সাহিত্য

খুকির হাতে গদ্যগোলাপ

বাছিত ইবনে হাবীব প্রকাশিত হয়েছে: ০৫-০৫-২০১৯ ইং ০০:৪৮:০৪ | সংবাদটি ২৫৯ বার পঠিত

ভারতের কিশোর কিশোরীদের যদি প্রশ্ন করা হয় তাদের সেরা দিবস কোনটি- নির্দ্বিধায় বলবে- ১৫ই আগস্ট ১৯৪৭। ঠিক তেমনি একটি মার্কিন কিশোর বা কিশোরী বলবে ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই। অনুরূপভাবে আজকের বাংলার বিদ্বান কিশোরীদের প্রতিনিধি ঢাকা মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণীর ছাত্রী ফ্লোরা তার নাইনটি সিক্স আওয়ার্স ইন টর্চার সেল’ গ্রন্থটির মধ্য দিয়ে বলতে চায় বাংলার মানুষের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ দিবস ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। একটি অনাথ কিশোর মুক্তিযোদ্ধা চন্দনের চারদিনের অমানবিক নির্যাতনের রক্তাক্ত দলিল এই গ্রন্থটি। চন্দন শুধু প্রত্যক্ষ দৈহিক শাস্তির শিকার নয়। সে চরম মানসিক শাস্তিরও শিকার। যেমন চন্দন বলছে-‘আমি দেখলাম, লোকটার চারটা আঙ্গুলই কেটে দিয়েছে উর্দি পরা লোকগুলো। অঝোরে রক্ত বের হচ্ছে লোকটির কাটা স্থানগুলো থেকে। লোকটি ব্যথায় কাতরাচ্ছে পাগলের মতো’। পৃ:১৯
টর্চার সেলে চন্দনের দেহে যে অমানবিক আঘাত করা হয়েছে তা রাষ্ট্র বনাম হৃদয়ের সংঘাত। রাষ্ট্র কোন দিনও সৃজনশীল প্রাণবান হৃদয়কে সহ্য করেনি। বইটি এই চিরন্তন কথাটি পাঠকবর্গকে নূতন করে স্মরণ করিয়ে দেবে।
অনেকটা মুমূর্ষু চন্দনের সামনে আশার বাণী শোনাতে লেখিকার উচ্চারণ- ‘দাদা মায়াভরা কণ্ঠে বললেন, ‘চন্দন ভয় পাস না। মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের বাঁচাতে আসবে দেখিস।’ আমার মৃত হৃদয়ে যেন শীতল এক অনুভূতি বয়ে গেল। পৃ: ২১ লেখিকা বুঝাতে চান চন্দন সকল শাস্তি সহ্য করবে, কিন্তু পরাজয় মেনে নেবে না। বইটির ২২-২৩ পৃষ্ঠায় চন্দনের চোখের সামনে তার ফারুক ভাই ও অন্যান্যদের মৃত্যু আমাদেরকে এস. টি কোলরিজের ‘দ্য রাইম অব দ্য এনসিয়েন্ট মেরিনারের বৃদ্ধ নাবিকের সামনে তার সঙ্গী সাথীদের করুণ মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আমরা বুঝতে পারি Mental Punishment is more terrible than physical punishment.
লেখিকার ধারাবাহিক সুন্দর বর্ণনার মধ্য দিয়ে মাঝে মধ্যে তার দার্শনিকতা কাব্যময় ভাষায় রূপ লাভ করেছে। যেমন ‘আমার শরীর কবেই আমার সঙ্গ ত্যাগ করেছে, কিন্তু এই মন বেঁচে রয়েছে মনটাই যেন চালাচ্ছে শরীরটাকে পৃ: ২৭।
জনৈক ষোড়শির তাজাগোলাপ সুবাসমাখা দেশপ্রেমের অনুভূতির পুঁজিসঞ্চয় নিয়ে চল্লিশ পৃষ্ঠার একটি বই হাতে এলো। সুরাইয়া মঈন ফ্লোরা ঢাকার মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ নির্যাতনের একটি কাহিনী তার নাইনটি সিক্স আওয়ারস ইন এ টর্চার সেল গ্রন্থে বর্ণনা করেছে তার হৃদয়ের সকল আবেগ ও ভালোবাসা দিয়ে। ঘটনা সমূহের সংবেদনশীল বর্ণনা বইটিকে দিয়েছে নূতন ব্যঞ্জনা। যেমন-
মা দুর্বল হাতে আমার পকেটে একটা চিঠি ঢুকিয়ে দিলেন। তারপর স্নেহভরা চন্দন ডাক আমার শোনার আশা আজীবনের জন্য হারিয়ে গেলো। পৃষ্ঠা ৯
‘কালো রাতে চোখের কালো পর্দা এ কেবল অন্ধকার করেনি, কেড়েও নিয়েছিল আমার সকল ইন্দ্রিয়ের শক্তি। হঠাৎ একটা ছোট্ট ছেলের ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্নার আওয়াজ পেলাম। আঁকাবাঁকা রাস্তায় গাড়ির ঝাকুনি খেতে খেতে খুব সাবধানে আমি হামাগুড়ি দিয়ে আওয়াজের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। রক্তের বিদঘুটে পঁচা গন্ধে আমার নাক সিটকে বমি আসছিল। পৃষ্ঠা-১০ লক্ষ্যণীয় যে, বইটিতে একজন কিশোরী কলমকর্মীর দরদমাখা ভাষা প্রয়োগ রীতিমতো পরিণত লেখকদের মতো। তার সংবেদনময় সৃজনতার ঝিলিক মুগ্ধতা ছড়াবেই পাঠক মনে। যেমন চন্দন তার মাকে বলছে, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলে তোমারই গর্ব হবে মা’।
পাক আর্মিদের নির্যাতনকালীন উর্দু ভাষার প্রয়োগ বইটির একটি বিশেষ গুণ। লেখিকা অত্যন্ত সচেতনভাবে ঐ সময়ের ভাষা প্রয়োগ করে গ্রন্থটিকে সমৃদ্ধ করেছেন। লাইট এট দ্য এন্ড অব দ্য টানেলের মতো চন্দনের নির্যাতনের চতুর্থ ও অন্তিম দিনের আশাবাদ যেন পুরো জাতিকে নূতন আশায় উজ্জীবিত করে। একদল মুক্তিযোদ্ধা ধড়াম করে চন্দনকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। চন্দন পায় নূতন জীবন, নূতন আশা এবং দেশ ও জাতিকে নিয়ে গর্ব করার নূতন প্রেরণা। আজকের প্রজন্মের একজন কিশোরী তার প্রজন্মকে অনেক সংঘাতময় সময় পেরিয়ে নতুন চেতনায় উজ্জীবনের দিকে আহ্বান করে। বইটি একবার হাতে নিয়ে কোনো সচেতন পাঠক শেষ না করে উঠার কথা নয়।
অবাক হওয়ার কথা একজন ষোড়শী কী করে এত সুন্দর করে লিখতে পারে? না, অবাক হব কেন? ১৯৪১ সালে হিটলারের নাৎসি বাহিনী হল্যান্ড দখল করলে হল্যান্ডের বন্দি শিবিরে আশ্রয় নেয়া জার্মান মেয়ে আনা ফ্রাঙ্ক রচিত ডায়েরী যদি বিশ্বের প্রায় সকল ভাষায় অনুদিত হতে পারে, তাহলে বাংলার সচেতন ষোড়শী কন্যা সুরাইয়া মঈন ফ্লোরা আমাদের কাছে বিস্ময়ের নয়, গর্বের ধন। এবং তার চল্লিশ পৃষ্ঠার সুন্দর গ্রন্থটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি অমর গ্রন্থ হিসেবে বাংলা সাহিত্যে টিকে থাকবে। আশা করি সে নিশ্চয়ই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আগামী দিনের একজন সমঝদার লেখিকা হিসেবে আবির্ভূত হবে।
একটি নূতন হাতের প্রথম শস্যভা-ারে পোকা মাকড়ের আক্রমণের দিকে দৃষ্টি না দেয়াই যুক্তিসঙ্গত হলেও যেহেতু শিল্পের নন্দন কাননে অভিযাত্রা- এজন্যে এ পথের কিছু কাঁটা দেখিয়ে দিলে লেখিকা আরো সচেতন হবে এবং তার চারু হাত সুচারু হবে তার নিপুণ চিন্তা নিপুণতর হবে। তাই সামান্য ত্রুটি বিচ্যুতির উপর সামান্য আলোকপাত করা হলো সংসারে যেমনটি নিকষিত সোনা হয় না ঠিক তেমনি সম্পূর্ণ সাবলীল গ্রন্থ আশা করা অনেকটাই অস্বাভাবিক। এর প্রমাণ এই বইটিতেও আছে। যেমন- বইটির ১১ পৃষ্ঠায় চোখ খুলে যা দেখলাম তা ছিল দুঃস্বপ্নের চেয়েও দুর্বিষহ দৃশ্য। এখানে ‘দৃশ্য’ শব্দটি বাদ দিলে বাক্যটির গাঁথুনি আরো শক্ত হতো। “কারোবা সব আঙ্গুল, চোখ তুলে নেয়া দেহ পড়ে আছে।” এখানে তুলে নেয়া শব্দটির পরিবর্তে ‘উপড়ানো’ শব্দটি প্রয়োগ করলে বাক্য বিন্যাস আরো অনেক সুন্দর হতো।
বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে খুকীর হাতে ফুটেছে একটি অনুপম গদ্যগোলাপ। আগামী দিনে আমাদের সাহিত্যে ফ্লোরা ছড়াবে তার হৃদয়ের সুপ্ত আলোকরশ্মি মালা।
বইটির বহুল প্রচার ও পাঠ কামনা করছি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি এই লেখিকার মননের বাগানে উৎপাদিত হোক আরো অনেক সোনার ফসল। কৈতর প্রকাশনকে ধন্যবাদ। এত সুন্দর প্রচ্ছদে বইটি প্রকাশ করার জন্য। মাত্র একশত টাকা সুলভ মূল্যে রকমারী ডট কমে বইটি পাওয়া যাচ্ছে। এই নবাগত কলমকর্মীর সুস্থ সুন্দর দীর্ঘ জীবন কামনা করছি।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT