ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন

আতিকুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৫-২০১৯ ইং ০০:১৭:১৬ | সংবাদটি ১৭০ বার পঠিত


[পূর্ব প্রকাশের পর]
(তাং- রোববার, ৩ মাঘ ১৪০৬ বাংলা, ১৬ জানুয়ারি ২০০০ খ্রি./ দৈনিক গিরিদর্পণ, রাঙ্গামাটি)।
ভুলের খেসারত টানা ক্ষতিকর। বৃহত্তর কল্যাণের লক্ষ্যে ভুল স্বীকারের হীনমন্যতা পরিত্যাগ করাই সঙ্গত। কিন্তু জনসংহতি সমিতি ভাংবে তবু মচকাবেনা, এরূপ একরোখা মনোভাবে পরিচালিত বলেই মনে হয়। আমরা এটা বুঝতে অপারগ যে, কেন দীর্ঘ দিনেও নিজেদের ক্ষমতার শূণ্য ভিত্তি সম্বন্ধে নেতৃবৃন্দ ওয়াকেবহাল হতে পারছেন না। এজন্য সংবিধান বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। দরকার নেই রাষ্ট্রনীতিক হওয়ার। সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং-১ ও ৫৯ এর মর্মবাণী অত্যন্ত সোজা।
মনে হয় জনসংহতি সমিতির নেতৃবৃন্দ সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং-২৮ (৪) কে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু তাতে অনগ্রসর বলে কেবল পার্বত্য উপজাতীয়রাই যে চিরকালের জন্য গণ্য হবেন তা অবশ্যই নয়। এবং বিশেষ বিধান লাভের সুযোগের অর্থ সংবিধান লঙ্ঘণ ও নয়। মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য বিধানাবলী, অনুচ্ছেদ নং-২৬ (১), (২) বলে অলঙ্ঘনীয়। এই বিধানাবলীর সাথে অসমঞ্জস আইন প্রণয়ন ও নিষিদ্ধ। ১৪২ অনুচ্ছেদে ব্যক্ত, সংসদের দুই তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনেও তা সম্ভব নয়। সুতরাং জনসংহতি সমিতির ভরসার ক্ষেত্র অত্যন্ত দুর্বল।
উপরোক্ত মূল্যায়নের আলোকে সংশ্লিষ্ট দফার নিম্নোক্ত উপদফাগুলোতে ব্যক্ত ক্ষমতাবলী অর্জনটাও দুরাশা মাত্র, যথা :
(খ) এই পরিষদ পৌরসভা সহ স্থানীয় পরিষদ সমূহ তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় করিবে।
(গ) তিন পার্বত্য জেলার সাধারণ প্রশাসন, আইন শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের ব্যাপারে আঞ্চলিক পরিষদ সমন্বয় সাধন ও তত্ত্বাবধান করিতে পারিবে।
(ঘ) পরিষদ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনাসহ এনজিওদের কার্যাবলী সমন্বয় সাধন করিতে পারিবে।
(ঙ) উপজাতীয় আইন ও সামাজিক বিচার আঞ্চলিক পরিষদের আওতাভুক্ত থাকিবে।
(চ) পরিষদ ভারি শিল্পের লাইসেন্স প্রদান করিতে পারিবে।
এই ক্ষমতার বহর অবশ্যই উল্লাসের বিষয়। কিন্তু আসলে যে পরিষদ তলাহীন ঝুড়ি, যার কোন ধারণ ক্ষমতা নেই। সর্বাগ্রে তার তলা লাগান দরকার। পার্বত্য চট্টগ্রাম কোন প্রশাসনিক অঞ্চলে পরিণত হলেই তবে আঞ্চলিক পরিষদের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্র অর্জিত হবে, নইলে সবই ঢাক ঢোল পিটান সার। লোক দেখানো বৈঠক, যাতায়াত, হম্বি তম্বি, আর আদর আপ্যায়নেই শেষ হবে সমন্বয় ও তত্ত্বাবধান। এই মাতবরীতে আঞ্চলিক পরিষদ খুশি হলে বলার কিছুই নেই। গাড়ি বাড়ি, বেতন ভাতা মাতবরী, আদর আপ্যায়ন আর ভিআইপির মর্যাদা, এ পাওনা কম কিসে! এ সন্তুষ্টি যথেষ্ট নয়। এখানে একটি প্রশ্ন উত্থাপন যোগ্য যে, পরিষদ হলো একটি স্থানীয় স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, এবং মূলতঃ সাধারণ শাসন ও আইন-শৃঙ্খলা কেন্দ্রাধীন বিষয়। এ হিসাবে কোন স্থানীয় স্বায়ত্ব শাসিত প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রাধীন বিষয়ের উপর হস্তক্ষেপের ক্ষমতা প্রাপ্য নয়। এই দুই খাতে আঞ্চলিক পরিষদের ক্ষমতার প্রাচুর্য্য দাবী নিতান্তই বাগাড়ম্বর। স্থানীয় পরিষদ আসলে কেন্দ্রাধীন প্রতিষ্ঠান। তার হাতে সাধারণ প্রশাসন আর আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ে তত্ত্বাবধান ও সমন্বয় সাধনের ক্ষমতা দান মানে প্রশাসন ও পুলিশকে তার অধীন ন্যস্ত করা। তাতে কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় হস্তান্তর ঘটে এবং প্রশাসনের আঞ্চলিক বিন্যাস অকার্যকর হয়ে যায়। সংবিধানের ধারা নং-১ এই রূপ জিম্মি করণের বিরোধী। এককেন্দ্রিক বাংলাদেশ রাষ্ট্র হলো মূলতঃ একক কেন্দ্রীয় শাসনাধীন দেশ। তার এই প্রশাসনিক ক্ষমতায় দ্বিতীয় কোন ভাগিদার হয় না। স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা, ক্ষমতার বিভাজন নয়, কেন্দ্রীয় ক্ষমতা পরিচালনায় যোগানদারী বা এজেন্সী। একে কর্তায় পরিণত করার কোন সুযোগ নেই। তাকে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের মোসাহেবিতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। মৌলিক ক্ষমতাক্রম হিসাবে প্রশাসনের অধস্তন হলো স্থানীয় শাসন ব্যবস্থা। প্রশাসনের উপর এর প্রাধান্য ও মাতবরী প্রাপ্য নয়। আইন ও শৃঙ্খলা হলো প্রশাসনেরই আওতাধীন বিষয়। এটা এটা পরিষদীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন হতে পারে না। নইলে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বিভাজিত হয়ে, আপনাতেই আঞ্চলিক ক্ষুদ্র সরকারের উদ্ভব ঘটবে, এবং রাষ্ট্রের এককেন্দ্রিকতা ক্ষুন্ন হবে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও ব্যবস্থা ছাড়াই দেশ হয়ে পড়বে একাধিক আঞ্চলিক রাজ্যের সমষ্টি। এমন বিশৃংখল অবস্থা কাম্য হতে পারে না।
যদি আঞ্চলিকভাবে ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণের পক্ষে জাতীয়ভাবে সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়, তখন বাংলাদেশকে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বৈধভাবেই ফেডারেল ষ্টেট বা যুক্তরাষ্ট্রে পরিণত করা যেতে পারে। এর বাহিরে অসাংবিধানিকভাবে, ক্ষমতার ভাগ বাটোয়ারা অনুষ্ঠিত হলে, দেশে বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে, এবং একের অনুসরণে অন্যরাও ক্ষমতার ভাগাভাগিতে উৎসাহিত হবে।
বিছিন্নতাবাদীদের বিশৃঙ্খলাই কাম্য। তবে অখন্ডতাবাদীদের শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে হবে। যদি জনসংহতি সমিতির বিচ্ছিন্নতা কাম্য না হয় এবং এক শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল বাংলাদেশই তাদের লক্ষ্য হয়ে থাকে, তাহলে তাদের বিশুদ্ধ এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র বা যুক্তরাষ্ট্র এ দুয়ের যে কোন একটি পদ্ধতির প্রতি সমর্থন দিতে হবে। দেশবাসীর জন্য তা হবে উৎসাহজনক। সার্বিক কল্যাণের স্বার্থে উপজাতীয় ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নয়, সার্বজনীন জাতীয় রাজনীতিটাই বাঞ্ছিত। উপজাতি আর বাঙালি বিভাজন, পার্বত্য রাজনীতিকে কলুষিত করছে।
[চলবে]

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • সিলেট প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে ভাবনা
  • খাপড়া ওয়ার্ড ট্রাজেডি
  • জাদুঘরে হরফের ফোয়ারা
  • ইতিহাস গড়া সাত শক্তিমান
  • ভেজাল খাবার প্রতিরোধের ইতিহাস
  • বর্ষাযাপন : শহর বনাম গ্রামগঞ্জ
  • বর্ষা এলো বর্ষা
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • নবীদের স্মৃতিচিহ্নে ধন্য যে জাদুঘর
  • দর্শনীয় স্থান ও পর্যটন কেন্দ্র
  • ঐতিহ্যে অম্লান গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়
  • বিলুপ্তির পথে গরীবের ‘শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত’ মাটির ঘর
  • হারিয়ে যাচ্ছে হিজল গাছ
  • তালের পাখা প্রাণের সখা
  • জামাই ষষ্ঠী
  • বাঙালির অলংকার
  • জল-পাহাড়ের ’কাঁঠালবাড়ি’
  • সাগরের বুকে ইসলামি স্থাপত্য জাদুঘর
  • বাঙালির আম-কাঁঠাল
  • ঐতিহ্যের সিলেট
  • Developed by: Sparkle IT