পাঁচ মিশালী

সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুনামগঞ্জের টেকেরঘাট

মোঃ বেলাল আহমদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৫-২০১৯ ইং ০০:১৫:০০ | সংবাদটি ১২৯ বার পঠিত

মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অপরূপ শোভায় শোভিত এক নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুনামগঞ্জ। সুনামগঞ্জ, নারায়ণতলা ও টেকেরঘাট সৌন্দর্যের লীলানিকেতন। সুনামগঞ্জ শহর থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার উত্তরে সুরমা নদী পাড়ি দিয়ে নারায়ণতলা এলাকায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অভাব নেই। হালুয়ার ঘাট থেকে রিকশা কিংবা মোটর সাইকেলে যাওয়ার সম্পূর্ণ পাকা রাস্তা। রাস্তাটি হালুয়ারঘাট থেকে সোজা উত্তরে নারায়ণতলা খ্রিস্টান মিশন পর্যন্ত। রিকশায় ৪০ মিনিট সময়ের মধ্যে পৌঁছা যায় সীমান্ত এলাকায়। মোটর সাইকেলে ২৫ মিনিট। অন্যান্য যানবাহন এখনও চলাচল শুরু করেনি। তবে কিছুদিনের মধ্যে টেম্পো চলার জন্য এলাকার মানুষ উদ্যোগী হয়েছে। এখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ নারায়ণতলা খ্রিস্টান মিশন দেখতে যায়। মেঘালয় খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশে নারায়ণতলায় অসংখ্য পাহাড়ি পরিবারের বসবাস। সঙ্গেই রয়েছে ডলুরা শহীদ মিনার।
বাংলা-ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা ডলুরা শহীদ মিনার। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পুরোটাই উপভোগ করার মত। শীত মৌসুমে মানুষ পিকনিকে দল বেঁধে যাচ্ছে, বিনে পয়সায় উপভোগ করছে সৌন্দর্যকে। সরকারি ছুটির দিনগুলোতে প্রচুর দর্শক সমাগম ঘটে এখানে। ডলুরা শহীদ মিনারের পশ্চিম পাশে পাহাড়ি নদী ‘চলতি নদী’ বয়ে চলেছে। বালি আর নুড়ি পাথর সামান্য পানির তলদেশে স্পষ্ট দেখা যায়। নিরাপত্তার অভাব একেবারেই নেই। নারায়ণতলায় আমাদের বিজিবি ক্যাম্প রয়েছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এখানে অবস্থান করলেও কোন অসুবিধায় পড়তে হবে না। আশপাশে রয়েছে গারো পরিবার ও আমাদের বাঙালি ঘরবাড়ি।
নারায়ণতলায় খ্রিস্টান পরিবারদের ধর্মীয় মিশনটি দেখতে অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন ভিড় করে। প্রথমে রিকশায় যাবার সময় হালুয়ারঘাট থেকে উঠলে চোখে পড়বে এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় অর্থকরি ফসল সবজি চাষের বাগানগুলো। সব ধরনের শাকসবজি চাষ করে আমাদের বাঙালি পরিবারগুলো। সুনামগঞ্জের চাহিদা পূরণ করে বাইরের জেলাতে সবজি প্রচুর পরিমাণে সরবরাহ করা হয়। এছাড়া ধান ক্ষেত, বিভিন্ন ফলমূলসহ গাছগাছড়া-আপনি যেতে যেতে ভ্রমণের অর্ধেক সার্থকতা পাবেন। যখন পৌঁছাবেন সীমান্ত এলাকা নারায়ণতলা খ্রিস্টান মিশন এলাকায় তখন আপনাকে মোহিত করে তুলবে ডলুরা এলাকায় ৪৮ জন শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতির উদ্দেশ্যে অপরূপ সৌন্দর্যে নির্মাণ করা স্মৃতিসৌধ। স্মৃতিসৌধের গায়ে কষ্টি পাথরে খোদাই করা ৪৮ জন সূর্যসন্তানের নাম লেখা রয়েছে। খুব দ্রুত এখানে দর্শনার্থীদের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে একটি রেস্টহাউজ।
জানা গেছে জেলা পরিষদ রেস্ট হাউজ নির্মাণের জন্য ইতিমধ্যে টেন্ডার আহবান করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের নিকট জেলাবাসী দীর্ঘদিন দাবি জানিয়ে আসছে ডলুরা এলাকাকে পিকনিক স্পট হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। প্রশাসন একটু আন্তরিক ও সচেষ্ট হলে গড়ে তোলা যেতে পারে সুন্দর পিকনিক স্পট। বর্তমানে মানুষ এলোমেলোভাবে পিকনিক করতে আসে এখানে। অন্যদিকে এই এলাকা ‘৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম স্থান থাকার কারণে অনেক স্মৃতি রয়েছে এখানে। তাহিরপুর থানায় টেকেরঘাট দেশের একমাত্র চুনাপাথর প্রকল্প। সুনামগঞ্জ জেলা সদর থেকে পশ্চিম উত্তর কোণে প্রায় ২৬ কিলোমিটার দূরে অপরূপ সৌন্দর্যের এক সুনিপুণ প্রাকৃতিক দৃশ্য হাতছানি দিয়ে ডাকে টেকেরঘাট। দিগন্ত বিস্তৃত ছায়াঘেরা পাহাড়-স্বপ্নীল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আপনার হৃদয় ভরিয়ে দেবে। প্রকৃতির সৌন্দর্য পিপাসুরা যে দুর্বার আকর্ষণে চষে বেড়ান পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে তাদের জন্য প্রাণভরে উপভোগ করার মত এক অনুপম সৌন্দর্যের লীলাভূমি টেকেরঘাট। টেকেরঘাটের বারিক্কা টিলা নামক আকর্ষণীয় এই উঁচু পাহাড়ের নিচে বয়ে চলেছে ঐতিহাসিক যাদুকাটা নদী। নৌ-বিহারের সুন্দর ব্যবস্থা আছে। অনতিদূরে বিস্তীর্ণ বালুকাময় মাঠ। দেখলে মনে হবে মরুভূমিতে আসা হয়েছে।
বালুকাময় এর এক প্রান্তে রয়েছে বিশাল এলাকা জুড়ে কাশবনের সমারোহ। কাশবনের অপরূপ সৌন্দর্যের নয়নাভিরাম দৃশ্য সত্যিই আপনার হৃদয় ভরিয়ে দেবে। যাদুকাটা নদীতে পাথর আর সোনালী বালু এবং চুনাপাথর খনি অপরূপ-সৌন্দর্য পিপাসু ও সৌখিন ভ্রমণকারীদের মন জুড়িয়ে যাবে। এখানকার পথের দুধারে দাঁড়িয়ে আছে সৌন্দর্য বৃদ্ধিকারী বৃক্ষরাজি, উঁচুনিচু পাহাড় টেকেরঘাট এর চুনাপাথর উত্তোলনের সুগভীর সুড়ঙ্গ, রেলপথ আর খনি প্রকল্পের মুগ্ধকর সৌন্দর্য। এখানে একটি সুন্দর রেস্ট হাউজ রয়েছে। থাকার পরিবেশ চমৎকার। একটু উত্তর দিকে এগুলেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। কয়লা আমদানির সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর। ভারতের বড় বড় ট্রাক ভর্তি কয়লা আমাদের সীমান্তে আসছে। পাহাড়ের লাল-হলুদ পথ অতিক্রম করে প্রতিদিন শত শত ট্রাক আসার দৃশ্য খুবই সুন্দর। টেকেরঘাট অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিশাল এলাকা চলচ্চিত্র নির্মাণের উপযুক্ত স্পট। এখানে আমাদের চলচ্চিত্র নির্মাতারা বেশ কিছু ‘ছবি’ নির্মাণ করেছেন। ১৯৯৬ সালে সাহিত্যিক ও নাট্যকার হুমায়ুন আহমেদ টেকেরঘাটে একটি নাটক চিত্রায়িত করেছেন। এখানের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে লোক বিমোহিত হয়েছেন। টেকেরঘাট এলাকার পাশে ঐতিহাসিক যাদুকাটা নদী দেখলে মনে হবে সাগর সৈকতে এসেছেন। পাহাড়ি নদী শীত মৌসুমে খুবই শান্ত। নৌবিহারে বেরুবার ব্যবস্থা আছে। যাদুকাটা নদীর পূর্বপাড়ে পাহাড়ি সোনালী বালুর স্তূপ। বিরাট এলাকা জুড়ে কাশবনের সমারোহ। বিদেশি পর্যটকরা দেখতে আসেন প্রতিদিন দেশের একমাত্র চুনাপাথর খনি প্রকল্প, দেখার মত। টেকেরঘাট যাবার পথে বিলগুলোর সৌন্দর্য সহজেই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে। এখানে পর্যটক কেন্দ্র স্থাপিত হলে পতিত জমি কাজে লাগার পাশাপাশি জেলাবাসীর অনেকদিনের প্রত্যাশা পূরণ হয়ে সরকারের রাজস্ব আয় হবে। টেকেরঘাট কেমোরু চুনা পাথর প্রকল্প এলাকা সীমান্তবর্তী স্থান। ¯্রষ্টা যেন এ পুরো এলাকা জুড়ে আপন সৌন্দর্যের মাধুরী মিশিয়ে এক অপূর্ব বৈচিত্র্যময় লীলাক্ষেত্র তৈরি করেছেন মানবকূলের জন্য। প্রকৃতির সৌন্দর্য পিপাসুরা স্বর্গীয় সুখ ভোগে ছুটে আসে টেকেরঘাটে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে টেকেরঘাট পর্যটন স্পটের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো হচ্ছে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT