পাঁচ মিশালী

ব্ল্যাকহোল : বৈজ্ঞানিক ধারণা থেকে বাস্তবতার পথে

হেলাল হামাম প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৫-২০১৯ ইং ০০:১২:৩৪ | সংবাদটি ২৩১ বার পঠিত

দশ এপ্রিল ২০১৯, পৃথিবীবাসী এক বিরল অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত করেছে। ব্ল্যাকহোল (কৃষ্ণগহ্বর) নামক দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক ধারণাকে বাস্তবতার দরজায় পৌঁছুতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের এতদিনের গবেষণা সার্থকতার দিকে যাত্রা করলো সেদিন। ১৮ শতক থেকেই ব্ল্যাকহোল নামক বৈজ্ঞানিক ধারণা নিয়ে অনেক আন্দাজ-অনুমান করার পাশাপাশি সাইন্স ফিকশনেও বেশ জোরেসুরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল ধারণাটি। কিন্তু ১০ এপ্রিল ব্ল্যাকহোলের ছবি প্রকাশের পরই সুদীর্ঘ এই অনুমান রীতিমতো হুমকির মুখে পড়েছে। এদিকে, বিজ্ঞানপ্রিয় সবার কাছে ঘটনাটি চাঞ্চল্যকর ও বেশ আনন্দদায়ক।
নভোম-লের কোন বিশাল অদৃশ্য (কৃষ্ণ) অঞ্চল বা বস্তুর মধ্যাকর্ষণ বল যদি এতোই তীব্রতর হয় যে, সে সবকিছুকে গ্রাস করে ফেলে, কিন্তু কোনকিছুই তার বা সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না (এমনকি আলোও) তা-ই হলো ব্ল্যাকহোল। যা আয়তনে হয় প্রকা-কায়। সে যাইহোক, সংজ্ঞানুযায়ী বুঝা যাচ্ছে, ব্ল্যাকহোলের কোন স্থিরচিত্র পাওয়া সম্ভব না। কারণ ছবি তুলার জন্য ক্যামেরা থেকে যেসব আলোকতরঙ্গ প্রেরিত হবে তা ব্ল্যাকহোল শুধু গ্রাসই করবে, ফিরিয়ে দেবে না। তাহলে সেদিন কী দেখলাম ঐ ছবিতে? প্রশ্ন উঠবেই। ব্ল্যাকহোলের মাত্রাতিরিক্ত মাধ্যাকর্ষণ বল একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে এসে দুর্বল হয়ে যায়, তখন যেকোন ব্লাকহৌলের সেই পৃষ্ঠীয় অঞ্চল হতে আলো দেখা যেতে পারে। আর এই অঞ্চলটাকে বলা হয় ইভেন্ট হরাইজন। স্থিরচিত্রটি আসলে ছিলো এই ইভেন্ট হরাইজনের। ছবিতে সেই অংশটিকে, রিং আকৃতির, আমরা আলোকিত দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু অসমভাবে বিন্যস্ত হওয়ার কারণ- ব্ল্যাকহোলের অত্যাধিক মধ্যাকর্ষণ বল আলোকে বাঁকিয়ে দেয়।
আমাদের সৌরজগত থেকে ব্লাকহৌলটির দূরত্ব ও সূর্যের তুলনায় তা কতো বড় এসব শুনলে দেহ ও মনে রীতিমতো কাঁপুনি ওঠে। মহাকাশবিজ্ঞানীদের দেয়া তথ্যানুযায়ী, Powehi (হাওয়াইয়ান নাম) নামক ব্ল্যাকহোলটির অবস্থান হলো, পৃথিবী থেকে ৫.৫ কোটি (সাড়ে পাঁচ কোটি) আলোকবর্ষ দূরের গ্যালাক্সি গ৮৭ (মেসিয়ার ৮৭) এর প্রাণকেন্দ্র। তাহলে ব্ল্যাকহোলটির আনুমানিক দূরত্ব দাঁড়ায়, আলো পৃথিবী থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি বছরে যেতে যত দূরত্ব অতিক্রম করে অর্থাৎ ৫০ লক্ষকোটি কোটি কিলোমিটার (ভালোভাবে দেখুন, ৫০ কোটি না কিন্তু...)। তো, পৃথিবী থেকে ঐ ব্ল্যাকহোলে আলো'র যেতে সময় লাগবে ৫.৫ কোটি বছর। আলো কিন্তু এক সেকেন্ডে যেতে পারে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার!
মাথায় রাখতে হবে, ১ আলোকবর্ষ সমান ৯.৪৫ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার (১ ট্রিলিয়ন মানে ১ লক্ষকোটি)। ব্যাপারটিকে আরও বাস্তবমুখী করতে আমরা এযাবৎকালের সবচেয়ে দ্রুতগামী স্পেইসক্রাফট (মহাকাশযান) কে বিবেচনায় আনবো। Parker Solar Probe নামক স্পেইসক্রাফটটি ২০১৮ সালে মহাকাশ গবেষণায় বিপ্লব ঘটিয়েছে। কারণ এই যানের সর্বোচ্চ গতি প্রতি সেকেন্ডে ১৯২ কিলোমিটার। সুবহানাল্লাহ! অর্থাৎ আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসি থেকে জাপানের টোকিওতে যেতে ১ মিনিটও লাগবে না। এই গতিতে চাঁদে যেতে লাগবে মাত্র ৩৩ মিনিট আর সূর্যে যাওয়া যাবে মাত্র ২১৭ ঘন্টায় বা ৯ দিনে।
ধরুন, সবচেয়ে দ্রুতগামী এই মহাকাশযানে করে আপনি ঘুরে আসতে চান ব্ল্যাকহোলটিতে। তাহলে আপনি কি এই ৬০, ৭০ বা ৮০ বছরের জীবনে তা সম্পন্ন করতে পারবেন?
পারবেন না যে এতে তো কোন সন্দেহ নেই-ই, দুনিয়ার সবচেয়ে দ্রুতগামী যান Parker Solar probe এ করে আপনার শুধু যেতেই লাগবে ৮৬০০ কোটি বছর.....! কল্পনা করা যাচ্ছে?
আবারও বলি, যদি প্রতি সেকেন্ডে আপনি ১৯২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারেন, তবু ঐখানে যেতে লাগবে প্রায় ৮ হাজার ৬শ’ কোটি বছর....! (ইয়া মাবুদ, আমরা তো ১০০ বছর বাঁচিই না)
ব্ল্যাকহোলটি আকারে কতো প্রকা- তা বলতেও ভয় পাচ্ছি! কারণ আমরা জানি, পৃথিবী থেকে সূর্য ১৩ লক্ষ গুণ বড়। তাহলে ব্ল্যাকহোলটি কতো বড়? প্রায় ৬৫০ কোটি সূর্যকে একত্র করলে যতটুকু জায়গা লাগবে ব্ল্যাকহোলটির চাই ততটুকুই। কী দানবাকৃতির ব্লাকহোল!
এবার আরও অবাক করা কাহিনী, ব্ল্যাকহোলটির যে স্থিরচিত্র আমরা সেদিন প্রত্যক্ষ করেছি, তা কিন্তু সদ্য তোলা। ছবিতে যে মূহূর্তের অবস্থা আমরা দেখেছি অর্থাৎ যে দৃশ্যটা ক্যামেরাবন্দী হয়েছে তা কিন্তু সদ্য না। এটা প্রায় ৫.৫ কোটি বছর আগের দৃশ্য! সাড়ে পাঁচ কোটি বছর আগের কোন একদিনের অবস্থার চিত্র আমরা দেখেছি। আমরা যদি আজ ব্ল্যাকহোলটিকে কেমন লাগছে, সেই দৃশ্যটি দেখতে চাই তাহলে অপেক্ষা করতে হবে মাত্র সাড়ে পাঁচ কোটি বছর!
কারণ, কোন বস্তুর উপর আলো পড়লে তা প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসলে আমরা বস্তুকে দেখি। সেই হিসেবে সাড়ে পাঁচ কোটি আলোকবর্ষ দূরের বস্তু থেকে আলো আসতে সময় লাগবে সাড়ে পাঁচ কোটি বছর। আর আজকের অবস্থা দেখতে আজ যে আলো ঐ বস্তুর উপর পড়বে সেই আলোকেই আমাদের কাছে আসতে হবে। সুতরাং আলো আসতে যতদিন লাগবে ততদিন অপেক্ষা করতেই হচ্ছে।
কী আচানক হিসাব-নিকাশ! কী প্রকা-, রহস্যঘন মহাবিশ্ব। মহাবিশ্বের অতি নগণ্য অংশ আবিষ্কারের পরই যেভাবে অবাক হচ্ছি, আগামিতে কী যে হবে তা কল্পনা করাও কঠিন। আর মহাবিশ্বের বাইরের জগৎ কেমন তা তো কল্পনাতীত! কিন্তু এইসব আবিষ্কার মানব সভ্যতাকে কতটুকু এগিয়ে নিচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন নিয়মিতই উঠে। এই যেমন, ব্ল্যাকহোলটির ছবি তুলার জন্য প্রায় ৪০ মিলিয়ন পাউন্ডের একটা বাজেট ছিলো। এগুলো কেউকেউ বিলাসী কর্মকা- বলে অভিহিত করছেন, কেউ আবার বলছেন, খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
সবশেষে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। এই মহাবিশ্ব কতো বড়? কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বিশাল এই মহাবিশ্ব?
বিজ্ঞান এখনও শিশুতোষ পর্যায়ে থাকায় এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান করে দিতে হয়। বিজ্ঞান বাস্তবতা পর্যবেক্ষণের পরই নিশ্চিত হয়। সুতরাং অপর্যবেক্ষণযোগ্য কোন কিছুতে বিজ্ঞান নীরবতা পালন করে।
সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেন, তিনি (আল্লাহ) আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে অনস্তিত্ব হতে অস্তিত্বে নিয়ে আসেন এবং যখন তিনি কিছু করবার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন শুধু বলেন হও, আর তা হয়ে যায়। ‘(০২ : ১১৭)’
আল্লাহ-ই এই মহাবিশ্বের ¯্রষ্টা, সবকিছুরই। সার্বভৌম ক্ষমতা একমাত্র তাঁর। মহাবিশ্বের পরতে পরতে আল্লাহর সাইন (নিদর্শন) ঝলঝল করছে। কেবল দিল-এ-ফিতরত (প্রকৃতি অনুধাবনক্ষম হৃদয়) সম্পন্নরাই এসব নিয়ে চিন্তাভাবনা করে।
সেজন্য তিনি কোরআনে বলেন, “হে নবী বলুন, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি এক হতে পারে? আলো ও অন্ধকার কি এক ও অভিন্ন হতে পারে?” (সূরা রাদ, আয়াত-১৬)।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT