পাঁচ মিশালী

লজিং জীবন

সৈয়দ আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৫-২০১৯ ইং ০০:১৪:৩০ | সংবাদটি ২১৮ বার পঠিত

সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার ¯েœহ মমতা কতটুকু গভীর তা পরিমাপ করা কঠিন। সন্তানের কাছে পিতামাতা হল আচ্ছাদন। শিশু জন্ম নেওয়ার পর নতুন এই অপরিচিত পৃথিবীতে সে যখন একান্ত একা ও অসহায়, তখন এই নিরুপায়ত্বের সাথী হয় মা; আর ভরসা হয় পিতা। পরবর্তী বর্ধনশীল শিশুর জীবনে প্রয়োজন হয় ¯েœহাশীল যতœ, পরিচর্যা ও বলিষ্ট সাহচার্য্য। তখন মায়ের মমতা ভরা ¯েœহ আর পিতার সোহাগ ভরা দৃঢ়তার সাথে দেয়া হয় সেই সাহচার্য্য। হিংসা হানাহানিপূর্ণ কুঠিল এই পৃথিবীতে অ-প্রতিরোধ্য আপদ-বিপদ ও দুঃখ-কষ্ট থেকে রক্ষা করার জন্য যে বলিষ্ট হাত শিশু-কিশোর সন্তানের মস্তকে সর্বদা আশীর্বাদ হয়ে ছায়া দেয়, সে হাতটি হলো পিতার। যে পিতামাতার এমন দায়িত্ববোধ আছে তারা বাস্তবিকেই মহান। সকল সন্তানের প্রতি আমার অনুরোধ, যদি তোমার অন্তরে তোমার মাতাপিতার প্রতি সামান্যতম কৃতজ্ঞতা ও মঙ্গল চিন্তা ও ইচ্ছা থাকে তবে তাদেরকে গালি দিও না, কষ্ট দিওনা, অবহেলা করো না। কেননা যে গৃহে পিতামাতা জীবিত থেকেও নেই, ¯েœহের শীতল হাতের স্পর্শ ও সৃষ্টিকর্তার রহমতও সে গৃহে থাকতে পারে না। ইসলাম ধর্মে এ কথাটি গুরুত্বের সাথে মেনে চলার জন্য তাগিদ রয়েছে। আমার ‘মা’ শিশুকালেই আমাকে রেখে পরপারে আল্লাহর আশীর্বাদ লাভ করেছেন ফলে শিশু-কিশোর বয়সে আমি মায়ের ¯েœহ মমতা থেকে ছিলাম বঞ্চিত কিন্তু উনার ¯েœহ না পেলেও সর্বদা আশীর্বাদ ছিল বলেই আজ আমি লিখতে পারছি। আমার পিতা আমাকে মায়ের অভাব বুঝতে দেননি। তিনি পিতামাতা উভয়ের ¯েœহমমতা দিয়ে আমাকে মানুষ করতে চেষ্টা করেছেন তাই আমার জীবনের জন্য আমার পিতা ছিলেন একজন আদর্শ ও আশীর্বাদ। এমন আদর্শ পিতার সন্তান হিসাবে আজ গর্ববোধ করছি এবং সৃষ্টিকর্তার কাছে উনাদের জান্নাতুল ফেরদৌস দানের জন্য কামনা করছি।
১৯৬৮ সাল আমার জন্য যে লজিংটি ঠিক করেছেন তা আমাদের বাড়ির পার্শ্বের বাড়ির জনাব নিজাম উদ্দিন চাচাদের আত্মীয় হয় বিধায় আমার আর অসুবিধায় পড়তে হয়নি। তারপরও এটাই যখন জীবনের প্রথম লজিং (Lodging) ছিল এবং আমি ছিলাম কিশোর বয়সী বালক এবং কোনো কক্ষে একা একা ঘুমানোর অভ্যাস ছিল না বরং একা ঘরে ঘুমাতে ভয় পাই তাই আমার পিতা ছিলেন শঙ্কিত।
তারপরও লেখাপড়া করতে চাইলে ভয় ও কষ্টকে মেনে নিতে হবে তাই আমার পিতা আমার জন্য বিছানাপত্রসহ চলাফেরা, লেখাপড়া ও বসবাসের জন্য যাবতীয় পোষাক, বইপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করে দিয়ে নিজামউদ্দিন চাচাকে বল্লেন, ভাই ছেলেটির বয়স কম, রাত্রে কোনো দিন একা ঘরে ঘুমায়নি তাই তাদের বাড়ির কাউকে ছেলেটির সাথে রাত্রে একজন থাকার জন্য বলে এসো। যেহেতু তারা তোমার আত্মীয় তাই তুমি বল্লে হয়তো ওরা তোমার কথা রাখতে পারে। নিজাম চাচা আমাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছিল এবং চোখ দিয়ে পানি ঝরছিল। কারণ জীবনের প্রথম আমি বাড়ি হতে পিতা ছাড়া আলাদা জায়গায় থাকতে ও ঘুমাতে হবে। সেদিন বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মায়ের অভাবটুকু বুঝেছিলাম। বিকালের দিকে লজিং বাড়িতে পৌঁছলাম। নিজাম উদ্দিন চাচা লজিং অভিভাবকের কাছে আমাকে পরিচয় করে দিয়ে বল্লেন, ‘মাতৃহারা ছেলেটিকে আপনার বাড়িতে দিয়ে গেলাম, আপনি তাকে আপনার সন্তানের মত করে রাখবেন, কোনো ধরনের অসুবিধা হলে আমাকে জানাবেন।’ কিছুক্ষণ তাদের সাথে কথা বলে তিনি আমাকে রেখে চলে গেলেন। আমি তাদের একটি ঘরে একা একা নানা চিন্তায় নিমগ্ন থাকলাম।
সন্ধ্যার পর আমার বয়সী ৩/৪ জন ছেলে নিয়ে লজিং অভিভাবক আমার ঘরে ঢুকলেন। সন্ধ্যার সময় এদের মধ্যে বড় ছেলেটি একটি হারিকেন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। তখনকার সময় কুপি বাতিই ছিল প্রতিটি ঘর ও পরিবারের রাতের অন্ধকারে আলোর একমাত্র ব্যবস্থা। তখন গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বাতি ছিল স্বপ্নের বিষয়। বড় বড় শহর, বন্দর ছাড়া অনেক জেলা-উপজেলাতেও বিদ্যুৎ ছিল না। অতিরিক্ত আলোর জন্য তখন কেরোসিন দ্বারা হেজাক লাইট (বাতি) জ্বালানো হতো। গ্রাম-গঞ্জে ওয়াজ মাহফিল বা বড় কোনো অনুষ্ঠান হলে হেজাক বাতি জ্বালিয়ে অতিরিক্ত আলোর ব্যবস্থা করা হতো। তখনকার সময় ছায়াছবির একটি গান খুব বেশি জনপ্রিয় ছিল। গানটি ছিল, ‘ঢাকা শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে’। লাল লাল নীল নীল বাতি দেইখা নয়ন জুড়াইছে’। গ্রাম-গঞ্জে বিদ্যুৎ বাতি ছিলনা বলেই তখনকার সময় গানটি ভাইরাল হয়েছিল। বর্তমান সময়ে বিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুতের বদৌলতে ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো জ্বলমল করছে তাই কেরোসিনের কুপি বাতি ও হেজাক বাতি এখন জাদুঘরে স্থান পেয়েছে। লজিং অভিভাবক ঘরে ঢুকতেই আমি উনাকে সালাম দিলাম। তিনি সালামের জবাব দিয়ে আমার পাশের চেয়ারে বসেই বল্লেন, ‘বাবা তুমি আমার ছেলেদের মত বাচ্চা মানুষ, বয়স অল্প তাই তোমাকে আমার বাসায় শিক্ষক হিসাবে নয় সন্তান হিসাবেই জায়গা দিলাম। আজ হতে (ছেলেদেরকে ইশারায় দেখিয়ে) তুমি আমার ৩/৪টি ছেলেমেয়েকে তোমার সাথে পড়তে বসাবে এবং যতটুকু সম্ভব পড়াতে চেষ্টা করবে। আর তোমার থাকা খাওয়ায় কোনো অসুবিধা হলে তোমার ছাত্রদেরকে বলবে, তাদের দ্বারা সম্ভব না হলে আমি তা সমাধান করে দিব। আজ হতে তুমি আমার ছেলেমেয়ের মত এই বাড়ির একজন সদস্য’।
প্রথম দিন লজিং বাড়ি থেকে স্কুলে যাওয়া-আসা করতে গিয়ে ভালই লাগছিল। তেরাকুড়ি গ্রামের রাস্তাটি ছিল খালের পাড় দিয়ে ফলে রাস্তাটি তেমন ভালো ছিলনা। তাই রাস্তা দিয়ে হাঁটতে সাবধানে হাটতে হতো। মে/জুন মাসে বর্ষা শুরু হওয়ায় কাদা মাটিতে রাস্তা কর্দমাক্ত ও পিচ্ছিল হয়ে পড়ায় হাঁটতে আরও বেশি অসুবিধা হতো। কান্দাগাঁও জুনিয়র উচ্চ বিদ্যালয়টি তেরাকুড়ি গ্রাম থেকে আধা কিলোমিটার দূরত্ব হলেও নদীর পার ও পিচ্ছিল রাস্তা তাই আসা-যাওয়ায় বেশ কষ্ট হতো। কিন্তু সে কষ্ট ও অসুবিধাকে প্রশ্রয় না দিয়ে বরং কষ্টকে জয় করেই প্রথম লজিং জীবন মোটামুটি ভালভাবে চলছিল। কিন্তু কিছুদিন পর বিপত্তি বাঁধলো তখন, যখন তেরাকুড়ি গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে (Chican Fox) বা জল বসন্ত রোগটি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ল। ইতিমধ্যে আমার ছাত্র-ছাত্রীসহ বাড়ির কয়েকজন সদস্য বসন্ত রোগটিতে আক্রান্ত হওয়ায় আমি একটু ভয় পেলেও সাবধানে চলাফেরা করছিলাম। একদিন আমার লজিং অভিভাবক আমাকে বল্লেন, ‘দেখ বাবা আমার ছেলে-মেয়েসহ গ্রামে যেভাবে রোগটি ছড়াচ্ছে, তাতে তুমিও আক্রান্ত হতে পার তাই তোমার মঙ্গলের জন্যই তোমাকে কিছুদিনের জন্য তোমার বাড়িতে চলে যাওয়া উচিত। রোগটির প্রকোপ কমলে পুনঃরায় এসো’। নিজেরও ইচ্ছে ছিল এবং লজিং অভিভাবকের কথায় ইচ্ছাটুকু আরও বেড়ে গেলো এবং পরদিন আমি স্কুল থেকে ছুটি দিয়ে বাড়িতে চলে আসলাম। বিছানাপত্র রেখে সেদিন যে চলে এলাম আর কোনো দিন উক্ত তেরাকুড়ি গ্রামের লজিংটিতে গেলাম না। ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ, সুবিধা-অসুবিধা বুঝার পূর্বেই উক্ত প্রথম লজিং (Lodging) এর সমাপ্তি ঘটলো।
১৯৬৮ সালের দিকে বা তৎপূর্ব থেকেই অত্র অঞ্চলে বসন্ত, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া, কলেরা ইত্যাদি রোগ ব্যাধিগুলো দেশের বিভিন্ন এলাকায় মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়তো। তখনকার সময় এসব রোগগুলোর ভালো বা নিরাময়যোগ্য চিকিৎসা ছিল না। কলেরা বা ডায়রিয়া হলে নিশ্চিত মরণ ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। গ্রাম্য ডাক্তার ছাড়া গ্রামাঞ্চলে ভালো কোনো ডাক্তার পাওয়া সম্ভব ছিল না। যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে মুমূর্ষু রোগীকে শহরের ভালো ডাক্তারের কাছে নেওয়াও সম্ভব হতো না ফলে গ্রাম্য ডাক্তার কবিরাজ ছাড়া ভালো চিকিৎসা ছাড়াই রোগীদের মৃত্যু ঘটতো। গ্রামের ডাক্তারবৃন্দ ডায়রিয়া রোগীকে কিছু স্যালাইন দেওয়া ছাড়া তেমন কোনো চিকিৎসা দিতে পারতো না। তখন ডাবের পানি ছাড়া রোগীকে কোনো প্রকার পানি পান করতে দিতো না ফলে ডায়রিয়া রোগীরা পানি শূন্য হয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে চলে যেতো। তখনকার যুগে এ রোগটিকে ভূত প্রেতের আচড় বলে মানুষ বিশ্বাস করতো তাই মোল্লা-মুন্সি বা কবিরাজ দিয়ে ঝাড়-ফুক করা হতো। রাতের বেলায় রোগটির আচরকারী ভুত প্রেত যাতে গ্রামে ঢুকতে না পারে তাই গ্রামের সবাই রাত্রে পালাক্রমে পাহারার ব্যবস্থা করতো এবং গ্রামবাসী সকলেই কবিরাজের দেওয়া তাবিজ কবজ শরীরে ধারণ করে থাকতো। আমি নিজেও গ্রামে অন্যান্যদের সাথে রাত্রে পাহারা দিয়েছি কিন্তু কোনো উপকার হয়েছে বলে আমার বিশ্বাস হয়নি। কেননা জীবন মরণ একমাত্র আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। আল্লাহর উপর বিশ্বাস থাকলে দুনিয়ার সকল বিপদাপদ ও রোগ ব্যাধি আহসান হবে ইনশাল্লাহ। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর।
প্রায় ১/২ মাস বাড়িতে ঘুরাঘুরির পর মনে হল আমার লেখাপড়ার ভীষণ ক্ষতি হচ্ছে তাই কি করতে হবে তা ভেবে পাচ্ছিলাম না। ইতিমধ্যে পিতা আমাকে বল্লেন, ‘যদি তুই স্কুলে যেতে না চাস তবে যত শীঘ্র সম্ভব কৃষি কাজে লেগে যা। এমনিভাবে তো জীবন চলবে না। জীবনে একটা কিছুতো করে খেতে হবে। চিরদিনতো পিতার হোটেল থাকবে না তাই লেখাপড়া কর অথবা কৃষি কাজ করার জন্য কাজ করতে শিখ।’ আমার কৃষি কাজ ভালো লাগতো না তাই পরদিন স্কুলে গেলাম এবং তাজ উদ্দিনকে পুনরায় একটি লজিং এর ব্যবস্থা করে দিতে বল্লাম। সেদিন বিরতি পর্যন্ত ক্লাশ করে বাড়িতে চলে এলাম। দুই/তিন দিন পর তাজ উদ্দিন আমাকে বাংলাবাজারে সাক্ষাত করে জানালো সে যে গ্রামে লজিং-এ আছে সে গ্রামেই আমার জন্য একটি লজিং এর ব্যবস্থা করেছে। যত শীঘ্র সম্ভব আমি যেন লজিং-এ চলে আসি। তার কথামত আমি পরের দিনই বইপত্র ও বেডিংপত্র নিয়ে দ্বিতীয় লজিং বাড়ির উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে তার লজিং বাড়িতে চলে আসি। তাজ উদ্দিন ও তার বন্ধু আমাকে নিয়ে লজিং বাড়িতে গেলো। আমার জন্য যে গ্রামে লজিং ঠিক করা হলো তা সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলাধীন বর্তমান বোগলা বাজার ইউনিয়নের একটি গ্রাম যার নাম ‘সুনাচূড়া’।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT