মহিলা সমাজ

স্বপ্নভঙ্গ

ফরিদা হোসেন প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৫-২০১৯ ইং ০১:০৮:৩৫ | সংবাদটি ৫৮ বার পঠিত

ঘটনার আকস্মিকতায় স্তব্ধ হয়ে গেলো সবাই।
লন্ডনের অভিজাত এলাকা টট্রেজের একটি বাড়ির সামনে তখন বাড়তি লোকজনের উপস্থিতি। মায়ের সাথে বাড়ির সামনের এক টুকরো বাগানে দাঁড়িয়েছিল বাইশ বছরের জীতু।
আগুনের মতো টকটকে গাঁয়ের রং। একরাশ ঘন ব্রাউন চুল। সুঠাম দীর্ঘদেহী জীতু মায়ের সাথে মাঝে মাঝে রাস্তার ধারে বাগানে এসে দাঁড়ায়।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দ্যাখে। মা নীপা গাছের গোড়া খুঁছিয়ে দেয়। পানি দেয়। এটা ওটা কখনো কখনো মাকে এগিয়ে দেয় জীতু। আবার কখনো ইচ্ছে হলে গোঁ ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।
পাশের বাড়ির মেয়েটিকে প্রায়ই দেখে জীতু।
পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে সাইকেলে চড়ে স্কুলে যায়।
জীতুকে দেখলেই দূর থেকে হাসে জেনি।
জন্ম সূত্রে বাংলাদেশী হলেও জীতুর বেড়ে ওঠা এই লন্ডন শহরে। প্রথমে লেখা পড়া এবং পরে চাকরির সুবাদে বহু বছর ধরে নীপা-রাশেদের সংসার স্থায়ী হয়ে গেছে লন্ডনে। শেকড় বাংলাদেশের বলেই কৃষ্টি সংস্কৃতি রয়ে গেছে মাতৃভূমির। প্রয়োজনে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে রাশেদ পরিবার।
একদিন ঘর আলো করে এলো ফুটফুটে জীতু।
একাকিত্ব ভুলে গেলো নীপা।
চাঁদের মতো পুত্র সন্তানকে নিয়ে অজ¯্র ব্যস্ততায় দিন রাত এক হয়ে গেলো নীপার। প্রথমে ছুটি নিলেও পরে চাকরি ছেড়ে দিলো নীপা। রাশেদ একবার কথা প্রসঙ্গে বলেছিলো ডে কেয়ার সেন্টারের কথা। নীপা বলেছিলো। অসম্ভব, এরকম দুরন্ত বাচ্চাকে আমি এক সেকেন্ডের জন্যও আড়াল করতে পারব না।
হলোও তাই, পারলো না চোখের আড়াল করতে। সকাল গড়িয়ে দুপুর আর বিকেল গড়িয়ে কখন রাত নেমে আসে জানবার ফুরসত নেই নীপার। ছেলেকে নিয়ে ছড়া কাটা আর ঘুম পাড়ানী গান গেয়ে সুরের লহরী তৈরি করে চারদিকে। বাড়ির পেছনের বাগান, মাথার উপর অসীম আকাশ- সবাই যেন মুগ্ধ হয়ে যায় নীপার সন্তান বৎসল্য দেখে।
গুটি গুটি পায়ে এগুতে লাগে সময়। নীপা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে মা ডাক শুনবে বলে। দেখতে দেখতে তিন বছর পেরিয়ে গেল। নীপার কণ্ঠে ছড়া আর সুর ঘুরপাক খেতে খেতে একদিন আছড়ে পড়ল।
কথা আর বলতে পারলোনা চাঁদের মতো ছেলে জীতু। ডাক্তার জানালো নিপা রাশেদের ছেলে কখনও কথা বলতে পারবে না।
কথাটা প্রথমে বুঝতে পারলো না নীপা ও রাশেদ। কিন্তু পরে যখন জানলো যে তাদের আদরের ছোট্ট জীতুমনি, যে চঞ্চল হাত- পায়ের দুষ্টুমীতে পুরো বাড়ি লন্ড ভন্ড করে দেয়, সে কখনও মিষ্টি কণ্ঠে কলকলিয়ে কথা বলতে পারবে না। বলতে পারবে না ‘মা-মনি আমাকে খুঁজে বের করো’। আমি এখানে।
নাহ: একবারও কাঁদলো না নীপা। চিৎকার করে উঠলো না, না, না, না এ হতে পারে না। নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ালো এক সময়। ছেলের দিকে একবারও তাকালো না। রাশেদ নীপার অবস্থা দেখে বলল, : তুমি একদম চিন্তা করো না প্লিজ। জীতুকে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ডাক্তার দেখাবো। ওকে ঠিক হতেই হবে। ওযে আমাদের অনেক স্বপ্নের জীতু।
বাড়ি এসে বাগানের সিঁড়িতে বসলো। মাথার উপর খোলা আকাশ। পেঁজা তুলো মতো মেঘেদের ইতস্তত আনমনা।
হঠাৎ এসে চুলে আছড়ে পড়া দমকা বাতাস ...
ঘাস-ফুলে প্রজাপতিদের দুষ্টুমি... সব...
সব যেন একেবারে অর্থহীন।
কোন মানে হয়না এর। কোনই অর্থ নেই এ জীবনের। যে বাড়িতে একটি শিশুর কল-কাকলী শোনা যাবে না কোথাও...। সেটাকি কোন বাড়ি...? কোন সংসার...? এটা কি রকম বিচার বিধাতার ...? কি অপরাধ ছিলো এ টুকুন ছেলে জীতুর?
শুক্ল পক্ষের চাঁদের মতো প্রতি মুহূর্তে প্রতিদিনে একটু একটু করে বাড়তে লাগলো জীতু। স্বাস্থ্যে সৌন্দর্যে এবং প্রাণ চাঞ্চল্যে বয়সের দিক থেকে অনেক দূর এগিয়ে গেল সে। কিন্তু ওর কথা বলা আর হলো না। মাঝে মাঝে কিছু অসম্পূর্ণ শব্দ করতে পারে ঠিকই। বাবা-মাকে মোটামুটি বুঝাতেও পারে ইশারায়। কিন্তু কথা। কিছুতেই আর বলতে পারে না।
মাঝে মাঝে উত্তেজিত হয়ে বাবা-মার উপর হামলা করে। অনবরত কিল ঘুসি মেরে কাহিল করে ফেলে ওকে। কোন কোন দিন মায়ের চুলের মুঠি ধরে ছিঁড়তে থাকে গোছা গোছা চুল।
আত্মরক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে নীপা। তারপর একসময় বাধ্য হয়ে জোরে ধাক্কা দেয় জীতুকে এবং দৌড়ে গিয়ে অন্য ঘরের দরজা বন্ধ করে থাকে। তারপর একসময় কেঁদে ফেলে অসহায়ের মতো।
কোনো কোনো দিন নিজের অপরাধ বুঝতে পারে জীতু।
মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে হাউমাউ করে। বোঝাতে চেষ্টা করে আর সবার মতো কেন সে কথা বলতে পারে না। বাড়ন্ত বয়সের ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে নীপাও।
পাশের বাড়ির মেয়ে জেনির সাথে প্রায়ই দেখা হয় জীতুর।
কখনও দোতলার জানালায়, কখনও বা পেছনের বাগানে।
দু’জনে দু’জনকে দেখে হাসে। ইশারায় মনের ভাব প্রকাশের চেষ্টা করে।
এক অজানা আতঙ্কে নীপার বুকের ভেতররটা ধরে থাকে। লক্ষ্য করে যৌবনপ্রাপ্ত হয়েছে জীতু। তার সব কিছুই যে কাউকে, বিশেষ করে মেয়েদেরকে মুগ্ধ করার মতো। সুদৃঢ় শারীরিক গঠন, অবয়ব, হাঁটার আর তাকাবার ভঙ্গি, নিঃসন্দেহে অন্যকে আকর্ষণ করার মতো। জীতুর কাছাকাছি না এলে কেউ টেরই পাবে না যে এই রাজপুত্রের মতো ছেলেটা কথা বলতে পারে না।
কিছুদিন থেকেই নীপা লক্ষ্য করছে কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে জীতু। আগের মতো যখন-তখন চিৎকার করেনা, অথবা মাকে আক্রমণ করে না। কখনও দোতলার জানালায় অথবা পেছনের বারান্দার সিঁড়িতে বসে থাকে। নীপা কখনও কখনও এসে বসে জীতুর পাশে। ওর মাথায় হাত বুলায়। অশ্রুশিক্ত চোখে হাসতে চেষ্টা করে ছেলের চোখে চোখ রেখে। মায়ের কাঁধে মাথা রাখে জীতু। এক সময় উঠে গিয়ে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদে নীপা। একি বিচার বিধাতার? কোন মহাপাপে তার এ শাস্তি...? কেন তার এই দুর্বিষহ জীবন...?
নীপা দেশের পড়া শেষ করে, তারপর পড়েছে লন্ডন কিংস কলেজে। পড়তে পড়তে ফাইনাল ইয়ার, সেখানেই তুখোড় ছাত্র রাশেদের সাথে আলাপ। তারপর প্রেম এবং বিয়ে। বাড়ির সবার অমতেই রাশেদকে বিয়ে করেছিলো নীপা।
বাবা-মা বলেছিলেন, বিদেশে বিয়ে করে দেশ ছাড়া হয়ে যাবি?
নীপা তখন রাশেদের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। ও বলেছিলো-
রাশেদের জন্যে দেশ কেন আমি দুনিয়া ছেড়ে যেতে পারি।
সেই নীপা..., সেই ক্যারিয়ার পাগল নীপা, সব ছেড়ে দিলো একমাত্র অসুস্থ ছেলে জীতুর জন্য। কবে কোন ইউনিভার্সিটির সেরা ছাত্রী ছিলো...? কবে কোন বড় কোম্পানিতে একটা ভালো চাকরি করে অনেকের ঈর্ষার পাত্রী হয়েছিলো...? সেই সব আজ আর মনে পড়ার ফুরসত হয় না। মনে পড়ে না জীতু হবার পর থেকে কবে নিজেকে গৃহবন্ধী করে রেখেছে। বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে পুরোন চেনা পৃথিবী থেকে। পরিবর্তন এসেছে এতো ভালোবাসার স্বামী রাশেদের জীবনেও। আজকাল অফিস শেষে ক্লাবে সময় কাটে তার বেশি।
কি হবে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে? একমাত্র ছেলেকে সুস্থ করার জন্য বহু বড় বড় ডাক্তার দেখিয়েছে। খরচ করেছে সাধ্য মতো কিন্তু ফল কিছুতেই হয়নি। আর হয়নি ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখা।
আজ কয়দিন ধরে পাশের বাড়ির জেনির কথা খুব মনে পড়ছে জীতুর। চঞ্চল উজ্জ্বল প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা মেয়েটি। ওকে দেখলেই বোঝাতে চেষ্টা করে ‘আই লাভ ইউ’ গোছের ভাব। ছোট্ট গেঞ্জি-স্কাট পরা যৌবন পুষ্ট নিটোল শরীরটা আরো টানটান হয়ে যায় জীতুকে দেখলে। কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠে জীতুর বুকের ভেতরটা। কেন? কেন এমন মনে হয় ওর। কেন এতো কষ্ট। সব বুঝতে পারে জীতু। সব অনুভব করে। অনেক অনেক জোরে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে ইচ্ছে করে জীতুর। পারে না।
মাথার মধ্যে যেন কেমন করতে থাকে।
এমনি সময় একদিন কলিং বেল বেজে উঠলো, মা নীপা বাথরুমে। নিচে দরজার কাছেই ছিলো জীতু। বেলের শব্দ শুনে যথারীতি দরজা খুলে দিলো এবং স্তব্ধ বিস্ময়ে দেখলো সামনে দাঁড়িয়ে পাশের বাড়ির জেনি। বাইরে কোথাও কোন শব্দ নেই, এমনকি শুকনো পাতা ঝরে যাওয়ারও না। রুদ্ধশ্বাস জীতুর দু’টো চোখ জেনির চোখে স্থির।
উত্তপ্ত শ্বাস জেনিরও। কয়েক মুহূর্তের ব্যবধান মাত্র-হঠাৎ করে দু’বাহু বাড়িয়ে জীতুকে বুকে জড়িয়ে ধরলো জেনি এবং বলতে লাগল আই লাভ ইউ ডার্লিং, আই লাভ ইউ।
দাঁতে দাঁত চেপে ঘামতে লাগল জীতু। আপ্রাণ চেষ্টা করলো নিজেকে শক্ত রাখতে।
নাহ, আর যেন পারে না জীতু নিজেকে ধরে রাখতে। থর থর করে কাঁপছে ওর সারা শরীর। প্রলঙ্করী এক ভূমিকম্পে যেন এখনই তলিয়ে যাবে সে।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই নিজেকে প্রচন্ডভাবে সামলে নিলো জীতু। ঝট করে নিজেকে মুক্ত করে নিল সে। আর তারপরই সজোরে দুই চড় মারলো জেনির গালে। বিস্মিত ও স্তব্ধ জেনি।
তখনই ওপর থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে থেমে গেল নীপা, বিস্মিত হয়ে ঘটনার আকস্মিকতায় বিস্ময়ে স্তব্ধ গায়ে পড়া মেয়ে জেনিও। এরকম ঘটনার জন্য সে প্রস্তুত ছিলো না। ভেবেছিলো ওর রূপ যৌবন জীতুর মতো একটা বোবা ছেলেকে বশীভূত করে ফেলবে। জীতুর কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে ধন্য হয়ে যাবে জেনি।
কিন্তু না। তা হতে দেয়নি জীতু।
প্রকৃতি এবং নিয়মিত পরিহাসে বাকশক্তি নেই তার সত্যি, কিন্তু মায়ের যে স্বপ্ন চেতনা আর রক্তবিন্দু থেকে তার জন্ম তাকে অসম্মান হতে দেয়নি জীতু।
দরজা দিয়ে বেরিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো জেনি।
আশপাশের দু’একজন এগিয়ে এলো, জেনি বলতে লাগলো- তার খেলার বলটা জীতুদের বাগানে পড়ে যাওয়ায় সে আনতে গিয়েছিল, আর সেই সুযোগে ওকে অসম্মান করার চেষ্টা করেছে জীতু।
এক পর্যায়ে জেনির অফিস ফেরত বাবাও এলো। জানালো এর একটা বিচার হওয়া চাই। যদিও ঘটনাটা জেনির সাজানো। তারপরও জোড় হাতে মাফ চাইলো রাশেদ। জানালো মানসিকভাবে সে অসুস্থ।
কিন্তু সত্যি কি তাই? মা নীপার। চোখের দেখা সব।
কিন্তু তারপরেও ঘটনা ঘটনাই।
রাশেদ একবার কথাও তুলেছিলো যে রিটারডেট হোমে জীতুকে দিয়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু কিছুতেই রাজি হয়নি নীপা। বলেছে- আমার ছেলের ঝামেলা আমি বইবো। এ নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজি হতে হলো নীপাকে।
ড্রইং রুমের একটা সোফায় গুম হয়ে বসে ছিলো জীতু। নীপা গিয়ে বসলো ছেলের পাশে। গায়ে মাথায় হাত বুলালো এবং জড়িয়ে ধরে অনেক চুমো খেলো।
একসময় নীপা বলল- যেখানে তোকে পাঠাচ্ছি সেখানে অনেক বন্ধু পাবি। এখন বড় হয়েছিস। মা-বাবার কাছে কি সবসময় থাকতে হয়...? দেখবি সেখানে তোর খুব ভালো লাগবে। আমি সবসময় তোকে দেখতে যাব। এতোগুলো কথার পর ভাব ভঙ্গিতে কোন পরিবর্তন এলো না জীতুর। কেমন করে যেন বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলো। রাতে কিছুই খেলো না এবং তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লো জীতু।
এদিকে নীপার কান্না যেন আর শেষ হয় না। কোন প্রাণে এরকম একটি ছেলেকে কাছ ছাড়া করবে সে?
তারপর একদিন সত্যি সত্যি হোমে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো জীতু। গাড়িতে ওঠার আগে একবার তাকালো পাশের বাড়ির জানালার দিকে। না সেখানে জেনি নেই। জেনি দাঁড়িয়ে ছিলো রাস্তার পাশের গাছের নিচে। কি মনে করে হাত নাড়লো জেনি।
চোখ ভিজে এলেও মুখ ফিরিয়ে নিয়ে গাড়িতে উঠলো জীতু। বসলো মায়ের পাশে।
এতো দিনের পরিচিত বাড়ি, বাগান, রাস্তাঘাট, দু’ধারের গাছপালা, মাথার উপর খোলা আকাশ, সবকিছুকে পেছনে ফেলে জীতুর গাড়ি রওনা হয়ে গেল রিটারডেট হোমের ঠিকানায়...।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT