পাঁচ মিশালী

রেগে গেলেন হেরে গেলেন

ইছমত হানিফা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৫-২০১৯ ইং ০০:১০:৩০ | সংবাদটি ২১১ বার পঠিত

প্রচলিত একটা প্রবাদ হচ্ছে-দোষে গুণে মানুষ। এই গুণের বিপরীতে প্রথম যা, তা হচ্ছে রাগ। যে কোন মানুষের গুণের অন্তরায় হচ্ছে রাগ। এই রাগ সম্পর্কে বলতে গিয়ে পিয়েত্রো এরেটিনো বলেছেন- ‘রাগ হলো এক বিশেষ শক্তি, যা একটি বড় হৃদয়কে তার সুকুমার বৃত্তি থেকে বিচ্যুত করে। যদি সেই পাথরের যুগ থেকে শুরু হওয়া সভ্যতা নিয়ে ভাবি তবে দেখা যাবে, বর্তমান পৃথিবীতে বসবাসকারী মানুষের সিংহভাগই অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করে থাকে।
জাতিসংঘ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী অনেক দেশেই দারিদ্রের হার কমেছে এবং মানুষের সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল বাড়ছে। মানব জাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, উন্নত বিশ্বে বসবাসকারী মানুষের অধিকাংশই অন্যান্য যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি নিরাপদ এবং সমৃদ্ধ জীবন যাপন করছে। প্রশ্ন থেকে যায়, যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের আশেপাশের এত মানুষকে কেন সবসময় ক্রুদ্ধ, রাগান্বিত মনে হয়?
রাস্তায় চলাচল করার সময়, সামাজিক মাধ্যমে বা কোন রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করার সময় মানুষের ক্ষোভ যেভাবে প্রকাশিত হয়, তা দেখে কেউ যদি ধারণা পোষণ করে যে, পৃথিবীর মানুষ আসলে চিরস্থায়ী ক্রোধের মধ্যে ডুবে আছে-তাহলে তাকে খুব একটা দোষ দেয়া যায় না। ব্রিটিশ সাংবাদিক এবং লেখক অলিভার বার্কেম্যানের লেখালেখির বিষয়বস্তু হলো কীভাবে সুখের সন্ধান পাওয়া যায়। এই বিষয়ে গবেষণা করতে গিয়েই তিনি ক্রোধ বিষয়টিকে আরো ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করেছেন। তিনি খুঁজে বের করতে চেয়েছেন যে, আমরা কেন রেগে যাই? কোন বিষয়গুলো রাগ চড়িয়ে দেয়? অথবা রাগ করা কি আসলে খারাপ? এই প্রসঙ্গে ফ্রান্সিস বেকন বলেছেন কোন মানুষই নিজের রাগকে খারাপ বলে মনে করে না। প্রকৃতির সাথে মানুষের অভিযোজনের শুরুর দিকে, একজন ব্যক্তির আরেকজনের ওপর ক্রুদ্ধ হওয়ার ইচ্ছা আসতো কীসের থেকে? যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইয়োর হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান ও অপরাধ বিজ্ঞানের অধ্যাপক অ্যারন সেল বলেন, ‘ক্রোধ খুবই জটিল একটি বিষয়।’
নাটকীয়ভাবে বর্ণনা করলে বলা যায়, এটি মানুষের মন নিয়ন্ত্রিত একটি যন্ত্র। আরেকজন ব্যক্তির মাথায় ঢুকে নিজেকে ঐ ব্যক্তির কাছে আরো গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার একটি পদ্ধতি। তাদের মন পরিবর্তন করে তাদের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে জয়ী হওয়ার একটি প্রক্রিয়া। তবে হ্যাঁ ক্রোধ দমন বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারা একটি মহৎ গুণ। প্রফেসর সেল বলেন এই মন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা রাখে মানুষের রাগান্বিত চেহারা। বিজ্ঞানের পরীক্ষায় অনেক কিছুর সমাধান না আসলেও কেন? কি? এর উত্তর কিন্তু আছে। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে প্রমাণ করেছেন যে, ক্রুদ্ধ হলে মানুষের ভ্রু বিস্তৃত হয়ে যাওয়া, নাসারন্দ্র প্রসারিত হওয়া এবং চোয়ালের পুরুত্ব বেড়ে যাওয়ার মত পরিবর্তনগুলো মানুষ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে, রাগ হলো মানুষের মুখের অভিব্যক্তিতে যেসব পরিবর্তন হয়, তার প্রত্যেকটির ফলেই মানুষকে শারীরিকভাবে শক্তিশালী দেখায়। রাগান্বিত মানুষ তার মুখ খোলা রাখে এবং চক্ষুদ্বয় বন্ধ রাখে। এই বিষয়গুলো মানুষ শেখে না। বরং জন্মসূত্রে অর্জন করে, কারণ অন্ধ শিশুরাও একই ধরনের ক্রুদ্ধ অভিব্যক্তি প্রকাশ করে ‘রিক্যালিব্রেশনাল থিওরির’ মতে-‘আপনি এমনটা ধারণা করতেই পারেন যে, আমাদের পূর্ব পুরুষদের মধ্যে যারা ক্রুদ্ধ হতো না এবং সংঘর্ষে জড়াতো না, তারা দ্রুত রেগে যাওয়া ব্যক্তিদের চেয়ে বেশিদিন বাঁচত-তবে বিষয়টি আসলে সেরকম নয়। প্রফেসর সেল এর মতে-‘একটি বিশেষ ধাঁচের রাগ যেসব মানুষের মধ্যে ছিল তারা অন্যদের চেয়ে বেশি হারে বংশবৃদ্ধি করেছে। স্বার্থের সংঘাতে বিজয়ী হয়ে এবং আরো ভালো জীবনযাপনের লক্ষ্যে ক্রমাগত দর-কষাকষির মাধ্যমে তারা সেটি সম্ভব করেছে।
সময়ে সেসব মানুষই টিকে ছিল যারা অন্যান্য সাধারণ মানুষকে সাহায্য করা বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিতো এবং নিজেদের গুণকীর্তন এমনভাবে অন্যদের বারবার মনে করিয়ে দিতো যার ফলে অন্যান্য সাধারণ মানুষ তাদের সম্পর্কে ক্রমাগত উঁচু ধারণা পোষণ করতো এবং কৃতজ্ঞতা বোধ করতো-যে কারণে ঐসব ব্যক্তিদের সাথে ভালো ব্যবহার করতো। বিশ্লেষণ করে বলা যায়-ক্রুধ ঐ ধরনের মানুষকে অভিযোজনে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতে ক্রোধ একটি আত্মঘাতি শক্তি। রাগকে বোঝার জন্য আমাদের ভাবতে হবে যে এটি আমাদের মধ্যে কী ধরনের শারীরিক পরিবর্তন ঘটায়, এর ফলে আমাদের আচরণে কী পরিবর্তন আসে, রাগের বশবর্তী হয়ে আমরা কী চিন্তা করি এবং কী চিন্তা করতে পারি না। যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান। বিভাগের প্রধান প্রফেসর রায়ান মার্টিন, যিনি ক্রোধ বিষয়ে গবেষণা করেন। তিনি বলেন রাগ হলে মানুষের সহানুভূতিশীল ¯œায়ুবিক কার্যক্রম শুরু হয়। রাগ হলে হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন হয়ে যায়, রাগান্বিত ব্যক্তি ঘামতে শুরু করে, পরিপাক ক্রিয়া ধীরগতিতে থাকে। ব্যক্তি যখন মনে করে যে, তার সাথে অবিচার করা হচ্ছে, তখন শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে এ ধরনের উপসর্গ প্রকাশ পায়। একই সাথে মস্তিষ্ক ভিন্ন আচরণ করা শুরু করে। মানুষ যখন, তীব্রভাবে কিছু অনুভব করে তখন চিন্তা ভাবনার অধিকাংশই ঐ একটি বিষয় কেন্দ্রিক হয়ে থাকে। তখন তারা টিকে থাকা বা প্রতিশোধ নেয়ার বিষয়টিকেই বেশি প্রাধান্য দেয়।
কোন বিশেষ একটি অবিচার বা অন্যায়ের বিষয়ে চিন্তা করা বা তার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করার সময় অন্য কোন বিষয় নিয়ে মানুষের মস্তিষ্ক করতে চায় না-এটিও অভিযোজনের আশ বস্তুত আধুনিক জীবন রাগকে আরো ত্বরান্বিত করছে। আপাত দৃষ্টিতে, বর্তমান সময়ে উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ মানুষেরই তাদের পূর্বসূরিদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম সংগ্রাম করে জীবনযাপন করতে হয়। তাহলে আধুনিক জীবনকে কেন এত ক্রোধ উদ্রেককারী বলে মনে হয়। প্রফেসর মার্টিন বলেন, ‘মানুষ আগের চেয়ে ব্যস্ত এবং তাদের জীবনে চাহিদা অনেক বেশি। কাজেই জীবনের উদ্যম কমে যাওয়ার পরিণাম চিন্তা করলে মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সুপার মার্কেটের লাইনে দাঁড়ালে অথবা কোন জরুরি সেবা নিতে গিয়ে অহেতুক অপেক্ষা করতে হলে আমরা অনেক দ্রুত রেগে যাই। এর একমাত্র কারণ আমাদের কাছে নষ্ট করার মত সময় নাই।
আমাদের রাগের কতটুকু আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। ক্রোধ আত্মা ও সভ্যতার শত্রু। ক্রোধের দ্বারা কারো কখনো মঙ্গল সাধিত হয় না, বরং বিনাশ, বিনষ্টি ও ক্ষতিসাধিত হয়ে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই, যে ব্যক্তির উপর আমরা রেগে থাকি, তাকে আরো বেশি আঘাত দিয়ে কোন লাভ হবে না। কাজেই রাগ কমাতে আমাদের অন্য পন্থা অবলম্বন করতে হবে।
জেরুসালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মায়া তামির বলেন, আমরা যতটুকু মনে করি, রাগ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে আমাদের তার চেয়ে বেশি ক্ষমতা রয়েছে। মায়া বলেন, ‘যদি জন্মসূত্রে অর্জন করার পাশাপাশি আবেগ তৈরি করা এবং শেখা যায়, তাহলে ক্রোধের মত আবেগের ক্ষেত্রে সব মানুষ হয়তো একইরকম প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করবে না।
চাইলেই রাগকে একেবারে ঝেড়ে ফেলা যায় না। আবার এই রাগ কখনো কল্যাণকরও হয়। মানুষ যদি তার ক্ষমতা ও সামাজিক অবস্থান ধরে রাখার উদ্দেশ্যে ক্রোধকে ব্যবহার করে তাহলে তার পরিণাম ভয়াবহ হতে পারে। তবে মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ক্রোধের বশবর্তী না হয়ে মানুষ তার মনকে একীভুত করে তার বিরুদ্ধে হওয়া অবিচারের প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা রাখে। দার্শনিক এবং মনোরোগ চিকিৎসক মার্ক ভারনন বলেন, প্লেটোনিক এবং অ্যারিস্টটলিয়ান চিন্তাধারায় ধারণা করা হতো যে, ‘সঠিক ক্রোধ বলে একটি বিষয় রয়েছে। ক্রোধ যখন কাউকে ‘সাহসের সাথে একটি অবিচারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে অনুপ্রেরণা দেয় অথবা গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে ন্যায়বিচারের পটভূমি তৈরি করে দেয়-তখনই সেই রাগকে ভালো না বলার কোন কারণ থাকতে পারে না।
রাগ না করাই উত্তম, আমরা নিজেদের বিবেকের কাছে জাগ্রত থাকলে, যত যাই ঘটুক না কেন, রাগকে আয়ত্বে রাখতে পারবো।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT