ধর্ম ও জীবন

মৃত স্বজনকে সাওয়াব পাঠানো প্রসঙ্গ

আব্দুস সালাম সুনামগঞ্জী প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৫-২০১৯ ইং ০১:২২:২১ | সংবাদটি ২৫০ বার পঠিত

শরীয়তের পরিভাষার কোনো নেক আমল তথা পুণ্যের কাজ সম্পাদন করে মৃত ব্যক্তির আত্মায় বা আমলনামায় প্রেরণ করে দেওয়াকে ঈসালে সাওয়াব বলা হয়। ঈসালে সাওয়াব একটি অন্যতম মহৎ কাজ। তা শরীয়তসম্মত তরিকা মত পালন করলে বিরাট উপকারী ও ফলদায়ক হয়। কিন্তু মনগড়া পদ্ধতিতে করলে সাওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ হয়ে যায়। অতএব এ সম্পর্কে সঠিক নিয়ম জেনে সেভাবে কাজ করা কর্তব্য। ঈসালে সাওয়াবের বহু প্রমাণ হাদিসে বর্ণিত আছে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেনÑহযরত সা’দ ইবনে উবাদা (রা.) এর মাতা ইন্তিকালের সময় তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সাথে জিহাদে ছিলেন। যখন জিহাদ থেকে ফিরে এলেন, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) এর খিদমতে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমার অনুপস্থিতিতে আমার আম্মা ইন্তেকাল করেছেন। এখন যদি আমি আমার সম্পদ থেকে তাঁর জন্য সদকা করি, তাহলে কি এর সাওয়াব তাঁর নিকট পৌঁছবে? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, হ্যাঁ, এর সাওয়াব তার নিকট পৌঁছবে। তখন হযরত সা’দ (রা.) বলেন, তাহলে আমি আপনাকে সাক্ষী রেখে আমার বাগান আমার আম্মার জন্য সদকা করে দিলাম। (বুখারি শরীফ)
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) বলেনÑযখন তোমরা কবরস্থানে যাবে, সেখানে সুরা ফাতেহা, সুরা ফালাক, সুরা নাস এবং সুরা এখলাস পড়ে এর সাওয়াব কবরবাসীকে পৌঁছাও, যা তাদের নিকট পৌঁছে যায়। ঈসালে সাওয়াবের জন্য কবরে গেলে ঈসালে সাওয়াব ও মাগফিরাতের দু’আ দ্বারা কবরবাসী উপকৃত হয়। আর যারা কবরে যাবেন, তাদের জন্য উত্তম হলো সেখানে পৌঁছে উপদেশ গ্রহণ করা তথা আমাকেও একদিন কবরে আসতে হবে তাই কবরের সম্বল অর্জন করি। (মাযাহিরে হক)
হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, যে ব্যক্তি কবরস্থানে যায় এবং সেখানে ‘কুলহু আল্লাহু আহাদ’(সুরা এখলাস) ১১ বার পড়ে, ইহার সাওয়াব কবরবাসীদেরকে পৌঁছালে কবরবাসীদের সংখ্যানুযায়ী পাঠক ব্যক্তি সাওয়াব পাবে। (মাযাহিরে হক)
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেনÑ রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কবরস্থানে গিয়ে সুরা ফাতেহা, সুরা এখলাস, সুরা তাকাসুর পাঠ করে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবে ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার পবিত্র কালাম থেকে যা কিছু এখন পাঠ করেছি এর সাওয়াব এই কবরস্থানে দাফনকৃত মু’মিন নারী পুরুষের নিকট পৌঁছে দাও। তাহলে কবরস্থানের দাফনকৃত মুর্দারা তার জন্য আল্লাহ তা’আলার কাছে সুপারিশকারী হয়ে যান। (মাযাহিরে হক, ২/৪৪৮, ৪৪৯)
হযরত হাম্মাদ মক্কী (রহ.) নিজের একটি ঘটনা বর্ণনা করেনÑ‘এক রাত্রে মক্কার এক কবরস্থানে পৌঁছেন। সেখানে একটি কবরের সাথে মাথা রেখে ঘুমিয়ে যান, হঠাৎ স্বপ্নে দেখেন মুর্দাগণ হালকা বানিয়ে বিভিন্ন দলে বসে আছেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কিয়ামত কি হয়ে গেছে? তোমরা তো সবাই কবর থেকে উঠে বাইরে বসে আছো! তারা বললেন না, বরং আমাদের ভাইদের থেকে এক ব্যক্তি সুরা এখলাস পড়ে এর সাওয়াব আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন, তাই আমরা এক বৎসর থেকে এখানে বসে সেই সাওয়াব আপোসে বণ্টন করছি। (মাযাহিরে হক, ২/৪৪৯ পৃষ্ঠা)
হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেনÑ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেনÑ‘যে ব্যক্তি কবরস্থানে গিয়ে ঈসালে সাওয়াবের উদ্দেশ্যে সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করে, আল্লাহ তা’আলা কবরবাসীদের আযাব লাঘব করে দেন। আর পাঠক ব্যক্তিকে কবরস্থানের মুর্দাদের সংখ্যানুযায়ী সাওয়াব দান করেন। (মাযাহিরে হক, ২/৪৪৯ পৃষ্ঠা)
ঈসালে সাওয়াবের উদ্দেশ্যে সামাজিক নিয়মানুসারে জিয়াফতের আয়োজন করা কি বৈধ? কোনো মানুষ মারা গেলে আমাদের দেশে আত্মীয়-স্বজনসহ এলাকার বা গ্রামের বহু লোককে মেহমানদারী করানো হয়, তা যদি রুসুম অনুযায়ী নির্দিষ্ট দিনে যেমনÑ৩ দিন, ১০ দিন, ৪০ দিন মৃত্যুবার্ষিকী প্রভৃতি হয়, তাহলে তা বিদ’আত হবে। আর নির্দিষ্ট দিন ছাড়া যেকোনো দিন এমনিতেই মৃতের রূহের সাওয়াব পৌঁছানোর জন্য জিয়াফতের আয়োজন করা যদিও শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়িয আছে, তবে বর্তমানে এটাও অনেকটা ফ্যাশন বা রুসুম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মৃতের বাড়িতে শোকের পরিবর্তে জিয়াফতের দরুণ বিবাহের জাঁকজমকের মতো অবস্থা হয়। অনেক স্থানে এসব আয়োজনে বেপর্দাসহ অসংখ্য গুনাহ হয়ে থাকে। আয়োজকদের অন্তরেও অনেক সময় লৌকিকতার মনোভাব থাকে। অনেকে সমাজের তিরস্কার থেকে বাঁচার জন্য এরূপ ব্যবস্থা করে থাকে। এসব কারণে অনেক সময় সাওয়াবের আসল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। এজন্য উত্তম হলো নিজের পিতা-মাতা বা আত্মীয়-স্বজনের জন্য ঈসালে সাওয়াবের উদ্দেশ্যে সামর্থ অনুযায়ী গোপনে গরীব-মিসকিনদেরকে খাওয়ানো বা দান করা বা কোনো মাদরাসার গরীব ফান্ডে লিল্লাহ বোডিং-এ দান করা। এতে দানের সাওয়াবের সাথে সাথে দ্বীনি ইলমের সহায়তা হিসেবে সদকায়ে জারিয়ারও সাওয়াব হাসিল করে। তাদের নামে মসজিদ-মাদরাসায়ও দান করা যায়। (ফাতওয়ায়ে শামী-২/২৪০, ইমদাদুল ফাতাওয়া ১/৭৭০)

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT