বিশেষ সংখ্যা

শ্রমিক দিবস ডাক দিয়ে যায়

জাহিদা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০১-০৫-২০১৯ ইং ০০:৪৭:০২ | সংবাদটি ২০৪ বার পঠিত


বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সংহতি দিবস পহেলা মে। ১৮৯০ সাল থেকে ১ মে বিশ্বব্যাপী পালন হচ্ছে মে দিবস। সারা বিশ্বের শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন হিসেবে এ দিনটি স্বীকৃত।
অনেক বছর পূর্বে শিকাগো শহরের হে মার্কেটের মকরম্যাক রীপার ওয়ার্কস নামক শিল্প প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটী শ্রমিকদের রক্তদানের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিলো মহান মে দিবস। সৃষ্টি হয়েছিলো শ্রমের বিরুদ্ধে শ্রমিক সমাজের সংগ্রামের ইতিহাস।
পহেলা মে একটি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ দিন। প্রতি বছর এ দিনটি শ্রমিক সংহতি দিবস শ্রমিকদের পারস্পরিক একাত্মতা ঘোষণার দিন।
এককালে শ্রমিকদের কাজের ঘন্টা ছিলো আঠারো থেকে কুড়ি। ১৮২০ থেকে ১৮৪০ সাল পর্যন্ত দশ ঘন্টার কর্মদিবসের দাবিতে বহু আন্দোলন ও ধর্মঘট হয়। ১৯৬২-৬৩ থেকে গড়ে ওঠে ট্রেড ইউনিয়নের রাজনৈতিক ভিত্তি। সে সময় আমেরিকার গৃহযুদ্ধে সেখানকার শিল্পের বিকাশ ঘটতে থাকে।
এ সময় তাদের আন্দোলনের দ্রুত প্রসার ঘটে। ১৯৮১ সালের নভেম্বরে প্রতিষ্ঠিত হয় আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার। ১৯৮৬ সালের ১ মে থেকে আট ঘন্টাকেই কাজের হিসেব বলে আইনগত গণ্য করা হয়।
১৮৮৪ সাল থেকে আট ঘন্টা কাজের দাবিতে শ্রমিক শ্রেণি মুখরিত ছিলো। ১৮৬৮ সালে আট ঘন্টার কাজের একটি আইন পাশ করলেও সে আইনটি কার্যকর হয়নি।
১৮৮৫ সালে শ্রমিকদের আন্দোলন তীব্র আকার ধারন করে। শ্রমিকরা তখন আট ঘন্টার বেশি কাজ করবে না বলে ঘোষণা দেয়। প্রায় পাঁচ লক্ষ শ্রমিক এ দাবিতে ধর্মঘট করে।
শাসকদল সুবিশাল ধর্মঘট দেখে পিছিয়ে যায়। চারিদিকে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই ফরাসী বিপ্লবের কেন্দ্রস্থল বাতিল পতনের শত বার্ষিকীতে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৮৯০ সাল থেকে প্রতি বছর ১ মে থেকে শ্রমিক দিবস পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য হয়।
এভাবে ১৮৮৬ সালের ঐতিহাসিক মে দিবস ১৮৮৩ সালে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে রূপান্তরিত হয়। ১৮৯০ সাল থেকে পৃথিবীর সব দেশেই শ্রমজীবী মানুষ মিছিল বিক্ষোভের মাধ্যমে মে দিবস পালন করে আসছে। ভারতে প্রথম মে দিবস পালন করা হয় মাদ্রাজে ১৯২৩ সালে।
বর্তমানে পৃথিবীর সব দেশেই মে দিবস উদযাপন করা হয়। মে দিবস দুনিয়ার মেহনতী মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামের পর বিজয় অর্জনের দিন। এ দিন যেমন গৌরবের তেমনি বেদনাদায়কও।
আজকের দিনের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, ধর্মঘট করার অধিকার ইত্যাদি যে বিশ্বে স্বীকৃতি পেয়েছে তার সবই মে দিবসের সংগ্রামের ফল।
‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ শ্লোগান নিয়ে বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষ আজ একতাবদ্ধ। একই পতাকার তলে তাদের অবস্থান।
মে দিবস শ্রমিক চিন্তা চেতনায় এসেছে এক বৈপ্লবিক তাৎপর্য। মে দিবস শ্রমিক সাধারণের বিজয়ের প্রতীক। এ বিজয়ের পথ ধরে তারা সারা পৃথিবীতে বহু আন্দোলনে সাফল্য অর্জন করেছে। সমগ্র বিশ্বের সকল শ্রমিকদের নিকট মে দিবসের অনুভূতি এক রকম নয়। তাদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা এখন সম্মানজনক অবস্থানে আছে। অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ সমূহে এখনও শ্রমিকরা নানা বঞ্চনার শিকার। ফলে তাদের এ দিবস পালনে রয়েছে সংগ্রামের চেতনা।
বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ আজো মালিক সুবিধাবাদী শোষণের শিকার। বিভিন্ন কলকারখানায় কর্মরত শ্রমিক এখনো দুর্দশার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করছে। স্বল্পমূল্যে তারা শ্রম দিচ্ছে বলে এখনো তাদের জীবনে মে দিবসের বাণী কোন সুফল বয়ে আনতে পারেনি। তাই তারা সংগ্রামী চেতনায় সব-সময় উজ্জীবিত থাকে।
অনেক আগেই মে দিবস শতবর্ষ অতিক্রান্ত করেছে। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, মে দিবসের আলাকে শ্রমিক জীবনের অমোঘ অন্ধকার অপসৃত হয়েছে। তাদের সংহতি দৃঢ় হয়েছে।
আবার এটাও ঠিক তারা এখনো সামন্ততান্ত্রিক শোষণ থেকে মুক্ত হতে পারেনি। প্রবল শক্তিমান সা¤্রাজ্যবাদীর কবলে এখনোও তারা যন্ত্রণাকাতর।
শিল্পক্ষেত্রে শ্রম দক্ষতার সাক্ষর রাখতে হবে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘কুলি-মজুর’ কবিতার এই অসামান্য লাইন দুটো জানান দেয় শ্রমিকের সম্মান, প্রকৃত মর্যাদা। শিল্পক্ষেত্রে শ্রম-দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে মহান মে দিবসের চেতনায় শ্রমজীবীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
শ্রমিকদের যথার্থ মূল্য ও মর্যাদা না দিতে পারলে জাতীয় উন্নতির পথ উন্মুক্ত হবে না। সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলে সকলের অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT