে ব্যবহার করত। এই অভিবাসনই উত্তর আমেরিকায় কৃষি ও শিল্পের বিকাশ ঘটায়। কালক্রমে আমেরিকা ইউরোপের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ায়।
ইউরোপের শ্রমিক শ্রেণির ন্যায় আমেরিকার শ্রমিক শ্রেণিও মালিক শ্রেণির শোষণ, বঞ্চনা ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে থাকে। আমেরিকাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাজের ঘন্টা কমাবার দাবিতে আন্দোলন সংগঠিত হতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকরা কাজের সময় ১০ ঘন্টায় কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়। যে সংগ্রামগুলোর একটা পর্যায়ে হে মার্কেটের বিস্ফোরক ও ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে।
আট ঘন্টা কাজের দাবির এই লড়াই ছিল একটি রাজনৈতিক লড়াই। এই আন্দোলন কোনো একটি শিল্প বা কারখানার দাবি ছিল না। দাবি ছিল আট ঘন্টা কাজের ভিত্তিতে সারা দেশে একই আইন চালু করতে হবে। দাবিটি ছিল সমগ্র শ্রমিক শ্রেণির দাবি রাষ্ট্রের কাছে আইন প্রণয়নের দাবি, মূলত রাজনৈতিক দাবি।
শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম যখন দেশে দেশে গড়ে উঠতে থাকে, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত লড়াই হতে থাকে তখন সমগ্র সংগ্রামগুলি একই সূত্রে গ্রথিত করার জন্য কার্ল মার্কস একটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। এই বিষয়ে এঙ্গেলস ১৮৯০ সালে কমিউনিস্ট ইস্তাহারের ভূমিকায় লিখেছেন-“দুনিয়ার মজুর এক হও”। বিয়াল্লিশ বছর আগে প্রথম প্যারিস বিপ্লবে সর্বহারা তার নিজস্ব দাবি নিয়ে হাজির হয়। ঠিক তারই পূর্বক্ষণে আমরা যখন পৃথিবীর সামনে এই কথা ঘোষণা করেছিলাম সে দিন অতি অল্প কন্ঠেই তার প্রতিধ্বনি উঠেছিল। যাই হোক, ১৮৬৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ দেশের সর্বহারা ‘শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সমিতি’তে (ওহঃবৎ-হধঃরড়হধষ ড়িৎশরহম সবহং ধংংড়পরধঃরড়হ) হাত মেলায়। ঐ সমিতির স্মৃতি অত্যন্ত গৌরবময়। সত্য বটে, আন্তর্জাতিক সমিতি বেঁচেছিল মাত্র নয় বছর, কিন্তু সকল দেশের সর্বহারাদের সে ঐক্য আজও জীবন্ত এবং আগের তুলনায় যে অনেক বেশি শক্তিশালী বর্তমান কালটা থেকে আর কোনো বড় সাক্ষ্য নেই। কেন না ঠিক আজকের দিনে যখন আমি এই পংক্তিগুলো লিখেছি তখন ইউরোপ ও আমেরিকার সর্বহারারা তাদের লড়বার শক্তিকে বিচার করে দেখছে, এই সর্বপ্রথম তারা সংঘবদ্ধ, একক বাহিনীরূপে, এক পতাকার নীচে, একটি আশু লক্ষ্যের জন্য। ১৮৬৬ সালে আন্তর্জাতিক জেনেভা কংগ্রেসে ও ১৮৮৯ সালে প্যারিসে শ্রমিক সংগ্রেসে আবার যা ঘোষিত হয়েছে, সেই ভাবে আইন পাস করে সাধারণ ৮ ঘন্টা শ্রমদিবস চালু করতে হবে। আজকের দৃশ্য সকল দেশের পুঁজিপতি ও জমিদারের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে যে, আজ সকল দেশের শ্রমিকরা সত্যই এক হয়েছে।
আহা, নিজের চোখে দেখার জন্য মার্কস যদি এখনও আমার পাশে থাকতেন।’’ প্রকৃতপক্ষে শ্রমিক আন্দোলনের জীবনীশক্তি হল আন্তর্জাতিক শ্রমিক ঐক্য। সেদিনের থেকে আজকের পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মার্কস এঙ্গেলস ‘কমিউনিস্ট ইস্তাহারে’ পুঁজিবাদের যে চরিত্র বিশ্লেষণ করেছিলেন, শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রামের যে দিক নির্দেশ করেছিলেন তার মৌলিক কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। কমিউনিস্ট ইস্তাহারে বলা হয়েছে-আমেরিকা আবিষ্কার যার পথ প্রস্তুত করে সেই বিশ্ব বাজার প্রতিষ্ঠা করেছে আধুনিক শিল্প। এ বাজারের ফলে বাণিজ্য, নৌচালন, স্থ’লপথ যোগাযোগের প্রভূত বিকাশ ঘটেছে। সে বিকাশ আবার প্রভাবিক করেছে শিল্প প্রসার হতে।
‘নিজের প্রস্তুত মালের জন্য অবিরত বর্ধমান এক বাজার প্রয়োজন। বুর্জোয়া শ্রেণীকে সারা পৃথিবীময় দৌড় করিয়ে বেড়ায়। সর্বত্র একে বসতি নির্মাণ করতে হয়, সর্বত্র এক উপনিবেশ স্থাপন করতে হয়, যোগসূত্র স্থাপন করতে হয় সর্বত্র।’ তাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটা হয়েছে সামাজিক এবং বিশ্বজনীন।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হল-মুনাফার জন্য উৎপাদন। পুঁজিপতিদের মধ্যে চলে অবাধ প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় বড়রা ছোটদের গিলে খায়। সৃষ্টি হয় একচেটিয়া মালিকানা। পুঁজির কেন্দ্রীভবন বাড়তে থাকে । ব্যাংক ও শিল্প পুঁজির মধ্যে আঁতাত গড়ে উঠে সৃষ্টি হয় লগ্নি পুঁজি। লগ্নি পুঁজি নিজ নিজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে হানা দেয় অন্য দেশে সৃষ্টি হয় বহুজাতিক পুঁজির। প্রকৃত অর্থে পুঁজির বা পুঁজিপতিদের কোনো দেশ বা জাতি নেই। এদের জাত শোষক, লক্ষ্য মুনাফা। এদের মধ্যে যেমন প্রতিযোগিতা আছে আবার টিকে থাকার জন্য মাঝে মাঝে আঁতাতও গড়ে তোলে। এক দেশ থেকে অন্য দেশে পুঁজির সঞ্চরণ ঘটতে থাকে। বাজার দখলের লড়াই চলতে থাকে, এই বাজার দখলের লড়াইয়ে দুটি বিশ্বযুদ্ধ ঘটে গেছে। কোনো একটা উৎপাদন আজ আর কোনো একজন শ্রমিকের শ্রমশক্তি অথবা, একটা দেশের নিজস্ব কাঁচামালের উপর নির্ভরশীল নয়। একচেটিয়া ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের তৈরি পণ্য কোনো একটি দেশে সীমাবদ্ধ রাখেনি, সেটি তারা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দিয়েছে। তাই শ্রমিক শ্রেণির নিজস্ব অর্থনৈতিক দাবির লড়াই নিজের শিল্পে বা কেবল নিজের দেশেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। একই মালিকের অধীন শিল্পগুলোর শ্রমকিরা শুধু নিজের দেশেই অন্যান্য দেশের শ্রমিকদের সাথে যোগাযোগ গড়ে তুলছে।
মার্কস বলেছেন-“বুর্জোয়া শ্রেণীর বিকাশ বাণিজ্যের স্বাধীনতা, বিশ্ব বাজার, উৎপাদন পদ্ধতির একরূপতা এবং সেটার উপযুক্ত জীবন যাত্রার পরিবেশ এসবের জন্যই জাতিগত পার্থক্য ও জাতি-বিরোধ দিনের পর দিন অধিকতরভাবে মিলিয়ে যাচ্ছে। পূর্ববর্তী সকল ঐতিহাসিক আন্দোলন ছিল সংখ্যাল্পের দ্বারা অথবা সংখ্যাল্পের স্বার্থে আন্দোলন। প্রলেতারীয় আন্দোলন হল বিরাট সংখ্যাধিক্যের আত্মসচেতন স্বাধীন আন্দোলন। প্রলেতারিয়েত আজকের সমাজের নি¤œতম স্তর। তাদের লড়তে হলে, দাঁড়াতে হলে উপরে চাপানো সরকারি সমাজের গোটা স্তরটিকে শূন্যে উৎক্ষিপ্ত না করে উপায় নেই।’’
“বুর্জোয়া শ্রেণীর বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়েতের লড়াইটা মর্মবস্তুতে না-হলেও আকারের দিক থেকে হল প্রথমত এক জাতীয় সংগ্রাম। প্রত্যেক দেশের প্রলেতারিয়েতকে অবশ্যই সর্বাগ্রে ফয়সালা করতে হবে স্বদেশী বুর্জোয়াদের সঙ্গে।” আজ বিশ্বায়নের নামে নয়া উদারবাদী দৈত্য সারা পৃথিবী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আমাদের দেশের বুর্জোয়া শ্রেণী সা¤্রাজ্যবাদী পুঁজির সাথে গাঁটছড়া বেঁধেছে। বিদেশি পুঁিজ ও পণ্যের জন্য দেশের বাজার খুলে দেওয়া হয়েছে। ক্ষেত্র-শিক্ষা-সংস্কৃতি এমনকি দেশের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে অবাধ বিদেশি পুঁজির অনুপ্রবেশ ঘটছে।
কৃষি, শিল্প-বাণিজ্য-আর্থিক ক্ষেত্র-শিক্ষা-সংস্কৃতি এমনকি দেশের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে অবাধ বিদেশি পুঁজির অনুপ্রবেশ ঘটছে। দেশের অর্থনীতির ভিত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পগুলোকে পানির দরে বে-সরকারি মালিকের নিকট বেঁচে দেওয়া হচ্ছে। শ্রমিক শ্রেণির অর্জিত অধিকারসমূহ আক্রান্ত হচ্ছে। তাই আজকের দিনে আমাদের দেশের শ্রমিক শ্রেণির কাছে মে দিবসের তাৎপর্য হল-ক্স পুঁজিবাদী শোষণ ব্যবস্থা তথা সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামকে তীব্র করা, ক্স শ্রেণি শোষণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম মানেই রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম, ক্স ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামই শ্রমিক সংগ্রামের প্রধান শক্তি।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT