ধর্ম ও জীবন

  ঈমান, আমল ও বাস্তবতা

মুন্সি আব্দুল কাদির প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০৫-২০১৯ ইং ০০:৫৬:৩৭ | সংবাদটি ২২৫ বার পঠিত

একজন অমুসলিম ইসলামকে জানার জন্য বা ইসলামকে নিয়ে ব্যঙ্গ করার জন্য, ইসলামকে নিয়ে বিতর্ক বাহাস করার জন্য অথবা ইসলামের বিপক্ষে লেখার জন্য ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা করে থাকে। ইসলামকে নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে সে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ, রাসুল সা. এর রিসালত নিয়েও অনেক সময় পড়াশোনা করে। এই পড়াশোনা বা জানার কারণে সে মুসলমান হয়ে যায় না। সে যদি আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদে বিশ^াসী না হয় এবং রাসুল সা. কে আল্লাহর রাসুল হিসেবে মেনে না নেয়, তবে সে ঈমানদার হতে পারে না। এই বিশ^াস তার মুখে, কর্মে চিন্তা চেতনায় সব খানেই প্রতিফলিত হবে। এই জন্যই দেখি যে ব্যক্তি বুঝেশোনে ইসলাম ধর্মে ফিরে আসে। তার পুরো জীবনটাই পাল্টে যায়। তখন আগের মানুষ আর ইসলাম গ্রহনের পরের মানুষটির মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ হয়ে যায়। এমনটিই ঘটেছিল সাহাবা রা. গনের জীবনে এর পরবর্তীতে এবং বর্তমান কালেও এরূপই ঘটছে।
ঈমানের ব্যাখ্যায় আরো গভীরে গিয়ে আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রাহ. ইকফারুল মুলহিদীনে হাফেজ ইবনুল হাজার আসকালানী রাহ. এর সহিহ বোখারী শরীফের বিখ্যাত ব্যাখ্যা গ্রন্থ ফাতহুল বারীর বরাত দিয়ে লিখেছেন, কোন কাফেরের শুধুমাত্র রাসুল সা. এর নবুওয়াতকে স্বীকার করে নেওয়াই তার ঈমানদার হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত ইসলামের সমস্ত বিধানের উপর আমল করার বিষয়টি তার নিজের জীবনে জন্য অত্যাবশ্যক করে না নেবে, ততক্ষণ সে কাফেরই থেকে যাবে।
একটি মানুষ তার দেহ এবং রূহ এই দুটির সমন্বিত রূপ। রূহ ছাড়া দেহকে যেমন মানুষের পরিচয় বলে না। শুধু তার লাশ বলা হয়। তেমনি আমল ছাড়া ঈমানও একটি লাশের মত। পার্থক্য এটুকু যে মানুষ মারা যাওয়ার পর লাশের ভিতরে আর রূহ ফেরত আসে না তাকে তাড়াতাড়ি দাফন করতে হয়। কিন্তু আমলবিহীন লোক যেকোন সময় আমল শুরু করতে পারে। লাশ দিয়ে যেমন কোন কাজ করা যায় না। লাশের যেমন কোন মূল্য নেই। বরং লাশকে কবরস্ত করার জন্য অনেকের ব্য¯ত হতে হয়। তেমনি আমলহীন ইমানের দাবীদারগনও ইসলামের সম্পদ নয় বরং বোঝা। একটি মানসিক বিকারগ্রস্ত সন্তান যেমন পিতা মাতার জন্য দুশ্চিন্তার কারন, কষ্টের কারণ, পরিবারের বোঝা। আমলবিহীন মুসলমানও ঠিক তেমনি।
ইসলামের সোনালী যুগে মুসলমাদের আমল আখলাক দ্বারাই সারা বিশ^জয় করেছিল। আমরা যদি দেখি আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমির দিকে। একসময় আমাদের পূর্ব পুরুষগণ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হয় হিন্দু অথবা বুদ্ধ থাকারই সম্ভাবনা বেশী। তারা কিসের কারণে অন্য ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন? শক্তি দিয়ে দেশ জয় করা যায়। মানুষের অন্তরের বিশ^াস, ধর্ম পরিবর্তন করানো যায় না। সুদূর আরব থেকে কয়েকজন মানুষ পায়ে হেটে বা ঘোড়ায় চড়ে বা নৌকায় চড়ে এসে একটি দেশ, একটি ভূখন্ড শক্তিতে জয় করে ফেলবে এটা বাস্তবতা নয়। কখনও হয়তো তাদের একটি গুষ্টি বা দলের সাথে অথবা রাজন্যবর্গের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছে। কিন্তু তাদের আমল আখলাক, চরিত্র মাধুর্য, চিন্তা চেতনা, আল্লাহ তায়ালার উপর একান্ত নির্ভরতা, ইসলামের বিধানগুলোর সৌন্দর্য আপামর জনসাধারণকে তাদের দিকে আকৃষ্ট করেছে। দলে দলে লোক ইসলামের ছায়াতলে এসেছে। আমাদের পূর্ব পুরুষগণ আল্লাহ কে পেয়েছে। আমরাও খুব সহজে ইসলামের আহবান শুনতে পেয়েছি।
আমরা যারা জন্মসূত্রে মুসলমান হয়েছি। অর্থাৎ মুসলমান পিতা মাতার ঘরে জন্ম নেওয়ার কারণে অতি সহজে ইসলাম পেয়েছি। এটাও আমাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার বিরাট এক বিরাট নেয়ামত। এর জন্য সর্বাগ্রে আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করা উচিত। আর এই নেয়ামতের শুকরিয়া আদাই করার যে তৌফিক পেয়েছি তার জন্যও আবার শুকরিয়া আদায় করা দরকার। একেতো পৃথিবীর বেশীর ভাগ মানুষ হেদাায়েতের পথ গ্রহণ করেনি, আমরা সকলের নিকট হেদায়েতের আহবান পৌছাতে পারিনি, আমরা যারা ইসলামের অনুসারী বলে দাবী করি তারা অনেকাংশ ইসলামের অনুশাসন মেনে চলি না বা চলার চেষ্টা করি না বা অনেক ক্ষেত্রে ইসলামের অনুশাসনের বিপক্ষে রুখে দাড়াই।
সারা পৃথিবীতে আমাদের অবস্থা আরও করুণ। কোথাও অন্য ধর্মের অনুসারী দ্বারা আমরা নির্যাতনের স্বীকার, কোথাও নিজেদের মধ্যে জুলুমের স্বীকার সবখানে অশান্তি আর অশান্তি। এই অশান্তি যেন আমাদেরকে পিছু ছাড়ছেনা। বর্তমান পৃথিবীতে আমরা জ্ঞানে পিছিয়ে, শক্তিতে পিছিয়ে, বুদ্ধিতে পিছিয়ে। জনসংখ্যায় আমরা পিছিয়ে নেই। আমরা বিশ^ নেতৃত্বে নেই। এর কারণ কি? আগেকার মুসলমানদের চরিত্র মাধুর্য দেখে একজন অন্য ধর্মের লোক মুসলমান হয়ে যেত। আজ আামার চরিত্র কি এমন যে আমাকে দেখে একজন মানুষ মুসলমান হবে বরং আমি বলি আমার চরিত্র এমন যে আমাকে দেখে একজন মুসলমান নামাজীও হয় না।
কুফরের ভিত্তিতে পরিচালিত কোন জাতি যদি শুরু থেকেই কুফরের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে তবে তারা দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠিত থাকলেও থাকতে পারে। কোন জাতি যদি শুরুতে ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে পরে ইসলাম থেকে দূরে সরে যায়। কুফর দ¦ারা পরিচালিত হতে থাকে, তাহলে এটি বেশী দিন টিকবে না। আস্তে আস্তে তা ধ্বসে যাবে। কোন কিছুর ভিত্তি যদি নড়বড়ে হয়ে যায়, ভিত্তি যদি ধ্বংস হয়ে যায় যায় তাহলে ঐ বস্তুও ধ্বংস হয়ে যায়। ভূমিকম্প কোন দালানের চূড়াকে আক্রমন করে না। সে জমিনকে নাড়া দেয়। জমিনকে নাড়া দেওয়ার সাথে সাথে জমিনের উপর দাড়ানো দালানের ভিত্তি টলতে থাকে। ভিত্তি যখন দুর্বল হয়ে যায়, দাঁড়ানের শক্তি হারিয়ে ফেলে তখন পুরো দালানটি ধ্বসে যায়।
আমাদের ভিত্তি ঈমান। ঈমান হল বিশ^াস আর কর্মের সমষ্টি। কর্ম না থাকার কারনে বা কর্মে আতœনিবেদন না থাকার কারণে আমাদের কর্ম হয় দায় সারা গোছের ফলে আমাদের ইমানের মজবুতি আসে না। আমাদের আমল পরিপক্ক হয় না। ঈমান শক্তিশালী হয় না। আমাদের আখলাকে পরিবর্তন আসে না। আল্লাহর সাথে বন্ধত্বের সম্পর্ক হয় না। আল্লাহর গাইডে আমি পরিচালিত হই না। ফলে জীবনের সৌন্দর্য বিকশিত হয় না। মনে হয় যে আমি পিছিয়ে পড়া জাতি। আমি হিনমন্যতায় ভুগতে থাকি, এই বলি আমি শেষ হয়ে গেলাম।
আমরা যদি সারা পৃথিবীর দিকে তাকাই তাহলে এই বিষয়টি আমাদের সামনে আসে যে সমাজের মুসলমানগণ ইসলামকে যত বেশী মেনে চলে সে সমাজে তত শান্তি বিরাজ করে। ইসলাম ছাড়া আমাদের অন্য কোথাও শান্তি নেই, মুক্তি নেই। আমরা উন্নতি আর অগ্রগতির জন্য যতই ইসলাম থেকে দূরে সরেছি, ততই আমাদের উপর বিপদ মুসিবত, অশান্তি এসে হানা দিয়েছে।
আমাদের শান্তির বুনিয়াদ ইমানের উপর নির্ভরশীল। আমরা যত বড় ঈমানদার হব, আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক যত মজবুত হবে। আল্লাহর প্রেমে আমরা যত আত্মহারা হব, ইসলামকে যত বেশী অনুস্মরণ করব তত বেশী শান্তি আর নিরাপত্তা পাব। আর পরকালে পাব অনাবিল শান্তির জান্নাত। পাব মাওলার দিদার। আমরা পরিচালিত হব মহান প্রভুর নির্দেশনায়। রাসুল সা. বলেন, তোমরা মুমিনদের দূর দৃষ্টির দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখ কারন তারা আল্লাহর নূর দেখে চলে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT