ইতিহাস ও ঐতিহ্য

রাজারগাঁওয়ের গুণীজন

সিরাজ উদ্দীন আল হুসাইনী প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৫-২০১৯ ইং ০০:১৬:৩১ | সংবাদটি ২০১ বার পঠিত

হযরত মাওলানা শেখ আব্দুল ওয়াহিদ (রহ.) শেখ সাব বলে হিন্দু মুসলিম সবার কাছে পরিচিত ও সম্মানিত ছিলেন। সিলেটের কৃতি সন্তান শাইখুল হাদিস মাওলানা শেখ আব্দুল ওয়াহিদ (রহ.) ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবীদ, মুমতাযল মুহাদ্দিসীন ও উস্তাযূল আসাতিযা। ১৯০৮ সালে পাইক রাজ গ্রামে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন এবং ইমদাদুল ইসলাম কওমি মাদরাসা, ঝিঙ্গাবাড়ী মাদরাসা, সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা ও কলিকাতা আলিয়া মাদরাসায় কৃতিত্বের সাথে অধ্যয়ন করেন। সকল স্তরের পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে তিনি প্রভুত জ্ঞান ভান্ডারের অধিকারী শিক্ষক মন্ডলীর ভুঁয়সি প্রশংসা অর্জন করেছেন। বৃত্তি ও স্বর্ণ পদক লাভ করে ফখরুল মুহাদ্দিসীন ডিগ্রি অর্জন করেছেন। অসাধারণ প্রতিভা, অপূর্ব মেধাবী, বিচক্ষণ বুদ্ধিমত্তা ও চরিত্র মাধুরী হযরত শাইখ ইমদাদুল ইসলাম মাদরাসা থেকে কর্ম জীবনের সূচনা করেন। ১৯৩২ সালে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষক নিযুক্ত হন। তখন তাযকিয়ায়ে নফস বা আত্মশুদ্ধির প্রবল বাসনা তাকে ব্যাকুল করে তোলে। তাই রাহবারে তরীকত শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) এর কাছে বাইআত গ্রহণ করেন। অতঃপর ১৯৫৬ সালে ইযাযত লাভ করেন। ১৯৬৮ সালে সিলেট আলিয়া মাদরাসা থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তখন রাজারগাঁও এলাকার আলিম সমাজ ও মুরুব্বিগণ তাকে মখযনুল উলুম মাদরাসার মুহতামিম নিযুক্ত করেন। ১৯৮১ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। প্রভুত জ্ঞান, মহৎ গুণ, বৃহৎ চরিত্রের সমাহার, সুডৌল, সুন্দর ও সুবাসী সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রাজ্ঞ আলিম হযরত শাইখের সুযোগ্য ছাত্রগণ রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে জাতির সেবা দানে দেশ বিদেশে কর্মরত আছেন।
ড. আব্দুল হামীদ : আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষাবিদ যিনি ১৯৩০ সালে উমাইরগাঁও গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। মধ্যবিত্ত পরিবারে পৈতৃক পেশা কৃষি কাজের ফাঁকে ফাঁকে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে লেখাপড়ার সূচনা করেন। এখানেই ধরা পড়ে তার মেধা ও প্রতিভার নিদর্শন। পিতা বরকত উল্লাহর হাল চাষে তিনি সহযোগিতা করতেন। তাই শিক্ষক মহোদয় বলতেন, সময় পেলেই স্কুলে চলে এসো। জ্ঞান অর্জনের প্রেরণায় তিনি ভর্তি হলেন আঙ্গারজুর স্কুলে, অতঃপর সিলেট হাই মাদরাসায়। এখান থেকে মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে বোর্ডের প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে সর্বোচ্চ বৃত্তি লাভ করেন। তারপর এমসি কলেজে ক্লাস ও স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়াতে চাকুরি গ্রহণ করেন। তখনকার একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি তার গুণে মুগ্ধ হয়ে নিজ কন্যাকে তার কাছে বিবাহ দেন। শ্বশুড়ের অর্থানূকুল্যে তার মেধা ও প্রতিভাকে সমৃদ্ধ ও বিকাশ করে জ্যোতির্মন্ডিত ভবিষ্যৎ নির্মিত হয়। চলে গেলেন ঢাকা ভার্সিটিতে। সেখানে অধ্যয়ন করে চাকুরি নিলেন রাজশাহী ভার্সিটিতে। সেখানে অধ্যাপনা করলেন। অতঃপর উড়ে গেলেন সাত সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের মাঞ্চিটারে। ডিগ্রি নিলেন ডক্টরেট। সম্মান কুড়ালেন আন্তর্জাতিক। লাভ করলেন বিরল স্বর্ণ পদক। তার তীক্ষ্ম জ্ঞান গরীমায় আকৃষ্ট হয়ে লিবিয়া সরকার তাকে উচ্চ বেতনে চাকুরি দিয়ে টেনে নিলেন মধ্যপ্রাচ্যে। আবার চলে এলেন ঢাকা ভার্সিটিতে। তিনি লন্ডন, আমেরিকা, চীন, জাপান, রোম, জার্মান, রাশিয়া ও কানাডাসহ বিশ্বের ৫২টি দেশে বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহন করে স্বর্ণ পদক লাভ করতঃ বিশ্ব খ্যাতি অর্জন করেছেন। জীব বিজ্ঞানের উপর লিখা জগতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী কয়েকটি বই তিনি রেখে গেছেন। বিশ্ব নন্দীত অনাড়ম্বর এই জীব বিজ্ঞানী ১৯৮৪ সালে ইন্তেকাল করেন।
উমাইরগাঁও নিবাসি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মাওলানা সিদ্দিক আলীর পুত্র নাসির উদ্দিন ছিলেন একজন লেখক ও সাহিত্যিক। মেয়ে হাজী নুরুন্নেছা হক ছিলেন আল ইসলাহ ও মুসলিম সাহিত্য সংসদের প্রাণপুরুষ মৌলবী নুরুল হকের সহধর্মিনী ও খ্যাতিমান লেখিকা। মাস্টার মঈন উদ্দীনের পুত্র আবু তাহের একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক। সংগ্রাম, ইত্তেফাক, বাংলাবাজার ও বাসস এর সাংবাদিক ছিলেন। ১৯৯২ সালে আমেরিকা চলে যান। সেখানে সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকার তিনি সম্পাদক। লন্ডন-সিলেটের যৌথ পরিচালনায় রুচিশীল শিল্প সাহিত্য, ইতিহাস ঐতিহ্য ও ধর্ম সংস্কৃতি সমৃদ্ধ ভিলেজ ডাইজেস্টের তিনি আমেরিকার প্রতিনিধি।
জাঙ্গাইল নিবাসী বিশিষ্ট শিক্ষাবীদ মাওলানা মুজাম্মিল আলীর পুত্র এম এম হুসাইন একজন সাংবাদিক ও সমাজসেবী। তিনি সাবেক স্পীকার আলহাজ্ব হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর এপিএস থাকাকালে বাদাঘাট সেতু নির্মাণের জন্য বিশেষ প্রচেষ্টা চালান। তার চেষ্টায় সেতু নির্মাণ হলে উত্তর সিলেটের উন্নয়নের দ্বার উন্মুক্ত হয়। বর্তমানে তিনি লন্ডনে আছেন।
নয়াগাঁও নিবাসি হাজী সিরাজুল ইসলামের পুত্র সাইদ চৌধুরী একজন তরুণ কবি, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। তিনি বর্তমানে যুক্তরাজ্যে আছেন।
পাগইল নিবাসি আব্দুস সোবহান (কালার বাপ) ছিলেন একজন প্রখ্যাত বিচারক। প্রায় ৩০ বছর তিনি হাঠখোলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। উপজেলা নির্বাচনে একসময় তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তখন তার সম্পর্কে একটি চমকপ্রদ বাক্য ‘বাপরে বাপ কালার বাপ’ দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। কালারুকা নিবাসি মাস্টার ইলিয়াসুর রহমানের পুত্র চেয়ারম্যান আ.স.ম. আব্দুল্লাহ (সায়স্তা মিয়া) ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন।
গুণীদের পদার্পণ : ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে বিশ্ব নন্দিত ইসলামি চিন্তাবিদ ফেদায়ে মিল্লাত মাওলানা সায়্যিদ আসআদ মাদানী (রহ.), বাহরুল উলুম আল্লামা মুশাহিদ (রহ.), কাঈদুল উলামা হাফিয মাওলানা ক্বারী আব্দুল করিম শাইখে কৌড়িয়া (রহ.), শাইখে তরীকত মাওলানা লুৎফুর রহমান শাইখে বর্ণভী (রহ.), শাইখুল হাদিস মাওলানা নূরুদ্দিন গহরপুরী (রহ.), মাওলানা আব্দুল লতিফ ফুলতলী (রহ.), আওলাদে রাসুল (সা.) আল্লামা সায়্যিদ আরশাদ মাদানী দা.বা.। বিশিষ্ট সাহিত্য সেবক মৌলভী নুরুল হক, সাবেক স্পীকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমান, দানবীর ড. সৈয়দ রাগীব আলী, সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতসহ আরও বিশিষ্ট জ্ঞানী গুণীজন রাজারগাঁও এলাকায় পদার্পণ করেছেন।

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সিলেট প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে ভাবনা
  • খাপড়া ওয়ার্ড ট্রাজেডি
  • জাদুঘরে হরফের ফোয়ারা
  • ইতিহাস গড়া সাত শক্তিমান
  • ভেজাল খাবার প্রতিরোধের ইতিহাস
  • বর্ষাযাপন : শহর বনাম গ্রামগঞ্জ
  • বর্ষা এলো বর্ষা
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • নবীদের স্মৃতিচিহ্নে ধন্য যে জাদুঘর
  • দর্শনীয় স্থান ও পর্যটন কেন্দ্র
  • ঐতিহ্যে অম্লান গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়
  • বিলুপ্তির পথে গরীবের ‘শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত’ মাটির ঘর
  • হারিয়ে যাচ্ছে হিজল গাছ
  • তালের পাখা প্রাণের সখা
  • জামাই ষষ্ঠী
  • বাঙালির অলংকার
  • জল-পাহাড়ের ’কাঁঠালবাড়ি’
  • সাগরের বুকে ইসলামি স্থাপত্য জাদুঘর
  • বাঙালির আম-কাঁঠাল
  • ঐতিহ্যের সিলেট
  • Developed by: Sparkle IT