ইতিহাস ও ঐতিহ্য

একাত্তরে হাকালুকি

সৈয়দ আলতাফ হোসেন খলকু প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৫-২০১৯ ইং ০০:১৬:০৬ | সংবাদটি ৫৮ বার পঠিত

মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্ণেল এমএজি ওসমানী (পরে জেনারেল) ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি নির্দেশ দেন তাদের একটি অংশকে দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে আত্মগোপন থেকে গেরিলা পদ্ধতিতে শত্রুর উপর আক্রমণ চালাতে হবে। এমনি একটি সাহসী ও ঝুকিপূর্ণ অপারেশনের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ভারতের কুকিরতল ক্যাম্প থেকে ২৮ সদস্যের মুক্তিযোদ্ধা দল রাতের বেলা বেরিয়ে পড়েন। তাদের পরিকল্পনা ছিলো সীমান্ত পাড়ি দিয়ে রাতের মধ্যেই হাকালুকি হাওর পাড়ি দিয়ে বরমচালের পাহাড়ে গিয়ে অবস্থান গ্রহণ করা। দলটির কমান্ডার ছিলেন বিয়ানীবাজার থানার তজমুল আলী (যিনি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মুজমিল আলীর ছোট ভাই)। গাইড কর্তৃক রাতের বেলা পাহাড়ের ভিতর রাস্তা ভুল করার কারণে তা খোজে পেতে অনেক সময় নষ্ট হয়। তাই পাহাড় অতিক্রম করতেই শেষ রাত হয়ে যায়। এমতাবস্থায় দমে না গিয়ে অত্যন্ত ঝুকি নিয়ে তারা অগ্রসর হতে থাকেন, এবং এক পর্যায়ে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল পথের ‘ঘেট ঘর’ নামক স্থান দিয়ে রেললাইন অতিক্রম করার সময় টহলরত একদল রাজাকারের সাথে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে রাজাকাররা পালিয়ে গেলেও তাদের একটি বুলেটের আঘাতে আনোয়ার নামক এক মুক্তিযোদ্ধা মারাত্মক ভাবে আহত হন। সময় নষ্ট না করে আহত মুক্তিযোদ্ধাকে দু’জন মুক্তিযোদ্ধার কাধে ভর করায়ে সম্মুখের ধান ক্ষেত দিয়ে অগ্রসর হয়ে সুজানগর ইউনিয়নের চানপুর নামক গ্রামে গিয়ে তারা পৌঁছেন। জায়গাটা ছিলো টিলা সমৃদ্ধ জঙ্গলাকীর্ণ এলাকা। সেখানে আহত আনোয়ারের সাথে আরও দু’জন মুক্তিযোদ্ধাকে রেখে বাকী দলটি সম্মুখে অগ্রসর হতে থাকে। পরিশ্রান্ত দলটি এক পর্যায়ে সুজানগর গ্রামের তৈয়বুর রহমান মাস্টার সাবের বাড়িতে পানি পানের জন্য সামান্য যাত্রা বিরতি করে আবার হাকালুকির দিকে অগ্রসর হয় এই অবস্থায় প্রভাত হয়ে যায়। হাকালুকিতে যাওয়ার পথে কয়েকটি রাজাকার দূর থেকে তাদের প্রতি গুলি ছোঁড়ে। মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা গুলি ছোড়লে তারা আর অগ্রসর হয়নি। কিছুক্ষণের মধ্যে তারা হাওর পাড়ের দশঘরী গ্রামে পৌঁছেন। সুজানগর ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার চাঁন মিয়ার বাড়িতে গিয়ে উঠেন। সেখানে পুরো দলটির খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
এদিকে মুক্তিযোদ্ধা দলটির আগমনের সংবাদ সারা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং বড়লেখায় অবস্থিত পাকসেনাদের ক্যাম্পেও খবর পৌঁছে যায়। খাওয়া শেষে সামান্য বিশ্রাম নেয়ার এক পর্যায়ে কমান্ডার মনে করেন যে পূর্ব পরিকল্পনানুযায়ী দিনের বেলা হাকালুকি দিয়ে অগ্রসর হয়ে ঘিলাছড়া বা বরমচালের দিকে যাওয়া মোটেই নিরাপদ নয়। তাই দিনটি হাওরের অপেক্ষাকৃত কোন নিরাপদ স্থানে আত্মগোপন করে কাটানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চাঁন মিয়া মেম্বারের সহযোগিতায় বড় একটি খেয়া নৌকার ব্যবস্থা করে তাতে উঠে হাওরের উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে ‘মালাম’ নামক বিলের নল খাগড়া ও ঝোপ ঝাড়ে আচ্ছাদিত ‘হিংডহর’ নামক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করেন। হিংডহরের কান্দিতে থাকা নল খাগড়া ও প্রচুর লতাগুল্ম জোগাড় করে এবং দশঘরী থেকে সঙ্গে নিয়ে আসা কলাগাছ দিয়ে বিলের কান্দিতে কয়েকটি শক্ত মাঁচা তৈরি করেন তারা। মাচার উপর অস্ত্রশস্ত্র মোতায়েন করে মোটামুটি যতোদূর সম্ভব একটি শক্ত ডিফেন্স তৈরি করে, স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে পুরোপুরি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন।
এদিকে, সিনিয়র এক পাক সেনা অফিসারের নেতৃত্বে ৫০ সদস্যের এক সু-সজ্জিত রাজাকারের দল দশঘরী থেকে বড় দু’টি ছৈয়া নৌকা যোগে তাদের খুঁজে বের হয়। বেলা প্রায় দুই ঘটিকার সময় রাজাকার দলটি মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান খোঁজে পায়। জোরে শব্দ করে কথা বললে শুনা যাবে এ রকম দূরত্বে উভয় দল। রাজাকারদের বদ্ধমূল ধারণা ছিলো যেহেতু মুক্তিযোদ্ধা দলটি সীমান্ত থেকে ১০-১২ মাইল ভিতরে সঙ্গে বহন করে নিয়ে আসার মত-সামান্য গুলাবারুদ নিয়ে বিপদজনক অবস্থায় চারিদিকে ্রত্রু বেষ্টিত হয়ে পড়েছে তাই তারা যুদ্ধ না করে আত্মসমর্পণ করে ফেলবে। সেই হিসাবে তারা চিৎকার করে আত্মসমর্পণ করার আহবান জানায় মুক্তিযোদ্ধাদেরকে।
মুক্তিযোদ্ধারা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তা প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে আমরা তোমরা অর্থাৎ রাজাকারদের সাথে যুদ্ধ করতে আসিনি। তোমরা চলে যাও। পাক সেনাদের পাঠাও। কিছুক্ষণ এভাবে বাদানুবাদ চলার এক পর্যায়ে এক মণিপুরী রাজাকার তার এলএমজি থেকে গুলি ছোঁড়লে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। উভয় পক্ষের রাইফেল আর মেশিনগানের গগণবিদারী আওয়াজে নিরব হাকালুকি হাওর প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। রাজাকারদের অবস্থান ছিলো নৌকায় অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধারা ছিলো বিলের কান্দিতে মাটির স্পর্শে, হাটু পরিমাণ জলে। তাই মুক্তিযোদ্ধারা ছিলো সুবিধাজনক অবস্থানে। প্রচন্ড এই গুলাগুলির শব্দ চারিদিকে ৬-৭ মাইল দূর থেকেও শব্দ শুনা যাচ্ছিল। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এলাকার জনগণ মুক্তিযোদ্ধাদের বর্তমান এই অবস্থান নিয়ে যুদ্ধ করে কি পরিণতি ঘটে তা ভেবে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেন। সকলের মন চিন্তিত ও ব্যথিত হয়ে উঠে। সীমান্ত থেকে অনেক ভিতরে। চারিদিক শত্রু বেষ্টিত, সঙ্গে বহনকরে নিয়ে আসা যৎসামান্য অস্ত্র ও গুলাবারুদ। জলাশয় বেষ্টিত স্থানে অবস্থানে অস্ত্র বা গুলাবারুদ যোগান দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ঐ প্রতিকুল অবস্থান থেকে যুদ্ধ করে নিজেদের রক্ষা করা কি করে সম্ভব। তাই সবার ধারণা ছিলো শেষ পর্যন্ত তাদেরকে আত্মসমর্পণ করতেই হবে এবং প্রচুর প্রাণহানী ঘটবে।
রাজাকাররা নৌকায় থাকায় যুদ্ধ চলাকালীন এই মুহূর্তে তাদের অবস্থান ছিলো বিপদজনক। তাই রাজাকারদের নৌকা যুদ্ধ করতে থেকে থেকে পিছু হঠতে থাকে। নিরাপদ দূরত্বে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। ঠিক এই অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের ছোড়া একটি মর্টার সেল রাজাকারদের নৌকার দিকে নিখুঁত ভাবে ধেয়ে আসতে দেখে তাদের পাক অধিনায়ক সবাইকে তড়িৎ গতিতে পানিতে ঝাপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেয়া মাত্র তারা সকলেই পানিতে ঝাপিয়ে পড়ে। মর্টারটি নৌকার মধ্যখানে এসে পড়ে বিস্ফোরিত হলে নৌকাটি টুকরো টুকরো হয়ে চারিদিকে উড়ে যায়। পানিতে পড়ে প্রাণে বাচলেও গভীর পানিতে অসহায়দের মতো দিক বিদিক সাতার কাটতে লাগল। পানিতে অসহায়ভাবে সাঁতার কাটা অবস্থায় মুক্তিযোদ্ধারা তাদেরকে মেরে ফেলার জন্য আর গুলি করেনি। যুদ্ধ শেষে এসে রাজাকাররা নিজেই বলেছে এই অবস্থায় ইচ্ছা করলে তারা আমাদেরকে এক এক করে গুলি করে মেরে ফেলতে পারত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ধ্বংস হয়ে যাওয়া নৌকার রাজাকাররা কোন মতে সাঁতরে বিলের তীরে আশ্রয় নেয়। সাথে থাকা অন্য নৌকা থেকে দূরবর্তী অবস্থান থেকে গুলাগুলি চলতে থাকে। এভাবে দুপুর ২টা থেকে ওর হওয়া সংঘর্ষ সন্ধ্যার পূর্ব পর্যন্ত চলে বন্ধ হয়।
ঐ যুদ্ধে পাক অধিনায়ক বুকের ডান দিকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মকভাবে আহত হয়। জানামতে, কোনো রাজাকার নিহত হয়নি। তবে অনেকের ধারণা আরও অনেক হতাহত হয়েছেন তবে কর্তৃপক্ষ তা গোপন রেখেছেন। অন্যদিকে দু’জন মুক্তিযোদ্ধা নিহত হয়েছেন এবং কমান্ডার তজমুল আলী বুকের ডান পাশের গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন। যুদ্ধের এই শোচনীয় অবস্থার পর পাক সেনারা রাতেরবেলা তাদের নিয়মিত বাহিনী ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হাওরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অবরোধ করে রাখার জন্য তাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে নির্দেশ পাঠায়।
এদিকে রাত নামার সাথে সাথে এক মুহূর্তও দেরী না করে মুক্তিযোদ্ধারা স্থান ছেড়ে চলে যায়। চারিদিকে শত্রুসেনার অবস্থান ও অবরোধকে ফাঁকি দিয়ে তাদেরকে বোকা বানিয়ে কেমন করে যে তার নির্বিঘেœ এখান থেকে চলে যেতে সক্ষম হল তা ছিলো সত্যিই একটি আশ্চর্যের বিষয়। সারা এলাকাজুড়ে তা আলোচনার ঝড় তুলেছিলো। ভয়কে জয় করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে স্বাধীনতা এনে দিতে ইম্পাত কঠিন শপথ নিয়ে যুদ্ধ করতে ঢুকেছিলো তারা দেশের অভ্যন্তরে। হাকালুকি হাওরের বুকে বীরের মতো লড়াই করে সঙ্গের দুই সাথীকে এখানে চির বিদায় জানিয়ে তারা চলে গিয়েছিল আবার অজানার পথে, স্বাধীনতার খোঁজে।
অন্যদিকে চাঁনপুরে থেকে যাওয়া আহত আনোয়ার ও দুই মুক্তিযোদ্ধার একজন আনোয়ারের জন্য কিছু জরুরি ঔষধ ও খাদ্যের আশায় জঙ্গলের পাশ্ববর্তী এক বাড়িতে গিয়ে সাহায্য চায়। কিন্তু বাড়িওয়ালা লোকটি খাদ্য বা সাহায্য করলোই না উল্টো পিচ কমিটির কাছে তাদের কথা জানিয়ে দেয়। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে রাজাকাররা এসে জঙ্গলটি ঘিরে ফেলে তাদের খুঁজতে থাকে। সুস্থ দু’জনকে খোঁজে না পেলেও আহত আনোয়ার শেষ পর্যন্ত দু’হাত তুলে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলে এই অবস্থায় এক কুলাঙ্গার রাজাকার তাকে গুলি করে শহীদ করে। আনোয়ারকে চানপুরে কবর দেয়া হয়।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার পিতা-মাতা এসে তার কবর জিয়ারত করে গেছেন। তার নামানুসারে ঐ এলাকার নামকরণ করা হয়েছে আনোয়ার নগর। স্বাধীন হওয়ার পর কমান্ডার তজমুল আলীর সাথে পুরো মুক্তিযোদ্ধা দলটি সুজানগর সফর করে গেছেন। যুদ্ধের বর্ণনা দিতে গিয়ে তজমুল আলী বলেছিলেন ‘যুদ্ধের শেষের দিকে যখন মাত্র ১০/১৫ মিনিট যুদ্ধ চালিয়ে যাবার মতো গোলাবারুদ তাদের হাতে অবশিষ্ট ছিলো ঠিক সেই মুহূর্তে রাজাকাররা যুদ্ধ বন্ধ করে দেয়। নতুবা আর ২০ মিনিটের মতো যুদ্ধ তারা চালিয়ে গেলে তাদের দিক থেকে আর গুলি ছোড়া সম্ভব হতো না। পরাজয় বরণ করতে হতো। বলতে হয় হাকালুকি হাওরের এই যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক সাহসী যুদ্ধ-সাহসী প্রত্যাবর্তন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT