সাহিত্য

আমাদের রবীন্দ্রনাথ

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৫-২০১৯ ইং ০০:৪৭:১৪ | সংবাদটি ১৯৩ বার পঠিত

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের গর্ব। এজন্য যে, তিনিই প্রথম বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা এবং বাঙালি জাতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছিলেন। বাংলা সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায় তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য বিচরণ। তবে বাংলা কাব্যে এক অকল্পনীয় বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ- যা আজও বিরল। আর বাংলা সাহিত্যকে তিনিই প্রথম মার্জিত রূপ দিয়েছেন। ছোট গল্পের জনক এই রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমেই বাংলা কথা সাহিত্য বিকশিত হয়। তাঁরই হাতের জাদুকরী ছোঁয়ায় বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যেরও ব্যাপ্তি ঘটে। তাঁর লেখনীতে আমরা পাই এক চিন্তাশীল ও দার্শনিক রবীন্দ্রনাথকে। তিনি একাধারে গীতিকার, চিত্রশিল্পী। তাঁর রচিত রবীন্দ্র সঙ্গীতের সংখ্যা প্রায় ২২৩২টি। তাঁর দেশাত্মবোধক গান, ‘ও আমার দেশের মাটি.....’ কালজয়ী একটি গান।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ৭০ বছর পূর্তি জয়ন্তী উৎসবের ভাষণে বলেছিলেন, ‘একটিমাত্র পরিচয় আমার আছে, সে আর কিছু নয়, আমি কবি মাত্র।’ এবং ওই অনুষ্ঠানে কবিকে অভিনন্দনপত্র দিতে গিয়ে ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রবীন্দ্রনাথকে সম্বোধন করেছিলেন- সার্বভৌম কবি বলে। আসলেই ঠিক, রবীন্দ্রনাথের বিচরণ সাহিত্যের সব ভূমিতে ছিল। এদিকে, ইংরেজ কবি রুডিয়ার্ড কিপলিং প্রাউড ফিল করে একবার বলেছিলেন, ‘প্রাচ্য প্রাচ্যই, প্রতীচ্য প্রতীচ্যই। দুই দেশ কখনও এক হতে পারে না। কিন্তু আমাদের রবীন্দ্রনাথ কিপলিংয়ের সে কথা ভুল প্রমাণ করে পাশ্চাত্যের সামনে তুলে ধরেছিলেন ভারতবর্ষকে, আর ভারতবর্ষের সামনে তুলে ধরেছিলেন পাশ্চাত্যকে। তিনিই উচ্চারণ করেছিলেন, ‘দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে।’
মাত্র ৮ বছর বয়সে এই রবীন্দ্রনাথ কবিতা লেখা শুরু করেন। আর ১৩ বছর বয়সে তাঁর লেখা প্রকাশ পায়। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কবিকাহিনী’ (১৮৭৮) এবং তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘শেষলেখা’ (১৯১৪)। [তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত]। ৬০ বছরের কবিজীবনে গান ও কাব্যনাট্য ছাড়া ৫৬টি বই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন। তাঁর কবিতার সংখ্যা এক হাজারের ওপরে। রবীন্দ্রনাথের কাব্যনাট্য সংখ্যা ১৯টি, নাটক ২৯টি, ছোটগল্প ১১৯টি, উপন্যাস ১২টি ও ভ্রমণকাহিনী মাত্র ৯টি। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্রগুলো ১১টি গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। এবং ছোটদের জন্য রবীন্দ্রনাথের লেখা গল্প- কবিতা ও ছড়ার বই আছে ৮টি মাত্র।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ও স্বদেশী আন্দোলনের সময় রবীন্দ্রনাথ চারণ কবির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত তাঁরই অমর, অসাধারণ রচনা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর রচিত জাতীয় সঙ্গীত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা দিয়েছে। আবার রবীন্দ্রনাথ একজন সফল সংগঠক ও কর্মী ছিলেন। কৃষি উন্নয়ন, কুটির শিল্পের উন্নয়নের জন্য তিনি কাজ করেছেন। জমিদার পুত্র হয়েও রবি ঠাকুর সকলের সাথে কথা বলতেন, মিশতেন। কৃষকদের দুঃখ গল্প মন দিয়ে শুনতেন। বিদেশী শিক্ষার গ্রাস থেকে দেশের শিক্ষাকে রক্ষার জন্য তিনি জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠন করেছিলেন। প্রতিবাদীও ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাই ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস গণহত্যার প্রতিবাদ করে ‘স্যার’ উপাধি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ইংরেজ বড়লাট চেমস্ ফোর্ডকে এজন্য তিনি খোলা চিঠি লিখেন- যা পড়ে বড়লাট বিস্মিত হয়েছিলেন। এই আমাদের রবীন্দ্রনাথ। এছাড়া, ৩০-এর দশকে ইতালির ফ্যাসিবাদী স্বৈর শাসক মুসোলিনির শাসনের তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন বাংলার রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথ ভ্রমণ রসিকও ছিলেন। জাপান, চিন, কোরিয়া, বার্মা, মালয়, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, ইরান, জার্মানি, ফ্রান্স, লন্ডন, আমেরিকা, রাশিয়া ও ইতালি ভ্রমণ করেছেন। এবং ভ্রমণকাহিনীও লিখেছেন প্রচুর। রবীন্দ্রনাথের মন ছিল আধুনিক ও রোমান্টিক। তাই তো তাঁর সাহিত্যের সমস্ত ইতিহাস ঘেঁটে আমরা জানতে পারি যে, আমাদের রবীন্দ্রনাথ সে-ই যুগে ছুটিয়ে প্রেম করেছেন ইংরেজ নারী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সাথে। এজন্য আজকের আধুনিক লেখক সমাজেও তিনি প্রেমের রোল মডেল।’ আধুনিক কিছু কবিরা বলেন, আরে রবীন্দ্রনাথ সে কালে প্রেম করতে পারলে, আমরা পারবো না কেন? রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রেমের গুরু। অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ- এর বিশ্বজনীন মন ও মানসিকতা-এ কালের তরুণ কবিদেরও মুগ্ধ করছে। সর্বকালে রবীন্দ্রনাথ আধুনিক। তাঁর রচিত রবীন্দ্র সঙ্গীত-
-হে দু’জনে দেখা হলো/ মধু যামিনী/ ফিরে এলে না/ কেন চলিয়া গেলে ধীরে/ মধু যামিনী.....
অথবা,
তোমায় গান শোনাব/ ওগো দুঃখ জাগানিয়া/ তোমায় গান শোনাব.....
ঘুমোতে যাবার আগে এ কালের অনেক তরুণ কবি কানের কাছে স্মার্টফোন রেখে শোনেন। আবার ‘অনেক তরুণ কবি স্মরণে রাখেন রবীন্দ্রনাথ-এর অমর সে কথা-
-দেশে দেশে মোর দেশ আছে/ আমি সেই দেশ লব যুঝিয়া/ ঘরে ঘরে আছে পরমাত্মীয়/ তাঁরে আমি ফিরি খুঁজিয়া।
এখনও রবীন্দ্রনাথ দীপ্যমান আলোয় আলোচিত। তাঁর চিন্তা এখনও সবার কাজে লাগে। পাশ্চাত্যের দান্তে, শেক্সপিয়র ‘গেটে, তলস্তয় অথবা ভারতবর্ষের কালিদাস, বাল্মীকির মতো রবীন্দ্রনাথও চিরকাল এক অনন্য মহিমায় ভাস্মর! অমর হয়ে কিছু বাঙালির হৃদয়ে থাকবেন তিনি। প্রায় সকলেরই আপন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাই তো, ১৯৩৮ সালে রচিত ‘সেঁজুতি’ কাব্যের ‘পরিচয়, কবিতায় নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন,
মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক/ আমি তোমাদেরই লোক/ আর কিছু নয়/ এই হোক শেষ পরিচয়।
কবি সুকান্তের ভাষায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ- এর জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই এভাবে-
এখনও তোমার গানে সহসা উদ্বেল হয়ে উঠি/ নির্ভয়ে উপেক্ষা করি জঠরের নিঃশব্দ ভ্রুকুটি/ এখনও প্রাণের স্তরে স্তরে তোমার দানের মাটি/ সোনার ফসল তুলে ধরে/ এখনও স্বগত ভাবাবেগে/ মনের গভীর অন্ধকারে তোমার সৃষ্টিরা থাকে জেগে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT