সাহিত্য

কয়েক প্রস্থ বিড়ম্বনা

বাশিরুল আমিন প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৫-২০১৯ ইং ০০:৪৫:১২ | সংবাদটি ৫০ বার পঠিত

করুণ বিড়ম্বনার স্বীকার হয়েছিলেন দেবদাসের শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। সবে তার ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাস বেরিয়েছে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে শরৎবাবুর নামডাক। যেমন আসছে শংসাবাক্য, আসছে তীর্যক সমালোচনাও। প্রকাশকরা এরকম বই-ই চাচ্ছিল। এমন সময় দেখা গেল শরৎচন্দ্রের নামে ‘চাঁদমুখ’ উপন্যাস বেরিয়েছে। বিক্রি হচ্ছে খুব। অথচ এই উপন্যাস তো শরৎচন্দ্র লেখেননি। তাঁর প্রকাশক হৈ চৈ শুরু করে দিলেনÑ কী হচ্ছে এসব! আসল শরৎ ব্যাপারটা কানেই তুললেন না। গা ছাড়া ভাব। কিন্তু প্রকাশক হরিদাস বাবু নাছোড় বান্দা। ব্যবসায়ী মানুুষ, ম্যালা খরচ করেছেন শরৎচন্দ্রের বইয়ে। এখন যদি নকল কেউ এসে ব্যবসা ধরে বসে তাহলে তাঁর পথে বসতে হবে।
হরিদাস চাটুজ্যে এসে একদিন শরৎচন্দ্রকে বললেনÑ ‘ওহে শরৎ এর একটা কিছু বিহিত করো। তোমার নাম ভাঁড়িয়ে আরেক শরৎ চাটুজ্যে যে বাজারে বই ভালই কাটিয়ে দিল।’
কে শুনে কার কথা। এসব কথা পাত্তাই পেল না শরৎচন্দ্রের কাছে। তিনি বললেন, পাঠকই ধরে নেবে কে খাঁটি আর কে ভেজাল। আদতে এমনটি হয়নি। আমজনতার খুব অল্পই সেটা ধরতে পেরেছে। এদিকে তাঁর নামে ‘হীরক দুল’ ও ‘শুভ লগ্ন’ নামে বই বেরিয়ে গেছে আরো দুটি। এবার কিছুটা টনক নড়লো। কে এই ভেজাল শরৎ? তিনি হলেন- ‘গল্পলহরী’ পত্রিকার সম্পাদক শরৎচন্দ্র চট্টোপধ্যায়। তার খুব দুর্দিন যাচ্ছিল, পত্রিকা চলে না। বন্ধ হয় হয় অবস্থা। নামটা পুঁজি করে নেমে গেলন উপন্যাসে। বাহ! বইয়ের কাটতি ভালো। সুতরাং আর থামলেন না।
এতোদিনে বোধোদয় ঘটলো আসল শরৎচন্দ্রের। কিন্তু সমাধান কী? তার নামে তো আর মামলা মোকাদ্দমা করা যায় না। আবার এক কথায় তাকে নকল ঠাওরানোটাই কি ঠিক হবে! বেচারাও তো শরৎচন্দ্র চট্টোপধ্যায়।
এগিয়ে আসলেন ‘বাতায়ন’ পত্রিকার সম্পাদক অবিনাশ ঘোষাল। শরৎ বাবুর খাস লোক ছিলেন তিনি। তার কাছেই কেবল তিনি তার পেটের কথা বলতেন। তারা দুজনে বসে অনেক ফন্দি-ফিকির করলেনÑ কীভাবে থামানো যায় ব্যাটাকে! কতোসব ফিকির। কিন্তু কোনোটিই মনপুত হয় না শরৎচন্দ্রের। একবার অবিনাশ বলেন- ‘বরং আপনিই চলে যান তার কাছে। আপনাকে ফিরিয়ে দেবে না। বিহিত একটা হবেই।’ এ প্রস্তাব পছন্দ হয় না। পরক্ষণে শরৎ বলেন- ‘অবিনাশ তুমিও যাও। গিয়ে তাকে মারপিটের ভয় দেখাও। বলো, চরিত্রহীন বইটি প্রকাশের পরে অনেকেই শরৎচন্দ্রকে অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত করছে। সিটি কলেজের ছেলেরা মারতেও পারে। এখন যদি আপনি শরৎচন্দ্র নামে লিখেন তবে কখন আবার বিপদে পড়বেন।’
অবশেষে অবিনাশ ঘোষালই গেলেন ভেজাল শরৎচন্দ্রের কাছে। প্রস্তাব করলেন, নাম পাল্টানোর। কিন্তু না, ওটা করবেন না তিনি। শেষমেষ গল্পলহরী’র শরৎচন্দ্র বললেনÑ ‘এক কাজ করা যাক, বইয়ে বড়ো করে আর্ট পেপারে ছবি ছাপলেই তো মামলা খতম। আমি আমার বইয়ে ছবি ছাপবো তিনিও যেন তার বইয়ে ছবি ছাপেন।’
এই কথার ওপর ফিওে গেলেন অবিনাশ বাবু।
মাস খানেক পরে ‘গল্পলহরী’র শরৎচন্দ্রের নতুন বই বাজারে এলো ‘কণকাঞ্জলি’ নামে। টাইটেল পেজের সামনের পেজে বড়ো করে তার দাঁড়িসমেত ছবি দেওয়া হলো, নিচে লেখা ‘শ্রী শরৎচন্দ্র চট্টোপধ্যায় (জুনিয়র)’।
এই সপ্তাহেই অবিনাশ ঘোষাল তার ‘বাতায়ন’-এ আসল শরৎবাবুর ছপি ছাপতে চাইলেন কিন্তু সমস্যা আর পিছু ছাড়ে না। আসলজনেরও দাঁড়ি আছে। ফ্রেঞ্চ কাট দাঁড়ি। এখন দুজনেরই যদি একই রকম ছপি ছাপা হয় তবে লোকে চিনবে কী করে! অগত্যা তিনি তার শখের দাঁড়ি কাটলেন। তারপর দাঁড়িহীন ছবি ছাপা হলো বাতায়নে। ছবির নিচে লেখা ছিলÑ ‘চরিত্রহীন উপন্যাসের লেখক শ্রী শরৎচন্দ্র চট্টোপধ্যায়’।
বিমল মিত্র মানেই বেস্ট সেলার। দারুণ কাটতি। একের পর এক বই বেরুচ্ছে বিমল মিত্রের, প্রকাশকরাও ব্যবসা করছেন দু’হাতে। ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’সহ সব বই-ই হিট। একটা সময় দেখা গেল বিমলমিত্রের বইয়ে বাজার সয়লাব। এমন অনেক বই বেরোলো যার খবর খোদ লেখক-ই জানেন না। ‘রক্ত পলাশ’ নামে একটি বইয়ের খুব ডাকনাম হলো অথচ লেখক বিমল মিত্র এ নিয়ে একেবারেই বেখবর। প্রচ্ছদে যার নাম দেখে পাঠকরা বই কেনেন সেই লেখক বইয়ের নামটি পর্যন্ত শুনেননি এমন ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকবার। ইতোমধ্যে তাঁর নামে বই বেরিয়ে গেছে অগুণতি। কিছু সংখ্যক উপন্যাস তাঁর নামের সাথে খানিক যশ-খ্যাতি যুক্ত করলেও অধিকাংশই তার দুর্নাম ছড়ালো। আর আর্থিক ক্ষতির কথা তো রয়েই গেল। চতুর্দিক থেকে চিঠি আসা শুরু হলো, এসব কী লিখছেন বিমল বাবু!
চেন্নাইয়ের বিখ্যাত পরিচালক নানু ঘোষ বিমল বাবুকে ভয়ংকর অপমান করে বসলেন, সিনেমা করার জন্য পাঠানো তাঁর উপন্যাসকে এক কথায় রাবিশ বললেন। বিমল মিত্র তো হা হয়ে গেলেন। কী বলে এসব! তিনি তো কখনো কারো কাছে এরকম কিছু পাঠাননি। আসলে বিমল মিত্রের নামে উপন্যাস পাঠিয়েছিল অন্য আরেকজন। সাথে চিঠিওÑ ‘আমি ‘সাহেব বিবি গোলাম’-এর লেখক, আমার নতুন বই কড়ির চেয়ে দামি সিনেমা করার জন্য পাঠাচ্ছি।’ এসব শুনে মাথা খারাপ হওয়ার অবস্থা। তাঁর নাম বেঁচে খায় ভালো কথা তাই বলে ‘সাহেব বিবি গোলাম‘র লেখক বলে দাবি তুলছে এ কেমন ভয়ংকর!
কারা ছিল এসব নকল বিমল মিত্র? কোথায় তাদেও আঁতুড়ঘর? ছোটখাটো প্রকাশকরাই তৈরি করেছিলেন এসব বিমল মিত্রদের। যাদের সাধ্য ছিল না বা যোগ্যতা ছিল না আসল বিমল মিত্রের পা-ুলিপি প্রকাশ করার তারাই এরকম নকলদের তৈরি করতেন। এই সংখ্যাটা নেহায়েত কম ছিল না । কারো মতে এই সংখ্যাটা অন্তত বিশ-পঁচিশেক তো হবেই। এদের অধিকাংশ নেপথ্যে থাকলেও প্রকাশ্যে এসেছিলেন বা আসতে বাধ্য হয়েছিলেন দুয়েকজন।
রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ছিলেন নকল বিমলদের একজন। তিনি লিখতেন ভালো। আসলের কাছাকাছি। ফলে তার দারুণ বাজার ছিল, ছিল বাজার দরও। তার এই নকল হওয়ার পেছনের গল্পটা অন্যরকম। পা-ুলিপি নিয়ে এসেছিলেন প্রকাশকের কাছে, প্রকাশক বেচারা ফিরিয়ে দিলেন। তবে অন্য এক প্রস্তাব দিলেন। বিমল মিত্রের নামে বই লিখে দিতে হবে। প্রথমে রাজি না হলেও পরবর্তীতে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলেন বিষয়টা । একাধারে লিখলেন বিমল মিত্রের নামে। এক পর্যায়ে ধরা খেয়ে গেলেন। আসল বিমল মিত্র গেলেন আইনের কাছে। কিন্তু আসলজন ঠকে গেলেন নকল জনের কাছে। প্রকাশক বুদ্ধি করে রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে কাগজে পত্রে বানিয়ে ফেললেন বিমল মিত্র। এই নামে যোগাড় করে ফেললেন পরিচয় পত্র, রেশন কার্ডসহ আরোসব দলিল দস্তাবেজ। খালাস, এক নামে তো দুই ব্যক্তি হতেই পারে।
শেষ বয়সে এসে সব কথা স্বীকার করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী । অদ্রীশ বিশ্বাসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজ মুখেই সত্য স্বীকার করেনÑ ‘বিমল মিত্রের নাম দিয়ে আমি উপন্যাস লিখতাম, ‘রক্ত পলাশ’ আমার-ই লেখা।’
বিখ্যাত লেখকদের এমন অভিজ্ঞতা কম নয়। শরৎচন্দ্র যেখানে শখের দাঁড়ি কেটে মুক্তি খুঁজছিলেন সেখানে বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ‘আরোগ্য নিকেতন’ এর লেখক তারাশঙ্কর বন্দোপধ্যায় ভেজালের খপ্পরে পড়ে নিজের নামেই হাত দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
তিনি যখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে তখন যথারীতি তার নামে বই ছাপা হতে লাগলো। এসব অখাদ্য বই তার নামের সাথে যুক্ত হতে থাকলো আর তিনি অহেতুক সমালোচনায় আক্রান্ত হতে থাকলেন। কয়জনকে বুঝাবেন যে তিনি এসব লিখেননি। বই বেরুচ্ছে তো বেরুচ্ছেই একদম পাইকারি হারে। নকলদের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেন আসল তারাশঙ্কর। যাবতীয় নতুন বই আর পুরনো বইয়ের নতুন সংস্করণে দীর্ঘ ভূমিকা লিখতে হলো তাকে। আসল নকল চিনিবার উপায় বাতলে দিতে হলো। রাগে-ক্ষোভে লিখলেনÑ ‘শ্রীময়ী’র শ্রী তারাশঙ্কর বন্দোপধ্যায় শ্রীময় থাকুন, আমি এখন হইতে শ্রীহীন হইলাম’। এরপর থেকে তিনি তার নামে আর শ্রী লাগাতেন না। কী করুণ!
আগেকার বহু লেখকই এমন করুণ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছেন। এখনো কি কারো ক্ষেত্রে এমনটি হয়! হতে পারে...
তথ্যসুত্র : ০ সম্পাদকের বৈঠকে, সাগরময় ঘোষ, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা ০ পাঠকও ধরতে পারেননি নকল কে, ঊর্মি নাথ, আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৩.০৭.২০১৭।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT