মহিলা সমাজ

সুইস ব্যাংকের আদ্যোপান্ত

মারিয়া ইসলাম সেতু প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৫-২০১৯ ইং ০১:০৯:৩৩ | সংবাদটি ৪৯ বার পঠিত

সুইস ব্যাংক- নামের সঙ্গেই একগাদা প্রশ্ন আর কৌতূহল মনে এসে ভিড় করে। বৈধ হোক আর অবৈধ হোক, অর্জিত টাকা নিরাপদে গচ্ছিত রাখতে বিশ্বের সব নামী-দামী আর বিত্তবান লোকদের প্রথম পছন্দ এই সুইস ব্যাংক।
সুইস ব্যাংক নিয়ে মানুষের মনে বড় বড় দুটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। প্রথমটি হল ‘সুইস ব্যাংক একটি একক ব্যাংক।’ আসলে সুইস ব্যাংক বলতে কোন একক ব্যাংককে বোঝানো হয় না, বরং সুইস ফাইন্যান্সিয়াল মার্কেট সুপারভাইজরি অথোরিটি (Swiss Financial Market Supervisory Authority-FINMA) এবং সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে থাকা প্রায় তিন শতাধিক ব্যাংককে একসঙ্গে সুইস ব্যাংক বলা হয়, যাদের মধ্যে ইউবিএস ক্রেডিট সুইস অন্যতম। ব্যাংকিং খাতে সুইসরা এতটাই সুনাম কুড়িয়েছে যে এক জেনেভা শহর কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একশ’র বেশি ব্যাংক। দ্বিতীয় ভুল ধারণাটি হলো, অনেকেই ভাবে সুইস ব্যাংকে কেবল বুঝি বিত্তবানরাই এ্যাকাউন্ট খুলতে কিংবা টাকা রাখতে পারে। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। সংশ্লিষ্ট নিয়মনীতিমালা মেনে এবং কিছু নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রাপ্তবয়স্ক যে কেউ খুলতে পারে তার সুইস ব্যাংক এ্যাকাউন্ট। এমনকি একটি পাসপোর্ট থাকলেই তা সম্ভব!
সুইস ব্যাংক কেন এত জনপ্রিয়?
টাকা নিরাপদে গচ্ছিত রাখতে দুনিয়াজুড়ে সুইস ব্যাংকগুলোর জুড়ি মেলা ভার। কেননা এরা এদের গ্রাহকের পরিচয়, ব্যাংক ব্যালান্স থেকে শুরু করে যাবতীয় তথ্যাদি অত্যন্ত কঠোরতার সঙ্গে গোপন রাখে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আরও কিছু দেশের চাপের মুখে ব্যাংকগুলোর এই কঠোর গোপনীয়তা নীতি অনেকটাই শিথিল করা হয়েছে। কেননা এই নীতিমালার সুযোগ নিয়ে অনেক দেশেরই অপরাধী, দুর্নীতিবাজ এবং কর ফাঁকি দেয়া লোকজন তাদের অবৈধ অর্থ গোপন করছে এবং দেশের বাইরে পাচার করে দিচ্ছে। তাই এসব অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে সুইস ব্যাংকগুলো বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে তাদের গ্রাহকদের তথ্যাদি প্রকাশ করতে সম্মত হয়েছে। সুইস ব্যাংকের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, যে কোন ধরনের অপ্রত্যাশিত এবং অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা বা দুর্যোগের কারণে যদি কোন গ্রাহকের ব্যাংক ব্যালান্স বা এ্যাকাউন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে সুইস ব্যাংক তার পরিপূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিতে বদ্ধপরিকর। যার কারণে তূলনামূলক অস্থিতিশীল এবং ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশগুলোর মানুষের টাকা রাখার অন্যতম নির্ভরতার নাম হলো সুইস ব্যাংক। এছাড়াও বিগত ৫০০ বছরে সুইসরা বড় কোন যুদ্ধে জড়ায়নি যার ফলে তাদের অর্থনীতি ভীষণ স্থিতিশীল।
কিভাবে সুইজারল্যান্ড ব্যাংকিং সেবার জগতে সবচেয়ে বড় নির্ভরতার জায়গা দখল করেছে তার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ১৩ শতকের শুরুর দিকে ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অর্থ ব্যবসায়ীরা সুইজারল্যান্ডে পাড়ি জমায়, যাদের বেশিরভাগই ছিল ইহুদি। মধ্যযুগে ইতালি, জার্মানি কিংবা ফ্রান্সের মতো পরাশক্তি দেশগুলোর মাঝেও তুলনামূলক ছোট দেশ সুইজারল্যান্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট হয়ে ওঠে, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল জেনেভা। ১৭ শতকের গোড়ার দিকে সেই জেনেভাকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে। ১৭৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সুইজারল্যান্ডের প্রথম ব্যাংক ‘Wegelin and Co’’। ১৮৫৪ সালে ৬টি ব্যাংক মিলে গঠন করে ‘সুইস ব্যাংক করপোরেশন।’ ১৯ শতকে যখন ইউরোপসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশে যুদ্ধের সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে, তখন বিত্তশালীরা সুইস ব্যাংককে বেছে নেয় তাদের অর্থ রাখার জন্য। জানা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে যখন জার্মানিতে ইহুদিরা নাৎসীদের শুদ্ধি অভিযানের মুখে পড়ে, তখন তাদের অর্থ গোপন ব্যাংক এ্যাকাউন্টে রাখার মাধ্যমে সুইস ব্যাংকগুলোর ব্যবসার শুরু। তবে তারও আগে ফ্রান্সের কয়েকজন রাজনীতিক এবং ব্যবসায়ীর সুইস ব্যাংকে বিপুল পরিমাণের অর্থ গচ্ছিত রাখার তথ্য ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। আর তার প্রেক্ষিতে সুইস ব্যাংক তাদের গোপনীয়তা রক্ষার আইন প্রতিষ্ঠিত করে। পরবর্তীতে এই আইন হয়ে ওঠে সুইস ব্যাংকের ব্যবসার মূল চাবিকাঠি। এই আইনকে পুঁজি করে ব্যাংকগুলো ক্রমশ ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে। অঢেল অর্থ গোপন এবং পাচার করতে তৃতীয় বিশ্বের দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক থেকে শুরু করে পশ্চিমা বিশ্বের কর ফাঁকি দেয়া বিত্তশালী ব্যবসায়ী- সবার পছন্দের শীর্ষে উঠে আসে সুইস ব্যাংকগুলো।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT